চেনাশোনার কোন্ বাইরে-২৫ ॥ সুশীল সাহা



‘…চোখের জলের লাগল জোয়ার’


দু’দিন ধরে কেবল এই গানটাই মনের মধ্যে গুনগুন করছে। দু’চোখের কূল ছাপানো এই জল বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে না। অথচ অন্তরে রচনা করেছে এক দুখের পারাবার। অন্তহীন সেই দুখের পারাবারে একলা পথিকের আকুল করা মন কেবলই যেন বলছে,
“…পথিক সবাই পেরিয়ে গেল ঘাটের কিনারাতে,
আমি সে কোন আকুল আলোয় দিশাহারা রাতে/”
আপনার এই চলে যাওয়া আমার মনের মধ্যে এমনই এক অদৃশ্য কান্নার হাহাকার তুলেছে। আপনার এই চলে যাওয়া তো আকস্মিক কিছু নয়। শরীর ও মন কীভাবে একটু একটু করে ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল, সে তো আমরা জানি। এই অল্প ক’দিনে আপনার কত প্রিয়জন চলে গেছেন। সেই অতল বিষাদময় দুঃখ সাগরে ভাসতে ভাসতে কতবার বেদনাদীর্ণ হয়েছেন আপনি। তাঁদের সেই গমনপথের ধূসর বিবর্ণ ছায়ায় আপনার অন্তরের উদ্গত অশ্রু বাষ্প হয়ে উবে গেছে কতদিন। এ সবই আমরা যত না চাক্ষুষ করেছি, তার চেয়ে বেশি করেছি অনুভব। এইতো কিছুদিন আগে কথাচ্ছলে বলেছিলেন, অচল হয়ে মানুষের বেঁচে থাকার বিড়ম্বনার কথা। শুধু আপনি নন, কত প্রিয়জনকে দেখেছি জীর্ণ শরীরের বোঝা বইতে বইতে দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া। ছেঁড়া পাল আর ভাঙ্গা হালের বোঝা বইতে না পারা বহু ক্লান্ত কাণ্ডারীকে দেখেছি জীবনের প্রতি এক নির্মোহ বীতরাগে হতাশ হতোদ্যম হয়ে বেঁচে থাকার স্পৃহা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে। বার্ধক্যের দুরবগাহ দিনযাপনের কষ্ট যে কত অসহ্য সে তো আমরা কতই না দেখেছি। তবু জন্ম এবং মৃত্যু তো আসে তাদের নিজস্ব নিয়মে। সেই নিয়ম যে বড় কঠিন। সেই কঠিনের নিগড়ে কত মানুষের জীবন প্রদীপ নির্বাপিত হয়ে যায় অকালেই। আবার অনেকেই ভগ্ন ক্লান্ত শরীরটার বোঝা বহু কষ্টে বয়ে নিয়ে যান অনাগত কালের নির্দেশে। আবার মনে পড়ে যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের সেই গান। আমাদের মনোগহনের নিভৃত কথাগুলো তিনি তো সেই কবেই তাঁর গানের মধ্য দিয়ে বলে গেছেন,
‘…সহসা দারুণ দুখতাপে সকল ভুবন যবে কাঁপে,
সকল পথের ঘোচে চিহ্ন সকল বাঁধন যবে ছিন্ন
মৃত্যু আঘাত লাগে প্রাণে।’
আপনার এই চলে যাওয়া এমনই এক আঘাত শঙ্খদা। এই আঘাতের জন্যে একেবারেই তৈরি ছিলাম না। তাই তো এই কঠিন কঠোর দুঃসময়ের মুখোমুখি হয়ে তার অসহ্য দাপট মেনে নিতে পারছি না। মনে হচ্ছে, “এবার দুঃখ আমার অসীম পাথার পার হল যে পার হল।’

সেই দুঃখের অসীম পাথারে হাবুডুবু খেতে খেতে আপনার ছবি হয়ে যাওয়া মুখের দিকে অপলক নয়নে তাকাচ্ছি আর কোথা থেকে যেন অশ্রুসজল এক বাতাবরণ তৈরি হয়ে যাচ্ছে। বিনম্র প্রণতি জানাবার ছলে কিছু বলতে চাই যে। কিন্তু আজ আমার কণ্ঠ রুদ্ধ, বাঁশি হারিয়েছে তার সুর। তাই অন্য এক কবির একেবারে সদ্য লিখিত কবিতার পঙক্তি নিজের মতো করে নিবেদন করছি। সেই নিবেদনের বিনতি আপনার কাছে পৌঁছাবে কিনা জানিনা। তবে সেই কবি অর্থাৎ শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই স্মৃতিমেদুর উচ্চারণের মধ্যে যে খুঁজে পেয়েছি আমার মনের মাধুরী মেশানো প্রণতি।
‘…তাহলে কান্না কার কাছে নিয়ে যাব?
তবে আশ্রয় কে দেবে, বারংবার?
খোলা জানলায় আকাশ হরিদ্রাভ
কেবল সে-ঘরে বসে নেই তুমি আর…
…এ কেমন ঘোর, শান্ত ও বেসামাল?
সে-দ্বিধা কেবল ভেঙ্গে দিতে পারে ঘুমই।
যেন-বা আমারই মৃত্যু হয়েছে কাল
দূর থেকে এসে শিয়রে বসেছ তুমি…’
এই কান্নার রেশ ফুরোতে-না-ফুরোতে আপনার দীর্ঘ ৬৫ বছরের জীবনসঙ্গিনী প্রতিমাবৌদি চলে গেলেন। মাত্র আট দিনের ব্যবধানে দু’জনার এই প্রয়াণ একেবারে মুহ্যমান করে দিল যেন। এই দম্পতির আন্তরিক সুভদ্র আলাপন আজ এখন কিংবদন্তি। বৌদির ধীর স্থির মৌন স্বভাব কীভাবে যেন আপনার মধ্যেও সঞ্চারিত হয়ে গিয়েছিল। আপনার সঙ্গীনী কবিতায় লিখেছেন,
‘হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়
সারা জীবন বইতে পারা সহজ নয়
একথা খুব সহজ, কিন্তু কে না জানে
সহজ কথা ঠিক ততটা সহজ নয়।’
কিন্তু এক লম্বা সময় একে অপরের হাতে হাত রেখে পথ চলে প্রমাণ করে দিয়ে গেলেন কত অনায়াস ছিল আপনাদের সেই পথচলা।

বৌদির মৃত্যুর পরে একজন বিখ্যাত কবি ফেসবুকে লিখলেন, একে কি সহমরণ বলা যায়? বুকটা কেঁপে উঠল। সহমরণ শব্দের সঙ্গে সম্পৃক্ত বীভৎস এক চিত্রকল্প চোখে সামনে ভেসে উঠল। ছবিটা মিলিয়ে যেতে স্মিতহাস্য ওই দম্পতির একটা যুগল ছবি ভেসে উঠল।
মনে হল, কথাটা তিনি খুব একটা মিথ্যে বলেননি।