ছায়াবৃক্ষ ও একটি বকুলফুল ॥ দীলতাজ রহমান




বকুল ফুল যখন আজমল সাহেবের বাসায় কাজে আসে, তখনো আগের কাজের লোক সেখানে বহাল ছিলো। একমাস ধরে নাকি চল্লিশ/বিয়াল্লিশের সেই মহিলা বকুল ফুলকে কাজ শেখাবে। এটা আজমল সাহেবের স্ত্রী’র বাবার বাড়ির নিয়ম। বকুল ফুল আগবাড়িয়ে অন্যের সংসারের সে নিয়ম আর ভাঙতে বলে না।
আজমল সাহেবের শ্বশুরবাড়ির মানুষ মেয়েকে শিখিয়েছে, নতুন কাজের লোক আসার পর, তাকে অন্তত একমাস ধরে আগের কাজের লোক হাতে ধরে ধরে সব কাজ শিখিয়ে যাবে। পরিবারে যার জন্য যেমনটি করা হয়, ঠিক তেমনটি তেমনটি। কাজ শেখানো হয়ে গেলে তারপর পাই পাই করে সে আগের লোকের পাওনা মিটানো হবে। তার আগে নয়।

আজমল সাহেবের স্ত্রী’র মোটেও ধৈর্য্য নেই যে তিনি কাজের লোকের পেছনে ঘুরে কাজ শেখাবেন। কাজ আদায় করে নেবেন। আসলে আলগা ঠাঁট-বাট দেখানো ছাড়া তিনি কোনো কাজ তেমন জানেনই না, দিনে দিনে এটাই কেবল বকুল ফুলের মনে হয়েছে। তবে তার সব কিছু সময় মতো হওয়া চাই। মানে টেবিলে খাবার পাওয়া। ঠিক সময় ঘুমোতে যাওয়া। ঘুম থেকে ওঠা। ঠিক সময় বাচ্চাদেরকে তার সামনে থেকে সরিয়ে ফেলা। আর নিজে নিজের বিছানায় শুয়ে সারাক্ষণ তার টেলিভিশনে রিমোট ঘোরানো। এর বাইরে বকুল ফুল তাকে কখনো কিছু করতে দেখেনি।

বাচ্চাদের স্কুলে নেয়ার সময় আজমল সাহেবই তাদের সাজিয়ে গুছিয়ে বের করেন। মেয়ে দুটিকে সাজানো গুছানোর সময় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আজমল সাহেবের মা অজমল সাহেবের হাতে তুলে দেন। আজমল সাহেবের মা যে আজমল সাহেবের বাসায় থাকেন, সেখানে তিনি খুব একটা সম্মানে আছেন বলে বকুল ফুলের মনে হয় না। মাকে সম্মান প্রদর্শনে আজমল সাহেবের ঘাটতি আছে, তাই তার স্ত্রী’রও শাশুড়ির প্রতি ঘাটতিটা প্রকট। এখানে এই একটা বিষয় বকুল ফুলকে খুবই পীড়া দেয়। বাকি আর সব বিষয় সাধারণ। আজমল সাহেব সংসারের যেটুকু কাজ করেন, তা অন্য বাসার পুরুষেরাও এখন করেন। পুরুষতান্ত্রিকতায় এটা একটা চিড়। এই চিড়-ই একসময় ফাটল হয়ে উঠবে বলে তার বিশ্বাস। তাই বকুল ফুলের মনে হয় এটা একটা ভাল লক্ষণ।

আজমল সাহেবের স্ত্রী বাসায় ইস্ত্রি করা কাপড় ছাড়া পরেন না। এমন কি বিছানার চাদরও ইস্ত্রি না করে বিছানোর সাধ্য কারো নেই। কিন্তু নিজে তো সেই কুটোটিও নাড়বেন না। তবে তিনি নাকি উচ্চ শিক্ষিত। বড় লোকের মেয়ে। কিন্তু চাকরি-বাকরি করার ধৈর্য্য নেই। মেয়ে দুটির একটি ক্লাস ফোরে আরেকটা সিক্সে। তাদেরকেও তিনি কখনো পড়াতে বসেন না। সন্ধ্যায় একমেয়ে টিচার এসে তাদেরকে পড়িয়ে যায়। আর তাদের স্বল্পশিক্ষিত দাদী তাদেরকে যা পারে লেখাপড়া আর গল্প শোনানোর ভেতর বন্দি করে রাখে। তার ওপর তো আছে হাতে হাতে ট্যাব। পানের থেকে চুন খসার মতো হলেও তা তারা বাপকে ফেইসলাইনে কন্ট্রাক্ট করে সব বলে দেবে। ওরকম একখানা ট্যাব অবশ্য বকুল ফুলও তার ছেলেকে কিনে দিয়েছে। পরে তার নিজের জন্যও একখানা কিনতে হয়েছে। কিন্তু তার ব্যবহার এতো পরিমিত, যে যখন যেখানে থাকে তারা এটা নিয়ে কথা তুলতে পারে না। তবে ট্যাব নিয়ে আজমল সাহেবের মেয়েদের বাড়াবাড়ি আচরণটা কাজের লোকের জন্যও একটা হ্যাপা বটে। একটুতেই সেই কাজের লোককেই ডাকাডাকি।

অজমল সাহেব খুব যে বড় চাকরি করেন না, এটা বোঝে বকুল ফুল। তবে কোনো বড় মার্কেটে তার একটা শাড়ির দোকান আছে। অফিস টাইমের পর সে দোকান নিয়ে আজমল সাহেবকে খুব খাটতে হয়। আজমল সাহেব সংসারে বেশ ভালোই খরচ করেন। বেশি খরচটা কিন্তু বউয়ের ভয়েই করেন। আজমল সাহেবের বউকে ভয় পাওয়ার কী এমন কারণ এটা অবশ্য বকুল ফুল বোঝে না। তাহলে কি আজমল সাহেবের চাকরিটা তার শ্বশুর দিয়েছেন? অথবা ব্যাবসার টাকাটা? অথবা তিনি কি শ্বশুরের টাকায় লেখাপড়া করেছেন? দোকানটাও তো আজমল সাহেবের বাবার কেনা। তাই বউকে তোয়াজের সাম্ভাব্য ইস্যুর কোনোটাই বকুল ফুলের মাথায় ঢোকে না। আবার আজমল সাহেব তার মা-বাবার একটাই সন্তান। তার বাবা বড় চাকরি না করলেও বউ-ছেলের ভালো করে চলার মতো নিশ্চয় কিছু করতেন। আজমল সাহেবের মায়ের গল্প শুনে তো তাই মনে হয় বকুল ফুলের।

মাস ঘুরে এলো। তার আগের কাজের লোক কুসুমের মা’র বিদায়ের সময় চলে এলো। তাকে কাজ শেখানোর জন্য একমাস কুসুমের মাকে আটকে রাখা হয়েছে। কুসুমের মা তাকে কি কাজ শেখাবে? সে নিজেই তো কোনো কাজ যথাযথভাবে করতে পারে না। রান্নাবান্না যা করে গেঁয়ো ধাঁচের। বেশির ভাগ সময়েই বাইরের খাবার খেয়ে পেট ভরায় এরা। আজমল সাহেবের মা’য়ের আবার রান্নার বাতিক আছে। তিনি প্রায়ই আগের গঞ্জনা ভুলে সন্তানের জন্য মায়ের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ নিয়ে রান্নাঘরে ঢোকেন, কিন্তু তাকে নানান দোষে দুষ্ট অপবাদ দিয়ে কেউ আর সেসব তেমন পছন্দ করে খায় না। শেষে কাজের লোক দু’জন আর তিনি, এই তিনজনে মিলে খেয়ে শেষ করেন।

বকুল ফুল একটা এনজিও থেকে ট্রেনিং পাওয়া। সে বাচ্চাদের ফিডার থেকে সঠিক নিয়মে ফ্রীজও পরিস্কার করতে শিখেছে। কীভাবে বৃদ্ধ ও অসুস্থ লোকের সেবা করতে হয় তাও সেখানে শিখিয়েছে। তারপর আরো দুটি বাসায় সে কয়েক বছর করে কাজ করে শুধু হাতই নয়, সে নিজেকেও পাকিয়েছে। সে দেখেছে এক ঘর পার হলেই মানুষের মত ও রুচি, আদর্শ ভিন্ন হয়ে যায়।
সাংসারিক কাজে বকুল ফুলের বিজ্ঞানসম্মত ট্রেনিং আছে বলেই তার বেতন বেশি। মাথার ওপর সংখ্যাটা বড় একটা চাপ সৃষ্টি করলেও তাকে পনের হাজার টাকা বেতনেই রাখতে রাজি হয়েছে আজমল সাহেব। কিন্তু একটা শর্ত, এটা যেন কুসুমের মা না জানে। কারণ কুসুমের মার বেতন ছয় হাজার টাকা।
কুসুমের মা বকুল ফুলের বেতনের পরিমাণ জানলেও বকুল ফুলের ক্ষতি নেই। সে তো দেখছে কুসুমের কাজের ধারা। তাই বকুল ফুলের বিশ্বাস, ডাক্তার আর কম্পাউন্ডারের বেতন এক হবে কেন?
কুসুমের মার দেনা-পাওনা ক্লিয়ার। সে এখন যাচ্ছে আজমল সাহেবের স্ত্রী’র এক খালাতো বোনের বাড়ি। তারাই এখানে দিয়েছিলো কুসুমের মাকে। এখন তাদের দরকার তাই ফিরিয়ে নিচ্ছে। যেদিন আজমল সাহেবের স্ত্রী’র খালাতো বোন কুসুমের মাকে নিতে এলো, ঘটা করেই। খালাতো বোনের বাড়ি বলে কথা। তাই প্রচুর রান্নাবান্নাও হলো আজমল সাহেবের বাসায়। দুপুরে খেয়েদেয়ে সবাই ড্রয়িংরুমে বসে আছে। শুধু দুই বাড়ির বাচ্চা এক হয়ে বাড়িময় ভীষণ হৈ হুল্লোড় করছে। আর এদিকে ড্রয়িংরুমে খালাতো বোনে বোনে, খালাতো ভায়রা ভায়রা কত গল্প। বিকালে চা’এর সাথে নিজের বানানো হরেকরকম টা নিয়ে সেখানে ঢুকলো বকুল ফুল। বকুল ফুল সবাইকে হাতে হাতে টা তুলে দিয়ে, তারপর কাপে কাপে চা ঢেলে দিচ্ছে। এর ভেতর আজমল সাহেবের স্ত্রী রেবেকা খানম তার শাশুড়ির উদ্দেশ্যে চোখ কাৎ করে মৃদু ধমকের সুরে বললো, যান না, আপনার কাপটা নিয়ে আসেন। দেখছেন না কাপে কুলোচ্ছে না…’। বকুল ফুলের কী হলো, সে চা ঢালা থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। আঁচল তার আগেই কোমরে প্যাঁচানো ছিল। বকুল ফুল বললো, আমি আপনাদের বাসায় থাকবো না।

মেহমান, মেজবান দু’পক্ষ একসাথে ভড়কে গেলো। বিষয়টা সত্যিই তাই হলে কেমন হবে। আজমল সাহেব পরিবারের কর্তা, এ ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা তো তাকেই নিতে হয়। অনেক খোঁজ লাগিয়ে এক বন্ধুর মাধ্যমে তিনি পেয়েছিলেন এই মহিলার খোঁজ। তার পর মা তার পারঙ্গমতার ফিরিস্তি শুনে আজমল সাহেব এমন আকৃষ্ট হলেন, যে এতগুলো টাকা বেতন দিতে রাজি হয়ে তাকে বাড়িতে আনলেন। তাই এমন গ্যাঁড়াকলে পড়া অবস্থায় তিনি একটু বেশ জোরেসোরেই তার কর্তাগিরির যোগ্য ভূমিকাটা প্রয়োগ করে ফেললেন। বললেন, ‘এই তুমি কি ফাজলামি পেয়েছো? এতদিন ঘাপটি মেরে থেকে আজ যখন পুরনো মানুষ চলে যাচ্ছে, আর তোমারও মুখোশ বেরিয়ে পড়ছে’।
উত্তরে বকুল ফুল বললো, মুখোশই বটে। এতদিন সহ্য করার চেষ্টা করেছি। মনে হতো এরপর ঠিক হয়ে যাবে। এই যে এতগুলো মানুষ এখানে, আপনার স্ত্রী তো তাদের কাউকে বললেন না কাপ আনতে? আপনাকে বললেও তো মানা যেতো। একেবারে আপনার মাকেই তার কাপটা তাকে আনতে বলা হয়েছে। যেখানে আপনি সামনে বসে। কেন তিনি কি নতুন কাপে খাওয়ার যোগ্য নন। কাপে কম পড়লে তো যে কটা লাগে আমিই নিয়ে আসবো।’

পুরো পরিবশে থমথম। আজমল সাহবের কণ্ঠেও কথা নেই। কিন্তু বকুল ফুলকে তো এখানে থামলে চলবে না। বাঁধের মুখ ভেঙে গেলে জলের তোড় তো সেদিকেই ছুটবে। সে বলে ফেলে, ‘আপনার দোষ মামা।’ কুসুমের মা আজমল সাহবেকে মামা ডাকে। তাই সেও এসে ওই মামা-মামী ডাক ধরেছে। কুসুম বলে, আপনি স্পষ্ট করে আপনার মাকে সম্মান দিয়ে ডাকেন না, কথা বলেন না বলে, মামী এই সাহস পেয়েছেন। আপনার মা আপনাকে নিশ্চয় বিয়ে করতে পাঠানোর সময় এটা বলে পাঠায় নাই, যে আগে যা ব্যবহার তুমি আমার সাথে করেছো, করেছো। বাড়িতে বউ এলে, এখন থেকে তুমি যে ব্যবহারটি আমাদের সাথে করবে, মানে তোমার মা-বাবার সাথে যে ব্যবহারটি তুমি করবে, বউও ঠিক সেই ব্যবহারটি তোমার মা-বাবার সাথে করবে। মামী আপনার মা’য়ের সাথে কখনো হাসিমুখে কথা বলেন না। চোখ কাত করে থাকেন। প্রয়োজনে যা দু’চারটে কথা বলেন, তা ঢেলা ছুঁড়ে মারার মতো। কিন্তু আমি তো এই আচরণে অভস্ত্য হবো না। তাই এখানে কাজও করবো না। তার জন্য আপনারা আমাকে কিছু করতে পারবেন না এবং আমার চলে যাওয়ার আসল ইস্যু এটা দেখিয়ে আমি আমার বেতনের টাকাও আদায় করে নিতে পারবো। কারণ আমাদেরকে আমাদের অধিকার সম্পর্কেও সচেতন করা হয়।

আজমল সাহেবের মা এসে বকুল ফুলের গায়ে হাত বুলান। বলেন, মা হলে এগুলো ধরতে হয় না। আমি অধিকার ফলাতে গেলে সংসারে অশান্তি হবে। তখন আমার এখানে থাকা হবে না। আমার ছেলেটা এমনি মানসিক চাপে থাকে। কিন্তু আমি এখানে থাকার জায়গার অভাবে থাকি না মা। আমি এখানে থাকলে সংসারটাতে একটু আসান হয়। আজমলের একটু আসান হয়। বাচ্চা দুটো বেশি জ্বালাতন করলে, কাজের লোককে দেখেছি ওদের চোখ রাগাতে। তাই এইকুটু সমঝে রেখে তাদের ভার না কমাতে পারলেও আমার বুকের ভার তো কমে।
: আমার নিজের বাচ্চা মায়ের কাছে রেখে আসছি আমি জানি এটা কী ভার। আমার বাচ্চা না রাখতে হলে তো আমার মাও আমার মতো কারো বাড়িতে পড়ে থাকতে পারতো। তাতে তার খাওয়া-পরা চলতো। মাস শেষে তার হাতেও নগদ বেতন জমতো।

বকুল ফুলের এতোগুলো কথার পরেও ঘরে কারো কোনো টু শব্দ নেই। চা’ও পড়ে আছে তেমনি। ধোয়া থিতু হতে হতে এখন আর ধোয়াই দেখা যাচ্ছে না চায়ে। পড়ে থাকা চা আর ঘরের সবগুলো মানুষের ভেতরের চেহারা একই রকম স্পষ্ট হয়ে ওঠে বকুল ফুলের কাছে। তবু বকুল ফুলকে বকুল ফুল নিজেও থামাতে পারলো না। সে আবার বলে উঠলো, আমি অনেক বাড়িতে দেখেছি, বাড়ি থেকে কাজের মেয়ে চলে গেলে গিন্নী হেঁচকি তুলে কাঁদেন। কিন্তু শাশুড়ি গেলে বউয়েরা ঘরে গোলাপ জল ছিঁটান আর যে আসে তার কাছে শাশুড়ির কথা বদনাম করেন। একবারও ভাবেন না ওই মহিলার ছেলেটি নিয়েই তাকে বিছানায় যেতে হয়। ওই মহিলাটির ছেলের নামে অংশই নিজের নামের সাথে জোড়ে। তার স্ট্যাটাসেই ভর করেই পুরো জীবন চলতে হয়। এই মামীদের মতো মহিলারা মনে করেন যেন স্বামীটা তাদের অনলাইনে অর্ডার করে আনা। কারো পেট থেকে তার জন্ম হয়নি। মামা, আপনি জানেন, আপনার মা যদি কুটোটাও না নাড়েন, তবু তার বেতন কত হয়? এই যে অনেক রাতে বাড়ি ফেরেন, এটা কি জানেন, ঘরে আপনার মা আছেন, সেই স্বস্তি আপনি টাকা দিয়ে কিনতে পারবেন না। কাজের মেয়েরা সব তচনচ করে নিয়ে চলে গেলেও, ছেলেমেয়েকে কুশিক্ষা দিলেও কিছু করতে পারবেন না। তার ওপর দাদীআম্মা আপনার বাচ্চাদের কত ভালো ভালো গল্প শোনায়, লেখাপড়া করায়…’। বকুল ফুল তৃতীয় ধাপে এটুকু বলতেই আজমল সাহেবের স্ত্রী রেবেকা খানম খেঁকিয়ে ওঠে, এই মেয়ে চুপ করবি? অযথা বকবক…’।

মামী, শোনেন, আমি মেয়ে নই। আর আপনার ওই নিরস মুখে ওরকম তুই-তোকারি আমার সাথে চলবে না। ওগুলো আমি বহু আগেই পরাস্ত করে আসছি। ত্রিশ বছর বয়স আমি পার করে ফেলেছি। আমার ছেলের বয়স দশ। আমি ছোটবেলা তেমন স্কুলে যাই নাই। কিন্তু বড়বেলা একসাথে অনেক কিছু শিখছিলাম। আর লেখাপড়া তো শুধু অক্ষর ধরে ধরে শেখার বিষয় নয়। শেখার ভেতরেই তো আছি। তার ভেতর প্রথম শিক্ষাটা হলো অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। আপনার মা এলেও আপনার শাশুড়ির প্রতি আপনার মাও চোখ কাত করে কথা বলেন। এই যে আপনার বাপের বাড়ি থেকে রোজ এতবার ফোন আসে, কেউ তো আপনার কাছে জানতে চায় না, তোর শাশুড়ি কেমন আছে? অথচ টবের কোন চারাটি কত বড় হলো সেসব খবরও তারা ফোনে নেয়। এ বাড়ির বিড়ালটার জন্যও তাদের আদরের সীমা নেই। একটা মাত্র জামাই বলে মামাকে নিয়ে কী তাদের আদিখ্যেতা।
বকুল ফুলের কী হলো আজ, সে সবার চোখের ভেতর যেন দুটো করে গরম শলা ঢুকিয়ে দিয়ে কথা বলছে। এবার আজমল সাহেবকে খালি চোখের শলা মনে ঢুকিয়ে অন্য সবার উদ্দেশ্যে আবার বলতে শুরু করলো, শোনেন, মামা সময়ের আগে জন্মানোর জন্য তাকে ইনকিউবেটরে নাকি রাখা হয়েছিলো। জানেন না বোধহয়, শিশুর ওইরকম সময় মা’কে সেখানে নিয়ে খালি গা করে মায়ের বুকের ওপর ওই মরণাপন্ন বাচ্চাকে রেখে দেয়া হয়, মায়ের তাপে বাচ্চার শরীরের গ্রথ ত্বরান্বিত করতে। আগুনের মতো গরম সেখানে কিন্তু কারো স্ত্রী বা শাশুড়ির কোনো ভূমিকা থাকে না। আমাদের মতো ভাড়া খাটা মানুষও সেখানে বড় কোনো মূল্যের বিনিময়েও কাজে লাগি না। অতএব যে বিষয়ে আমি সোচ্চার হয়েছি, আপনার ধমকে সেটা বন্ধ হবে না মামী।

বকুল ফুলকে থামাতেই বিব্রতাবস্থায় হাবডুবু খাওয়া আজমল সাহেব তার মায়ের দিকে মুখ তুলে বললেন, মা, আমি তোমার সাথে অবিচার করি?
আজমল সাহেবের মা থতমত হয়ে বললেন, কোনটা বিচার আর কোনটা অবিচার তা আমি দেখতে যাই না রে বাবা। তবে নিজেকে বড় বাহুল্য ঠেকে তোমাদের এখানে। কারণ তোমরা কোনো দায়িত্ব আমাকে ঠিক করে দিয়ে তো আমাকে রাখোনি। যেন গায়ে পড়ে চলি। কিন্তু তারপরও বাইরে যেতে পা চলে না, যদি কোনো সময় আমার কোনো কাজ তোমাদের ঠিক জরুরী মনে হয়, সেই আশাতে।
বকুল ফুল বললো, শোনেন দাদীআম্মা, যদিও আমার মতো এক নারীর দাদী হওয়ার বয়স আপনার হয় নাই। তবু বলি, আপনার মতো হেলাঢেলা হয়ে আমি আমার সন্তানের সংসারে পড়ে থাকবো না কিন্তু। কেন থাকবো না তা আপনাদের মতো মানুষ দেখেই শিখেছি। মা-বাবার স্নেহ-মমতা জলের মতো। জলের মতো বলছি কেন শোনেন। মা-বাবার স্নেহ-মমতা, উপস্থিতি প্রয়োজনের বেশি হলেই সেসবই সন্তানের কাছে বন্যার পানির মতো নাকমুখ পর্যন্ত তলানো লাগে। কিন্তু ঘটি না ডোবা গর্তের জলের মতো হলেই বরং তার দাম থাকে। তাই আপনার মতো বয়সে গিয়ে আমি কাজের ধারা পাল্টে পরের বাড়িতে বাচ্চা রাখার কাজ করবো। সে কাজের মূল্য আরো বেশি ।‘
হোস্ট-গেস্ট কোনো পক্ষের কারো মুখে কোনো কথা নেই দেখেই কুসুমের মা মুখ বাড়িয়ে বললো, ও বইন তোমার পোলার বাপ আছে তো? মাইয়া মাইনষের এমুন চেতা কতা শুইননা কুনো বেডাই কাছে থাকতো না, তাই তো জিগাই, মনে কিছু কইরো না।

বকুল ফুল বললো, ঠিকই বলছেন কুসুমের মা আপা। বেশি বেতনের লোভে এক বিদেশীর বাসায় কাজ করতে যাই। গিয়ে দেখি সে বাসায় কোনো মেয়ে মানুষ নেই। চলে আসবো ভাবতে ভাবতে দেখলাম ভয় পাওয়ার মতো কোনো অবস্থা তৈরি হয় না। বরং নিজের জন্য একখানা বড় ঘর-ঝকঝকে বিছানা পেয়ে মনে হতো এটাই বেহেস্ত। আর আমি আগে তো কিছুটা লেখাপড়া জানতামই। তাই আমি পড়তে পারি তিনি আমাকে প্রায়ই তেমন বই কিনে কিনে দিতেন। যে তার কাছে আসতো, তাকে আমার জন্য বই নিয়ে আসতে বলতেন। তারপর দিনে দিনে আমিই তার প্রতি মুগ্ধ হয়ে পড়ি। তিনি তা বুঝতে পারেন। তারপর আমাকে তার দিকে টানতে চান। আমাকে লেখাপড়া শেখানো থেকে রান্নাবান্নাও যেটা যেখানে শেখানো হতো, আমাকে পাঠিয়ে তার নিজের টাকায় শিখিয়েছেন। একদিন তিনি আমার ফুলু নাম বাদ দিয়ে বললেন, তোমার নাম বকুল ফুল।
: কিন্তু বিয়া করতে চায়নাই ক্যা?
: তার দেশে তার স্ত্রী আছে। আর এখানে তার বিয়ে করা বৈধও ছিলো না। তিনি বয়সে আমার থেকে দ্বিগুণ বড় ছিলো। তবু দিনে দিনে তার প্রতি এতো মায়া পড়ে গেলো, মনে হতো এমন মানুষ তো মানুষের কল্পনাতেই থাকে। ওদিকে আমার বাবা আমাকে নিয়ে আসতে চাইতো। মা বলতো যতই লোকটার বয়স হোক জোয়ান মেয়ের একবাড়িতে থাকা ঠিক না। পাঠানোর আগে তো ভাবছিলাম, বিদেশী মানুষ হলেও বাসায় বউ-বাচ্চা তো থাকবে।

একদিন আমিই তাকে বুদ্ধি দিলাম, একজন মৌলবি ডেকে আমাদের বিয়ে হোক। তাহলে যতদিন আপনি এখানে থাকেন, আমি আপনার কাছে থেকে যাবো। বাবা-মা নিয়ে যেতে চাইলেও যাবো না!
পরদিনই তাই হলো। কিন্তু বিয়ের অনেকদিন পরও মনে হলো তিনি আমার অতীত ভোলেননি। যেটুকু মর্যাদা আমাকে দেয়া হতো, সেটা মানবিক। তাতে স্ত্রী’র মর্যদা ছিলো না।
তিনি এদেশে এসেছিলেন কি একটা বিষয়ের যেন কনসালটেন্ট হয়ে। কদিনেই তার অতো যোগ্য আমি নিজেকে করতে পারবো না। কিন্তু আমার চেষ্টা তো ছিলো…। শেষে ওই গ্যাপটাই আমার গলা চেপে ধরতো। কিন্তু দুনিয়াতে সব বিষয় নিয়ে কি আর তর্ক চলে। তারপর ভাবলাম, তার সূত্রে, তার চেষ্টা ও অনুপ্রেরণায় যা আমি শিখেছি, এইটুকু নিয়েই আমি মুক্ত মানুষ হয়ে বাঁচবো। হৃদয়ে ভার বহন করার জোর বোধহয় আমার হৃদয়ে নেই। তাই যে বিষয়গুলো ধীরে ধীরে অর্জন করেছি, তাকে ভারাক্রান্ত করে হত্যা অন্তত কততে চাইলাম না। তারপর আমি চলে আসতে চাইলে তিনি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। আর তা বুঝে খুব অভিমান হলো। কিন্তু মনকে বোঝালাম কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয়। তাই আমার যা গেছে আমি না হয় তাকে আমার প্রাপ্তির মূল্যই দিয়ে গেলাম…।

: হায় হায় এ দেহি নাটক? তারপর কী অইলো?’ কুসুমের মা বললো। কুসুমের মা চলে যাচ্ছে বলে সেও আজ আলগা সাজগোজ করেছে। আর সেই সাজগোজের প্রভাবে তারও আজ সাহস বেড়ে গেছে এতোগুলো মানুষের ভেতর বাড়তি কথা বলার। না হলে বাড়ির গোয়ার-রাশভারি কর্তা-গিন্নীর সামনে সে কি এই দু’বছরে একটা কথাও কখনো বলতে পেরেছে।
এর ভেতর রেবেকা স্বামী আজমলকে কনুইয়ে ধাক্কা দিয়ে বললো, দেখো কী নাটকের মানুষ ঘরে ঢুকিয়েছো।
বকুল ফুল বললো, হ্যাঁ, ঘটনাটা নাটকের মতো করে রেখেছি বলেই এখনো নাটক হয়ে আছে। যে সমস্যার কোনো সুস্থ সমাধান নেই, তা সেখানেই ভাঁজ করে সুগন্ধমাখা রুমাল করে রাখতে হয়। উনি আসলে আমাদের দেশের মানুষ ছিলেন না। অন্য দেশের নাগরিক। কিন্তু কিছুটা বাংলা জানতেন। আমি তার কাছ থেকে চলে আসার তারপরেও তিনি এদেশে ছিলেন কিছুদিন। কিন্তু আমি বেরিয়ে আসার পরে মনে হচ্ছিলো, আমার পেটে বাচ্চা। আমাকে না জানিয়ে আমার বাবা-মা তাকে খবরটা জানিয়ে এসেছিলো। তিনি নাকি বলেছিলেন, আমি আর কিছুদিন আছি। তাই যতদিন আছি, ততোদিন এসে থাকুক। এতে আমার আরো রাগ হলো। তবে সে রাগ শুধু তার ওপর নয়…। হয়তো নিয়তির ওপর…।
তবু ভাবলাম যে তেজ নিয়ে আমি বেরিয়ে এসেছি সে তেজ আর ভাত-কাপড় আর একটু আশ্রয়ের জন্য খরচ করবো না। এই তেজটুকুই আমার সাথী হয়ে থাক। হয়তো তা একটা বেলুনে একটু কারো ফুঁ’এর মতো বাতাস…।
: উম্মা, মাইয়া মাইনষের এতত্যাজ বালো না। তোমার বাচ্চার বাপের নাম লাগদো না?‘ কুসুমের মা বললো।
: বাপ যখন আছে, নামও আছে। হয়তো থাকবেও। আল্লাহকে সাক্ষী রেখে যখন তার মায়ের বিয়ে হয়েছিলো। কিন্তু বাচ্চা কি তার বাবার একার? আমারও তো বাচ্চা। আমিই না হয় আমার মতো তাকে কম খাইয়ে মানুষ করি। তারপর সে তার সময় মতো তার বাবাকে খুঁজে নেবে।
: বাচ্চার লাইগ্যা কিছু দিয়া যায় নাই।’ কুসুমের মা বললো।
: আমি আর খোঁজ রাখিনি। অবশ্য ডেকেও পায়নি।

: তোমার বুদ্ধিও মন্দ না কুসুমের মা আপা। কিন্তু সবার রুচি-বুদ্ধি এক হয়ে গেলে দুনিয়া একরকম হয়ে যাবে যে!
: এহন কও এইহানে তুমি থাকতেছো নাকি? নাকি যাইবা গিয়া।’ বকুল ফুল দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলো বলে কেউ তাকে ঠেলে বেরোতে পারেনি। যেন সবাইকে আটকে থেকে তার ঝাঁঝ ও নাটকীয় কথাবার্তা শুনতে বাধ্য করেছে। কুসুমের মার এই প্রশ্নের পর বকুল ফুল সম্বিৎ ফিরে পায়। সে বললো, দেখো এবার এরা আর আমাকে রাখতে চান নাকি। তবে এরা ঠিক হয়ে গেলে আমার থাকতে আপত্তি নেই।
কারণ এতোগুলো মানুষের একসাথে অসুবিধা করাও মানবিক আচরণ নয়।’ বকুল ফুল এতক্ষণ যা বলেছে, তা নিশি পাওয়া মানুষের মতো বলেছে। হঠাৎ তার ঘোর ভাঙলো যেন। সে স্বাভাবিক হয়ে সবার দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে বলে উঠলো, আপনারা একটু অপেক্ষা করেন, আমি আবার চা করে আনি। আপনারা খেয়ে তবে যান।

কুসুম যখন রান্নাঘরে ঢুকলো, ভরা সন্ধ্যা তখন। দরজা ফাঁকা পেয়ে আজমল সাহেবের মা আনোয়ারা বেগম ড্রয়িং রুমের দুঃসহ পরিবেশ ছেড়ে কারো ছোঁড়া তীরের মতো ক্ষিপ্রবেগে বকুল ফুলের পিছে পিছে ছুটে সেখানে গেলো। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাকে বললো, মা’রে আমার তো একটাই ছেলে। আর তো একটা মেয়েও নেই। নিজের আত্মার ওপরে বড় বেশি অত্যাচার করে ফেলেছি সন্তানের দরদে। তুই এই সংসারে যে ক’দিন পারিস, থেকে যাস। আমি বরং এখান থেকে বেরোই।
: কোথায় যাবেন?
: সেই যে গ্রামে তো ঘরদোর সবই ছিলো। সেখানে গিয়ে…। আজমলের বাবা তো একটা দোকান কেনা ছাড়া ঢাকায় কিছু করে যেতে পারে নাই।

বকুল ফুল বললো, তাই করেন। দেশেই যান। আমি যদি এখানে থাকি তাহলে যাওয়ার সময় আমাকে সাথে নিয়ে যাবেন, আমি সব ঝেড়ে পরিস্কার করে দিয়ে আসবো। মিস্ত্রি ডেকে বাড়ির আলগা বাঁধন সব নতুন করে দিয়ে আসবো। মাত্র পড়ালেখা শিখছে বাড়ির এমন বাচ্চাদের জন্য কিছু নতুন বই কিনে নেবেন। তাদেরকে প্রতিদিন দিনের একটা সময় পড়াবেন। কিছু দানা-পানি দিলে আঙিনায় কত পাখি আসবে, দেখবেন। ঘরে যে পুরনো বইপত্র আছে আপাতত তাও নিবেন। এখন তো আর অশিক্ষিত মানুষ কোনোখানেই নাই। বাড়ির বউ-ঝিদের ডেকে সেগুলো সেধে দেবেন। তাদেরকে অদল-বদল করে সেগুলো পড়তে বলবেন, তারপর কোন বইটি কার কেমন লাগলো তা নিয়ে বারান্দায় পাটি বিছিয়ে আলাপ জমাবেন। আর আপনার ছেলেরও যখন পানির তৃষ্ণার মতো মায়ের ভালবাসার তৃষ্ণা জেগে উঠবে। সে মাঝে মাঝে গাড়িখানা নিয়ে আপনার উঠোনে চলে গেলে দেখবেন আপনার বেঁচে থাকার মানেটা বদলে গেছে দাদীআম্মা। এ ছাড়া আপনি মরে গেলে আপনার ছেলে আপনার অভাব অবশ্যই বুঝবে। পরপারে তখন আপনার তাতে কিই বা লাভ…তারচে’ ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জ কতটুকু আর দূর। একটু প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা না রাখলে তাকেও কেউ মনে রাখে না।

বকুল ফুলের কথায় আনোয়ারা বেগম চোখের সামনে তার সেই সাজানো আঙিনা দেখতে পাচ্ছেন। যেখানে একসময় পাশের গ্রাম থেকে তিনি বউ হয়ে এসেছিলেন। তবে আজ সেখানে কেউ তাকে বরণ করবে না। একসময় যেখানে এসেছিলেন নতুন প্রজন্মের বুনিয়াদ হয়ে। তিনি এও বুঝছেন, যেহেতু বকুল ফুলের মতো নিজস্ব কোনো তেজ তার নেই। আর এখন তা অর্জন করা সম্ভবও নয়। তাই এখন তিনি যাবেন আসলে সেই মাটির অংশ হতে।
যতদিন বেঁচে থাকবেন দিনের চব্বিশটি প্রহরের ভেতর নিজের কাউকে তিনি দেখবেন না। এভাবে জীবনের সব প্রহর তার একটানা একাকার হয়ে কণ্ঠ রোদ করে আনে আনোয়ারা বেগমের। তবু সেই রাতের ভেতরই তিনি নিজের একান্ত জিনিসপত্রগুলোর গোছগাছ সম্পন্ন করেন।