ছোটকাগজ ‘লেখমালা’ এবং কবি মামুন মুস্তাফা ॥ মাহফুজ রিপন



ছোটকাগজ ‘লেখমাল’ এবং কবি মামুন মুস্তাফার সাথে পরিচয় ২০১৮ সালের বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে। যতদূর মনে পড়ে সে বছর বেহুলাবাংলা প্রকাশনী থেকে আমার ‘জলকাদার ঘ্রাণ’ কবিতার বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। লিটল ম্যাগ চত্বরে যাই বইমেলায় প্রকাশিত নতুন ছোটকাগজ উল্টাই। ‘লেখমালা’র স্টলে গেলাম কবি বন্ধু তুষার প্রসূন পরিচয় করিয়ে দিলেন কবি ও সম্পাদক মামুন মুস্তাফা ভাইয়ের সঙ্গে। সেই থেকে শুরু হলো কবির সাঙ্গে শিল্পের পথ চলা, আশা করি সেটা আমৃত্যু ধাবমান থাকবে।
মন ও মননের ছোটকাগজ ‘লেখমালা’ লিটলম্যাগ জগতে যাত্রা শুরু করে এক জানুয়ারি ২০১৫ ‘ভাষা দিবস সংখ্যা’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে। এই ছোটকাগজটি ২০১৫ ও ২০১৬ এই দুই বছর ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মোট ৮টি সংখ্যা প্রকাশ করে। এরপর থেকে বছরে একটি বিশেষ সংখ্যা আকারে ‘লেখমালা’ প্রকাশিত হয়ে আসছে। বাংলা সাহিত্যকে রাঙাতে ছোটকাগজ ‘লেখমালা’ উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু সংখ্যা প্রকাশ করেছে। তার মধ্যে ‘কবি আবুবকর সিদ্দিক সংখ্যা’ প্রকাশ করে ৩ জুলাই ২০১৫; ‘কবিদের গল্প সংখ্যা’- ১ জানুয়ারি ২০১৬; জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যারকে নিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ, সঙ্গে নির্বাচিত কাব্যের মূল্যায়ন এবং নির্বাচিত কাব্যের কবিতা প্রকাশিত হয়- ডিসেম্বর ২০১৭ সংখ্যায়; ‘সমকালীন পাঁচ গল্প, এই সময়ের কবিতা’ প্রকাশিত হয়- মার্চ ২০১৯ সংখ্যায়; জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ছোটকাগজ লেখমালা ‘বঙ্গবন্ধু’ শিরোনামে একটি ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে, সঙ্গে রয়েছে স্বাধীনতার কবিতা এবং মুক্তিযুদ্ধের গল্প। ছোটকাগজ ‘লেখমালা’ ২০২১ সালের বইমেলায় বিশিষ্ট লেখক ও চিহ্ন সম্পাদক শহীদ ইকবালকে নিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে, সঙ্গে রয়েছে করোনাকালের একগুচ্ছ কবিতা এবং করোনাকালের গদ্য এবং একটি অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি। শিল্পী আইয়ুব আল আমিনের এক রংয়ের প্রচ্ছদে লেখমালার ১২তম সংখ্যাটি ছোটকাগজ পাঠকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

ছোটকাগজ লেখমালা-র সবগুলো সংখ্যা পাঠ-পর্যলোচনার পর এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় এটি একটি পরিচ্ছন্ন লিটল ম্যাগাজিন। ‘লেখমালা’ লেখক এবং পাঠকদের মনকে জোগাতে নয় মনকে জাগাতে সংকল্পবদ্ধ। পুরনো ধ্যান-ধারণার গ্রহণ বর্জনের মাধ্যমে নতুন সৃষ্টির উদ্যমকে জাগিয়ে তোলাই ছোটকাগজ ‘লেখমালা’র আসল উদ্দেশ্য। কাগজটি সম্পাদনা করছেন কবি মামুন মুস্তাফা, সহযোগী সম্পাদক তুষার প্রসূন এবং সজল বিশ্বাস।

আমি বললাম আমার জল চাই
এক ঘটি জল
তুমি দিলে আমি হাত পেতে
পান করলাম।
আমি বলালাম তোমার বাগানের ফুল নেবো
গন্ধযুক্ত ফুল
তুমি দিলে আমি দু’আঙ্গুলে তুলে
নিয়ে নাকের কাছে ধরলাম।
আমি বললাম আমার বিশ্রাম দরকার
কিছুটা সময়।

(দশ দশমী ১৩)

কবি মামুন মুস্তাফা নয়ের দশকের উল্লেখযোগ্য প্রাজ্ঞ কবিদের একজন। শিল্পগুন সমৃদ্ধ এই কবির কবিতা পাঠ করলে চিত্রকল্পে ভেসে যাই দূর থেকে দূরে, বহু দূরে। প্রেম এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর যে অন্তরমুখী কবিতার ভাসান সাধারণ থেকে শুরু করে সর্বাধুনিক পাঠককেও নাড়িয়ে দেয়। কবিতা তাঁর কাছে সাবিত্রী হয়ে ধরা দিয়েছে। কবি মামুন মুস্তাফার কবিতার দুয়ার খুললেই চোখে পড়ে- জুঁই ফুলের দোলা, প্রাণচাঞ্চল্য আর মননশীলতার এক শৈল্পিক রসায়ন। সততা আর সারল্যই যে প্রকৃত কবিতা সেটা টের পাওয়া যায় তাঁর নির্বাচিত কবিতা গ্রন্থ- ‘দশ দশমী’র প্রতিটি পৃষ্ঠায়।
কবি মামুন মুস্তাফার উল্লেখযোগ্য কবিতা গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- সাবিত্রীর জানালা খোলা, কুহকের প্রত্নলিপি, এ আলোআঁধার আমার, একাত্তরের এলিজি, শনিবার ও হাওয়া ঘুড়ি, ব্যক্তিগত মেঘ ও স্মৃতির জলসত্র, কফিনকাব্য, দশ দশমী (নির্বাচিত কবিতা) এবং প্রবন্ধ গ্রন্থ : এই বদ্বীপের কবিতাকৃতি, মননের লেখমালা ও অন্য আলোর রেখা।
‘বাইরে কাটা তরমুজের ফালিতে জীবনের সমান
চুমুক- বিষবৃক্ষের নিচে দেখ মনোবিকলন।’

(শায়কচিহ্ন : রক্তচিহ্ন : ৩)

রক্তচিহ্ন কবিতার এই দুটি লাইনের মধ্যে যে উদার মূল্যবোধ লুকিয়ে রয়েছে, সেটা যেন এক প্রকার সোম-রসের বিস্তার, হাহাকার করতে করতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। কবি মামুন মুস্তাফার কাব্য ভাষা বহুমাত্রিক। শায়কচিহ্ন কাব্যের মধ্যদিয়ে তিনি যে দাগ রেখে যেতে চাইছেন সেটা- বিপ্লবের এবং দেশ প্রেম থেকে মানব প্রেমের। তাঁর কবিতার হাজিরা খাতা যেন নিসর্গের গ্রীন কার্ড। আদরের পৃথিবীকে গভীর মমতায় আরো সজিব করে তুলতে চায়। কবির সৃজনে ছড়িয়ে রয়েছে একজন খাঁটি বাঙালি হওয়ার আরতি।

‘উন্নয়নের নারী সমতলে পায় না ঠাঁই।
রাতের বউঝিরা আজ মূক ও বধির;
ট্রিগারে আঙুল,
তবু আত্মহত্যা বড় বেশি করুণ লাগে।’

(শায়কচিহ্ন : সুবর্ণচর : ৬)

‘সুবর্ণচর’ কবিতার এই চারটি লাইন আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কোথায় শরীরের অসুখ। আর কতটা পথ পেরলে আমরা মানুষ হতে পারবো। কবি মামুন মুস্তাফা কোন বিদ্রুপ আঙ্গিকে নয় সরাসরি তার কাব্যভাষায় সরল ভাবে তুলে ধরেছেন সময়ের গভীরতম অসুখটাকে। যে ক্ষতটা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে ভার্চুয়াল যুগের এই আধুনিক যুগে। কোন মলম দিয়ে সেটাকে দাবিয়ে দেয়া যায় না। একবিংশ শতকের এই সম্ভাবনার যুগে যখন কোন উপকরণই টিকে থাকছে না। দড় দড় করে ভেঙে পড়ছে সব। ভেঙে যাচ্ছে একান্নবর্তী পরিবার। ফ্লাট বাড়ির বাস্ক বাস্ক খেলায় মেতেছে নাগরিক। ঘটে চলছে চরম মূল্যবোধের অবক্ষয় তখন কবি মামুন মুস্তাফার কলম মানবিক বাংলাদেশের কথা বলে। ভোগবাদি এবং পুঁজিবাদি সমাজব্যবস্থাকে তিনি কবিতার আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে রচনা করতে চান একটি সাম্যবাদী শান্তির সমাজ। আর কবিতার আলোয় গড়ে তুলতে চান একটি মানবিক পৃথিবী। কবির জন্য ভালোবাসা রইলো। ছোটকাগজ ‘লেখমালা’র জয় হোক।