জাতিভেদ ও জাতিবিদ্বেষ : ভারতবর্ষে এবং আমেরিকায় ॥ অংকুর সাহা



তখন ১৯৫৯ সালের শীতকাল। আমেরিকার মানবাধিকার আন্দোলনের অবিসংবাদী নেতা রেভারেন্ড মার্টিন লুথার কিং এবং তার স্ত্রী কোরেটা ভারতবর্ষ সফরে এসেছেন, প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর আমন্ত্রণে। বিমানবন্দরে নেমেই তিনি জানালেন যে অন্য দেশে তিনি যান রাজনৈতিক ভ্রমণে, কিন্তু এখানে তিনি এসেছেন ভারততীর্থে। রাজনীতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক, সাংবাদিক সম্মেলন, মহাত্মা গান্ধীর সমাধিতে মাল্যদান ইত্যাদি নিত্যকর্ম সেরে একদিন বিকেলে তারা গেলেন কেরালার ত্রিভেন্দ্রাম শহরে অস্পৃশ্য ছাত্রদের এক বিদ্যালয়ে। কিং দম্পতিকে আন্তরিক অভ্যর্থনা জানালেন সেই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, তাদের সাদরে নিয়ে গেলেন একটি সাজানো ক্লাসঘরে। ক্লাসের ছাত্রদের সঙ্গে কিংয়ের পরিচয় করিয়ে দিতে তিনি বললেন, ইনি আমেরিকার অস্পৃশ্যদের নেতা।

কথাটা কানে যেতেই মার্টিন লুথার কিং হতবাক, সেই সঙ্গে বিরক্তও হলেন কিছুটা। তিনি এই দেশে এক সম্মানীয় অতিথি এবং আগের রাতেই নৈশভোজন সেরেছেন প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর সঙ্গে। অবশ্যই তিনি আমেরিকার নিপীড়িত কালো মানুষদের নেতা, কিন্তু তার সঙ্গে ভারতবর্ষের বর্ণাশ্রম প্রথার সম্পর্ক কী? কিন্তু কথাটা তার মনের ভেতর খচখচ করতে থাকলোই। হোটেলে ফিরে তিনি ভাবলেন তার দেশের দু’কোটি কালো মানুষের কথা: কিভাবে তাদের দারিদ্র আর অনটনের খাঁচায় তারা শ্বাসরুদ্ধ, কিভাবে তাদের বাস করতে হয় শহরের সবচেয়ে নোংরা আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, কিরকম দূরবস্থা তাদের স্কুলে, কলেজে, হাসপাতালে, ট্রেনে, বাসে: সঙ্গে অসাম্য আর নির্যাতন। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের কাছে স্বীকার করলেন যে আমেরিকায় তিনি এবং তার কালো সতীর্থরা সকলেই অস্পৃশ্য।

মার্কিন সাংবাদিক ও লেখিকা ইসাবেল উইলকারসনের জন্ম ১৯৬১ সালে। কালো মানুষদের জীবনযাপন আর নিত্যসংগ্রাম নিয়ে মুখর তার লেখনী। কয়েক বছর আগে তিনি ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণ দিতে এসেছিলেন জাতিভেদ ও বর্ণভেদ বিষয়ের সেমিনারে। সেখানকার সমাপ্তি অনুষ্ঠানে উদ্যোক্তারা তাকে উপহার দেন ভীমরাও আম্বেদকারের (১৮৯১-১৯৫৬) একটি ব্রোঞ্জ প্রতিমূর্তি। তিনি যখন তার নিজের শহরে ফেরার উড়ান ধরবেন, তখন বিমানবন্দরের কৃষ্ণকায় নিরাপত্তা কর্মী তার কেবিন লাগেজ খুলে পরীক্ষা করে দেখতে চাইলেন সেই ধাতব বস্তুটিকে। মোড়ক খুলে মূর্তিটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে তিনি জানতে চান ইনি কে? লেখিকার সময় নেই বিশদ ব্যাখ্যা করার, তিনি একবাক্যে বলেন, ইনি ভারতবর্ষের মার্টিন লুথার কিং। কর্মীটি সসম্মানে তাকে এগিয়ে যেতে অনুমতি দেয়।

ভারতবর্ষের অস্পৃশ্য, দলিত এবং আমেরিকার নিপীড়িত কালো মানুষদের যোগাযোগটি সুদূর ও নিবিড়। আম্বেদকার লেখাপড়া করেছেন আমেরিকায় এবং তার সঙ্গে কৃষ্ণকায় সমানাধিকার আন্দোলনের নেতা উইলিয়াম দুবোয়েস (১৮৬৮-১৯৬৩) এর চিঠিপত্রের যোগাযোগ ছিল নিয়মিত। মার্টিন লুথার কিং নিজেও মহাত্মা গান্ধীর অহিংস, অসহযোগ আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। কিন্তু দুই দেশের দুই প্রথার ঐতিহাসিক ভিত্তিমূল এবং বিশেষ করে মার্কিন দেশের ইতিহাসে বর্ণাশ্রম প্রথার প্রভাবটি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেননি কেউ। সেই দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করেছেন ইসাবেল তার সাম্প্রতিক গ্রন্থে: “জাতিভেদ: আমাদের অসন্তোষের উৎস”। নিউ ইয়র্ক টাইমস সংবাদপত্রের মতে, ‘an instant American classic and almost certainly the keynote nonfiction book of the American century thus far’.

গ্রন্থের সূচনা ঘটেছে জাতিভেদের উৎসে অর্থাৎ মনুসংহিতায়: ব্রহ্মার মুখ, বাহু, ঊরু এবং পা থেকে চারটি বর্ণের সৃষ্টি এবং সেই বর্ণপ্রথার বাইরে থেকে যাওয়া অস্পৃশ্য অথবা দলিত জাত। তারপরে সহস্রাব্দ জুড়ে সেই প্রথা চলে আসছে বংশানুক্রমে: অসাম্যের ধাপে ধাপে বাঁধানো বিদ্বেষ ও নির্যাতনের কুৎসিত ইতিবৃত্ত। ভারতবর্ষে যেখানে চারটি বর্ণ এবং একটি ফাউ, এবং তাদের আবার রয়েছে অসংখ্য ক্ষুদ্রতর উপবর্ণ। কিন্তু আমেরিকায় রয়েছে দুটি বর্ণ: শাদা অর্থাৎ উচ্চবর্ণ এবং কালো অর্থাৎ নিম্নবর্ণ। ইয়োরোপে কোনো শাদা মানুষ বাস করেন না: সেখানে আছেন ব্রিটিশ, ফরাসি, জার্মান, রুশ অথবা ওলন্দাজ মানুষ। তারা কেউ উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেন না, আমরা শ্বেতকায়। আফ্রিকায় কোনো কালো মানুষ বাস করেন না: সেখানে মানুষ নাইজিরিয়ার অথবা কেনিয়ার কিংবা ঘানার অথবা মোজাম্বিকের। অথবা তারা জুলু, হুতু, ইগবো, মাসাই প্রভৃতি তিন হাজার উপজাতির সদস্য। তাদের কেউই তাদের গাত্রবর্ণের জন্যে অপমানিত অথবা নিন্দিত হন না নিয়মিত।

শাদা ও কালো মানুষদের নতুন মহাদেশে আগমন ঘটেছে প্রায় একই সময়ে। ১৬০৭ সালে তিনটি পালতোলা জাহাজে ইংল্যান্ড থেকে ১০৪ জন মানুষ এসে উপস্থিত হন আমেরিকার উত্তর-পূর্ব উপকূলে এবং গড়ে তোলেন প্রথম শ্বেতকায় কলোনি ‘জেমসটাউন’। বারো বছর পরে ১৬১৯ সালে সেই একই অঞ্চলে ‘শাদা সিংহ’ নামে একটি ওলন্দাজ জাহাজের ক্যাপ্টেন ২০ জন ক্রীতদাসকে আফ্রিকা থেকে বন্দি করে এনে বিক্রয় করেন সেই কলোনির অধিবাসীদের কাছে। পরবর্তী চার শতক ধরে দুই জাতি আর দুই সমাজের সমান্তরাল জীবনযাপন: আলাদা এবং অসমান। ১৮৬৫ সালে ক্রীতদাস প্রথার বিলোপ ঘটলেও কোনো উন্নতি হয়নি কালো মানুষের জীবনযাত্রার। লেখিকা গভীর বিশ্লেষণের সঙ্গে দেখিয়েছেন যে এতে ক্ষতি হয়েছে উভয়পক্ষেরই। এখনো আমেরিকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক উন্নয়ন অথবা বিচার ব্যবস্থায় যত কিছু সমস্যা দেখা যায়, তার বেশির ভাগের মূলে রয়েছে এই জাতিবিদ্বেষ।

এদিকে আমেরিকায়ও ‘শ্বেতকায়’ কাকে বলে তার সংজ্ঞাও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টেছে ভীষণভাবে। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে আমেরিকায় ‘শ্বেতকায়’ বললে সকলে বুঝতো যে কেবল ইংল্যান্ড এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলি থেকে আগত মানুষ। ইউরোপের বাকি অংশের, বিশেষ করে মধ্য এবং পূর্ব ইয়োরোপের লোকেরা ছিলেন সম্পূর্ণ ব্রাত্য। জার্মানির লোকেদের নিন্দে করা হত অবিশুদ্ধ শোণিতের জনতা হিসেবে। ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়েছে শাদা মানুষের পরিধি: যোগ দিয়েছেন গ্রিস, পোল্যান্ড, রাশিয়া, স্পেন, ইতালি এবং ইওরোপের অন্য মানুষেরা।

উপসংহারে লেখিকা জানিয়েছেন যে জাতিভেদ প্রথাকে সমূলে উপড়ে ফেলা সম্ভব এবং তা ঘটেছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে নাৎসিদের পরাজয়ের পর জার্মানিতে। কিন্তু অন্য দেশে কি তা করা সম্ভব হবে?


Caste : The Origins of Our Discontents ॥ ইসাবেল উনলকারসন ॥ প্রকাশ : ২০২০ ॥ প্রকাশক : রান্ডাম হাউস, নিউ ইয়র্ক ॥ ১৭+৪৭৭ পৃষ্ঠা ॥ ISBN : ৯৭৮ ০৫৯ ৩২৩ ০২৫১ ॥ দাম: ৩২ ডলার