জাপানিরা কেমন-৬ ॥ আরশাদ উল্লাহ্



গতকাল নজিতা তার বর্তমান স্বামী মি. সাইতো ও তার প্রাক্তন স্বামী মি. সুগিইয়ামাকে নিয়ে কিছুক্ষণের জন্যে এসেছিলেন। আসার আগেই বলেছিলেন যে তারা চিচিবু পর্বতের ‘দোদাইরা’ শীর্ষে গাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন। ফেরার পথে আমাদের বাসায় আসবেন।

কথামতো বিকালে এসেছিলেন। জিজ্ঞাসা করলাম তিনজন মিলে পর্বত আরোহণ করবেন ড্রাইভ করবে কে?
নজিতা বললেন, ‘আমি ড্রাইভ করেছি’।

পঁচাত্তর বৎসর বয়সের নজিতা চিচিবু পর্বতমালার শীর্ষে যে সরু এবং আঁকাবাঁকা রাস্তা আছে সে রাস্তা দিয়ে ড্রাইভ করবেন। সঙ্গী তার তৃতীয় স্বামী এবং দ্বিতীয় স্বামী। তার তৃতীয় স্বামীর বয়স বিরাশি। আর তালাক প্রাপ্ত স্বামীর বয়স সাতাত্তর বৎসর। যিনি বৈধ স্বামী তিনি মদ্যপ। সকাল সন্ধ্যা মদ খেয়ে বুদ হয়ে থাকেন। তাই গাড়ি ড্রাইভ করেন না। তৃতীয় স্বামীটি একবার রোড এক্সিডেন্ট করাতে পুলিশ তার লাইসেন্স সিজ করেছে। জরিমানা দিয়ে এক মাস জেলে ছিলেন। তাই ড্রাইভ করা জানা স্বত্বেও তিনি ড্রাইভ করেন না। আর, যে লাইসেন্স পুলিশ সিজ করেছে। সেটা হাতে পেতে হলেও তাকে আবার পরীক্ষা দিয়ে পাশ করতে হবে। নতুবা সম্ভব নয়।

পার্বত্য রাস্তা পাকা রাস্তা হলেও অনেক সরু। আমিও বেশ কয়েকবার সেখানে গাড়ি চালিয়ে গিয়েছি। অনেক আঁকাবাঁকা রাস্তা। দুটি গাড়ি ক্রস করতে সাবধানে করতে হয়। নইলে ধাক্কা লেগে যাবে। স্পীড ২০ কিলোমিটারে রাখতে হয়। নজিতা তার স্বামী ও তার প্রাক্তন স্বামীকে নিয়ে শক্ত হাতে পঁচাত্তর বছর বয়সে দৃঢ়তার সাথে ড্রাইভ করে ফিরেছেন। তার পরনে তার হাতের তৈরী পোষাক, মাথার লেডিজ ক্যাপটি তার হাতে তৈরী করা। বলাই বাহুল্য যে এ পর্যন্ত তিনি যতোবার এসেছেন, ভিন্ন পোষাক পরে এসেছেন। এক পোষাক পরে দুবার আসেননি।

তার বর্তমান স্বামীটি ভদ্র স্বভাবের। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি তো বেশ সুখে আছেন। এ বয়সেও আপনি সুস্থ। আর কিছু চাওয়া পাওয়ার আছে কি’?
বললেন, ‘নাহ, চাওয়া পাওয়ার আমার আর কিছু নেই’।
কিন্তু নজিতা বলেছেন, যে তার স্বামীটি প্রতি রাতে মদ্য পান করেন। চাওয়া পাওয়ার মনে হয় তার সেটা্ই।
প্রাক্তন স্বামী সুগিয়ামা জীবন ভর জুয়া খেলেছেন। এখন তার সে অভ্যাস নেই। শান্তশিষ্ট মানুষ মনে হয়। তার মাথার সবগুলি চুল সাদা।

আরেক দিন নজিতা তার প্রাক্তন স্বামী সুগিইয়ামা সম্পর্কে বলেছেন, যে তিনি নাকি তার শহরের থানায় কয়েকবার হাজতবাসও করেছেন। নজিতা জোর দিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, সে থানাটির নিকট আমরা কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ’।

সুগিইয়ামার বিনা ড্রাইভিং লাইসেন্সে ড্রাইভ করে কয়েকবার ট্রাফিক পুলিশ কর্তৃক আটক হয়েছেন। বিনা ড্রাইভিং লাইসেন্সে প্রথম দু’বার ধরা খাওয়ার পরে আদালতে জরিমানা দিয়ে রেহাই পেয়েছেন। কিন্তু তৃতীয়বার তাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে এবং এক মাস জেল হাজতে ছিলেন। এ জন্যে নজিতা সে থানাটির নিকট কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ বলেছেন। কারণ, থানা হাজতে তাকে তিন বেলা খাবার দিয়েছে। কিন্তু সুগিয়ামা কেন পরীক্ষা দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স নিচ্ছেন না – সেকথা এখনো জিজ্ঞাসা করিনি।

এইতো মাস খানেক পূর্বে নজিতা এসে বললেন, ‘জানেন, সে আমাদের সাথে কিছু বোঝাপড়া না করেই একটি পুরানো ৬৬০ সিসি পাউয়ারের লাইট কার কিনে এনেছে। রাগত কন্ঠে বললেন, ‘আমাদের দুটো গাড়ি রাখার স্থান আছে কিন্তু তার গাড়ি বাসার সামনে রাস্তায় রাখে। যা জাপানে বেআইনি। কখন যে পুলিশ এসে গাড়ি উঠিয়ে নিয়ে যাবে এবং আমাকে গিয়ে পঁয়ত্রিশ হাজার ইয়েন জরিমানা দিয়ে গাড়িটি ছুটিয়ে আনতে হবে সে আশংকায় আছি।
বললাম, বকা দেন নি?
বললেন, হ্যাঁ, বকেছি। তখন চুপ করে দোতলায় উঠে তার রুমে গিয়ে বসে রয়েছে।

আরো কিছু তথ্য জানলাম। তা এক মজার কাণ্ড। শুনে না হেসে থাকতে পারিনি। নজিতা একদিন সকালে উঠে দেখেন ঘরের সামনে সুগিইয়ামার গাড়িটি নেই। তিনি আগেই সন্দেহ করেছিলেন যে একদিন পুলিশ আসবেই এবং গাড়িটি উঠিয়ে নিয়ে যাবে। কারণ, রাস্তায় পার্কিং এর হুকুম নেই। সকালে গাড়িটি না দেখে বেশ কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করে বাড়িটি মাথায় তুলে রাখলেন নজিতা। এক সময় সবাই ঘুম থেকে উঠে গাড়ি খুঁজতে লাগল। তাদের সাথে সুগিইয়ামাও গাড়ি খুঁজছেন। আধা ঘন্টা খুঁজাখুঁজি করার পর সুগিইয়ামা হঠাৎ বললেন, ‘আরে, মনে পড়েছে। গতরাতে গাড়িটি আমার এক বন্ধুর খালি পার্কিং ইয়ার্ডে রেখে এসেছি’।
নজিতা বললেন, তাহলে এতোক্ষণ বললে না কেন?
আমিও সেকথা ভুলে গিয়েছিলাম। সুগিইয়ামার জবাব।
কিন্তু তার কথা কেউ বিশ্বাস করল না। বলল, আমরাও তোমার সাথে যাবো, চল।
তারা গিয়ে সত্যই সেদিন গিয়ে গাড়িটি তার বন্ধুর পার্কিং ইয়ার্ডে পেয়েছিলেন। তারপর সাব্যস্ত হল গাড়িটি বিক্রয় করে দেওয়া হবে।

জাপানিরা কেমন তা জানতে হলে আরো গভীরে যেতে হবে। সত্যই এক রহস্যময় জাতি তারা। এক জাপানিকে জানতাম, তিনি একটি বিখ্যাত গবেষণাগারের ডিরেক্টর। সেখানে গবেষকের সংখ্যা সাড়ে সাতশত জন। মনে পড়ে একদিন তিনি বলেছিলেন জাপানিরা নাকি ‘মনোরেসিয়্যাল’ জাতি। তা বলে তিনি আমাকে বুঝিয়েছিলেন যে তাদের সাথে বিদেশীরা বেমানান। তার কথার মাঝে উন্নাসিকতার লক্ষণ ছিল। তারা এমন এক জাতি, শক্তের ভক্ত নরমের যম। প্রবাদ বাক্য। তবে অর্থবোধক। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হেরে গিয়ে তারা আমেরিকানদের সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারতো না। আমেরিকা যে জেনে শুনে তাদের ফাঁদে ফেলে যুদ্ধে নামিয়েছিল – সেকথা তারা অনেক পরে উপলব্ধি করতে পেরেছে। জাপানিরা জানতো না যে ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর যখন হাওয়াই দ্বীপে আমেরিকার সপ্তম নৌবহরে জাপানি সৈন্যরা অতর্কিতে আক্রমণ করে নৌঘাঁটি বিদ্ধস্ত করে দিয়েছিল – সে আক্রমণের কথা তৎকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ও তার সেনাবাহিনি আগেই অবগত ছিলেন। ইতিহাস সেকথাই বলে।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগবে যে কেন আগেভাগে জানার পরেও আমেরিকা জাপানি সেনাবাহিনিকে তার সপ্তম নৌবহর ধ্বংস করতে দিয়েছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, রুজভেল্ট চেয়েছিলেন জাপানের প্রথম আক্রমণের একটি ‘জ্বলন্ত অজুহাত’ সৃষ্টি করতে। তাহলে খোদ আমেরিকার জনগণ এবং বিশ্ববাসী সহজে বুঝতে পারবে আমেরিকা কেন এবং কি কারণে জাপান আক্রমণ করেছিল।

আমেরিকার সেনাবাহিনীর সেনাপতিগণ জাপানিদের তুলনায় অত্যন্ত চুতুর এবং কৌশলী ছিল। যুদ্ধের ইতিহাস পড়ে আমার এ ধারণা হয়েছে। গুপ্তচরবৃত্তি এবং ডিকোডিং এর মাধ্যমে সুকৌশলে তারা জাপানকে পরাভূত করেছিল। যুদ্ধে অবশ্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জাপানের তুলনায় তাদের খুব কম ছিল না। এখন সে কথা সকল জাপানিরা স্বীকার করে। অধুনা জাপানিদের মনে সুপেরিওটি এবং ইনফেরিওটি কমপ্লেক্স বলতে যা বুঝায় এ দু’টি ক্রিয়া করছে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত জাপানকে আমেরিকার অনুদানে পুনর্গঠিত করার কৃতিত্ব তাদের আছে। তাই সুযোগ পেলে ‘সুপেরিওটি কমপ্লেক্স’-এর ক্রিয়া তাদের স্বভাবে প্রতিফলিত হয়। বিশেষ করে এশিয়ানদের প্রতি তারা এমন ভাব দেখায়।

তা ছাড়াও তারা তাদের দেহবর্ণ নিয়ে মহা কমপ্লেক্সে ভুগছে। হোয়াইটদের প্রতি ইন্‌ফিওরিটি কমপ্লেক্স রয়েছে তাদের। আবার নন হোয়াইটদের কাছে অন্য রকম তারা। চোখ নিয়েও যুবতীরা কমপ্লেক্সে ভোগে। যাদের পয়সা আছে তারা প্লাস্টিক সার্জারীর বদৌলতে ছোট চোখ বড় করে ফেলে। আবার থ্যাবড়া নাক উঁচুও করে। তাদের এমন সুন্দর হওয়ার প্রবণতা দেখে তাদের প্রতি আমার মায়া জাগে।

ধর্মের চর্চা তাদের মাঝে তেমন নেই। তাই আইনের চর্চাই বেশী দেখা যায় তাদের দৈনন্দিন জীবন যাত্রার মাঝে। আইনের প্রভাব দিয়েই জাপানের সমাজ ও জনগণের জীবন গড়ে উঠেছে। কিন্তু মানুষের জীবনে যে মহত্ব ও বিবেক থাকার কথা – তার মাত্রা তাদের মাঝে কম মনে হয়।

একটি দৈনিক পত্রিকাতে ট্রাবলশুটার নামক বিভাগটিতে নিয়মিত বিভিন্ন সমস্যার উপর লেখা হয়। সেখানে একদিন এক বৃদ্ধের চিঠি পড়ে সহজেই তা অনুধাবন করলাম। লেখাটির টাইটেল ছিল:
‘আমার মেয়ের জামাই কোনো চাকরীতে লেগে থাকতে পারেনা, অলসের মতো দিন যাপন করছে’।

প্রিয় ট্রাবলশুটার,
আমি একজন পুরুষ, বয়স ৬০ এর কোঠায়। আমি আমার মেয়ের জামাইকে নিয়ে চিন্তায় আছি। সে চাকরীতে যোগদান করে বেশিদিন থাকে না। একটার পর একটি চাকরি নিয়ে ছেড়ে দেয়। এখন সে ঘরে বসে অলসের মতো দিন কাটাচ্ছে।
সে আমার মেয়েকে ১১ বৎসর পূর্বে বিয়ে করেছে। আমার মেয়ে একজন নার্স। তাদের তিনটি সন্তান রয়েছে। যখন তাদের বিয়ে হয় তখন জামাইটি একটি ভিডিও শপের ম্যানেজার ছিল। সে সময় দোকানটির ব্যবসা ভাল যাচ্ছিল। কিন্তু যখন জাপানের অর্থনীতি খারাপের দিকে – তখন দুই বৎসর পূর্বে তাকে বরখাস্ত করা হয়। তারপর থেকে সে যখন কাজে যোগদান করেছে, শীঘ্রই সে টায়ার্ড হয়ে যায় বলে চাকরি ছেড়ে দেয়। তাই আমাদের পারিবারিক যে দোকানটি আছে, সেখানে তাকে কাজ করতে বলি। সে এখন কাজ করছে এবং কাজটি তার ভাল লাগছে বলেছে। একদিন তাকে জিজ্ঞাসা করে জানতে চেয়েছিলাম যে এখন সে কি চিন্তাভাবনা করছে। সে জবাব দিল সে নিজেই একটি দোকান পরিচালনা করতে চায়। আমি জানি যে এমনতর স্বপ্ন দেখা সত্যই ভাল। কিন্তু সে তার দোকান চালু করতে কোন টাকা পয়সার ব্যবস্থা করছে না।
আমি মনে করি যে সে যদি সিরিয়াস হয়ে কাজ-কর্ম করে উপার্জন করে তাহলে তারা তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ বহন করতে পারবে।
যদি সে আবার কোন চাকরীতে যোগদান করে এবং কয়েক মাস পর আবার ছেড়ে দেয় তখন আমি আমার মেয়েকে তার স্বামীকে তালাক দেওয়া কথা বলব কি? অথবা আমি কি তার সবকিছু বহন করে যাব – যেহেতু আমার মেয়েকে সে বিয়ে করেছে?

উপরের চিঠিটির জবাব দিয়েছেন একজন ফিলোসফার। নিম্নে সেটার অনুবাদ:

জনাব,
যাদের বয়স ষাটের উর্ধে তারা সাধারণত তাদের সন্তানদের নিকট থেকে আলাদা থাকে এবং তাদের নাতি-নাতনিদের দেখাশোনা জীবনের একটি পর্যায় পর্যন্ত করেন। আপনার এই বয়সে এখন স্ত্রীকে নিয়ে অবসর জীবন যাপন করার সময়। কিন্তু তা করতে আপনি ভয় পাচ্ছেন। আপনার জন্য আমি দুঃখিত।
আমি মনে করি আপনার মেয়ের জামাইকে দীর্ঘদিন দায়িত্বে রেখে আপনি কিছু সময় অবসরে থাকুন। আমার মনে হয়না আপনার মেয়ের জামাইটি কোন কাজে লেগে গিয়ে শীঘ্র টায়ার্ড হয়ে যায়। তার যে সমস্যা, তা হলো সে তার মনোমত কাজ পাচ্ছেনা অথবা নতুন কর্মস্থলের কলিগদের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছে না। সে যে কাজ করতে ভালবাসে তাকে তা করতে দেওয়া উচিত মনে করি।
সে এখন অলসের মতো রয়েছে। কারণ সে তার উপযুক্ত কাজটি এখনো পায়নি। তাছাড়া সে দেখছে যে তার শ্বশুরের একটি ভাল দোকান রয়েছে এবং তার স্ত্রী নার্স এর কাজ করে যাচ্ছে। তার স্ত্রী ও আপনার সাহায্য ব্যতিরেকে সে অলস জীবন যাপন করতে পারে না।

তাই আপনি কেনো তার হাতে আপনাদের পারিবারিক ব্যবসার কাজটির সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছেড়ে দিচ্ছেন না? যদি তা আপনি করতে না চান তাহলে তাকে এভাবেই থাকতে দিন। তাকে শুধু বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা সকলে স্বাধীন ভাবে নিজেদের সাপোর্ট করে এসেছি, তা ঠিক নয় কি? আমার স্ত্রী এবং আমি বুড়ো হলে তখন অন্যের সেবার উপর নির্ভর করতে হবে। কিন্তু তোমার কাছ থেকে আমরা তা আশা করতে পারি না।
আপনি যদি তা করেন তাহলে তার প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে সে জন্যে আপনাকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
কিয়োকাজু ওয়াশিদা
ফিলসোফার

ট্রাবলশুটারকে লেখা বৃদ্ধের চিঠিতে যে কথাটি জেনে আঁতকে উঠেছি – তা হলো মেয়েকে তালাক দেওয়ার যে কথাটি তিনি উল্লেখ করেছেন সে ব্যাপারটি। কোন বিবেকে তিনি এ কথাটি বললেন? তার মেয়ের তিনটি সন্তান রয়েছে। এমন অবস্থায় তিনি চান তার মেয়ে তার স্বামীকে তালাক দিক। তালাক কথাটি এতোই হালকা তাদের সমাজে। ফিলোসফারের উত্তর যথার্থ মনে করি। তিনি তালাকের ব্যাপারটি এড়িয়ে গিয়েছেন। তাদের তালাক যদি হতো তখন সন্তান তাদের বাবার স্নেহ মমতা থেকে বঞ্চিত হতো। বুড়োর মেয়ে যে কথা নিজের মুখে বলেনি সেকথা তার মুখ থেকে বের হল। অবাক হওয়ার কথা নয় কি? তালাক কি এতোই মামুলি ব্যাপার? তালাক প্রাপ্ত কিছু পরিবারকে দেখেছি। তাদের পরিণতি হয়েছে বড় করুণ। সে ব্যাপারে আগামী পর্বে লিখব।

নজিতা এখন কম আসেন। আগে সপ্তাহে গড়ে তিন দিন আসতেন। ইদানিং আসা যাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। কারণ, মিসেস তোদাকে তার ভাল লাগে না। নজিতাই মিসেস তোদাকে আমাদের বাসাতে আড্ডা দিতে দু’মাস পূর্বে সঙ্গে নিয়ে এসে আমার স্ত্রীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। আর এখন তিনি মাত্র দু’মাসের ব্যবধানে মিসেস তোদাকে প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে নিন্দা করছেন।
বলেন, তোদা যে কলেজ থেকে ডিগ্রী নিয়েছে সে কলেজটি তৃতীয় শ্রেণীর কলেজ, বিখ্যাত নয়।

মিসেস তোদার দেহ বৈশিষ্ট লম্বা, বয়স সত্তর হলেও গায়ের বর্ণ এখনো অনেক ফর্সা। স্বাস্থ্য ভাল। সেদিন আমার স্ত্রীও আমাকে বোঝাল যে নজিতা মানুষের নিন্দা করেন অথচ নিজের ব্যাপারে বিন্দু মাত্র বিবেচনা করেন না।

সেদিন একজন মহিলা, যিনি নজিতাকে চিনেন। তিনি নজিতার নিন্দা করে বলে গেলেন, সে তো দুই স্বামী নিয়ে এক বাড়িতে থাকে – তা নিন্দার ব্যাপার নয় কি?
বললাম, সে দু’বার তার প্রাক্তন স্বামী ও বর্তমান স্বামীকে নিয়ে আমাদের বাসাতে এসেছিলেন।
মহিলা চোখ কপালে তুলে বললেন, ও মা…বলেন কী আপনি। সে তার দুই স্বামীকে নিয়ে এখানে এসেছিল। ছি… ছি…, লজ্জা বলতে কিছু নেই নজিতার।

এখানে নজিতার জানাশোনা কিছু মহিলা আসেন। তাদের বয়স সত্তরের কোঠায়। এই বয়সে এক মহিলা আরেক মহিলার দোষ ত্রুটি নিয়ে নিন্দাবাদ করছেন। তা আমাদের দেশে নেই বলেই আমার ধারণা। প্রবাদ বাক্য আছে যে “সুখে থাকলে ভূতে কিলায়।” এই মহিলা গ্রুপের প্রত্যেকে সুখে আছেন। সবাই উচ্চ মধ্যবিত্ত ঘরের এবং অর্থকষ্ট তাদের নেই! তাই ভূত জাতীয় কিছু তাদের কয়েকজনের মাঝে আছে মনে হয়। এই বয়সে ভিন্ন ভিন্ন শহরে বসবাস করছেন নজিতা গ্রুপের সবাই। অথচ কেজি স্কুলের শিশুদের মতো তাদের ব্যবহার দেখা যায়। তন্মধ্যে নজিতার নাম সবার আগে আসে।

নজিতার শহর আমার ছোট শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে। তার বাসাতে মাত্র একদিন আমরা নিমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলাম। মহিলা বেশ যত্নের সাথে রান্নাবান্না করে আমাদের আপ্যায়ন করেছিলেন।

তিন সপ্তাহ পরে একদিন তিনি এসে বলেছিলেন যে তার ছেলে কেইসুকের চাকরি হয়েছে। মহিলাকে সেদিন বেশ খুশি মনে হয়েছে।
বলেছিলেন, মাসের পর বেতন পেয়ে আমাকে সে কতো হাত খরচা বাবদ দেয় তা দেখার অপেক্ষায় আছি।

কেইসুকের চাকরিটা দীর্ঘস্থায়ী হোক মনে মনে কামনা করলাম। চাকরি করেনা বলে নজিতা ছেলেকে বিভিন্ন শাস্তিও দিয়েছেন। তদুপরি বকাঝকা তো আছেই। একদিন বলেছিলেন, শীতের দিনে কেইসুকেকে কেরোসিন হিটারে কেরোসিন ব্যবহার করতে তিনি দিচ্ছেন না। একথা শুনে অবাক হলাম। নিজের সন্তানটিকে এমন ভাবে শাস্তি দিচ্ছেন শুনে তার ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে লাগলাম।
বলেছিলাম, এ কাজটি কিন্তু আপনি ভাল করছেন না।

শীতকালে এ এলাকার তাপমাত্রা মাইনাসে নেমে যায়। ট্যাপের ভেতরে পানি জমে গিয়ে বরফ হয়ে থাকে। দুপুরের দিকে সূর্য উঠলে বরফ গলে যায়। তারপর পানি চলাচল শুরু হয়।
নজিতা বললেন, সে কয়েকটি লেপ গায়ে দিয়ে শুয়ে মোবাইল ফোন দিয়ে যেনো টুক্‌টাক করে। এভাবে না রাখলে সে চাকরি তালাশ করতে যাবে না।

গতো নির্বাচনের দু’দিন পূর্বে সিটি কাউন্সিলে কি কাজে যেনো নজিতাকে যেতে বলেছিল। কিন্তু তিনি যান নি। বললেন, সিটি কাউন্সিলে যেতে আমার ইচ্ছা হয়না।
কেনো যেতে ইচ্ছা হয় না?
বললেন, সেখানে গেলে এলাকার অনেকের সাথে দেখা হয়ে যায়। তা আমি পছন্দ করি না।
তিনি যাননি বলেছিলেন। কিন্তু তার না যাওয়ার পিছনে কী রহস্য থাকতে পারে তা জানার জন্যে নতুন করে তার সম্পর্কে আগ্রহ জাগল। মাস না যেতেই ফলাফল জানতে পারলাম। তা হলো নজিতার এলাকার লোকদের সাথে তার তেমন গভীর সম্পর্ক নেই। কারণ হলো নজিতার পূর্ব স্বামী নিয়ে যে অপ্রিয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল সে জন্য তিনি এক প্রকার কমপ্লেক্সে ভুগছেন। সে স্বামীটি তাকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছিল – তদুপরি সে স্বামীটিকে তালাক দিয়েও তাকে সহ একই বাড়িতে বর্তমান স্বামী সহ থাকেন। তাতে এলাকাবাসীর মাঝে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে। তাই তিনি প্রতিদিন এলাকার বাহিরে আমার শহরের কাছাকাছি এলাকায় গাড়ি নিয়ে চলে আসেন। লাঞ্চ ও ডিনার রেষ্টুরেন্টেই করেন। বাড়িতে ফিরে যান সন্ধ্যার পরে। এ হল তার দৈনন্দিন জীবনযাত্রার রোজনামচা। সমাজের লোকদের নজর থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে তিনি বাহিরে চলে আসেন। বাহিরে নজিতা একা একা রেষ্টুরেন্টে খান না। তকিগাওয়া শহরে ‘নেকো’ নামে যে রেষ্টুরেন্টটিতে মিসেস তোদা এবং পঞ্চাশ বছর বয়সের অবিবাহিতা মহিলা মিদরিকে নিয়ে লাঞ্চ ও ডিনার করেন। সেখানে আরেক ধনী মহিলারও আগমন হয়। নাম তার মিসেস হারাকি। এরা সেখানে খাওয়া দাওয়া সেরে গল্পগুজব করে দিন কাটিয়ে দেন। তবে মিদরি ও হারাকি যে পার্টি করেন তা নজিতার অপছন্দ। কিন্তু করার তো কিছু নেই। সাময়িক সঙ্গী হিসাবে রেখেছেন। তাছাড়া তিনি কথা বলতে ভালবাসেন। অন্যের কথা শুনতে ভালবাসেন না। তিনিই শুধু ক্রমাগতভাবে কথা বলে যাবেন, অন্যেরা শুনবেন। অন্য কেহ যদি কথা বলতে চায়, তখন তিনি নেগেটিভ মন্তব্য করেন। তাই বাকি দু’জন হলেন নজিতার শ্রোতা। কিন্তু মিসেস হারাকির কথায় যে ধনী সুলভ অহমিকার সুর থাকে তা পছন্দ করেন না। তাই যখন হারাকি অনুপস্থিত থাকেন তখন নজিতা তার বিরুদ্ধে কথা বলতে থাকেন।

মিসেস তোদা মাঝে মধ্যে নজিতার কথার মাঝে কথা বলতেন। এটা তার পছন্দ লাগতো না। ক্ষেপে গিয়ে বলতো, তুমি নিম্নমানের কলেজ থেকে পাশ করেছো তা তোমার কথা থেকে তা বুঝতে পারি।
তাই নজিতা একদিন ফোনে আমার স্ত্রীকে জানিয়ে দিলেন যে মিসেস তোদা যখন আপনার বাসায় থাকবে তখন তিনি আসবেন না। তিনি এখন আমাদের বাসাতে আসা যাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন।
আমার স্ত্রীর বক্তব্য হল, মিসেস তোদা নজিতার পছন্দের মহিলা না হলেও আমার তাতে কি? আমার এখানে যিনি আসবেন তাকে আমি বাসায় আসতে মানা করতে পারব না। আমার চোখে সবাই সমান।