জাপানিরা কেমন- ৭ ॥ আরশাদ উল্লাহ্




আমার দৃষ্টিতে জাপান এখন বৃদ্ধদের দেশে পরিণত হয়েছে।জোয়ানদের চেয়ে বৃদ্ধের সংখ্যা অধিক এবং যত্রতত্র তাদের দেখা যায়। সত্তরের অধিক বয়সের পুরুষ ও মহিলার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আমার শহরটির যে আধুনিক আবাসিক এলাকাটি আছে, সেটি কয়েকটি পাহাড় কেটে খাদ-খুদ ভরাট করে সুন্দর করে করেছে জাপানের ‘শিন্তোসি’ নামে এক কোম্পানী। সত্তরের দশকে গড়া এ আবাসিক এলাকাটিতে টোকিওতে চাকুরি করে এমন পরিবারের সংখ্যা অনেক বেশি। তাদের মধ্যে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকও আছেন। ১৯৮০ সালে যখন এ আবাসিক এলাকাটিতে বাসা নিয়েছিলাম তখন নতুন নতুন দম্পতি এসে সুন্দর বাগান যুক্ত বাড়ি কিনে বসবাস করেছে। শিশুর সংখ্যা অধিক ছিল। এ আবাসিক এলাকাটিতে দু’টি প্রাইমারী স্কুল ও একটি সিনিয়ার হাই স্কুল আছে। নব্বইয়ের দশকে একটি অত্যাধুনিক প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এমনটি হয়তো অনেকে কল্পনাও করতে পারবেন না। কিন্তু কথাটি সত্য এবং তা দেখে আমিও অবাক হয়েছি। জাপানের এসব প্রাইমারী স্কুল সরকারি স্কুল। অন্যদিকে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যাও বেশ বেড়েছে। এ সব পরিবর্তন এতো শীঘ্র দেখতে পাব – কল্পনাও করিনি। পাশের শহর মরোইয়ামাতেও একটি সরকারি সিনিয়ার হাই স্কুল বন্ধ হয়ে গেল। এ জন্য দায়ী করা যায় তরুণ প্রজন্মকে। কারণ তারা বিয়ে করেনা। লীভ-টুগেদার করে। ফলে শিশুর সংখ্যা কমছে।

শিশুর সংখ্যা বাড়াতে সরকার অবশ্য অনেক পন্থা অবলম্বন করেছে। যে সব যুবক-যুবতীরা বিয়ে না করে ‘লীভ টুগেদার’ করছে, তাদের মধ্যে অবৈধ সন্তান হলে তা এক সময় মন্দিরে রাতের অন্ধকারে গিয়ে ফেলে আসতো। এমনতর খবর পত্রিকাতে পড়েছি। বর্তমানে এমন সংবাদ কম ছাপানো হয়। কারণ, ম্যাটারনিটি ক্লিনিকগুলিতে সরকারের নির্দেশে অবৈধ শিশু গ্রহণ করার বিশেষ ‘দরজা’ খোলা হয়েছে। যাদের বিবাহ বহির্ভূত অবৈধ সন্তান হয়, তারা রাতের অন্ধকারে এসে দরজা খুলে সন্তান রাখার যে নম্র ও উষ্ণ বেড রয়েছে, তাতে শুইয়ে রেখে যায়। পরিত্যাক্ত সে সকল শিশুর লালন পালন করার বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও শিশুর সংখ্যা তেমন বাড়ছে না।

আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান হয় না। আধুনিক জাপানের দিকে লক্ষ করলে তা বোঝা যায়। নিজের সন্তানের প্রতি যদি মায়া-মমতা না থাকে তখন আর কী ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে? প্রভু ও ধর্মের অনুপস্থিতিতে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন সমাজ ব্যবস্থায় নতুন নতুন সমস্যা উদয় হয়েছে। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সমস্যাগুলি এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। উদাহরণ হিসাবে একটি ঘটনার কথা বলি-

ত্রিশের কোঠায় বয়স এক সুন্দরী মহিলা শুঁড়িখানায় কাজ করেন। জাপানে শহর ও গ্রামাঞ্চলে এমন শুঁড়িখানা বেশ রয়েছে। সেগুলিতে সুন্দরী নারীর কাজ অপেক্ষাকৃত উচ্চ বেতনে হয়ে যায়। এমন এক শুঁড়িখানায় কাজ করতো সায়াকা নামে এক মহিলা। যে সব শুঁড়িখানায় সুন্দরী নারী থাকে সেগুলিতে কাষ্টমারের সমাগমও বেশি থাকে। অনেকগুলিতে ফিলিপাইন, রাশিয়া, থাইল্যান্ড, চীন ও আরো অনেক দেশের নারী এসে কাজ করছে।

সায়াকা জাপানী। সুস্থ সবল। শুঁড়িখানায় মদ্যপান করতে যায় নব্য ধনী ও পকেটে পয়সা আছে এমন লোকজন। নারীরাও যায়। আর যুবতীরা অপেক্ষায় থাকে ভাল একজন ধনী পুরুষ পাওয়ার আশায়। অনেকে এক সময়ে পেয়েও যায়। তারপর প্রেম করে বিয়ে করে ফেলে। লক্ষ করেছি, এদের অনেকেই এমন বিয়েতে সুখী হতে পারেনা। বছর ঘুরে আসার আগেই ঝগড়াঝাঁটি করে তালাক হয়ে যায়। এমন দম্পতির মাঝে যদি একটি সন্তান জন্ম নেয় তখন আরেক নতুন সমস্যা দেখা দেয়। এ দেশের আইনে প্রাপ্ত বয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত সন্তান মায়ের সাথেই থাকে। তা বোঝাপড়ার মাধ্যমেই হয়।শর্ত থাকে, নির্দিষ্ট অংকের টাকা সন্তানের জন্যে পিতাকে দিতে হবে। তাছাড়া পিতাটি সপ্তাহে একদিন সন্তানকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যায়। অথবা কাছের রেষ্টুরেন্ট গিয়ে একসঙ্গে খায়। এই হল সন্তানের জন্যে পিতার মহব্বতের সীমাবদ্ধ কোটা। কিন্তু সব ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থাও যথাযথ ভাবে কর্যকর হয় না। পিতাটি অন্যত্র বিয়ে করে ফেলে এবং সন্তানের কথা ভুলে যায়। এমন নজিরও আছে। আবার তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীও প্রেম করে বিয়ে করে। সায়াকার বেলাতেও এমন জটিল অবস্থার উদ্ভব হয়। সে এখন নতুন নতুন স্বপ্ন দেখছে।

তার কন্যা সন্তানের বয়স পাঁচ। তালাকপ্রাপ্ত হয়ে গ্রাম্য শহরের একটি সস্তা ঘরে থাকে। নিয়ম মাফিক হয়তো সরকারের তরফ থেকে কিছু ভাতা পাচ্ছে। জাপানে এ পন্থাকে “সেইকাৎচু হগো” ‘সরকারের অনুদানে জীবনযাপন’ বলে। টাকার পরিমাণ কম নয়। তা দিয়ে সন্তান বড় হওয়া পর্যন্ত ভালই চলে। কিন্তু তাতেই সায়াকার জীবনের চাওয়া পাওয়া শেষ হয়ে যায় না। সে স্বপ্ন দেখছে আরেক রঙ্গিন পৃথিবীর। সেই পৃথিবীতে সে যেতে চায়। নতুন বন্ধুর হাত ধরে সাগর তটে বেড়াতে যেতে চায় তার মন। এমন আরো অনেক কিছু। জীবনের স্বপ্ন অনেক বাকি রয়েছে। প্রতিটি মহূর্ত সুখ আর আনন্দে থাকতে এই বয়সের অনেক নর নারীর অন্তরের একান্ত কামনা। জীবন তো এখানেই থেমে যেতে পারেনা। সে স্বপ্ন দেখে টোকিও গিয়ে নতুন কাউকে খুঁজে নিবে। প্রচুর টাকাও রোজগার করা যাবে। কিন্তু সমস্যা তার কন্যা সন্তান। তাকে সে কোথায় রেখে যাবে। তার জীবনের স্বপ্ন পুর্ণ করতে গেলে এই শিশু সন্তানটিকে সে কার নিকট রেখে যাবে? জাপানে আত্মীয়স্বজনও এ দায়িত্ব নিতে চায় না।

এ ভাবে বছরের পর বছর অতিক্রান্ত হচ্ছে। গ্রাম্য শহরে নিরানন্দে থেকে বর্তমান পরিস্থিতির প্রতি বিতৃষ্ণার মাত্রা চূড়ান্তে উঠেছে। তার স্বপ্ন টোকিও গিয়ে জীবনকে উপভোগ করা। মাঝে বাঁধা তার শিশু।
কয়েক কিলোমিটার দূরে সায়াকার আত্মীয় রয়েছে। কিন্তু কারো সন্তানকে কেউ গ্রহণ করবে না। যতবড় আত্মীয় হোক না কেন। সায়াকার টাকা থাকলে অন্য ব্যবস্থা করতে পারতো। কিন্তু তার এতো টাকা নেই। গ্রাম্য এলাকা থেকে টোকিওতে যায় সবাই টাকা রোজগার করতে। তার যে রূপ আছে তা দেখে টাকা উড়ে আসবে। তা্ই পথের বাঁধা দূর করতেই হয়তো সায়াকা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। গলা টিপে সে তার পাঁচ বৎসর বয়সের নিষ্পাপ কন্যা সন্তানটিকে হত্যা করে।

সায়াকা পাশের বাড়ির শিশুটিকেও হত্যা করে। সে তার শিশু সন্তানকে হত্যা করে নিজেই পুলিশকে রিপোর্ট করেছিল, যে সে তার মেয়েটিকে খুঁজে পাচ্ছে না। তারপর পুলিশ ও এলাকার নাগরিকেরা অনেক খুঁজাখুঁজি করে লাশটি একটি ব্রিজের নিচে অগভীর পাথুরে নদীর পানির মধ্যে পায়। এই হত্যাকাণ্ড ভীমরুলের বাসাতে ঢিল মারলে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় ঠিক তেমন এক অবস্থার সৃষ্টি করে। রেডিও, টিভি, পত্রিকা ও বিভিন্ন মাস মিডিয়াতে এ হত্যাকাণ্ডে খবর প্রাধান্য পায়। ভীমরুলের মতোই চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে এলাকার স্মার্ট পুলিশ বাহিনী।

বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ পুলিশ হল জাপানের পুলিশ। সরকার যথাযথ সুশিক্ষায় শিক্ষিত করেছে পুলিশ বাহিনীকে। তারা হল মানুষের বিপদের বন্ধু। এদেশে বিপদে আপদে লোকেরা প্রথমে পুলিশের কাছে দৌড়ে যায়। পারিবারিক কলহ বিবাদেও পুলিশ কাউন্সেলিং দেয়। একটি শিশু হত্যার রহস্য উদঘাটন করে হত্যাকারীকে ধরার জন্য পুলিশ হন্যে হয়ে দৌড়াতে লাগল। পাড়া প্রতিবেশিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে কোন ক্লু পাওয়া যায় কিনা – সে জন্যে দিনরাত কাজ করতে লাগল। বাসায় বসে টিভিতে সায়াকা তার কন্যা হত্যাকারীকে ধরতে যে পুলিশ দৌড়াচ্ছে তা দেখছে। বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় খবর প্রচার করছে। জাপানিরা এই ঘটনায় হতবাক।

সন্তান হত্যা করে সায়াকা ভোরে লাশটি দু’কিলোমিটার দূরে একটি নদীর উপর যে ব্রীজটি রয়েছে সেটার উপর থেকে নদীতে নিক্ষেপ করে। পাথুরে নদীগুলি অগভীর। পার্বত্য এলাকার নদীগুলিতে পাথর বেশি থাকে। তার উপর দিয়ে আয়নার মতো স্বচ্ছ পানির স্রোত সাগরের দিকে ধাবমান। সেখান থেকে পুলিশ তার সন্তানের মৃতদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠিয়েছে।


পুলিশ ও সাংবাদিকদের সায়াকা বলেছে যে কিছুদিন আগে একটি অচেনা লোককে বাসার সামনে নাকি কয়েকবার দেখেছে। সম্ভবত সায়াকাকে সেই লোক হত্যা করে নদীতে ফেলেছে। এমন এক মনগড়া কথায় পুলিশ এলাকার প্রতিটি ঘরের লোকদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। সন্দেহজনক কোন লোক তারা দেখেছে কি না জানতে চেয়েছে! সবাই এমন কাউকে দেখেনি বলেছে। সায়াকার সন্তানটি পাশের ঘরের তার সমবয়সী একটি পাঁচ বৎসর বয়সের একটি বালকের সাথে খেলাধূলা করতো। সে বালকটি প্রতিদিন এসে তার খেলার সঙ্গিনীকে খোঁজে। বালকটি প্রতিদিন সায়াকাকে জিজ্ঞাসা করতে যায়। অন্যদিকে পুলিশ সায়াকাকে ফোনে বিভিন্ন ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। কিন্তু সে পুলিশকে সন্তোষজনক কোন জবাব দিতে পারেনি। আবার সাংবাদিকরাও একের পর এক এসে সরাসরি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তারা সবাই এসে সায়াকাকে অস্থির অবস্থায় রেখেছে। পুলিশ সায়াকাকে চাপ দিয়ে বলেছে যে তার এলাকায় কোন সন্দেহজনক লোক কেউ দেখেনি। তাহলে সায়াকা কার কথা বলছে?

এখন পুলিশের সন্দেহ তার দিকেই রয়েছে। শুধু প্রমাণের অপেক্ষায় রয়েছে। সায়াকাও একথা ভালই বুঝতে পেরেছে যে পুলিশের সন্দেহ এখন তার দিকেই রয়েছে। তাই সে এক নতুন পরিকল্পনা করে। ছয় দিনের দিন সায়াকা তার কন্যা সন্তানটির খেলার সঙ্গী সেই পাঁচ বৎসর বয়সের নির্বোধ বালকটিকে গলা টিপে হত্যা করে। বালক শিশুটি সেদিন সকালে তার খেলার সঙ্গিনী ফিরেছে কিনা জিজ্ঞাসা করতে এসেিছল। সায়াকা তখন বালকটিকে হত্যা করে দূরের এক পাহাড়ের কাছের জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আসে। সায়াকা তার এই কাজের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছিল যে হত্যাকারী অবশ্যই একজন আছে। নইলে বালকটিকে কে হত্যা করেছে?


মনে হয় একেই বলে নিয়তি। মানুষ বুঝে শুনে বড় ধরণের কোন ভুল করলে তা মুছে ফেলার জন্য একের পর এক আরো কিছু ভুল করতে থাকে। সায়াকার বেলাতেও তা হয়েছে। তার পাশের বাড়ির এক মহিলা পুলিশকে বলেছে যে সকালে সায়াকাকে তার গাড়ির ট্রাংকে কম্বলে পেঁচিয়ে ভারি কিছু একটা রাখতে দেখেছে। পুলিশ তাতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় এবং সায়াকাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়। তারপর পুলিশের জেরায় সে সব অপরাধ স্বীকার করে।


চোর হোক কিংবা ডাকাত হোক, জাপানের পুলিশ আসামিকে নিপীড়ন করেনা। শুধু কথা আর যুক্তি দিয়ে আসামিকে জেরা করে সব তথ্য বের করে। জেরা করার পূর্বে বলে, “আমি তোমাকে এখন জিজ্ঞাসাবাদ করবো। জোর করে বা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তোমার কাছ থেকে কোন তথ্য আদায় করবো না। আমার কোন প্রশ্নের জবাব দিতে না চাইলে চুপ থাকার অধিকার তোমার আছে। আর, আমার প্রশ্নের যে জবাব দিবে, তা অবশ্যই সত্য হতে হবে!” বড় আশ্চর্য কানুন নয় কি?

জাপানের প্রসিকিউটর সিভিল সার্ভিসের লোক, তা তাদের স্থায়ী পদ। তিনিও আসামিকে জেরা করার পূর্বে একই শর্ত আরোপ করেন। আবার হাকিমও একই কথা বলে জেরা করেন। জোর করে আসামির মুখ থেকে কিছু বের করার চেষ্টা করেন না। অথচ মোকদ্দমা সঠিক ভাবেই চলে। কতো সুন্দর ব্যবস্থা।