জাপানীরা কেমন- ১ ॥ আরশাদ উল্লাহ্‌


অনেক বন্ধু আমাকে প্রশ্ন করেন জাপান কেমন এবং জাপানীদের ব্যবহার কেমন? তাদের এই প্রশ্নের উত্তর আমি গত তিন দশকেও দিতে পারিনি। কিভাবে দেবো? এখনো জাপান ও জাপানীদের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আমার ভালমতো জানাই হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলি জাপান সম্পর্কে খুব কমই জানে। আমাদের মনীষীরা জ্ঞানান্বেষণে আমেরিকা ও ইউরোপের দিকে যান। তারা সে সব দেশের সাহিত্য সংস্কৃতি শিখে দেশে ফিরেন। কিন্তু অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে, জাপানের সাহিত্য, বিজ্ঞান, প্রশাসন ও তাদের সমাজ ব্যবস্থা কতো সুন্দর ও নিখুত ভাবে চলছে। দেশটিতে অপরাধ প্রায় নেই-ই বলতে গেলে। এখানে বিপদে পড়লে বা যে কোন ধরনের সমস্যায় পড়লে পুলিশের কাছে বা নগর কাউন্সিলে গেলে ভাল পরামর্শ মেলে। এদেশে পুলিশকে বলে বিপদের বন্ধু। কোন রাষ্ট্রের জনসাধারণের চরিত্র যাচাই করতে হলে শুধু মাত্র পুলিশকে দেখেই ধারণা পাওয়া সম্ভব। পুরো রাষ্ট্রের চরিত্র বহন করে একটি দেশের পুলিশ। জাপানে পুলিশকে আদর্শ চরিত্রের সর্বোত্তম উদাহরণ হিসাবে গণ্য করা হয়। জাপানের পুলিশ যেমন শিক্ষিত তেমন বন্ধুবৎসল।

দাম্পত্য জীবনে কলহ হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। জাপানের কোনো পরিবারে যদি পারিবারিক কলহের সৃষ্টি হয় তখন ১১০ নম্বরে ফোন করলে পাঁচ থেকে সাত মিনিটে দুজন পুলিশ চলে আসে। তারা কলহের কারণ ভালভাবে জেনে শুনে যথাযথ কাউন্সেলিং দিয়ে ফিরে যায়। এখন চিন্তা করুণ জাপানের পুলিশ কোন মাত্রার এবং কতোটুকু বিচক্ষণ ও শিক্ষিত হতে পারে। এদেশের পুলিশ বেশির ভাগ সময়ই ইউনিফরম পরেনা। স্যুট ও নেকটাই পরে। সাদা পোশাক পরেই তারা দপ্তরে কাজ করে। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এবং ট্রাফিক পুলিশ ইউনিফরম পরে কাজ করে। ১৯৯০ সালে আমেরিকার সরকার তাদের একশ পুলিশকে জাপান পাঠিয়েছিল ক্রাইম প্রটেকশন শিখতে।

জাপানের পুলিশ কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে কাজ করেনা। তারা কাজ করে বিভাগীয় সরকারের অধীনে। উদাহরণ দিয়ে বলি, বাংলাদেশের ঢাকা বিভাগ বা রাজশাহী বিভাগ বা চট্টগ্রাম, জাপানে পুলিশ দায়িত্ব পালন করে এরকম সব বিভাগীয় সরকারের অধীনে। এবং তাদের বেতনও বিভাগীয় সরকার দেয়। বিভাগীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে হয়।

যাক সে কথা, আজ পুলিশের ওপর লেখতে বসিনি। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত টোকিওর বিখ্যাত কেইও ইনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছি। আমার এক সিনিয়র নাম মি. ইশিদা, ৩ বৎসর পুর্বে ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে আমার বসবাসরত মফস্বল শহরটিতে যে মহাশূন্য গবেষণাগার রয়েছে তাতে যোগদান করেন। তার আরেক সহকর্মী মি. আদাচি পাশাপাশি রিমোটসেন্সিং সেন্টারে কর্মরত। তারা দু’জনে পাশাপাশি আলাদা ফ্লাটে থাকেন। দুজনই অবিবাহিত বন্ধুবৎসল ও মিশুক। সমগ্র শহরে আমরা দু’জন বিদেশি আছি। তাই তারা কখনো কখনো একত্রে আবার একাও আমার সাথে কথা বলার জন্যে আসতেন এবং বাংলাদেশের কাহিনী ও জাপান সম্পর্কে আমার ধারনা কি তা জানতে চাইতেন। একদিন জাপানী রুই মাছের রান্না হয় এমন একটি রেষ্টুরেন্টে আমার স্ত্রীকেসহ আপ্যায়ন করেছিলেন।

জাপানে রুই মাছকে বলে ‘কই’। মাছগুলো আমাদের দেশের রুই মাছের মতোই দেখতে কিন্তু শীতল পানির মাছ। যে রুই জাপানীরা খায় সেগুলির রং কিছুটা কালচে রংয়ের। বাংলাদেশের রুই কিছুটা লালচে। কিন্তু জাপানে অনেক রংয়ের রুই আছে, যেমন স্বর্ণবরণ ছাড়াও সাদা ও লাল বর্ণের আবার লাল-সাদা মিশ্রিত রংয়ের রুইও আছে। জাপানীরা শুধু কালো রংয়ের রুই খায়। অন্যগুলিকে আদর করে বড় এক্যুরিয়ামে রেখে পালে। আবার ছোট পুকুর করেও পালে। নিয়মিত খাবার দেয়। একদিন একটি মাঝারি ধরনের পুকুরে বেশ রুই মাছ দেখতে পেলাম। স্বর্ণবরণ রুইও অনেক আছে। পুকুরটি জাপানের উত্তরে তহুকু প্রদেশের একটি গ্রামে। নাম চুরুওকা। আমি পুকুরের ঘাটে মাছ দেখতে গেলাম। মাছগুলিও আমাকে দেখে ঘাটের কাছে আসে। আমার হাতে খাবার ছিলনা। খালি হাত পানিতে রাখলাম। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম এই দেখে যে মাছগুলি এসে আমার আঙ্গুল চুষতে লাগল। বুঝলাম মাছগুলির ক্ষুধার্ত। বাড়িটির মালিক একজন নামকরা পেইন্টার। তার কাছে গিয়ে মাছগুলিকে খাবার দিতে বললাম। তিমি আমার কথায় চমকে উঠে বললেন, ‘তাইতো, মাছগুলিকে এখনো খাবার দেওয়া হয়নি!’ তৎক্ষণাৎ তিনি একটি লোককে ডেকে মাছগুলোকে খাবার দিতে বললেন। মাছকে দিনে একবার খাবার দিলেই হয়। এর অতিরিক্ত খাবার দিলে পুকুর বা এক্যুরিয়ামের পানি ঘোলাটে হয়ে মাছ অসুস্থ হয়ে যেতে পারে।

যাই হোক, আমি শুধু রুই মাছের রান্না হয় এমন একটি রেষ্টুরেন্টে খেতে গেলাম। আমাদের যৌথ হোস্ট হলেন মিঃ ইশিদা ও মিঃ আদাচি। যে সকল রেস্টুরেন্টে রুই মাছের রান্না হয় সেগুলিকে ‘কইরিইয়োরি তেন’ বলে। এসকল রেস্টুরেন্টে শুধু রুই মাছের রান্নাই হয় অন্য কোন মাছ বা মাংশের আইটেম থাকেনা। রুই মাছের বহুবিধ আইটেম স্যুপসহ থাকে। কিন্তু তারা বাঙ্গালিদের মতো রান্না করেনা। স্পাইসের ব্যবহার মোটেও নেই। রেষ্টুরেন্টে গিয়ে তাতামি ফ্লোরে ‘জা-বোতন’ কুশনে এক হাত উচু লম্বা একটি প্রশস্ত টেবিলের সামনে বসলাম। জাপানীজ স্টাইল রেষ্টুরেন্ট। প্রথমে রুই মাছের স্যুপ এনে রাখলো। মুখে দিয়ে দেখলাম। ভালই লাগলো। তারপর এক এক করে অনেক রকম আইটেম এনে রাখলো। কম পক্ষে সাত রকমের আইটেম আনল। সর্বশেষে যে আইটেমটি আনল সেটি দেখে হাসবো কি কাঁদবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। আস্ত দু’কেজি ওজনের একটি রুই মাছকে কেটে শাসিমি করে মাথাসহ মাছটির মাঝখানের যে কাটাগুলি থাকে তার উপর বেশ সুন্দর করে রেখেছে। আর যা দেখে বিস্ময়ে চোখ আমার কপালে উঠলো তা হলো, মাছটির মুখ তখনো নড়ছিল। এটা এদেশে তাদের খাবারের আর্ট। জীবন্ত মাছটি টুকরো টুকরো করে না কেটে তার দু’দিক থেকে ধারালো নাইফ দিয়ে কেটে শাসিমি বানিয়েছে। মাছটিকে জীবন্ত রেখেই কেটেছে, মারেনি।

শুনেছি ইশিদা এবং আদাচি নিউইয়র্কের মিঃ নুসবামকে সপরিবারে আমাদের আগে এ রেষ্টুরেন্টে দাওয়াত করেছিলেন। নুসবাম তার স্ত্রী ও দু’কন্যা সন্তানসহ থাকতেন। তিমি টোকিওর সোফিয়া ইউনিভার্সিটিতে পি এইচ ডি প্রোগ্রামে জাপানী সাহিত্যের উপর গবেষণা করছিলেন। তিনি তার পরিবার নিয়ে এসে খেতে বসলেন। কিন্তু সমস্যা হল তখন যখন দেখলেন রুই মাছের মুখ নড়ছে, এটা দেখে ভয় পেয়ে শাসিমি না খেয়েই তিনি তার পরিবারসহ বাসায় ফিরে যান। প্রাইমারি স্কুলের ছাত্রী তার সন্তানদ্বয় মাছটি মুখ নাড়ছে দেখে ভয়ে কান্না শুরু করে।