জাপানীরা কেমন- ৩ ॥ আরশাদ উল্লাহ্‌



মে মাসের প্রথম সাপ্তাহে জাপানের ক্যালেন্ডারে অনেকগুলি ‘রেড লেটার ডে’ রয়েছে। সে জন্যে এ সাপ্তাহটিকে জাপানীরা ‘রেন্‌কিয়ু’ বা ‘গোল্ডেন উইক’ বলে। প্রলম্বিত এই ছুটির সপ্তাহটির জন্যে জাপানীরা উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করে। বরফ শীতল শীতকালের পরে এপ্রিল থেকে বহু রকমের চেরী ফুল ছাড়াও কত রকমের ফুল যে ফুটে তা গুনে শেষ করার মতো নয়। মনে হয় নববধূর মতো সেজে জাপান তার রূপ বদলায়। সে এক নয়নাভিরাম নান্দনিক দৃশ্য। জাপানকে তখন মনে হয় ভূস্বর্গ। জাপানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এতো সুন্দর যে লিখে বোঝানো যাবে না।

একদিন মি. ইশিদা এসে আমাকে তার বাড়ি ফুকুশিমাতে যাওয়ার নিমন্ত্রণ করলেন। ১৯৮১ সালের কথা। তিনি শুধু আমাকে নয়, আমার স্ত্রী ও মি. আদাচিকেও দাওয়াত করেছেন। আমার শহর থেকে ফুকুশিমা দু’শ কিলোমিটার উত্তরে প্রশান্ত মহাসগরের পাড়ে অবস্থিত। তার দাওয়াত আমরা গ্রহণ করলাম। ইশিদা তার ‘নিশান স্কাইলাইন’ গাড়িতে ড্রাইভ করে নিয়ে যাবেন। সেখানে তার বাবা এবং মা থাকেন। ইশিদার বাবা একজন ধনী কৃষক। ইশিদারা দুই ভাই, বোন নেই। তার ছোট ভাইটিও বিখ্যাত কেইও ভার্সিটির ছাত্র। বলাই বাহুল্য, জাপানে আসার পরে কোন জাপানীর বাড়িতে সেটাই ছিল আমাদের প্রথম দাওয়াত।

মে মাসের গোল্ডেন উইক হলিডের একদিন আমরা ইশিদার গাড়িতে উঠে বসলাম। ‘তহোকু এক্সপ্রেস ওয়েতে’ উঠে ইশিদা গাড়ির স্পীড বাড়ালেন। প্রায় ১৪০ কিলোমিটারে যখন স্পীড উঠলো তখন আমি ভয় পেয়ে বললাম, মি. ইশিদা দয়াকরে এতো বেশি স্পীডে চালাবেন না। আমার কথা শুনে ইশিদা হাসলেন। বললেন, ‘ভয় পাবেন না, আমি অতি ঠান্ডা মস্তিষ্কে গাড়ি ড্রাইভ করি, এক্সিডেন্ট করবো না।’
আমার স্ত্রী এবং আদাচিও তাকে স্পীড কমাতে অনুরোধ করলেন। কিন্তু তিনি কারো কথায় কর্ণপাত করলেন না। অপূর্ব সুন্দর দেশ জাপান। যেদিকে তাকাই সুন্দর নয়ানাভিরাম দৃশ্য। সুউচ্চ পাহাড় পর্বত তার ফাঁকেফাঁকে ধানের জমিন। জাপানীরা অত্যন্ত রুচিশীল, তারা তাদের দেশ ও বাড়ি ঘরগুলো সুন্দর করে সাজিয়েছে। ছোট বড় পর্বতগুলি দেশটির সৌন্দর্য আরো বাড়িয়েছে।

যাওয়ার পথে ইশিদা আমাদেরকে বিভিন্ন টুরিস্ট স্পটে নিয়ে গেলেন। তন্মধ্যে একটি ‘লাইম স্টোনের’ পর্বত দেখলাম। পর্বতটি ১০০% লাইম বলেই মনে হল। নিচে অনেকগুলি সুরঙ্গ রয়েছে। আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম। শুভ্র চুনা পাথর চুইয়ে পানি নিচের দিকে পড়ছে। হাত দিয়ে দেখলাম সেগুলি এখন বরফের চাক হয়ে গেছে কিন্তু সুন্দর ও ট্রান্সপারেন্ট। সেখান থেকে আমরা যখন তার বাড়িতে পৌঁছলাম তখন সুর্য ডুবে ডুবে। সূর্যাস্ত তার বাড়ির উঠানে থেকেই দেখলাম। সমুদ্র তট থেকে তিন কিলোমিটার দূরে তার গ্রাম। বিশাল বাড়ি। জাপানী কৃষকদের বাড়ি আসলেও অনেক বড়। প্রধান ঘরটি দোতলা। দক্ষিণ ও উত্তর ভিটিতে আরো দুটো একতলা ঘর রয়েছে তার মাঝখানে মস্ত বড় উঠান। পশ্চিম ভিটিতে ঘর নেই। ঘরে বসেই প্রশান্ত মহাসাগরের একাংশ দেখা যায়। সূর্যাস্তও দেখলাম। কিছু দূরে দু’টি বড় ষাঁড় দেখলাম। সেগুলি দিয়ে কোন কাজ কারানো হয়না। মাংশের গরু। দাম কতো হতে পারে জিজ্ঞাসা করলাম। আদাচি বললেন, প্রতিটির মূল্য নাকি পাঁচ হাজার ডলারের কম নয়। মাংশের জন্যে জাপানের গরু বিশ্বখ্যাত। কথিত আছে, এ প্রজাতির সুস্বাদু মাংশের গরুর স্পেসিস নাকি জাপানেই পাওয়া যায়। আদাচি বললেন, বাজার থেকে যে মাংশ আমরা কিনে খাই সেগুলি বিদেশ থেকে আমদানি করা। আসল জাপানী গরুর মাংশর বেশি দাম। তা শুধু ধনী লোকেরাই কিনে খেতে পারে। বাদবাকি ধনী রাষ্ট্রগুলিতে যেমন, সিঙ্গাপুর, হংকং, চীন ছাড়াও আমেরিকা ও আরো অনেক দেশে রপ্তানী করা হয়।
পত্রিকায় একদিন দেখলাম সিঙ্গাপুরের অভিজাত রেস্টুরেন্টগুলি নাকি এক কিলোগ্রাম জাপানী গরুর মাংশ মার্কিন ডলারে ১,০০০/- ( এক হাজার ) রপ্তানি হয়। এ কথা আরো অনেক জাপানীকে জিজ্ঞাসা করেছি। বললেন, সত্য কথা। সে মাংশ আমরা কিনে খেতে সাহস করি না। বেশি দাম। তবে কুবে সিটির মাংশ মোটামুটি ভাল। তাও আবার ধনীরা কিনে খায়। জাপানীরা গরুর মাংশ যাতে বেশি স্বাদের হয় সে জন্যে আমেরিকা থেকে সেগুলির খাবার আমদানী করে। তাছাড়াও গরুকে খাদ্যের সাথে ওয়াইন খাওয়াবার কথাও শুনেছি। তাহলে গরু শীঘ্র মোটা হয়।

ইশিদার বাবা চাষাবাদ করেন যন্ত্রপাতি দিয়ে। এতো বড় কৃষক অথচ কোন কাজের লোক নেই। স্বমী-স্ত্রী মিলেই চাষাবাদের কাজ সব চালাচ্ছেন। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিই তাদের ভরসা। ট্রাক্টর, ধান কাটার মেশিন, রাইস মিল বাড়িতেই আছে। সময়ে কাজে লাগান। জাপানীরা বৎসরে মাত্র একবার ধান ফলায়। একবারে যে পরিমাণ ধান পায় তাতে সমগ্র জাপানের লোক খেয়েও শেষ করতে পারে না। অতিরিক্ত চাল বেশি দামে রপ্তানি করা হয়। জাপানী চাউলের স্বাদ অপূর্ব। তাই ধনী দেশ, যেমন, হংকং, চীন, সিঙ্গাপুর এবং খোদ আমেরিকাও জাপানী চাল উচ্চমূল্যে আমদানি করে শুধু ভোজন বিলাসদের জন্যে। জাপানীরা বলে তাদের রাইস বিশ্বখ্যাত। অত্যাধুনিক পদ্বতিতে চাষ করে বলেই এ দেশে সুস্বাদু রাইসের ফলন হয়।

রাতে ইশিদার মা খেতে ডাকলেন। আমরা সবাই মিলে খেতে বসলাম তাতামি গ্রাস মেটে বসানো এক হাত উঁচু টেবিলের সামনে জা-বোতন নামে কুশনের উপর বসলাম। আজ চল্লিশ বৎসর হল আমি জাপানের প্রবাসী। সেদিন ইশিদার মা যে সুস্বাদু স্যামন মাছ খেতে দিয়েছেন সে স্বাদ এখনো মনে আছে। কয়েক টুকরো ফ্রেশ স্যামন এলুমিনিয়াম ফয়েলে মুড়িয়ে তার মধ্যে বাটার ও আরো কিছু মিশিয়ে ইলেক্ট্রিক ওভেনে রেখে তৈরী করেছেন। অপূর্ব স্বাদ যা ভোলার মতো নয়। এ আইটেমটি ছাড়াও, বীফ, চিকেন ও বিভিন্ন প্রকার সবজি সহকারে বহু কিসিমের পিকলস্‌ পরিবেশন করেছেন। সব মিলিয়ে আইটেম সংখ্যা বারোটি। জাপানীরা শসা ও মুলা দিয়ে দশ প্রকারের উপর পিকলস্‌ তৈরী করতে পারে। সেগুলি খেতেও বেশ স্বাদ। তাছাড়া আদা ও সী উইডের অনেক রকম পিকলস্‌ আছে। প্রসেস করা সী উইডের ‘অনিগিরি ভাতের জড়া’ খেতে বড় স্বাদ।

পরের দিন ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা একটি প্রশস্ত কিন্তু অগভীর এমন একটি নদীর তীরে এসে দাঁড়ালাম। সে নদীটিতে যা দেখেছি তা ভোলার নয়। পাথুরে নদী যাকে বলে। তার ওপর প্রবাহিত পানি আয়নার মতো স্বচ্ছ। বড়জোর মিটার খানেক গভীর হবে। মে মাসে গভীরতা কম থাকে কিন্তু জুলাই আগষ্টে বৃষ্টিপাত বেশি হয় বলে গভীরতা আরো বাড়ে। অগভীর হলেও বড় খরস্রোতা নদী। লক্ষ করলাম শত শত স্যামন লাফিয়ে লাফিয়ে উজানের দিকে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে মাছগুলি নদীতে আনন্দ করছে। খরার পরে বৃষ্টিপাত হলে পুকুরের মাছেরা যেমন আনন্দে লাফায় ঠিক তেমন।
নদীর তীরে মৎস্য বিজ্ঞানীরা বড় ল্যাবে দাঁড়িয়ে কাজ করছেন। অনেকে মাছ ধরে উপরে জ্যান্ত তুলে এনেছে আর তারা মাছগুলির পেট কেটে লাল বর্ণের ডিম বের করে আর্টিফিসিয়াল ব্রিডিং এর জন্যে রাখছে। আর্টিফিসিয়াল ব্রিডিং করার পর যে পোনা স্যামন হবে সেগুলিকে কিছু বড় করে আবার নদীতে ছেড়ে দেওয়া হবে। আর যেগুলিকে ধরতে পারছে না সেগুলি আরো উজানে গিয়ে ডিম পাড়ে আর মেইল স্যামনটি ডিমের ওপর সাদা বর্ণের স্পার্ম ছেড়ে দেবে। এ ভাবে ডিমের সাথে স্পার্মের মিলনে জন্ম হচ্ছে হাজার হাজার স্যামনের পোনা। এই পোনাগুলি নদীতে কিছু বড় হবার পরে একসঙ্গে জোড়ায় জোড়ায় সমুদ্রের দিকে ধাবিত হয়।

এখন প্রকৃতির একটি বাস্তব ও অতীব দুঃখজনক কথাটি বলছি। তা হলো, মেইল ও ফিমেইল স্যামন নদীতে পেটের ডিম পেড়ে দিলে মেইল স্যামন তাতে তার স্পার্ম মিশিয়ে দিয়। তারপর কয়েক মিনিটের মধ্যে মরে যায়। কী আশ্চর্য ও নির্মম এ প্রকৃতি! তিন বৎসর পূর্বে এ নদীতে জন্ম নিয়ে স্যামনগুলি প্রশান্ত মাহাসাগরে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ ভ্রমণ করে জীবন যাত্রার শেষ পর্যায়ে আবার এখানে জোড়ায় জোড়ায় এসে পোনা জন্ম দিয়ে মারা যায়। এ রহস্যের পেছনে জন্ম-মৃত্যুর উপর প্রকৃতির নির্মমতার প্রমাণ পাওয়া যায়।

স্যামন পোনাগুলি তাদের জন্মের পরে জোড়ায় জোড়ায় এ নদীটি থেকে প্রশান্ত মহাসগরে গিয়ে দীর্ঘ তিন বৎসর একত্রে জীবন যাপন করে বড় হয়ে পেটে ডিম নিয়ে পুনরায় জোড়ায় জোড়ায় তাদের জন্মস্থান এ নদীটিতে ফিরে এসে ডিম ছেড়ে মারা যায়। স্যামন মাছের লাইফ সাইকেলের কী আশ্চর্য ও বিস্ময়জনক লীলাখেলা। যে মহাপ্রভু বিশ্ব–ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন তাঁর কতোইনা বিচিত্র রূপ। আমাদের মানব জন্মে এতো সব জানা সম্ভব হবে না।

সুবিশাল প্রশান্ত মহাসগরে হাজার জাহার মাইল পথ দীর্ঘ তিন বৎসরে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গিয়ে তাদের জীবন অতিবাহিত করে মাছগুলি তাদের পরবর্তী প্রজন্ম সেই নদীটিতে রেখে মারা যায়। প্রকৃতির রূপ কতোই না বিচিত্র! এ ভাবেই হচ্ছে স্যামন মাছের লাইফ সাইকেল। সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের বেলাতেও একই রকম। সন্তানের মাঝে মানুষ তার জন্মের স্বাক্ষর রেখে দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। আর কখনো ফিরে আসে না।

আমরা প্রায় দু’ঘন্টা হেঁটেহেঁটে সব দেখে নিলাম। তারপর গেলাম একটি এটমিক রিয়েক্টরের কাছে। ইশিদা বললেন, ‘এখানে আমার কাকা একজন অফিসার। ভেতরে গিয়ে দেখবেন কি?
এটমিক রিয়েক্টর? বিস্ময়ে আমি হতবাক। বললাম, ভয়ের কিছু নেই তো?
ইশিদা বললেন, ভয়ের কি আছে। আমি এখন কয়েন টেলিফোন দিয়ে কাকাকে ফোন করবো।
আনবিক শক্তি চালিত এটমিক রিয়েক্টর। রেডিয়েশনে একস্পোজড্‌ হলে মৃত্যু। কিন্তু ইশিদা বললেন, সবকিছু কন্ট্রোল করেই পরিচালিত হচ্ছে। আমরা কন্ট্রোল রুম থেকে আনবিক চুল্লিগুলিতে রেডিও একটিভ পদার্থগুলির চেইন রিয়েকশনের ফলে যা হচ্ছে তা দেখব।

কিছুক্ষণ পর আমাদের যাওয়ার পারমিশন মিললো। একজন লোক আমাদেরকে কন্ট্রোল রুমের ভেতরে নিয়ে গেলেন। মোটা ও শক্ত গ্লাসের ওয়ালের মধ্যদিয়ে ভেতরের সবকিছুই দেখা যাচ্ছে। ওয়ালে কয়েক ডজন মিটার সেট করা আছে। সেগুলির দিকে লক্ষ রেখে আনবিক রিয়েক্টরের ভেতরে যে তেজস্ক্রিয় পদার্থের ‘চেইন রিয়েকশন’ অনবরত হচ্ছে কর্মরত অফিসারগণ তা পর্যবেক্ষণ করছেন। এখানে তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার কিলোওয়াট বিদ্যুৎ।

তারপর কয়েক দশক পর ২০১১ সালের ১১ মার্চ ইতিহাসের বৃহত্তম নয় মাত্রার ভূমিকম্পের ফলে সাগরের জলের সুনামিতে তিনটি চূল্লিতে বিস্ফোরণ হয়। সে করণে জাপানের অর্থনীতির মারাত্মক ক্ষতি হয়।

ফুকুশিমাতে দু’নম্বর আরেকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে। আমরা জানিনা দুটি আনবিক কেন্দ্রের কোনটি দেখতে গিয়েছিলাম। ইশিদার মা বাবার কি হল জানতে পারিনি। কারণ, ইশিদা দীর্ঘদিন তাদের আমেরিকার হাওয়াইয়ের কাছে যে একটি মহাশূন্য কেন্দ্র ছিল সেটার দায়িত্তে কর্মরত ছিলেন বিধায় দীর্ঘ দিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।

সকল বন্ধু সময়ে একত্রে কয়েক বৎসর অতিক্রান্ত করে কর্মজীবনে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তারপর কয়েক বছর চিঠিপত্র বা ফোনের মাধ্যমে হাই, হ্যালো করে আরো দূরে সরে গিয়ে হারিয়ে যায়। এটাও মানুষের জীবনের একাংশ। ফুকুসিমাতে মি. ইশিদার বাড়িতে এক রাত্রি ছিলাম। ইশিদার মা আমাদের যথাসাধ্য আপ্যায়ন করেছেন। ফিরে আসার সময় তার বাবা হাসিমুখে আমাদের বিদায় জানালেন।

যাওয়া এবং ফিরে আসা পর্যন্ত ইশিদা তার নিশান স্কাইলাইন দীর্ঘ পথ ড্রাইভ করেছেন। আমি জাপানে যাওয়ার পরের বছরের কথা। জাপানি ভাষা ঠিকমত রপ্ত করতে পারিনি তখনো। তাদের আচার-ব্যবহার সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা পাইনি। শুধু দেখে যাচ্ছি আর শিখছি। পরের দিন মি. আদাচি এক পাতা সাদা কাগজে কি যেন লিখে নিয়ে এল। আমাকে দেখিয়ে বলল, ফুকুশিমা যাওয়া আসার খরচ বাবদ মাথাপিছু আট হাজার ইয়েন করে দিতে হবে। আমরা চারজন গিয়েছি। হাইওয়ে টল ফী এবং পেট্রোল খরচ বাবদ ইশিদাকে বাদ দিয়ে তিন জনের হিসাব করেছে। আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। বললাম, আমাকে তো নিমন্ত্রণ করেছিলেন মি. ইশিদা। তবু যদি এটা আপনাদের রীতি হয়ে থাকে তা দিব। কিন্তু মি. ইশিদা আসেন নি কেন? জানতে চাইলাম।

আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মি. আদাচি আমাকে বুঝিয়ে বললেন, ‘এটা কমনসেন্সের ব্যাপার!’

এমন সময় আমার স্ত্রী দোতলা থেকে নেমে আসলেন। সবকিছু শুনে বললেন, ‘মি. আদাচি আপনি জানেন আমার স্বামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কোন চাকুরি করেন না। তাকে মি. ইশিদা নিমন্ত্রণ করেছেন। তাকে কেন আট হাজার ইয়েন দিতে হবে? ঠিক আছে ইশিদা যদি বলে থাকেন দিবেন!’

আদাচি চলে গেলেন। পরের দিন মি. ইশিদা এলেন। তাকে জিজ্ঞাসা করার পর বললেন যে কোন টাকার হিসাব করার জন্য আদাচিকে আমি বলিনি। এটা তার কমনসেন্স থেকে হিসাব করে বলেছে। আপনাদের কোন টাকা দিতে হবে না। কারণ এটা কোন গ্রুপ ট্যুর নয় – নিমন্ত্রণ।

আদাচিকে পরে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে। বললেন, ‘হ্যাঁ, ইশিদা বলেনি। এ হিসাব আমার কমনসেন্স থেকে করেছি। আপনারা না দিলেও আমার ভাগেরটা দিব।’

পরে শুনেছি মি. ইশিদা আদাচির টাকাও গ্রহণ করেননি।

এ কমনসেন্স কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ব্যায় বহুল দেশ জাপান। ঘর থেকে বের হয়ে ট্রেনে এক ঘন্টার পথ টোকিও গিয়ে ফিরে আসলেও কমপক্ষে পঞ্চাশ থেকে ষাট মার্কিন ডলার খরচ হয়ে যায়। এ দেশে এক কাপ কফি বা চা খেলে স্থানভেদে ৩০০ ইয়েন থেকে ৯০০ ইয়েন প্রতিকাপে পেমেন্ট করার অভিজ্ঞতাও আছে। পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যায়বহুল দেশ জাপান। আমাদের দেশে যে ভাবে আপ্যায়ন করা হয়, তেমনটি জাপানে তিন জনকে এক জনের পক্ষে আপ্যায়ন করাটা কষ্টসাধ্য ব্যাপার।