জাপানিরা কেমন– ৫ ॥ আরশাদ উল্লাহ্




নজিতা সাপ্তাহে তিন দিন আমাদের বাসায় আসেন। আজ এসেছেন সঙ্গে আরেক জন মহিলাকে নিয়ে। নাম মিদরি, বয়স পঞ্চাশ, দেহের গঠন মোটাসোটা এবং লম্বা-চূড়া। উচ্চতার জন্য মোটা দেখায় না। উচ্চতা এবং দৈহিক ওজনের নির্দিষ্ট মাপ রয়েছে। তাই তাকে দেখতে মন্দ দেখায় না। কথা বলে জানলাম মহিলা বিয়ে করেননি। তিনি আমার শহরের যে এলাকাটিতে বাস করেন আমরাও একই এলাকার বাসিন্দা। একজন পার্মানেন্ট বাসিন্দা মিদরি অথচ তার সঙ্গে আজ আমাদের প্রথম পরিচয় হল নজিতার মাধ্যমে। মিস মিদরির বাসস্থান আমার বাসা থেকে তিনশত মিটার মাত্র। দেখতে তেমন সুন্দরী না হলেও নারী সুলভ কমনীয়তা আছে। জানতে বড় ইচ্ছা হল কেন বিয়ে করেনি? কিন্তু প্রথম পরিচয় বলে এ ব্যাপারটি এড়িয়ে গেলাম। তিনি নজিতার বান্ধবী কেমন করে হল জানার আগ্রহ ছিল। কিন্তু সেদিন বিরত রইলাম। প্রথম পরিচয়ে এতোসব জিজ্ঞাসাবাদ করা ঠিক নয়। বয়স ত্রিশ থেকে পঞ্চাশের কোঠায় রয়েছে এমন নারী বিয়ে করেনি জাপানে ৪০% হবে। পুরুষের বেলাতেও তাই। যে কারণে জাপানের লোকসংখ্যা কমে যাচ্ছে। কথা প্রসঙ্গে জানলাম মিদরি একা একটি ঘরে থাকেন। ধনী এবং অনেক টাকা পয়সা আছে। পরনে দামি ব্রান্ডের জামা কাপড় ও জুতা। কিন্তু তিনি কথা বলেন খুবই কম। মানুষের কথা শুনতে ভালবাসেন। আমি তার ব্যাপারে জানার জন্যে আগ্রহী হলাম। তিনি সহজ সরল নারী হলেও মাত্র তিনশত মিটার দূরের আবাসিক এলাকার বাড়িটি আজো আমাকে এবং তার নিকটতম বান্ধবী নজিতাকেও দেখাননি। নজিতার সঙ্গে নাকি তার এক বছর পূর্বে কোন এক রেষ্টুরেন্টে প্রথম দেখা।

নজিতার ছেলে কেইসুকে কেমন আছে জিজ্ঞাসা করায় বললেন, ‘সে ফর্ক লিফট চালাবার লাইসেন্স নেয়ার জন্যে ট্রেনিং নিচ্ছে’। তারপর হঠাৎ রাগত কন্ঠে বললেন, ‘সে জন্যেও তাকে আমার পঞ্চাশ হাজার ইয়েন দিতে হয়েছে’।
বললাম, ‘শত হলেও আপনি তার মা, দিতে তো হবেই’।
এ কথা শুনে তিনি আরো রেগে গেলেন। বললেন, ‘বয়স তার ৪০ বৎসর অথচ এখনো মায়ের কাছে টাকার জন্যে হাত পাতে তা আমার সহ্য হয় না। জানেন সেদিন তাকে গাড়িতে পেট্রোল নেয়ার জন্যে টাকা দিয়ে পাঠালাম। সে এসে আমাকে রিসিপ্ট দিলো। হিসেব করে দেখি পাঁচশ ইয়েন কম। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম বাকি পাচশত ইয়েন গেল কোথায়? তখন বলল, ‘এক প্যাকেট সিগারেট কিনেছি’। আমি রাগ করাতে তার রুমে গিয়ে সে টাকা আমাকে ফেরত দিল।
বললাম, তার কি টাকা আছে?
বললেন, ‘আছে, আছে। সে আমাকে তার ব্যাঙ্কের বই দেখায় না। লুকিয়ে রাখে’।

নজিতা বলেছেন, রুমে সারাদিন বসে দু’টি মোবাইল নিয়ে কি যেনো টিপাটিপি করে। পরে শুনেছি সফট ওয়্যার গেইম বানায় এবং সেগুলি নেটে বিক্রয় করে।
বললাম, তাহলে তো অনেক রোজগার তার।
বললেন, ‘আরে না, না। তেমন বেশি মূল্যবান সফট গেইম সে তৈরি করে না বা করতে পারে না’।

আমার এক বন্ধু নিকটস্থ মেডিক্যাল কলেজের চতুর্থ বৎসরের ছাত্র ছিল। তাও সেই আশির দশকের প্রথমার্ধের কথা। নাম ছিল তার ইয়ামাদা। সে হবি হিসাবে সফট ওয়্যার গেইম তৈরি করতো। বলাই বাহুল্য, তখন এ গেইম সম্পর্কে আমি জানতাম না। একদিন ইয়ামাদার বন্ধু কুকিহারা আমাকে বলল, ‘জানেন, ইয়ামাদা ভাল সফট গেইম তৈরি করেছে এবং সেটি সফট ওয়্যার কোম্পানির কাছে বিক্রি করে চার মিলিয়ন ইয়েন পেয়েছে’। সেই থেকে আমি জানতাম যে ভাল গেইম তৈরি করে করে ভাল দামে বিক্রি করা যায়।
নজিতা বললেন, কেইসুকের গেইম উচ্চ মানের নয়। কয়েক হাজার ইয়েনে (১২০ ইয়েন সমান ১ মার্কিন ডলার ) বিক্রি হয় মাসে দু’একটা মাত্র। তাতে তার যা আয় হয়, তা দিয়ে তার সিগারেটের কেনার খরচ আসে মাত্র।
বললাম, ‘তবুও তো কিছু রোজগার করছে’।

শুনেছি জাপানে শতকরা ৪০% লোক ধূমপান করে। ২৫% মেয়ে। মেয়েরা যে পুরুষের চেয়ে বেশি ধূমপান করে তা পত্রিকায় পড়ে অবাক হয়েছিলাম। পত্রিকাটিতে এক সমীক্ষার রেজাল্ট দেখনো হয়েছিল। সিগারেটের ওপর সরকার মাত্রাতিরিক্ত ট্যাক্স আরোপ করাতে অনেকে ধূমপান ছেড়ে দিয়েছে। আসলে সিগারেট স্বাস্থ্যের জন্যে হুমকি বিধায় সরকার এ পন্থা আরোপ করেছে। তাছাড়া কুড়ি বৎসরের ওপর যারা-শুধু তারাই ধুমপান করতে পারবে। কুড়ি বছরের নিচে যারা, তারা ধুমপান করতে পারবে না। এ আইন সংসদে পাশ করেছে। শুধু তাই না, যারা ধূমপান করবে তাদেরকে বিশেষ কার্ড দেখিয়ে সিগারেট কিনতে হবে। নচেৎ কিনতে পারবে না। এতে কুড়ি বছরের নিচে যারা তারা ইচ্ছা করলেও সিগারেট কিনতে পারে না। দোকান থেকে কিনতে গেলে সনাক্তি কার্ড দেখাতে হয়। নইলে বিক্রি করবে না। সে কার্ডে বয়স লেখা থাকে। কুড়ির নিচে হলে ধূমপানের কার্ড ইস্যু হবে না। এ জন্যে সরকার ধুমপান থেকে বিরত থাকার জন্যে চিন্তা ভাবনা করে এ আইন করেছে।

কেইসুকের ওপর তার মা নজিতা বড় অসন্তুষ্ট। সেদিন আমাকে বললেন, ‘তাকে দয়া করে বাংলাদেশে নিয়ে যান। সেখানে ভলান্টিয়ার হিসাবে জাপানী শেখাবে। থাকা খাওয়ার খরচ আমি দেবো। আর সম্ভব হলে তাকে একটি বাংলাদেশী মেয়ে বিয়ে করিয়ে দেবেন’।
বললাম, ‘ঠিক আছে, আমি এ ব্যাপারে ভেবে দেখবো’।
কিন্তু মহিলা চাপ প্রয়োগ করে বললেন, ‘না, শুধু ভেবে দেখলেই হবে না। এ কাজটি আপনাকে করতেই হবে’।

নজিতার সঙ্গে মিদিরির বন্ধুত্ব সম্পর্কের কথা পরে জেনেছি। এরা দু’জনই বাইরে রেষ্টুরেন্টে খেতে পছন্দ করেন। মিদরির অনেক টাকা। তাই তাকে তার সঙ্গী বানিয়েছেন। মিস মিদরির ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকলেও সে নাকি ‘পেপার ড্রাইভার’। তার অর্থ ড্রাইভিং স্কুল থেকে পাশ করা ড্রাইভার এবং তার ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে। কিন্তু কোন কারণবশত ড্রাইভিং করেন না। অনেক পরে শুনেছি তিনি একটি রোড এক্সিডেন্ট করেছিলেন। তাই ড্রাইভিং করার আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন।


তারা দুজন যে রেষ্টুরেন্টগুলিতে যান তারমাঝে তকিগাওয়া শহরের ‘নেকো’ নামে একটি রেষ্টুরেন্ট রয়েছে। ‘নেকো’ শব্দের অর্থ বিড়াল। এ নামেও যে রেষ্টুরেন্ট হতে পারে তা শুনলাম। একদিন সে রেষ্টুরেন্টে খেতে গিয়েছিলাম।

রেষ্টুরেন্ট নেকো ব্যতিক্রমধর্মী একটি রেষ্টুরেন্ট। সপ্তাহে মাত্র চার দিন খোলা থাকে এবং তিন দিন বন্ধ থাকে। সেটি পরিচালনা করেন এক মধ্যবয়সী মহিলা। আমি সেটাতে জাপানি ‘ছবা নুডল’ খেয়েছিলাম। ছবা এক ধরনের পাহাড়ি ঘাসের বিচির গুড়া দিয়ে করা হয় এবং জাপানে ছবা নুডল জনপ্রিয়। তকিগাওয়া শহরটির চার ভাগের দুই ভাগই পর্বত। তাই এখানে প্রচুর ছবার চাষ হয় এবং এ শহরে সর্বত্র ছবার রেষ্টুরেন্ট রয়েছে। নেকো রেষ্টুরেন্টটিতে চাউল ও গোলাপ ফুলও বিক্রি হয়। তবে প্রতিদিন নয়। সাপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে এসব আইটেম পাওয়া যায়। নজিতা বড় বন্ধুবৎসল বিধায় নেকোর মালিক সে মহিলাটির সঙ্গেও তার ভাল সম্পর্ক। তিনি দূর থেকে এসে নেকো থেকে চাউল কেনেন এবং সপ্তাহে একবার মিদরিকে সঙ্গে নিয়ে লাঞ্চ করেন। পেমেন্ট কিন্তু আলাদা ভাবে হয়। কথা প্রসঙ্গে মিদরির মুখ থেকে একটি কথা বের হল। তা হল সে কোনদিন ঘরে রান্না করে খায় না। সারা বছর রেষ্টুরেন্টেই খায়। মোটা হয়ে যাওয়ার পেছনে এটাও একটি কারণ। কারণ, রেষ্টুরেন্টের তৈলাক্ত খাবার খেয়ে তার রক্তে কলেস্টেরল ও চর্বির (লিপিড) পরিমাণ বেড়ে গেছে। সে জন্যে ডাক্তার তাকে সাবধান হতে বলেছেন জানালেন।

একদিন নজিতার ছেলে কেইসুকেকে ফোন করে এনেছিলাম। সেদিন বাসায় একসাথে লাঞ্চ করেছিলাম। পনেরো বছর আমেরিকাতে থেকে সুন্দর ইংরেজি বলা শিখেছে। পশু ডাক্তার হতে চেয়েছিল, কিন্তু বিশেষ কারণে ‘ড্রপ আউট’ হয়েছে। তার উচ্চতা প্রায় ১৬০ সেন্টিমিটারের মতো। এক কথায় বলা যায় বেটে। কথাবার্তায় বেশ ভদ্র। অথচ জাপানে এ লোকটির কোন গার্লফ্রেন্ড নেই। জাপান ওপেন সোসাইটি। যে কোন মেয়ের সঙ্গে সহজেই কথা বলা যায় এবং প্রপোজও করা যায়। তিনটি মেয়েকে প্রপোজ করলে একটিতো রাজী হবে।

জিজ্ঞাসা করেছিলাম আমেরিকাতে তার গার্লফ্রেন্ড ছিল কি না? হ্যাঁ বা না কিছুই বলল না, শুধু হাসল।
কিন্তু তার মাঝে বেশ কিছু গুণ যে আছে তাও বুঝলাম। ব্যবসা ও কম্পিউটার পরিচালনাতে সে বড় দক্ষ। শুধু কম্পিউটারে দক্ষ হলে সহজে চাকরি মিলে। কিন্তু ভাল চাকুরি পাওয়া সত্ত্বেও সে করেনি। মনে হল তার ভেতরে বড় ধরণের কোন কমপ্লেক্স আছে। তার মা নজিতার মতে সেটি তার সুপেরিওটি কমপ্লেক্স।

ভাল কথা, তাদের সৎ বাবা নাকি পড়াশোনার সব টাকা দেয়নি। নজিতার সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে সে কথা পরিষ্কার ভাবে জানতে পারলাম। সৎ বাবা মি. সাইতো একাংশ টাকা দিয়েছে এবং বাকি একাংশ তার বাবা ‘সুগিইয়ামা’ দিয়েছে, একাংশ তাদের নানা মি. তানাকা দিয়েছেন জানলাম। কারণ, দু’জনের পড়াশুনার খরচ একজনের পক্ষে বহন করা কষ্টকর ছিল। তারা ভাই বোন হলেও এক পিতার সন্তান নয়। তাই তারা সবাই মিলে একদিন ফ্যামিলি মিটিং করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কেইসুকে আমেরিকা থেকে পশু ডাক্তার হয়ে এলে তার পেশাতেই কাজ পেতো। থার্ড ইয়ারে উঠে নাকি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। জাপানে ফিরে এসে আবার সে তার পড়াশোনা চালাতে চেয়েছিল। কিন্তু জাপানের কলেজ থেকে বলেছে যে প্রথম বর্ষ থেকে তাকে শুরু করতে হবে। আমেরিকাতে তৃতীয় বৎসর পর্যন্ত পড়লেও জাপানে তা কর্যকর হবে না। তাই সে আর পশু ডাক্তার হতে পারেনি।

নজিতা বলেছেন, ‘আমার মেয়ে ‘এমিকো’ মেধাবী ছিল। সে লেখাপড়ায় ভাল ছিল। এখন একটি সিনিয়ার হাই স্কুলের ইংরেজি টিচার’। মেয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ তিনি। কিন্তু কাজ করে না বলে প্রতিদিন ছেলেকে বকাবকি করেন। তিনিই একদিন বললেন, ‘আমি আমার ছেলেকে কোন প্রকারেই ক্ষমা করতে পারবো না। জানেন তার বয়স এখন চল্লিশ। কি করে তাকে ক্ষমা করা যায়’?
নজিতার দ্বিতীয় স্বামী সুগিইয়ামা অর্থাৎ কেইসুকের পিতা-ছেলেকে একদিন কোন ব্যাপারে মন্দ বলেছিলেন। নজিতা তা শুনে বজ্রপাতের মতো রেগে গিয়ে তালাক দেয়া স্বামীটিকে গালাগালি করেছেন।
বলেছেন, ‘ছেলেকে তোমার কিছু বলার অধিকার নেই। তুমি জুয়া খেলে আমার সর্বনাশ করেছো, আমার বাবার সর্বনাশ করেছো। সেকথা কি ভুলে গেছো? আমার বাবা তোমার ঋণের টাকা কুড়ি মিলিয়ন ইয়েন পরিশোধ করেছেন। তুমি কি করে ছেলেকে মন্দ বলো। সে অধিকার তোমার নেই’।

আসলে মায়েরা মনে হয় এমনই হয়। ছেলের প্রতি তার রাগের অর্থ পরিষ্কার। কিন্তু মন্দ পিতা হয়ে ছেলেকে গালি দেবে তা সহ্য হয় না নজিতার। না হওয়ারই কথা চক্ষুশূল এ লোকটি একই বাড়িতে থাকে। নজিতা যে তাকে মেনে নিতে পেরেছে তা থেকে তার মহত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়।

নজিতার মেয়ে এমিকো চাকরি পাওয়ার পর প্রথম ছ’মাস পঞ্চাশ হাজার ইয়েন করে তার মা নজিতাকে দিতো সেকথাও সেদিন বললেন। এখন সে এক পয়সাও দেয় না। কারণ, এমিকো এখন চারটি সন্তানের মা। তাই সে শিক্ষকতার কাজ ছেড়ে দিয়েছে। দুঃখ করে নজিতা বললেন, ‘জানেন, সেদিন চল্লিশ কিলোমিটার ড্রাইভ করে তাদের দেখতে গিয়েছিলাম। এমিকো আমাকে গাড়ির পেট্রোল খরচের টাকাও দিল না’।
নজিতার মুখে একথা শুনে প্রথম বারের মতো চমকে উঠলাম। কিন্তু কোন প্রশ্ন করা থেকে বিরত রইলাম। কারণ, এমন কথা বা প্রথার কথা আগে কারো মুখে শুনিনি যে মেয়ের বাড়িতে গেলে মাকে পেট্রল খরচের পয়সা বাবদ কিছু দিতে হয়। এটা ব্যতিক্রম। নজিতা প্রতিদিন বেশ পয়সা খরচ করেন। বাইরে লাঞ্চ করেন। এখানে সেখানে হট্‌ স্প্রিং স্পাতেও যান। টাকার অভাব থাকলে এতো কিছু তিনি করতে পারতেন না।
পেট্রল খরচ বাবদ কিছু টাকা দেয়নি বলাতে তা আমার কাছে অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক মনে হয়েছে।

এমিকোর স্বামী ডক্টরেট ডিগ্রীধারী, মাসে দেড় মিলিয়ন ইয়েন বেতন পান। এদিকে চার সন্তানের খরচ, টুইশন ফি, বিভিন্ন বিষয়ে প্রাইভেট লেসন নেয়ার খরচ বাবদ এ চারটি সন্তানের পেছনে মাসে গড়ে দু’লক্ষ ইয়েন লেগে যায়।

জাপানে টাকা থাকলে সন্তানকে নামি দামী প্রাইভেট স্কুলে পাঠানো যায়। এক ডাক্তার পরিবার আমার পরিচিত, স্বামী স্ত্রী দুজনেই ডাক্তার, তাদের একটি সন্তানকে একহাজার কিলোমিটার দূরের এক প্রাইভেট প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠিয়েছে। সেখানে থাকা খাওয়া সবকিছু বাবদ মাসে প্রায় অর্ধ মিলিয়ন ইয়েন খরচ করছে। স্কুল ছুটির দিনে এরোপ্লেনে আসা-যাওয়া করে। এতো খরচ করে সন্তানকে যারা স্কুলে পাঠাতে পারে নূনতম যাদের মাসে যাদের তিন মিলিয়ন ইয়েন রোজগার করে তারাই। এমন লোকও বেশ আছে। সাধারণ একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর মাসিক বেতন দেড় লক্ষ থেকে দু’লক্ষ ইয়েন। কিন্তু ধনী ও দরিদ্রের রোজগারের এ বিভেদ তাদের চেহারা দেখে সহজে বোঝা যায় না।

অতিরিক্ত খরচে অভিজাত প্রাইভেট স্কুলে সন্তানটিকে পড়ানোর ফায়দাও কিন্তু আছে। প্রথম শ্রেণীর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতে এডমিশন পায় তাই সে সকল স্কুলে এডভাঞ্চ লার্নিং প্রোগ্রামে ছাত্রদের পড়তে হয়। আর, তাদের সন্তানদের অধিকাংশই টপ ক্লাস বিশ্ববিদ্যালয়ে এডমিশন পায়। তাই ধনীর সন্তানেরা নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়লে ষ্ট্যাটাস প্রব্লেম হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, প্রথম শ্রেণীর কোম্পানীতে চাকরি পাওয়া, আমলা, ডাক্তার কিংবা উকিল হতে হলে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ‘ইউনিভার্সিটি অব টোকিওতে’ এডমিশন পায় শতকরা এক জন। কেইও ও ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাইভেট। সেগুলিতে এডমিশন পায় শতকরা দু’জন মাত্র। এমনতর প্রতিযোগিতায় পাশ করার জন্যই নামিদামী প্রাইভেট স্কুলে ধনীরা তাদের সন্তানদের অতিরিক্ত খরচে পড়ায়। তবে মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে যে সে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে এডমিশন পায় না তা কিন্তু ঠিক নয়। এডমিশন টেস্টে টিকে যায় সাধারণ পরিবারের এমন মেধাবী ছাত্রও আছে।

আমার জানামতে গ্রামের একজন বারবারের ছেলে ‘টোকিও বিশবিদ্যালয়ে’ পড়াশোনা করেছে। আরেক জনের কথা জেনেছি বিশেষ ঘটনা চক্রে। আশির দশকে যখন দেশ থেকে ফিরছিলাম। নারিতা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ল্যান্ড করে টোকিওতে কমিউটার ট্রেনে পৌঁছতে এক ঘন্টা লেগে গেল। তখন রাত বারটা বেজে গেছে। রাত বারোটার পরে আমার মফস্বল শহরে ট্রেন যাতায়ত বন্ধ থাকে। তাই সেদিন বিপাকে পড়েছিলাম। কি করবো ভাবছি। টোকিও থেকে আমার শহরটি পঞ্চাশ কিলোমিটার হবে। ট্যাক্সিতে যাওয়া গেলেও অনেক টাকা খরচ হবে। হোটেলে থাকলেও একই খরচ তাই একটি ট্যাক্সিতে উঠে গেলাম। কোন উপায় ছিল না। সঙ্গে ভারী স্যুটকেস ছিল। তখন জাপানি ভাষা আমার কিছুটা আয়ত্বে এসেছে। কিছুক্ষণ পর ড্রাইভারটি আমার সাথে কথা বলতে লাগল। বলাই বাহুল্য, জাপানীরা দেশি বিদেশি সবার সঙ্গে জাপানিতেই কথা বলে। জাপানী জানা না থাকলে বিদেশী পর্যটকদের গাইড নিয়ে চলতে হয়।

ড্রাইভারটি আমার পরিচয় জানার পরে অনর্গল কথা বলছিল। বলল, ‘জানেন, আমি একজন সামান্য ট্যাক্সি ড্রাইভার মাত্র। জাপানে আমার ষ্ট্যাটাস নেই। কিন্তু আজ সকাল দশটায় ছেলেটি ফোন করে জানালো যে সে টোকিও ইউনিভার্সিটির মেডিক্যালে এডমিশন পেয়েছে। জানেন আজ কতো আনন্দ লাগছে আমার’। লক্ষ করলাম ড্রাভারটি তার চোখের জল রুমাল দিয়ে মুছছে। আনন্দে সে কাঁদছে। সে আরো বলল, ‘হ্যাঁ, আমি জানি অচিরেই আমার ছেলেটি ডাক্তার হয়ে যখন বের হবে তখন সে আমাকে ড্রাইভারের কাজ করতে দেবে না। আমাদের ষ্ট্যাটাস বদলে যাবে’।
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে কোন বড় হাসপাতালে চাকরি বা কোন মেডিক্যাল কলেজে যোগদান করলে তার বেতন মাসে তিন মিলিয়ন ইয়েনের মতো। এ কথাটি আমার জাপানি ভাষা শিক্ষকের মুখে শুনেছি।

জাপানে অনেক মেডিক্যাল কলেজ আছে। কিন্তু সে সব মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর কলেজ রয়েছে। সে সকল মেডিক্যাল কলেজে যদি টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ করা ডাক্তার জয়েন করেন তখন সে মেডিক্যাল কলেজটির ষ্ট্যাটাস উপরে উঠে যায়। তাই অতিরিক্ত বেতন দিয়ে সে সকল মেডিক্যালে টোকিও কিংবা কেইও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ করা ডাক্তার নিয়োগ করে।