ঝরে যাওয়া ফুল ও একটি পতাকা ॥ কানিজ পারিজাত




খুব ভোরে ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দে ঘুম ভেঙে যায় সন্ধ্যার। আগে হলে তাড়াতাড়ি বিছানার পাশে জানালায় গিয়ে দাঁড়াত, দূরে উঁচু রেললাইন ধরে এক অদ্ভুত ছন্দ তুলে ছুটে যাওয়া ট্রেন দেখত, গত কয়দিনে মনটা যেন মরে গেছে, এতদিনের চেনা অভ্যাসে কী এক অলিখিত নীরব বিরতি। ধীরে ধীরে কাঁথাটা গা থেকে সরিয়ে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায় সন্ধ্যা। ঘরের কোণে মেঝেতে রাখা সবুজ রঙের রংচটা টিনের ট্রাঙ্কের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়- পরম যত্নে হাত বুলায় ট্রাঙ্কের ডালার ওপর। তার পনের বছরের জীবনের খুব প্রিয় ট্রাঙ্ক এটি। পাঁচ বছর বয়সে বাবা শশীকান্ত মাস্টার শখ করে মেয়ের জন্য গড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেই থেকে দশ বছরে সময়ের স্রোত বেয়ে তাতে জমা হয়েছে কাপড়ের পুতুল, মাটির পুতুল, মেলা থেকে কেনা খেলনা হাঁড়িপাতিল, হাতপাখা, চুলের কাঁটা, খানকতক রঙিন শাড়ি, আলতা, ময়ূরের পালক আর সন্ধ্যার নিজ হাতে সেলাই করা কিছু দেয়ালিকা ও রঙিন সুতোর বান্ডিল। ট্রাঙ্কের ডানদিকে রাখা একটুকরো ভাঁজ করা সাদা কাপড় হাতে নিয়ে দেখে সন্ধ্যা- কয়েক রঙের সুতো দিয়ে গত কয়দিনে খুব যত্ন করে বুনেছে সে। কাল রাতে সবে সেলাই শেষ হয়েছে।
‘সরোবরে জল নাই পদ্ম কেন ভাসে
রাধার সাথে দেখা নাই কৃষ্ণ কেন হাসে’?
নিজের হাতের গোটা গোটা হরফের এই লেখা সে কালো সুতো দিয়ে খুব সুন্দর করে সাদা কাপড়ে ফুটিয়েছে। আর এই লেখাটির ঠিক নিচেই কৃষ্ণ ঠাকুরের চিত্র- কৃষ্ণঠাকুর একটি জলেভাসা পদ্মের ওপর খুব সুন্দর এক ভঙ্গিমায় বাঁশি হাতে দাঁড়ানো, মুখে এক রহস্যময় চিকন হাসির রেখা। পদ্মফুলের পাঁপড়িগুলো গাঢ় গোলাপি সুতো দিয়ে, পাতা ঘন সবুজ সুতো, বাঁশি আর কৃষ্ণঠাকুরের হাতের বাজুবন্ধ ও কোমরের বন্ধনী সোনালি সুতো দিয়ে বুনেছে। সবচেয়ে সুন্দর হয়েছে কৃষ্ণঠাকুরের অবয়ব- ঘন নীল, অনেকটা ময়ূরকণ্ঠী নীল সুতো দিয়ে কৃষ্ণঠাকুরের শরীরে অনাবৃত কালো রঙ সে বুনেছে, মনে হচ্ছে সত্যিই যেন কৃষ্ণঠাকুর পদ্মের ওপর দাঁড়িয়ে মুচকি হাসি হাসছেন- অপূর্ব নিখুঁত হস্তশিল্প, সন্ধ্যার সারাজীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ- তার প্রাণের সই জাহানারার জন্য। শুধু আফসোস একটাই, চৌকোণা কাপড়ের নিচের দিকে নিজের নাম লিখতে গিয়ে সবুজ সুতো দিয়ে শুরু করলেও শেষ করতে হয়েছে কালো সুতো দিয়ে। সবুজ সুতো শেষ হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধের বাজার। সারা দেশে দোকানপাট বন্ধ। সবুজ সুতো কারও কাছে জোগাড় করতে পারেনি সে, তা হোক, নিজের নামটা বাদে বাকি সেলাই নিখুঁত পরিপাটি। প্রাণের সই জাহানারাকে সুন্দর এক স্মৃতিচিহ্ন উপহার দিয়ে যাবে সে।
ঠাকুরঘর থেকে চাপা কান্নার আওয়াজ আসছে। রোজ ভোরে ঠাম্মা ঠাকুর ঘরে গিয়ে এমন কান্না করেন; থেকে থেকে, খুব চাপা স্বরে। চাপা হলেও আজন্ম লালিত বুকের কষ্ট যেন নদীর বাঁধভাঙা স্রোতের মতো সকালে আর সন্ধ্যায় ঠাকুর ঘরে আছড়ে পড়ে।

দুই.
নিকোনো উঠোনের এক কোণে জবাফুলগাছ, তার পাশেই খয়েরি রঙের গাঁদা ফুলের থোকা, ঘরের দুই কোণায় আতা ও বেলগাছ, আর উঠোনের মাঝখানে একটি তুলসিগাছ। মা নিয়ম করে রোজ জল ঢালে। গত কয়দিনে মা গাছের যত্ন বাড়িয়ে দিয়েছে, ছেড়ে যাওয়ার মায়ায় যেন বেশি বেশি করে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। উঠোনের এক কোণে সন্ধ্যার ছোট ভাই পার্থ বেড়ার গায়ে দাঁড় করিয়ে রাখা পুরনো বঁড়শিটা নেড়েচেড়ে দেখছে। সেদিকে চোখ যেতেই মা সন্ধ্যাকে উদ্দেশ করে বলে,
-‘পার্থর খাবার ঢাকা দিয়ে রেখে এসেছি, ওকে খেতে দে’।
ক’খানা লুচির সঙ্গে ডাল আর ফুলকপির তরকারি, আর দু’খানা সন্দেশ, পার্থর প্রিয় খাবার। পার্থকে খাবার বেড়ে দেওয়ার সময় সে সন্ধ্যাকে উদ্দেশ করে বলে-
‘দিদি আমার বঁড়শি, মাটির গুলি- এগুলো সব রেখে যেতে হবে? আমরা আবার কবে ফিরে আসব- এসে আমার সব জিনিস ঠিকঠাক পাব তো’?
সন্ধ্যা কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকে। মুন্সি কাকাদের বাড়ি থেকে মা, ঠাম্মা আর সন্ধ্যার জন্য তিনখানা বোরখা, পার্থ আর বাবার জন্য টুপি আর পাঞ্জাবি জোগার করা হয়েছে। যাতে সন্ধ্যারা নিরাপদে পার হতে পারে। সন্ধ্যারা যাচ্ছে শুনে পশ্চিমপাড়া থেকে তুহিন ফুপুরা মুড়ি ভেজে দিয়ে গেছে পোঁটলায় বেঁধে- পথে যদি লাগে, সন্ধ্যার মাও দিয়েছে কুমড়ো আর সুক্তোর বড়ি। সবার সাথে কী মায়ার বন্ধন- সব এলোমেলো হয়ে গেল দেশে যুদ্ধ বেঁধে। পাকিস্তানি মিলিটারিরা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। তরুণ যুবক ছেলে- বাড়িতে থাকলে ধরে নিয়ে যাচ্ছে বা মারছে, বাড়িতে না পেলেও মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছে ভেবে বাড়ির লোকজনকে মেরে ফেলছে। শিশু আর বুড়োরাও নাকি বাদ যাচ্ছে না। তবে সবচেয়ে যে আতঙ্কজনক কথাটি শুনেছে সন্ধ্যা- তা হলো, মিলিটারিরা নাকি জোয়ান সোমত্ত মেয়ে পেলে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, যেসব ঘরে সেয়ানা, সোমত্ত মেয়ে আছে তাদের বিপদ নাকি সবচেয়ে বেশি। সন্ধ্যার বয়েস পনেরো- কচি ছিপছিপে শরীরে মুখটা যেন দেবী লক্ষ্মী। সন্ধ্যাকে নিয়ে তাই মা-ঠাম্মার চিন্তাও যেন বেশি। কয়েকদিন আগে তাদের পাড়ার পঙ্কজদা এসেছিল, বারান্দায় বসে কথা বলছিল বাবার সঙ্গে-
‘মাস্টার কাকা, আপনি দেরি করতিছেন কিসের জন্যি। এক এক করি সবাই গ্যাছে, নুন্দি বাড়ির উরা, ঘোষ কাকারা, হরিপদ মামারা- সবাই উপার যাচ্ছে, আপনি কাকা কিসির জন্যি দেরি করতিছেন? কোন সুমা কোন বিপদ আসফি, তহন আর সুমায় পাবেন না’।
সন্ধ্যার বাবা চুপ ছিল। মুখে বিহ্বল দৃষ্টি- ঠিক কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না যেন। যুদ্ধ বাঁধার পর থেকে ছোট ট্রানজিস্টারে খুব অল্প আওয়াজে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শোনেন, শুনতে শুনতে কখনো কখনো মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার।
কী করবেন- তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নেন-
পঙ্কজদার কথার উত্তরে বাবার যেন হুঁশ হয়।
আমরা তো যাব- গিলি পারা আমাগের সাথেই চলেন।
বাবা খুব ধীরে ধীরে বলেন- দেখি-
সন্ধ্যার বাবা শশীকান্ত গণিতের শিক্ষক। সারাজীবন ছাত্রদের সরল অঙ্ক মিলিয়ে দিয়েছেন- আজ নিজের জীবন নিয়ে এক জটিল অঙ্কে এসে দাঁড়িয়েছেন- এই দেশ, এই মাটি এ তার মাতৃভূমি, তার চৌদ্দ পুরুষের ভিটে ছেড়ে কী করে যাবেন? এই মাটিই যে তার মা।

তিন.
‘দুটি সবুজ রঙের টিয়াপাখি মুখোমুখি লাল ঠোঁট মিশিয়ে বসা- নিচে লেখা ‘ভুলো না আমায়’- সাদা চৌকোণা কাপড়ে সবুজ আর লাল সুতো দিয়ে অদ্ভুত সুন্দর এক নকশিচিত্র সেলাই করে নিয়ে জাহানারা এসেছিল দিন পাঁচেক আগে। সন্ধ্যার জন্য স্মৃতি উপহার। প্রাণের সই তারা দুজন। রেললাইনের এপারে পুব পাড়ায় একটু ঢালুতে সন্ধ্যাদের বাড়ি আর রেললাইনের ওপারে পশ্চিম পাড়ায় একটু ভেতরের দিকে জাহানারাদের বাড়ি। মাঝখানে উঁচু হয়ে বয়ে চলা রেললাইন দুই পাড়ার সীমারেখা হলেও তাদের বন্ধুত্বে সীমারেখা কখনো টানতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই এক সঙ্গে খুঁটিমুচি খেলে, কুড়োনো ফুলের মালা গেঁথে, পুতুলের বিয়ে দিয়ে তারা বড়ো হয়েছে, পাঁচ ক্লাস পর্যন্ত একসঙ্গে পড়েছে- হরিহর আত্মা তাদের দুজনের। সন্ধ্যা চলে যাবে তাই জাহানারার চোখ ছলছল, দুই সই একসঙ্গে সন্ধ্যাদের বাড়ির অদূরে পঙ্কজদাদের পুকুর পাড়ের বকুল গাছতলায় যায়। কত স্মৃতি তাদের এই গাছের সঙ্গে। স্কুল থেকে ফিরে দুজনে এই গাছের নিচে ঝরা বকুল ফুল কোঁচড় ভরে তুলেছে কত, তারপর পুকুর ঘাটে বসে গেঁথেছে মালা। কিছুক্ষণ চুপ থাকে দুজন। জাহানারা হঠাৎ প্রশ্ন করে, অলোকদার কী খবর রে? নামটি শুনে মুখের রঙ পরিবর্তন হয় সন্ধ্যার। এই ব্যাপারটি আগেও খেয়াল করেছে জাহানারা। সন্ধ্যা আস্তে আস্তে বলে-
‘অলোকদা যুদ্ধে গেছে’।
খালি অলোকদা একা নয়, খোকন ভাই, সুবল দা, তাদের পাড়ার রহমান, গাজী, সুলেমান ভাই- সবাই গেছে যুদ্ধে। সন্ধ্যা বলে-
‘মাঝে একদিন আসছিল জানিস- রাতের বেলা খোকন ভাই, অলোকদা, মতি ভাই, গাজী ভাই- ওনারা আসছিল- সাথে আরও কয়েকজনকে নিয়ে, সবাই মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের পাড়ার কয়েক ঘর থেকে খাবারের ব্যবস্থা করছিল, মা খই আর মুড়ি পোঁটলায় বেঁধে দিছিল’।
-‘তোর সাথে দেখা হইছে’?
জাহানারার প্রশ্নের উত্তরে আস্তে আস্তে সন্ধ্যা বলে-
‘মা যখন মুড়ি আর খইয়ের পোঁটলা অলোকদার হাতে দিচ্ছিল তখন একবার দেখছিলাম- মারে বলছে-
‘কাকি আপনারা সাবধানে থাইকেন’।
অলোকদাদের বাড়ি সন্ধ্যাদের বাড়ির দুই বাড়ি পরে। সন্ধ্যার থেকে পাঁচ বছরের বড়ো। প্রচণ্ড সাহসী আর দুরন্ত ছেলে। মাছধরা, হাডুডু খেলা আর বাঁশি বাজানোয় ওস্তাদ। এই বকুলতলাতেই এক বছর আগে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল সন্ধ্যার। খুব ভোরে সে বকুলতলাতে এসে নিচু হয়ে ঝরা ফুল কুড়াতে কুড়াতে হঠাৎ থমকে যায়- অস্ফুটে ক্ষীণ এক আওয়াজ বের হয় গলা থেকে- তার সামনেই ফণা তোলা এক বিরাট সাপ- শ্বাস বন্ধ করে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়েছিল সন্ধ্যা, হঠাৎ পেছন থেকে-
‘খবরদার নইড়ো না’-
বলে অলোকদা যেন উড়ে এসেছিল- এক ধাক্কা দিয়ে সন্ধ্যাকে পেছনে সরিয়ে দিয়ে নিজে সামনে দাঁড়িয়েছিল, আর হাতে থাকা খেজুর গাছের ডগা দিয়ে সপাং সপাং মেরে ওখানেই সাপের লীলা সাঙ্গ করে দিয়েছিল। সন্ধ্যা তখনো নিশ্চল- অলোকদা কাছে এসেছিল, সন্ধ্যার ভয়ার্ত নিশ্চল চেহারা দেখে আশ্বস্ত করে বলেছিল-
‘ভয় নাই সাপ মরছে’।
পরে বলেছিল-
‘ভয় করলে চলো তুমারে বাড়ি পর্যন্ত দিয়ে আসি’।
সেই থেকে চোখ বন্ধ করলে কৃষ্ণঠাকুরের মুখের জায়গায় বারবার তার মনে অলোকদার মুখটা ভেসে ওঠে। কথাটা সে কাউকে বলেনি, এমনকি প্রাণের সই জাহানারাকেও না। অলোকদার ফর্সা, সুন্দর মুখটা কী করে যে কৃষ্ণঠাকুরের ঐ শ্যাম মুখে বসে যাচ্ছে সেটি সন্ধ্যার বোধগম্য নয়। দুই সইয়ে চুপচাপ আরও কিছু কথা হয়, দুই পাড়া কেমন থমথমে হয়ে গেছে, জাহানারারও বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষেধ। সবাই কেমন ভয়ে আছে। খোকন ভাই, অলোকদা, গাজী ভাই তারা নাকি খুব লড়ছে, হয়ত শিগ্গিরই দেশ স্বাধীন হবে- দেশ স্বাধীন হবে একথা ভাবতেই দুই সইয়ের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। জাহানারা চলে যাওয়ার সময়ও সন্ধ্যা তাকে বলেনি সেও জাহানারার জন্য স্মৃতি উপহার তৈরি করছে। ভেবেছে- থাক সেলাইয়ের কাজ শেষ হলে, একবারে যখন দেব, তখন দেখবে।

চার.
জাহানারা বেরিয়ে যাওয়ার দিন সন্ধ্যায় এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হয়। পঙ্কজদা খবর নিয়ে এসেছে- মিলিটারিরা নাকি পাশের থানা জামতলা বাজারে ঘাঁটি গেড়েছে। যেকোনো সময় আশপাশের গ্রামসহ তাদের গ্রামেও হানা দিতে পারে। মুন্সি আর মোল্লা কাকাদের বাড়িতে তারা পঙ্কজদাদের বাড়িসহ আরও কয়েক ঘর হিন্দু লুকিয়েছিল, ওনারা যত্ন করে মাচার নিচে লুকিয়ে রেখেছিল, ঐ বাড়ির কাকিরা একটু পরপর খাবার, পানি দিয়েছে। মুন্সি কাকাকে সবাই খুব মানে, উনি আশ্বস্ত করে বলেছেন-
‘মাস্টারদা ভয় নাই, তুমাদের, আমরা আছি। মরলি সবাই এক সাথে মরব’।
পরদিন পরিস্থিতি একটু ভালো মনে হওয়ায় তারা যার যার ঘরে ফিরেছে। ভয়, আতঙ্ক যায়নি- ঐদিন বিকেলে পঙ্কজদা বাবার সঙ্গে ঘরের ভেতর খুব আস্তে আস্তে বলে-
‘কাকা খবর বেশি ভালো না। জামতলা বাজারে মিলিটারির ঘাঁটিতে পশ্চিমপাড়ার পইঙ্কে, মফিজ, কালুরে নাকি দেখা গেছে। কয়জন বলল, ওরা মিলিটারিদের দালালের খাতায় নাকি নাম লেখাইছে’।
বাবা অবাক হয়ে বললেন-
‘পইঙ্কে? ও তো আগে থাকতেই চোর ছিল- বাজারে চুরির দায়ে সেদিন তো মানুষ ওরে মারতে মারতে মেরেই ফেলে, আমিই তো বাঁচায় আনলাম’।
পঙ্কজদা উত্তরে বলে-
‘সেই চোর পইঙ্কেরে নাকি দেখা যাচ্ছে মিলিটারির ঘাঁটিতে, ছাগল, মুরগি নাকি দিয়ে আসে, আপনাদের বললাম না কাকা, পরিস্থিতি ভালো না, তাছাড়া সন্ধ্যার কথা ভাবেন, এই জায়গায় থাকা কারও জন্যই নিরাপদ না, তাছাড়া আমাগের দুই পাড়ার বহু ছেলেপেলে মুক্তিতে যোগ দিছে, মিলিটারিগের কানে এই খবর দিলি যেকোনো সমায় হানা দিতি পারে’।
এবার বাবার মুখে সত্যিই চিন্তার ছাপ দেখা যায়, চিন্তাটা সন্ধ্যার জন্যই বেশি।
গত দুদিনে মা-ঠাম্মা গোছগাছ করেছে। বেশি কিছু নেওয়া যাবে না- এত দূরের পথ শুধু শুকনো খাবার সঙ্গে নিতে হবে, ঘরে তালা দিয়ে সবকিছু মুন্সি কাকা আর মোল্লা কাকাদের জিম্মায় রেখে যাবে। পঙ্কজদারাও যাবে তাদের সঙ্গে, কাল খুব সকাল সকাল বেরোতে হবে, অনেকটা পথ নাকি হাঁটতে হবে তাদের। বেলা বাড়লে উঠোন থেকে ঘরে যায় সন্ধ্যা, ট্রাঙ্ক থেকে সইয়ের জন্য সেলাই করা নকশিচিত্র হাতে নিয়ে দেখে, এত তাড়াতাড়ি তাদের যেতে হবে সে বোঝেনি, স্মৃতিচিহ্নটা প্রাণের সই জাহানারাকে না দিলেই যে নয়। সেদিনের রাতের আতঙ্কের পর থেকে মা-ঠাম্মা পারতপক্ষে সন্ধ্যাকে বাড়ির বাইরে যেতে দিচ্ছে না। দুপুরের দিকে মা যখন রান্নাঘরে, ঠাম্মা কাপড় ভাঁজ করছিল এমন সময় সবার অলক্ষে সন্ধ্যা বেরিয়ে পড়ে, প্রাণের সই জাহানারাকে নিজে হাতে স্মৃতি উপহার পৌঁছে দেবে। রেললাইনের ওপারে ঢালুতে তিন বাড়ি পরে জাহানারাদের বাড়ি। তাকে দেখে জাহানারার আবেগ উথলে ওঠে, এত সুন্দর স্মৃতি উপহার পেয়ে আবেগে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। জাহানারার মা কাকিরা সন্ধ্যাকে খেতে বললে সে জানায় বাড়িতে কাউকে না জানিয়ে এসেছে, মা চিন্তা করবে, তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে তাকে। আসার সময় জাহানারার মা জাহানারার ছোট ভাইকে সন্ধ্যার সাথে পাঠাতে চায়। সন্ধ্যা না করে, এইটুকু জায়গা, দিনেরবেলা, এখনই বাড়ি পৌঁছে যাব। জাহানারা আর তার মা বাহির বাড়ির উঠান পর্যন্ত তার পিছুপিছু এগিয়ে দিতে আসে। বিদায় নিয়ে সন্ধ্যা রেললাইনের দিকে ঢালু পথ বেয়ে উঠতে থাকে। মা তার খোঁজ করার আগেই ঘরে গিয়ে ঢুকতে চায় সে। উত্তর দিক থেকে একটি ট্রেন আসছে। সন্ধ্যা একটু অবাক হয়, রেললাইনের কাছে বাড়ি হওয়ায় ট্রেনের সময়সূচি তাদের জানা আছে। এসময় কোনো ট্রেন তো যাবার বা আসার কথা নয়। ট্রেনটি খুব ধীরগতিতে সন্ধ্যার কাছে এসে থেমে গেল, যেন সন্ধ্যার জন্যই থামল ট্রেনটি। রেললাইন পার হলেই তার বাড়ির পথ- কিন্তু ট্রেনটি থেমে গেল কেন? সন্ধ্যা পা বাড়াতে যাবে এমন সময় ট্রেনের সামনের জানালা থেকে একটি চেনামুখ বেরিয়ে এল- ‘পইঙ্কে- চোর পইঙ্কে। যাকে তার বাবা মানুষের মারের হাত থেকে গ্রামের ছেলে বলে বাঁচিয়ে এনেছিল, তার পর দুইবার তাদের বাড়ি গিয়ে বাবাকে সালাম করেছে। পইঙ্কে এই মালবাহী ট্রেনে কী করছে, তাকে দেখে ট্রেনই বা থামল কেন? একটা বিশ্রী রকমের হাসি দিয়ে পইঙ্কে বলে উঠল-
‘পাইছিরে, আইজকের মাল পাইছি, মাস্টরের মাইয়ে-’
বলেই ট্রেনের ভেতর থেকে ধপ ধপ করে নেমে এল পইঙ্কেসহ আরও দুজন। সন্ধ্যার একবার মনে হলো বাড়ির দিকে দৌড় দেবে, আবার মনে হলো পেছন ফিরে দৌড় দেবে জাহানারাদের বাড়ির দিকে, কিন্তু অপ্রত্যাশিত ঘটনার আকস্মিকতায় তার পা দুটো যেন অচল, সেদিনের সেই সাপ দেখে ভয় পাওয়ার মতোই শ্বাসবন্ধ হয়ে যায় যেন তার। অজানা গা হিম করা ভয়ে শরীর যেন শক্ত হয়ে যায়, তাকে যখন পইঙ্কেরা টেনেহিঁচড়ে অদূরে রেলসেতুর নিচে ঝোঁপের ভেতর নিয়ে যায়, তখন সেই ভরদুপুরে দূরে রেললাইনের মিশে যাওয়া দিগন্তরেখায় যেন দেখতে পাচ্ছিল অলোকদা ছুটে আসছে। ট্রেনের কামরায়, মিলিটারিদের জন্য খাদ্য- কতগুলো ছাগল, হাঁস, মুরগি তাদের সাথে সন্ধ্যাও যেন মিলিটারিদের মুখে যাওয়ার আগে ঝোঁপের ভেতর পইঙ্কেদের খাদ্যে পরিণত হলো। নিজের সর্বনাশের চরম মুহূর্তে বারবার মনে মনে কৃষ্ণঠাকুরকে ডেকে গেল সন্ধ্যা। জ্ঞান হারানোর কিছুক্ষণ আগে সন্ধ্যা যেন কতগুলো মানুষের গলা শুনতে পাচ্ছিল, তার মনে হলো- অলোকদা যেন ছুটে আসছে, তাকে এখনই উদ্ধার করবে।

পাঁচ.
বিকেলের একটু আগে মুন্সি কাকা, তাহের কাকা, রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত সন্ধ্যাকে বাড়ি নিয়ে আসে, তার এই অবস্থা দেখে মা প্রথমে চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। ঠাম্মা ‘ঠাকুর এ তুমি কী করলে’ বলে ঠাকুরঘরে মাথা ঠুকে যেতে লাগল, বাবা পাথর হয়ে গেলেন। আশপাশের কয় ঘরের কাকি ও বৌদিরা কিছু জরিবুটি করছিল, সন্ধ্যার অবস্থা ভালো নয়। দাঁড়ানো ট্রেনটি দেখে মুন্সি কাকা ও আরও দুজন এগিয়ে গিয়েছিলেন, রেললাইনের মাঠের পাশে খেলতে থাকা দুটি শিশু জানায়, তারা সন্ধ্যাদিকে এই পথে যেতে দেখেছে, এই ট্রেনে মিলিটারির খাবার নিয়ে পইঙ্কেরা দুদিন যাতায়াত করছে, মুন্সি কাকাদের আর বুঝতে বাকি থাকে না- হুংকার দিয়ে ট্রেনের দিকে এগিয়ে যান। পইঙ্কেরা গণ্ডগোল আঁচ করে আধমরা সন্ধ্যাকে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। ট্রেনচালকও ট্রেন চালু করে টান দেয়। আহত ক্ষতবিক্ষত সন্ধ্যার সেবার সাথে সাথে সবাই এই আলোচনা করছে- মুন্সি কাকাদের ভয়ে পইঙ্কে দৌড় দিলেও মিলিটারি নিয়ে ফিরে আসবে নাকি? যেকোনো সময় হানা দেয় যদি? মা বারবার মূর্ছা যাচ্ছে। ঠাকুমা সারারাত ‘হায় ঠাকুর’ বলে বিলাপ করে যাচ্ছে। আধো আধো চেতনে সন্ধ্যা কৃষ্ণঠাকুরকে মনে করার চেষ্টা করতে থাকে।

ছয়.
ভোরের আলো ফোটার কিছু আগে বিছানা থেকে আস্তে আস্তে নামে সন্ধ্যা। ব্যথা-যন্ত্রণায় কাতর শরীরটা টেনে টেনে কোনোমতে চলতে থাকে, বকুলগাছটা এত দূরে, আগে কত কাছে মনে হতো। অনেক কষ্টে বকুলতলায় আসে, কত প্রিয় তার এই গাছতলা, অলোকদার মুখটি মনে পড়ে, জাহানারার কথা মনে পড়ে, বাবা, ঠাম্মা-মা, পার্থ- না এই মুখ সে কাউকেই আর দেখাতে চায় না। আর কাউকে তার ভার বইতে হবে না। তার জন্মের বন্ধু বকুলগাছকেই সে তার ভার দিয়ে দেবে।
খুব ভোরে প্রতিবেশী শিখা বৌদি একটি দৃশ্য দেখে চিৎকার দিয়ে ওঠে- মৃদু বাতাসে একটু একটু নড়ছে বকুলগাছের পাতা, বকুল ফুল ঝরেঝরে পড়ছে নিচে। একটি ডালে ঝুলছে সন্ধ্যার নিথর নিস্তব্ধ দেহ। শাড়ি দিয়ে নিজের শরীর খুব যত্ন করে ঢেকেছে সে। মৃদু বাতাসে একটু একটু দুলছে গাছের ডাল, দুলছে সন্ধ্যার দেহ, আর ধীরে ধীরে একটা দুটো করে বুকল ফুল ঝরে পড়ছে তার নিথর শরীরে। দূরে জামতলা বাজারে তখন খোকন, অলোকেরা উড়িয়ে দিয়েছে লাল-সবুজ পতাকা। রাতে মিলিটারিদের সঙ্গে প্রচ- যুদ্ধে জয়ী হয়েছে খোকন, অলোক, গাজী, সুলেমান।
লাল-সবুজ পতাকা উড়ছে বাতাসে।