ডিভাইন কমেডি : সৃজনশীল মানুষ ও সংসারজীবনের সমন্বয় ॥ অনুপম হাসান



কাশীনাথ রায় ‘ডিভাইন কমেডি’ [১৪০৬/২০০৬] কাব্যনাটকে দাম্পত্য-জীবনের নিরর্থকতা এবং জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছেন। ‘ডিভাইন কমেডি’ জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে রচিত। নাটকের নায়ক অতনু দাম্পত্য-জীবনের দীর্ঘকাল পার হয়ে এসে তার মনে হয়েছে, তার জীবনের সবকিছুই যেন ব্যর্থতায় পর্যবসিত। সহজ-সরল ব্যক্তিবাদের চর্চা এবং আত্মরতিতে কেটেছে জীবনের সময়গুলো। সমীক্ষা যদি লতিকা পিসীর স্বামীর আত্মহত্যার কাহিনী অতনুকে না শোনাত, তাহলে হয়তো তার এই অস্তিত্ব বিষয়ক সংকটের উপলব্ধি ঘটতো না। আর লতিকা পিসীর স্বামীর আত্মহত্যার কারণ সন্ধান করতে গিয়ে কাব্যনাটকের নায়ক অতনু নিজের জীবনেরই সাদৃশ্য খুঁজে পায়— জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার নায়কের সঙ্গে। ফলে অতনু জীবনানন্দের নায়ক এবং লতিকা পিসীর স্বামীর সঙ্গে নিজের জীবনযাপনের তুলনা করে এবং ভাবে দেখে :
কল্প মাত্র, লতিকা পিসির
বরের প্রেতাত্মা মাত্র— স্তব্ধ শান্ত সৌম্য বিরতির
ছায়া মাত্র— বৃক্ষ প্রজননের আকাল—
আমি ক্লান্ত— ক্লান্ত— ক্লান্ত বহুকাল!

সমীক্ষা স্বামীর এই ক্লান্তি দূর করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। সমীক্ষা তার দেহমন সবকিছু দিয়ে অতনুকে বোঝাতে চেয়েছে : ‘অতনু, বিশ্বাস কর, এই মগ্ন দেহের উত্তাপ/ তোমার তৃষ্ণার পরিমাপ/ জানে।’ সমীক্ষা প্রাথমিক প্রয়াসে নারীর স্নেহ-ভালোবাসা, বিশেষত বাঙালি নারীত্বের রমণীয়তা দিয়ে পরিপাটি গোছানো সংসার আগলে রাখতে চায়। অতনুর জীবনবোধ হঠাৎ করেই যখন পরিবর্তিত হয় তখনো সে এককেন্দ্রিক পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, ভালবাসা দিয়ে স্বামীকে ধরে রাখার চেষ্টা করে। তাছাড়া সমীক্ষা নিজেও ব্যক্তিবাদের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে। নাট্যকাহিনীর পরিণতিতে সমীক্ষা ঠিকই অতনুর পাশে তার চলার পথে সঙ্গী হয়েছে। তবে প্রাথমিক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে সমীক্ষার আসতে সময় লেগেছে। এই সময়ের মধ্যে ব্যর্থতা এবং হতাশার কথা শুনে অতনুর মধ্যে জেগে ওঠা জীবনবোধ ম্রিয়মান হয়ে পড়ে; কিন্তু এরকম সময় সমীক্ষা তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়, এবং নিজেও তার সঙ্গী হয়। সমীক্ষা বলে :
যদি ফের
আসে ডাক উত্তাল পথের
দরজা খুলে নেমে যাব ঘর্মাক্ত ধূলায়।
আমরা তো কবি নই— কোন তপস্যার মহিমায়
বলব ডেকে, কমরেড, এই মনোভূমি
মিছিলের চেয়ে সত্য জেনো! কোন স্বপ্নের মৌসুমী
বায়ুর দারুণ টানে নিঃসঙ্গ দুয়ারে এঁটে খিল
মিছিল-স্পন্দিত বুকে মনে হবে আমিই মিছিল!

সমীক্ষা-অতনুর আট বছরের ছেলে খোকা তাদের আদর্শ দাম্পত্য-জীবনের ভালোবাসার ফসল। ব্যক্তিবাদের পারিবারিক জীবনের প্রতি আকৃষ্ট করার মতো চরিত্র; যাকে ভালো না-বেসে উপায় থাকে না। সে ভালোবাসা নেয়, অনেকটা ছিনিয়ে নেয়ার মতো করে। তারপরও খোকাকে বাধা দেয়া যায় না; কিন্তু খোকাও নাট্যকাহিনীর সমাপ্তিলগ্নে বাবা-মায়ের সঙ্গে পথে নেমে আসে এবং তার বাবাকে বলে :
আমি তবে যাবই মিছিলে।
যুদ্ধ চাই। আর সবচেয়ে তেজি ঘোড়ার লাগাম
হাতে চাই। আর চাই রাক্ষসের মাথা।
আমি যদি না-ই ফিরি, তুমি গাইবে খোকনের গাথা,
শুনে যত গাঁয়ের মানুষ আর অচেনা পথিক
বলবে, খোকা লড়েছিল ঠিক।
প্রসঙ্গত মনে রাখা দরকার যে, খোকার বয়স আট বছর, এই সময় দিয়ে নাট্যকার ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার সময় প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে সচেষ্ট হয়েছেন। তবে খোকার এই চলমান ‘অন্ন চাই, বস্ত্র চাই’ আন্দোলন বোঝার মতো বয়সের অসামঞ্জস্যতা নাট্যকারের দুর্বলতা হলেও কবিতার বিষয়বস্তু এবং সময়ের প্রতি অনুগত থাকতে গিয়েই নাট্যকারকে এই নাট্যিক দুর্বলতাকে স্বীকার করে নিতে হয়েছে। তবে সন্তান বাবা-মা’কে অনুকরণ-অনুসরণ করবে এটাই প্রকৃতির তথা সামাজিক জীবনের স্বাভাবিক ঘটনা।

অতনু বৃত্তবন্দী সংসারজীবন ছেড়ে দিয়ে যে পথে এসে দাঁড়িয়েছে, সেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সংগ্রামী জনতাকে মিছিল করতে দেখা যায়। এই মিছিলের চলমান জনস্রোতের একজন সাংবাদিকের সাথে অতনুর পূর্ব-পরিচয় ছিল। এই সাংবাদিক অতনুকে মিছিলের জনগণ সম্পর্কে ভিন্ন তথ্য দিয়েছে। সাংবাদিকের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, মিছিলের মানুষ ভাড়া করে আনা হয়েছে। ফলে সাংবাদিক অতনুকে মৌলিক অধিকার আদায়ের এই মিছিলের অন্তঃসারশূন্যতা এবং হতাশাব্যঞ্জক পরিণতির কথা বলেছে :
আমরা অসাধারণ মণি
খুঁজিনি কখনও। শুধু ভাত-
কাপড়ের শুভ দৃষ্টিপাত
আজন্ম কুড়োতে চাই। ক্ষুধার্ত মিছিলে
মৃত গৃহিণীর আত্মা শুঁকে দেখি। স্বপ্ন দণ্ড দিলে
বিক্ষোভে উঁচিয়ে ধরি নিরন্ন ভাঁড়ার।

অতনুর অভিনব জীবনবোধের প্রাথমিক পরিণতির চিত্র সাংবাদিকের সংলাপে প্রকাশিত হয়। মৌলিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া মিছিলের পরিণতি সম্পর্কে অতনু জানে না। কিন্তু সাংবাদিক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আজ হোক কাল হোক এদের মরতেই হবে; নিরন্ন এই মানুষগুলোকে মরতে যেহেতু হবে, এজন্যই সাংবাদিক তাই মনে করে : ‘সরকারি বুলেটের অন্ন বুকে মরা ঢের ভাল।’ সাংবাদিক বন্ধুর দেয়া তথ্য সম্পূর্ণ সত্য ও নির্ভুল জেনে নায়ক অতনুর উজ্জীবিত জীবনচেতনা কিছুটা দমিত হয়েছে। মৌলিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে অগ্রসরমান মিছিলের অল্প বয়স্ক ছেলেটি যে তথ্য দেয়, তার ভিত্তিতে অতনুর জাগ্রতচেতনা সম্পূর্ণ হতাশায় অবশিত হয়ে পড়ে। কেননা ছেলেটির নিকট থেকে অতনু জেনেছে : ‘এ-মিছিল, এই প্রতিবাদের মহড়া,/ টাকা দিয়ে গড়া’। অর্থাৎ ছেলেটি টাকার বিনিময়ে মিছিল করতে এসেছে। অথচ এই মিছিলে ওদের মতো গরীব-দুঃখীদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের কথাই বলা হচ্ছে। যার জন্য মিছিল, সেই ভাড়াটে হিসেবে মিছিল করতে এসেছে। মিছিল শেষে সে যে টাকা পাবে তার থেকে ক’টা টাকা ছেলেটি তার মায়ের হাতে তুলে দিয়ে মায়ের হাসিমুখ দেখবে। অবাক বিস্ময়ে তাই ছেলেটিকে অতনু বলেছে, ‘খোকা, তুমি চকচকে নোটের বাহার/ ছাড়া কিছু দেখনিক আর’। তবে অতনুর এই জিজ্ঞাসার প্রত্যুত্তরে ছেলেটি অবলীলায় জানিয়ে দিয়েছে :
[…] আমি এই নোটের ভিতর
ঝুমঝুমির শব্দ শুনি, সদ্য-সেঁকা রুটির নরম
গন্ধ পাই, দু’টো টাকা হাতে তুলে দিলে যেরকম
গলে যায় মা-র ভয়ংকর
রাগী সুর— তারও মিহি রেশ
এই নোটে লেগে থাকে বেশ।

ছেলেটি হয়তো সকাল বেলা মার খেয়ে টাকা রোজগারের জন্য মিছিলে যোগ দিয়েছে, সেই মিছিল শেষের পাওনা দিয়ে মায়ের নিকট স্নেহ পাবে। বিশেষত ছেলেটির জীবনের এই নির্জলা সত্য অতনুর সামনে প্রকাশিত হওয়ার পর সে সম্পূর্ণ স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। গৃহের সুখ-শান্তি রক্ষার জন্যই এই আয়োজন এবং দুর্বোধ্য এক বোধের জন্ম হয়েছে মাথার ভিতরে। গৃহের সুখ-শান্তি রক্ষার জন্যই যদি সবকিছু হয়, তাহলে অতনু মিছিলে গিয়ে কি করবে। অতনু তো মুক্তির এক বিপুল বিস্ময় খুঁজে পেতে চেয়েছিল :
অথচ তোমাকে
ঝড়ের দুরন্ত কোলাহলে
শোনাতে চেয়েছি আমি, মুক্তির উজ্জ্বল
উত্তাপ কুড়াতে পোড়া দিন ভেঙে ভেঙে
আগুন মেখেছি হেসে কী বিশ্বাসে। অতনু, তোমার
মুক্তি চেয়েছি আমি—
মিছিলে অংশ নেয়া ভাড়াটে ছেলেটির জীবনের নির্জলা সত্য জানার পরও দ্বিধান্বিত চিত্তে অতনু মিছিলের দিকে পা বাড়াতে উদ্যত হয়; এমন সময় মিছিল থেকে তার পরিচিত এক কবিবন্ধু অতনুকে ডাক দেয়। এই কবিবন্ধু অতনুকে মিছিলের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে ব্যাখ্যা দেয়; অর্থাৎ এই ভুখা-নাঙ্গাদের মৌলিক অধিকার আদায়ের মিছিলের পরিণাম সম্পর্কে আগে থেকে জেনেও সে মিছিলে অংশ নেয়। কেননা যেখানে গিয়ে এর সমাপ্তি ঘটবে— সেখান থেকে কবি পুনরায় হতাশায় ভেঙে পড়া মানুষকে জাগিয়ে তোলার দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করবে। কবির কথায় এটা স্পষ্ট যে, এই চলা অন্তহীন। এই আন্দোলনের কোনো শেষ নেই। কবি এজন্যই অতনুকে উদ্দেশ্য করে বলে :
এ-মিছিল যাবে যতদূর
ততদূর সরে যাবে গৃহের উষ্ণতা আর পরিতৃপ্ত দিন।
এ মিছিল তাই যতিহীন, তাই গন্তব্যবিহীন।
এক সময় সামনের সারির নেতাদের বেঈমানী বা বিশ্বাসঘাতকতায় এই আন্দোলনটি নস্যাৎ হয়ে যাবে; কিন্তু সেখানে থেমে গেলে চলবে না। তারপরও এগিয়ে যেতে হবে আর এজন্যই কবি জনমানুষের প্রেরণাদাতা হয়ে প্রতিনিয়ত তাদের সঙ্গী হয়ে রয়েছেন। কবির এই অন্তহীন পথ চলা এবং নিরন্তর আন্দোলন চালিয়ে যাওয়র কথা শুনে অতনু হতোদ্যোম হয়ে পড়ে, এবার সে প্রকৃত অর্থেই নিজেকে দিয়ে ঘরকন্না ছাড়া অন্যকিছু করা সম্ভব হবে, এ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে।

অতনু ঘরেই ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, ভাবে এ পথ তার জন্য নয়। সে একজন সাধারণ মানুষ মাত্র, যার দ্বারা অসাধারণ কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। অতনু যখন পথে নেমেও পথ থেকে ঘরে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখন তার প্রিয়তম সঙ্গিনী সমীক্ষা এবং সন্তান তাকে পুনরায় অন্তহীন এই চলার পথে তথা আন্দোলনে শরীক হওয়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে এবং তারা তিনজন একসাথে মৌলিক অধিকার আদায়ের এই মিছিলের সঙ্গে মিশে গেছে।

‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার নায়কের সহসা মৃত্যুর সাধ জেগেছিল এবং অশত্থের ডালে সে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে জীবনের যন্ত্রণা পার করে দিয়েছিল। কেন সে আত্মহত্যা করে, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কবি বলেন : ‘জানি— তবু জানি/ নারীর হৃদয়— প্রেম— শিশু— গৃহ— নয় সবখানি;/ অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—/ আরো এক বিপন্ন বিস্ময়/ আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে/ খেলা করে;/ আমাদের ক্লান্ত করে/ ক্লান্ত— ক্লান্ত করে;’ জীবনানন্দ দাশের নায়কের মতো ‘ডিভাইন কমেডি’র অতনুরও সংসারজীবনে কোনোকিছুর অপর্যাপ্ততার কথা জানা যায় না। তার স্ত্রী সমীক্ষার ভালোবাসার কমতি ছিল না, ফুটফুটে একটি শিশুও তাদের ঘরে ছিল— আশার প্রদীপ অথবা জীবনের আলো ছড়িয়ে; তারপরও ঘর তাকে বিবাগী করেছে। এখানেই সৃষ্টিশীল মানুষের অন্তর্গত বেদনা। যে বেদনার উপশম কিছুতেই হয় না— সৃষ্টি ছাড়া। সৃষ্টিশীল মানুষ যদি কোনোকিছু সৃষ্টি করতে না পারে, তাহলে তাকে লতিকা পিসীর স্বামী কিংবা ‘আটবছর আগের একদিন’ কবিতার নায়কের মতো লাশ কাটা ঘরে সব ক্লান্তি পেছনে ফেলে— ক্লান্তিহীন নিশ্চিন্ত শুয়ে থাকেত হয়। যাদের রক্তের মধ্যে ‘এক বিপন্ন-বিস্ময়’ খেলা করে, তারা যদি সেই বিস্ময়ের চেতনাকে বাইরের পৃথিবীতে বের করে নিয়ে আসতে না পারে, তাহলে তাদের কাছে ‘জীবনের এই স্বাদ— সুপক্ক যবের ঘ্রাণ হেমন্তের বিকালের’ সুর-সৌন্দর্য-ঐশ্বর্য ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

অতনুর ক্ষেত্রেও উপরে বলা বক্তব্যের ব্যতিক্রম ঘটে নি; তার জীবনও স্বাভাবিক অর্থে পরিপূর্ণ ছিল। অন্তত কাব্যনাটকের অন্য দুই চরিত্র সাংবাদিক ও ছেলেটির মতো নয়ই অতনুর জীবন। তবুও কেন সে অন্তহীন এক মিছিলের পথে নেমে আসে? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে— আমরা বুঝতে পারি, অতনুও আসলে একজন সৃজনশীল মানুষ। ফলে সৃজন-ব্যর্থতায় তার মধ্যেও ‘বিপন্ন-বিস্ময়’ জেগেছে। তাই স্ত্রীর ও সন্তানের ভালোবাসার টান উপেক্ষা করে অনন্তের যাত্রী হয়েছে। যে মিছিলের ভবিষ্যৎ হয়তো এক কালে অন্ধকারে ডুবে যাবে, তবুও অতনু-সমীক্ষা-খোকন প্রতিদিন মিছিলে যাবে; আর ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরবে— আবার যাবে। জীবনানন্দ দাশের নায়েকের মতোই অতনু-সমীক্ষাও চায় : ‘আমরা দু’জনে মিলে শূন্য ক’রে চলে যাবো জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার।’ জীবনানন্দ দাশের নায়ক আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর সুখ-সৌন্দর্য উপেক্ষা করেছে; কিন্তু কবিতার শেষ চরণে আবার জীবনের সকল সাধ-আহ্লাদ পূর্ণ করার কথা অথবা বলা যায়, জীবনকে পরিপূর্ণভাবে ভোগের কথাও বলেছেন। কাশীনাথ রায়ও একইভাবে তাঁর নায়ক-নায়িকার জীবনের যে চলার পথ নির্দেশ করেছেন, তা সৃষ্টিশীল। সেপথে তারা সাধারণ মানুষ হয়েও কিংবা সংসারের মায়া-মমতা বন্ধনের মধ্যেও সৃষ্টির আনন্দ খুঁজে পায়, অথবা পাবেই একদিন। যেপথে তাদের ‘অন্তর্গত বিপন্ন-বিস্ময়ে’র সমাধান খুঁজে পাওয়ার অবিরাম চেষ্টা চলবে প্রতিদিন। তাদের এই প্রচেষ্টা অনন্ত-অবিরাম, এর পরিণতি ‘জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার শূন্য করে’ যাওয়ার অব্যাহত প্রয়াস হিসেবেও গণ্য হতে পারে।

‘ডিভাইন কমেডি’ কাব্যনাটকে নাট্যকার কাশীনাথ রায় অসাধারণ দক্ষতায় নাট্যসংলাপে অবলীলায় কাব্যমাধুর্য তৈরি করেছেন। কাশীনাথ রায় মূলত কাব্যনাটকের চরিত্রগুলোর অন্তর্গত রহস্য উন্মোচনের প্রয়োজনেই কাব্যের রূপক-উপমা-প্রতীকের আশ্রয় নিয়েছেন। কেননা, একথা কাব্যনাটকের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, এখানে চরিত্রের অন্তর্গূঢ় সত্য উদ্ঘাটন করাই কাব্যনাটক রচয়িতা প্রধান দায়িত্ব। উল্লেখ্য যে, যে কথা কাব্য-ভাষায় বলা সম্ভব, তা সাহিত্যের অন্যকোনো মাধ্যমে প্রকাশ করা যায় না বলেই কাব্যনাটকের জন্ম হয়েছিল বিশ শতকের শেষার্ধ্বে। কাব্যনাটকের রচয়িতা এজন্যই কাব্যিকতার আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ‘ডিভাইন কমেডি’ কাব্যনাটকের প্রধান চরিত্র অতনুর অন্তর্গত সত্য সাধারণ নাট্যমাধ্যমে কোনোভাবেই প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না। কাশীনাথ রায় এজন্যই নাট্যসংলাপে কবিতার অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়ে ‘ডিভাইন কমেডি’ রচনা করেছেন, যা প্রকারন্তরে জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার দৃশ্যকল্প বা মঞ্চচিত্রও বটে।