ঢেউহীন এক নদী ॥ স্বপনা রেজা

অবেলায় ফোন এলে মেজাজটা বিগড়ে যায় সৌরভের। যদি আবার সেই সময়ে চোখে ঘুম থাকে। দু’বার রিং হতে ঘুম ছুটে গেল। আজকাল মানুষ টিএন্ডটির ল্যান্ড ফোন মানুষ খুব একটা ব্যবহার করে না। মোবাইল ফোনের যুগ। কতশত সুবিধা ওতে। নেট ব্যবহার করা যায়। ওপরপ্রান্তের মানুষটির চেহারা দেখা যায়। নিজের চেহারাও দেখানো যায়। পথে-ঘাটে, ঘরে, অফিসে মন চাইলে ছবি তুলে রাখা যায়। সবচাইতে বড় সুবিধা হলো গ্রাহকের সাথে সাথে পথ চলে মোবাইল ফোন। গ্রাহক বসে থাকলে সেও বসে থাকে।
হ্যালো। কে বলছেন? ঘুম ভাঙা অবস্থায় ঝরঝরা কথা বলা কঠিন। জড়ানো কিছু শব্দে সৌরভ জানতে চায় ফোনে অবেলায় তাকে স্মরণকারীর নাম।

সৌরভ বলছেন? সরাসরি জানতে চাওয়া। আগে, পিছে কোন সম্বোধন নেই। ভাব এমন, যেন সৌরভ তার অনেক পরিচিত। কিংবা কোন বড়মাপের মানুষ দয়া করে সৌরভকে খুঁজছেন।
জি বলছি।
একটু কথা ছিল আপনার সাথে। মানে কথা বলতে চাইছি। সময় দরকার।
কী বিষয়ে? কেন? কে বলছেন?
একটা প্রশ্নের জবাব আপাতত দিচ্ছি। আমার নাম সকাল। বাকি দুটো প্রশ্নের জবাব সাক্ষাতে দেব। প্রভাব বিস্তার করতে পছন্দ মনে হয় লোকটির। সৌরভের কাছে তেমন লাগে। এমন লোক অপছন্দ সৌরভের।
কেনো আমি আপনাকে সাক্ষাতের সময় দেব, তা না জানিয়ে সময় চাওয়াটা বোকামি নয় কি?
ওও। নদীর বিষয়ে কথা বলতে চাইছি। নদীর কথা কানে যেতেই সৌরভের দাঁড়িয়ে যাবার মতন অবস্থা হয়।
কী হয়েছে নদীর? নদী নামটার সাথে সৌরভের ব্যাকুলতা জড়িয়ে আছে। সকাল সম্ভবত সেটা জানে।
অস্থির হবেন না। কিছুই হয়নি নদীর। সকাল ব্যতিব্যস্ত হয় সৌরভকে আশ্বস্ত করার জন্য। একজন অপরিচিত লোক নদী সম্পর্কে কথা বলতে চায় তার সাথে, বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হয় না সৌরভের। নদী নামটা খুব যত্নে নিজের ভেতরে রেখেছে সৌরভ। সকালকে সময় দিতে হলো। কী বলবে আদতে লোকটা, তার চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নদীর নাম লোকটার মুখে। অন্তত নিজ চোখে সৌরভ তাকে দেখতে চায়। সময় দেওয়া হলো সকালকে সাক্ষাতের। আজই বিকেল পাঁচটায় ধানমন্ডির কফি হাউসে।
মোবাইল সেটের ঘড়িতে সাড়ে তিন হয়ে আছে। ঝিগাতলার রিকশার জ্যাম ছাড়িয়ে কফি হাউসে পৌঁছাতে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট লেগে যায়। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়তে হলো। বিরক্ত নয়, বরং তাড়া আছে ছুটে যাবার।

বাসা খালি। শশী গেছে বাবার বাড়ি। খুব ঘনঘন যায়। বাবা আর মাকে ঘনঘন না দেখলে তার খুব কষ্ট হয়। দিনে অন্তত একবার সেই কথা সৌরভকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সৌরভ তাৎক্ষণিক জবাব দেয়। বলে, প্লিজ ! এক্ষুনি দেখে এসো। ওমা আমি কী এক্ষুনি যেতে চাইলাম, গাল ফুলিয়ে শশী বলে। আহ্লাদে কাতর শশীকে তখন বুঝ মানাতে হয়। শশীর বড় গুণ, কিঞ্চিৎ সোহাগে তরল হয়ে যাওয়া। সন্তান না হওয়া শশীর বুকের ভেতর মোটা দাগের কষ্ট আছে। সৌরভের আরও একটা কাজ হলো, সেই কষ্টকে লাঘব করতে সহায়তা করা। যেন না ভেবে বসে সন্তান না হবার জন্য সৌরভের কোন কষ্ট আছে। হাহাকার আছে।

সূচির বয়স প্রায় চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। আজকাল গৃহকর্মীদের নামের পরিবর্তন এসেছে। আধুনিকতার ছাপ বেশ স্পষ্ট। বাঁধা-কাজের মানুষ। নরসিংদী থেকে আনা। একজন ছাত্রী সূচিকে এনে দিতে সহায়তা করেছে। শশীর অনেক আস্থা আর ভরসা সূচির ওপর। বাবার বাড়ি গেলে সংসারটা সূচির ওপর রেখে যায়। সূচিকে এক কাপ চা বানাতে বলে সৌরভ পোশাক পরিবর্তনে ব্যস্ত হয়। তাড়া থাকলে ঘড়ির কাঁটা দ্রুত হাঁটে।
কই যান? যেন শশী সূচিকে সেই দায়িত্বও দিয়ে গেছে জেনে রাখার সৌরভের গতিবিধি। এমন জবাবদিহিতা প্রথম প্রথম বিরক্তিকর লাগলেও এখন আর খারাপ লাগে না। বরং ঘড়ির কাঁটার মতন সময়কে বেশ বুঝিয়ে দেয়। কিছু সম্পর্ক আপন না হলেও আপনের মতন দাঁড়িয়ে যায়। আবার সম্পর্ক দূরে গেলে একেবারে নাই হয়ে যায়। সূচিকে দূর মনে হয় না তার দায়িত্বের কারণে। গ্রিন টি-এর হালকা সবুজ রঙের ভেতর কালো রঙের দুটো লং ছেড়ে দেওয়া। সৌরভের পছন্দ। শশী শিখিয়ে দিয়েছে হাতে ধরে। চা-এর কাপ হাতে নিয়েই জানতে চাওয়া।
একটু বাইরে কাজ আছে।
পরিষ্কার কইরা কয়ে জান। খালাম্মা জানতে চাইলে কইতে হইব। যেন আদেশ সূচির। এসব শশীর নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা। বুঝতে অসুবিধে হয় না সৌরভের। ঘরে না থাকলেও সূচিকে ঘনঘন ফোন করে খবরাখবর জেনে নেবে শশী। ম্যাপিং করে জেনে নেবার চেষ্টা করবে সৌরভের অবস্থান।
আপনাকে পরিষ্কার করে না বললে নিশ্চিত আপনার চাকুরি যাবে। ঠিক?
আমার চাকুরি আপনাদের মর্জি। ঘড়িতে সময় বেশ দ্রুত এগুতে শুরু করেছে। এত কথা সূচির সাথে বললে নদীর কথা শোনা হবে না। চায়ের কাপে অনবরত চুমুকে শেষ করতে হলো। উত্তরের অপেক্ষায় থাকা সূচি নাছোড়বান্দা। তাকে উত্তর দিয়েই যেতে হবে। নতুবা শশীর লাগাতার ফোন কল আসতে শুরু করবে সৌরভের মোবাইলে। দরজার ওপাশে গিয়ে সৌরভ বলল, ধানমন্ডি যাচ্ছি।
অফিসের কাজে? প্রশ্নটা সৌরভের পায়ের গতিকে রোধ করে। হার্ডব্রেক রীতিমতো। কী সাংঘাতিক জানতে চাওয়া সূচির। শশী কী তবে সন্দেহ করে সৌরভকে, যে-টা সে সূচির মাধ্যমে নীরবে করে চলেছে। প্রশ্নটা প্রচণ্ড ধাক্কায় মাথার ওপর জায়গা নিল। বাড়াবাড়ি হবে যদি শশী এমন নির্দেশ দিয়ে থাকে সূচিকে। বিরক্ত প্রকাশ করতে হলো সৌরভকে, আমি বাইরে যাচ্ছি। আপাতত এটাই আপনার জানা থাকুক।
ঠিক আছে। শান্তস্বরে ও ভঙিমায় মেনে নেয় সূচি। তবে খুশি নয় মোটেও। চেহারার রং হঠাৎ বদলে যাওয়ায় সেটা বেশ পরিষ্কার।

থানমন্ডির কফি হাউসের কাস্টমার কম নয়। সূচির ঝামেলার পরও যথাসময়ে পৌঁছানো গেছে। হাত-ঘড়িতে পাঁচটা বাজতে তখনও পাঁচ মিনিট বাকি। একবার সৌরভের মনে হলো, ঘড়ি ঠিক আছে তো। মনের সন্দেহ দূর করতে দু’তিন বার নাড়াচাড়া করে হাতে দিয়েছে। কিন্তু লোকটা কেমন দেখতে, জানেনা সৌরভ। কফি হাউসের ভেতর এদিক ওদিক তাকায়। জোয়ান আর বয়স্করা সমান তালে উপস্থিত। তবে প্রতিটি টেবিলে বিপরীত লিঙ্গের প্রতিনিধিত্ব আছে। অধিকার আর অভিগম্যতায় সমতা না থাকলেও হোটেল, রেস্টুরেন্টে বেশ ভারসাম্য বজায় থাকে। কাস্টমাররা বজায় রাখে। এখানে ছাড় নেই। কঠিন পরীক্ষা লোকটাকে খুঁজে বের করা। আদতে সকাল নামের লোকটা এসেছে কিনা, ঘড়ি ঠিক মতন চলছে কিনা এমন সন্দেহ উঁকি দিল। তবে তিনি নিশ্চয়ই সৌরভকে চেনেন। তিনি নিশ্চিত এগিয়ে আসবেন। একটা খালি টেবিলে বসে সৌরভ। ঘড়িতে ঘণ্টার কাঁটা পাঁচটার ঘর অতিক্রম করে সামনের দিকে হেলে পড়েছে। জ্যাম হয়তো রাস্তায়। এমন সান্ত্বনাময় চিন্তা অনেক সময় অপেক্ষাকে মধুর করে। তবে নদী প্রসঙ্গের ভেতর অস্থিরতা আছে। মোবাইলে রিং বেজে ওঠে। সকালের ফোন। ফোন রিসিভ করার সাথে সাথে একজন লোক সৌরভের কাছে এসে হাত বাড়িয়ে দেয়, হ্যালো, আমি সকাল।
জীবনের মধ্যভাগে পৌঁছে যাওয়া মানুষটার নাম সকাল, শুনলে খানিক বেমানান লাগে। তবে জন্মের পর আকিকা দেবার সময় তো জীবনের মধ্যভাগের অস্তিত্ব ছিল না। মানুষ নাম রাখবার সময় মনে রাখে না নামটা জীবনের কোন এক সময়ে বেমানান হয়ে যেতে পারে। বিশেষত যে সব নাম সময়ের স্তরকেন্দ্রিক।
হ্যালো, আমি সৌরভ। হ্যান্ডশেক করতে দু’জনই আগ্রহী ছিল। তারপর মুখোমুখি বসে। প্রথম সাক্ষাৎ বিধায় চেয়ে থাকবার বিষয়টি বেশ সময় খেয়ে ফেলে। কখনো সরাসরি, কখনোবা আড়চোখে, আড়াআড়ি।
কী বলতে চাইছিলেন? প্রশ্ন সৌরভের।
নদীর কথা। এমনভাবে সকাল নদীর নাম উচ্চারণ করল যেন নদী তার অনেক পরিচিত কেউ। কিন্ত নদীর কাছে কখনো সকাল নাম শুনেছে বলে মনে পড়ে না।
কী হয়েছে নদীর? দ্বিতীয় প্রশ্ন সৌরভের।
সে প্রশ্ন আমারও। এ পর্যন্ত এসে কফির অর্ডার দেওয়া হলো। কাজটি করল সকাল। কফির প্রতি খুব একটা আগ্রহ জন্মাল না সৌরভের। কিছুক্ষণ আগে সূচি গ্রিন টি বানিয়ে খাইয়েছে। তথাপি সৌজন্যতা। আজকের এই আকষ্মিক সাক্ষাতের মূল জায়গায় আসতে হবে। আর সেজন্য কফি পানে ব্যস্ত থাকা যায়।
নদী দুদিন হলো বাসায় নেই। পরিচিত জায়গায় খোঁজ নেওয়া হয়েছে। নেই।
পিলে চমকে দেবার মতন সংবাদ। সৌরভ অবিশ্বাস্য কথা শুনছে মনে হলো। নদীর সাথে তার শেষ কথা কবে, তার হিসেব মেলাতে শুরু করে সৌরভ। ফলাফল পাওয়া গেল শেষ কথা সপ্তাহ খানেক আগে। তাও ফোনে। কোন রকম অস্বাভাবিক কিছু ছিল না কথায়। বরাবরের মতন স্বাভাবিক কথা বলেছে নদী। সকালের কপালে চিন্তার ভাঁজগুলো একত্রিত হয়ে উঠতে শুরু করল।
নদী প্রায় আপনার কথা আমাকে বলত। আপনার গল্প করত। ভাবলাম-
কী ভাবলেন?
হয়তো তার খোঁজ আপনার কাছে আছে।
নদীর অনেক গল্প আমার কাছে আছে সত্য। কিন্তু খোঁজ না পাবার গল্পটা যে নেই। সৌরভের এমন জবাব হয়তো আশা করেনি সকাল। ছয় দশমিক সাত রেক্টর স্কেলে ভূমিকম্প হয়ে গেল সকালের ভেতর। টের পাওয়া যায়। ইট, কংক্রিটের দালান ধসে পড়ার মতন অবস্থা। ধ্বংসের শব্দ বের হয়ে আসে। চোখ যতটা বড় হবার, হলো।
তাহলে!

বিষ্ময় নয়, দুঃশ্চিন্তায় তলিয়ে যায় সৌরভ। লোকটা কে, কী সম্পর্ক নদীর সাথে সৌরভ তা জানে না। কোন কিছু জানবার আগে নদীর প্রতি সৌরভের টান প্রকাশ করা ঠিক কি না ভাবা দরকার। কিন্তু সকালের দুরবস্থায় কতটা কী জানা যাবে সেই সম্পর্কে সৌরভ শঙ্কিত। গভীর কোন সম্পর্ক হয়তো আছে। নদী কখনো টের পেতে দেয়নি, এটা ভাবলে নদীর প্রতি অবিচার হয় কি না, ভাবনায় সেটাও স্থান করে নেয়। অস্থির হয়ে মাথার চুলে অনবরত হাত চালিয়ে যাচ্ছে সকাল।
আপনি কী করে জানলেন নদী বাসায় নেই? সৌরভের প্রশ্নটা ছিল বেকুব ধরনের। সেকারণে সকাল নামের লোকটি স্প্রিং-এর মতন চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল।
অদ্ভুত ! আমি জানব না তো কে জানবে?
সরি! নদী কোন বাসা থেকে নেই?
আজব তো ভাই আপনি ! সৌরভের প্রশ্নগুলো সকালের কাছে অপ্রত্যাশিত, বেমানান। আপত্তিকরও ঠেকে। প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটে ঝুলিয়ে নেয়। সিগারেট অগ্নিসংযোগ করবার সাথে সাথে ওয়েটার কাছে এসে স্মরণ করিয়ে দেয়, সরি ! এটা নো স্মোকিং জোন! বাধা পছন্দ হয়নি সকালের। সিগারেটে অগ্নিসংযোগ ঘটাতে না পারলেও চোখ থেকে ওয়েটারের দিকে অগ্নি ছুড়ে দিল। বিড়বিড় করতে করতে আঙুল দিয়ে সিগারেট কয়েক ভাঁজ করে টিস্যুর ভেতর গুঁজে রেখে দিল। তারপর সৌরভের দিকে কামানের গোলার মতন প্রশ্ন, আপনি কী কিছুই জানেন না?
কী জানবার কথা, বলুন তো।
নদীর কথা।

জানি। কিন্তু আপনি যে নদীর কথা বলছেন, তার কথা জানি না। আপনি আপনার মতন নদীর কথা জানেন, আমি আমার মতন নদীর কথা জানি। বলুন, কী আমি জানি না।
বেকায়দায় পড়ে সকাল। সৌরভকে মনে হয় অতি চালাক। সহজে কথা বলবার মানুষ নয়। আশ্চর্য কম হচ্ছে না সকাল। যে নদীর বুকে অবিরাম স্রোতের মতন সৌরভের গল্প, সেই নদী সকালের কথা বলেনি সৌরভকে। না জানতে দেবার কারণ কী হতে পারে, অনুসন্ধানী মন অস্থির হয়ে ওঠে। খানিক চুপ থেকে উঠে দাঁড়ায় সকাল। হ্যান্ডশেক করবার জন্য হাত বাড়িয়ে বলে, সরি! আপনাকে বিরক্ত করবার জন্য!
কিন্তু নদীর কথা না বলে তো আপনি যেতে পারেন না। শক্ত আর দৃঢ়ভাবে কথাটা বলে সৌরভ। আশপাশের কাস্টমারদের দৃষ্টি এই টেবিলে এসে আছড়ে পড়ে। মানতে চাইছে না সকাল। অনর্থক আসা তার। লাভ হয়নি।
আমি নদীর খবর পেতে চেয়েছি আপনার কাছে। খবর নেই। এরপর তো আর কথা থাকতে পারে না। কাপড়চোপড় আর অভিব্যক্তিতে অর্থের দাপট বেশ।
কথা থাকতে পারে। কারণ, নদীর খবর আমার দরকার। সৌরভ অনড়। বুঝতে পারছে এক ধরনের জেদ তার শরীরমনে ভর করেছে। নদীর অমঙ্গল কিছু হয়নি তো, সৌরভ তা পরিষ্কারভাবে অনুভব করতে চায়। সকাল কণ্ঠের স্বর পাল্টে ফেলে।
আপনার সাথে নদীর কতদিনের সম্পর্ক? কুৎসিত শোনাল কথাটা। সম্পর্ক সাধারণত হয় পবিত্র। যে ধরনের সম্পর্ক হোক না কেন। তবে শুধু স্বার্থকে ভর করে যে সম্পর্ক প্রচলিত হয়, সেটাই অপবিত্র। এত ব্যাখ্যা বা তরজমা করবার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই সৌরভের। সকালকে ধরে রাখার জন্য কথা চালানো দরকার।
নদীর সাথে আমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। হিসেব এখন করা সম্ভব নয়। কী হয়েছিল নদীর। সৌরভ সরাসরি প্রশ্ন করে।
একটু কথাকাটি হয়েছিল। অভিমান করেছে মনে হয়। নিশ্চয়ই ফিরে আসবে। কী বলেন আপনি? উত্তর যেন সৌরভের জানা আছে সকালের ভাব সেরকম। আজকাল কতরকম দুর্ঘটনা ঘটে চারপাশ। তেমন অজানা আশঙ্কা বুদবুদ হয়ে উপচে পড়বার মতন অবস্থা সৌরভের।
নাও তো ফিরে আসতে পারে।

অহ্ ! আপনার কাছে তাহলে খবর আছে ! জানেন কী তেমন কিছু? কেউ ওকে মেরে ফেলেছে?
কত অবলীলায় কত সাংঘাতিক কথা বলে চলছে সকাল। নদী ফিরে আসলে কিংবা না ফিরে আসলে সকালের লাভ-ক্ষতির হিসেব করার জিদ সৌরভের ভেতর ডালপালা নিয়ে বেড়ে উঠতে শুরু করেছে।
খবর তো আপনার কাছে। বেশ শক্ত আর দৃঢ়ভাবে বলে সৌরভ। সকাল নিজেকে শান্ত করে। উত্তেজিত হলে অন্যরকম অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। মুখোমুখি বসে সৌরভের চোখে চোখ রাখে সকাল।
নদী এতটা করবে ভাবিনি। আমাকে বিপদে ফেলেছে।
সেও তো বিপদে পড়তে পারে।

আচ্ছা আপনি কেনো এতটা নেগেটিভাবে কথা বলছেন ! সকালের কথায় সন্দেহ। বন্দুকের নল সৌরভের দিকে। সৌরভের কাছে জানতে চাওয়ার কারণ হয়তো সে ধারণা করে আছে সৌরভই জানে নদীর খবর। এমন ধারণার উৎস কী শুধু নদীর কাছে সৌরভের গল্প শোনা, নাকি অন্য কিছু। সার্টের বুক পকেটে থাকা সৌরভের মোবাইলের রিং টোন বেঁজে ওঠে। শশীর ফোন। কল রিসিভ না করলে অনবরত রিং বেঁজে চলবে। আবার লাইন কেটে দিলে অনেক প্রশ্নের জন্ম নেবে। যার সব উত্তর সৌরভের জানা থাকবে না। বিড়াম্বনা সৃষ্টি হবে নির্ঘাত। নিশ্চিত সূচি শশীকে খবর দিয়ে ফেলেছে যে, সৌরভ বাইরে গেছে এবং সে জানে না কোথায় গেছে। এতে শশী অস্থিরতায় আক্রান্ত। অনবরত ফোন বেজে চলা আর রিসিভ না করার মানে অন্য দাঁড় করাতে পারে সকাল। রিসিভ করে সৌরভ শশীকে জানিয়ে দেয় সে মিটিঙে। বিশ্বাস বা অবিশ্বাস যেটাই হোক সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে নদীতে ফিরে আসে সৌরভ।
নদী কখনো অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটাতে পারে না। জোর দিয়ে বলে সৌরভ।
আমার চাইতে আপনি বেশি ভালো জানেন নদীকে। তাই তো আপনার শরণাপন্ন হওয়া। রং নম্বরের নক হয়নি নিশ্চিত। আচ্ছা নদীর মুখে আপনি আর কারোর নাম শুনেছেন কখনো?
কেমন কারো?

আপনি আর কারোর নাম জানেন, আপনি ছাড়া? সকালের চোখেমুখে সন্দেহের রেখা বেশ স্পষ্ট। সৌরভের সাথে নদীর গোপন সম্পর্কের ইঙ্গিত বেশ পরিষ্কার। এসব নিয়ে বিরক্ত বা বিব্রত হতে চাইছে না সৌরভ। কারণ, নদী। নদীর খবর জানা দরকার। কী হয়েছিল যে, নদী এভাবে নিখোঁজ হয়ে যাবে। এই মানুষটা নদীকে সরিয়ে ফেলেনি তো, এমন সংশয় কিন্তু মস্তিষ্কভরা। সেই ঘটনা চাপা দিতে নাটক করছে হয়তো। আজকাল তো কতরকম ঘটনা ঘটছে চারপাশ। সকাল চলে যাবার জন্য উসখুস করছে।
প্লিজ একটু বলবেন নদীর সাথে আপনার কী ধরনের কথা কাটাকাটি হয়েছিল। বিনয়মাখা অনুরোধ করে সৌরভ। উপেক্ষা সকালের। সার্টের ধুলো আঙুল দিয়ে টোকা মেরে ঝেরে ফেলার মতন আচরণ তার। বাধ্য নয় মোটেও সে তা বলার। উঠে দাঁড়িয়ে যায়। সৌরভের কাছে নদীর খবর নেই, এমন এক কঠিন সত্য নিয়ে তাকে ফিরে যেতে হবে। শেষ জানতে চাওয়া সৌরভের,
নদীর সাথে আপনার সম্পর্ক কী?
একই প্রশ্নের জবাব আমি আপনার কাছে চেয়েছিলাম। পাইনি। স্মরণ করিয়ে দেয় সৌরভকে সকাল। একই গোত্রের দু’জন হয়ে গেছে যেন। তফাৎ নেই। সকাল এমন কিছু বুঝিয়ে দিয়ে যেতে চাইলেও পারেনি। ইচ্ছে করেই। কারণ, সে সৌরভের চাইতে উঁচুতে অবস্থান করতে চায়। বেশ ভঙ্গিমা করে জবাব দেয়,
আমি নদীর হাজবেন্ড।
সৌরভ জানতে পারেনি নদী বিয়ে করেছে। তাই চোখ আর জায়গা মত থাকেনি। বরং কপালে উঠে গেছে। ঠিক শুনছে তো সৌরভ। বিশ্বাস করতে পারছে না যেন কেনো। মাত্র কদিন আগে কথা হলো নদীর সাথে। আর নদীর সাথে তার বয়সের পার্থক্য অনেক। কী করে সম্ভব, সেই সম্ভাবনা কিছুতেই উন্মোচিত হলো না। পরিচয় দিয়ে এক মুহূর্ত দাঁড়ায়নি সকাল। হনহন করে বেরিয়ে গেছে।

শশী বেশ ক’বার ফোন দিয়েছে। রিসিভ করেনি। সকালের কথায় রীতিমতো স্টাচু হয়ে আছে। হেঁটে চলছে না, কে যেন ধাক্কা দিয়ে সৌরভকে এগিয়ে নিচ্ছে। ধানমন্ডি থেকে হেঁটে হেঁটে বাসায় ফেরে। ভিড়-ভাট্টার মধ্যে হেঁটে যাবার বড় সুবিধা হলো, দূরত্বকে মনে আসে না। আর দিন দিন ঢাকা উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে। বারোমাসই উৎসব। কোন ধরনের অভাব বুঝবার উপায় নেই। অভাব থাকলেও তা যেন আড়াল করে রাখবার প্রতিযোগিতা। ধর্মীয় উৎসব, ঋতুকালীন উৎসব, জাতীয় উৎসব কত কী। এখন চলছে শীতের উৎসব। কেউ মরছে শীতে গরম পোশাক না পরবার অক্ষমতায়। কেউবা শীতের বাহারি পোশাক ডিজাইন নিয়ে মত্ত। যে সব এলাকায় শপিংমল জায়গা করে নিয়েছে সেসব এলাকার চিত্র অন্যরকম, রঙবেরঙের পোশাকে স্তুপ। বাতাসেও থাকে কড়া পারফিউমের গন্ধের ছড়াছড়ি। এসব অন্যসময়ে মন দিয়ে অনুভব করে কত কী ভাবার সুযোগ থাকলেও আজ নেই। নদীকে নিয়ে ভাবনার বহুদিক উন্মোচিত হয়ে যাচ্ছে। সকাল চলে যাবার পর মোবাইলে রিং দিয়ে নদীকে পেতে চেষ্টা করেছে সৌরভ। সুইচ অফ। কোথায় পাওয়া যাবে নদীর খবর, ভাবছে সৌরভ।
বাসায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করল না। রাত নেমে গেছে হাত-পা মেলে। চারপাশ অন্ধকার। একটা রিকশা ডেকে চড়ে বসে। অন্যসময় হলে দারুণ রকম দরদামের যুদ্ধ হলেও আজ শান্ত পরিস্থিতি। কায়সার থাকে ধানমন্ডি এগারোতে। শৈশবের বন্ধু সৌরভের। পেশায় সাংবাদিক। নামকরা পত্রিকায় কাজ করে। চুল সব সাদা করেছে এই পেশায়। ফোন না করে যাওয়া ঠিক নয়, ভদ্রতা রক্ষা করে না। এত কিছু ভাববার পরও যায় সৌরভ।

একুশ-শ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাট। দামি আসবাবপত্রে সজ্জিত। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার আসা। ফ্ল্যাটের উদ্বোধনীতে অন্য বন্ধুদের সাথে আসা হয়েছিল প্রথম। এপার্টমেন্টের সিকিউরিটির অনেক প্রশ্ন। এক এক করে উত্তর দিতে হলো। বাসায় ছিল কায়সার। বিশাল ড্রইংরুমে শৈশবের বন্ধুকে বরণ করে নিল। আনন্দটা বোধহয় বন্ধুকে দেখে নয়, বরং বন্ধুকে পেয়ে তার অভিজাত ঘরবাড়ি দেখাবার মাঝেই। ওয়াশরুম থেকে শুরু করে বেডরুম সব দেখাল। দেখতে হলো সৌরভকে। অন্তত যার কাছে সহায়তা পেতে আসা, তার ক্ষুধা তো নিবারণ করা দরকার আগে। একুশ-শো স্কয়ারের ফিটের বাসা ঘুরতে সময় লাগল প্রায় দশ মিনিট। প্রতিটি রুমের জন্য ছিল দেড়-দুই মিনিটের বর্ণনা। টাইলস, লাইট, ফ্যান, ইলেকট্রিক্যাল আইটেম, আসবাবপত্র ইত্যাদি কার পছন্দ, কোথা থেকে নিয়ে আসা হয়েছে এজাতীয় কথাবার্তা। কায়সারের স্ত্রীর পছন্দ আদতে সব। এক ছেলে, এক মেয়ে ওদের। ও লেভেল করার পর বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের জন্যও সাজানো ঘর রয়েছে। অবশেষে বসার সময় হলো।
সরি দোস্ত তোর ভাবি নেই। সে একটা দাওয়াতে গেছে। নইলে বলতাম রাতে খেয়ে যা।
না না । তার দরকার নেই। আমি জাস্ট তোর একটা হেল্প চাইতে এসেছি। সৌরভ আমতা আমতা করে বলে। ভ্রুজোড়া কুঁচকে যায় কায়সারের। সৌরভের হাত ধরে,
কোন সংকট? টাকা বা অন্যকিছু?
না না। টাকা নয়।
তাহলে?

সৌরভ নদীর কথা খুলে বলে। সকালের কথা বলে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক লেকচার দিচ্ছে যেন। মন দিয়ে শোনে কায়সার। শোনা নয় কেবল, বুঝতে চেষ্টা করছে সৌরভকে। কী পাবার আশায় সে এসেছে তার কাছে। সৌরভ খুব দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত নদীকে নিয়ে। নদীর খোঁজ পেতে আকুল সে। সৌরভের কথা শেষ হলে মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবে কায়সার।
শশী কী জানে নদীর কথা?
শশীর নাম উচ্চারিত হতে বিদ্যুৎ চমকায়। ভাবনার মধ্যে ঝাঁকি লাগে বেশ। অবাক হয় সৌরভ। কায়সার সকালের মতোই অন্য কিছু ভাবতে শুরু করেছে কিনা।
হঠাৎ তার কথা !
বুঝতে চাইছি তাকে নয়, তোকে। একজন ছাত্রীর প্রতি একজন শিক্ষকের এতটা ব্যাকুলতার ভিন্ন কোন মাত্রা আছে কিনা। কিংবা কোন কারণ। শ্রুতিমধুর নয় কায়সারের কথা। দুর্বলতার সব রঙ প্রেমের পোশাকে ঘুরে বেড়ায় না। আবার সব প্রেম মোহ বা কামুক হয় না। ভুল নম্বরে ডায়াল হলো কিনা, ভাবছে সৌরভ। কায়সার ভাবনার ব্যবচ্ছেদ করল।
শোন, মনে কিছু নিস না। যে-ই তোর কথা শুনুক, এক কথায় বলবে তুই তো ছাত্রীর তীব্র প্রেমে পড়েছিস। আরো অনেক কিছু ভেবে নিতে পারে। কী দরকার এসবের। তোর একটা সংসার আছে।
প্লিজ কায়সার ! এভাবে বলা ঠিক নয়। সৌরভ চলে যাওয়া উত্তম ভেবে উঠে দাঁড়ায়। কায়সার ওর হাত টেনে বসিয়ে দেয়।
তুই তো আগের মতই আছিস। সাহিত্যের ছাত্র-শিক্ষকদের আবেগ একটু বেশি হয়। বোস তো। নদীর স্বামীকে তুই চিনতি আগে কিংবা পরে?
না। আমি জানতাম না নদী বিয়ে করেছে।
আশ্চর্য !

হয়তো কারণ থাকতে পারে। আর এই বিয়ে বিষয়টির সাথে আমার সম্পর্কটা তো সম্পর্কিত নয়, তাই না? প্রয়োজন মনে করেনি হয়তো আমাকে জানানোর। সব কেনো বলতে হবে আমাকে। আমিতো মনে করিনা তার প্রয়োজন আছে। একটা সময় তো মানুষ সম্পূর্ণরূপে তার নিজের হয়ে যায়। কিংবা নিজের হয়ে থাকতে ভালোবাসে। সৌরভ বুঝতে পারছে তার গলা কেঁপে কেঁপে উঠছে। গলাটা কেমন ধরে আসছে। কান্নার মতন বিঁধে। নিজেকে সংযত করতে না পারলে কায়সার তার ভাবনায় আবার ফিরে যেতে পারে।
শোন কায়সার, নদী কী করবে না করবে, এটা তো তার ব্যাপার।
বুঝলাম। তারপর?
তারপর কী শুনতে চাইছে কায়সার। প্রশ্নটা থামিয়ে দিল সৌরভকে। কথা বেরুতে চাইছেনা। অথচ কিছু শুনবার জন্য অধীর কায়সার। এমন এক অবস্থায় শশী দু’বার ফোন করে। সৌরভ সাইলেন্ট করে রাখে মোবাইলের রিং টোন। খেয়াল করে কায়সার।
নদীকে তুই ভালোবাসিস এটাই সত্য। কায়সারের কথায় সৌরভের চোখ দিয়ে পানি ঝরে যাবার মতন অবস্থায় হয়। সামলে নেয় নিজেকে। সত্যি কথাটা বলেছে কায়সার। নদীকে সৌরভ অসম্ভব ভালোবাসে। নিঃসন্তান সৌরভ নদীর ভেতর স্নেহের আবাদ করেছে নিঃসংকোচে অনেকদিন ধরে। সত্যকে আড়াল করা যায় কী করে।
পত্রিকায় নিউজ ছাপাতে চাস?
কী নিউজ?
নদীকে পাওয়া যাচ্ছে না। নিখোঁজ সংবাদ। তখন সবাই তোর সাথে নদীর সম্পর্ক খুঁজবে, নদীর খবর নয়।
সৌরভের ফোন সাইলেন্ট করা ছিল। ভাইব্রেশন হচ্ছে অনবরত। হাতে নিয়ে মোবাইল সুইচ অফ করতে যেয়ে মনিটরের দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে। নদীর ফোন। কালবিলম্ব করে না সৌরভ। মিস হলে কুল হারিয়ে যাবে।
হ্যালো নদী ! কোথায় তুমি? তোমার মোবাইল অফ ছিল কেনো? কেমন আছো তুমি? হ্যালো! হ্যালো নদী কথা বলো !

এক নাগাড়ে অনেক কথা বললে সৌরভ। প্রতি-উত্তর আসে না। নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে আসে ভেঙে ভেঙে। আরো জোরে ব্যাকুল হয়ে কথা বলে সৌরভ। জানতে চায় নদীর অবস্থান। জানা হয় না। কায়সার সৌরভের হাত থেকে ফোন নিয়ে বুঝবার চেষ্টা করে ওপরপ্রান্তের অবস্থা। লাইন কেটে যায়। তারপর মোবাইল বন্ধ নদীর। কায়সার কিছুটা চিন্তিত।
তুই কী ওর কণ্ঠস্বর শুনতে পেলি?
না।
তাহলে?
নিঃশ্বাসের শব্দ পাচ্ছিলাম।
সিওর এটা নদীর শ্বাসের শব্দ? কায়সারের প্রশ্নের জোরালো উত্তর দেবার ক্ষমতা নেই সৌরভের। প্রশ্নটা সংশয় এনে দিল মনে। কার শ্বাসের শব্দ আদতে। কায়সার চিন্তিত সৌরভকে নিয়ে। দিনকাল ভালো না। কে কখন কাকে ফাঁসিয়ে দেয় বলা মুশকিল। অহেতুক ঝামেলা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা ভালো। কায়সার অনেক পরামর্শ দিল। মন মানে না। নদীর কোন রকম অকল্যাণ ভাবতে পারে না সৌরভ। কোন কিছুর বিনিময়েও নয়। বাসার দিকে পা বাড়াতে হলো ফলাফল শূন্য নিয়ে। দুটো পায়ের অনেক ওজন। সামনে এগুতে চায় না। অনেক কষ্টে টেনে নেওয়া। মনে হচ্ছে পুরো রাস্তাটা তার সাথেই চলছে। পথ ফুরায় না।

শশী চলে এসেছে বাসায়। দু’চোখভরা বিষ্ময়। নতুন দেখার ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে দরজার অগ্রভাগে। তার পেছন সূচি।
কখন এলে? প্রশ্ন করতে হলো। প্রতিদিন এমন অনেক সৌজন্যমূলক কথার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত হয়। মানুষ বেশ পরিপাটি আর প্রস্তুত থাকে পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করার জন্য। শশী বেশ গম্ভীরভাবে বলে,
কখন এসেছি সেটা জানানোর জন্যই ফোন দিয়েছিলাম। গলা স্বাভাবিক নয় শশীর। কথা না বাড়িয়ে পাশ কেটে ঘরে ঢোকে সৌরভ। এ কথার প্রতি-উত্তর দেবার ন্যূনতম শক্তি বা জ্ঞান তার নেই। ইচ্ছেও নেই। সূচি শশীকে খবর দিয়েছে সৌরভ কিছু না বলে বাইরে চলে গেছে। সূচির এই সংবাদই শশীকে নিয়ে এসেছে বাসায়।
রাতের খাবার টেবিলে সাজানো। নিজের হাতে গুছিয়েছে খুব অল্প সময়ের মধ্যে শশী। টেবিলে একা বসে বেশ অনেকক্ষণ। অপেক্ষা দীর্ঘতর হয় ক্রমশ। এক পর্যায়ে শশী সৌরভকে খেতে ডাকে। প্রাণ নেই ডাকে। শশীকে নদীর কথা বুঝতে না দেওয়া এবং শশীকে স্বাভাবিক রাখার জন্য সৌরভ ডাইনিং টেবিলে এসে বসে। নিজের হাতে শশী খাবার পরিবেশন করে। এত কিছু রান্না হলো কখন, কী করে, অবাক হয় সৌরভ। সৌরভ আরো অবাক হয় শশী একবারো তাকে প্রশ্ন করল না দেখে। অথচ কেনো সৌরভ তার ফোন রিসিভ করেনি, এমন প্রশ্ন শশীর স্বভাবজাত। খাবার এক পর্যায়ে শশী কথা শুরু করে।
মেয়েটা কে?
গলায় খাবার আটকে যায় সৌরভের। কার কথা জানতে চাইছে শশী। তাকিয়ে সেই উত্তর জানতে চেষ্টা করা সৌরভের। উত্তর নেই শশীর। আছে কৌতুহল আর সংশয় সীমাহীন। অন্যরকম লাগছে আজ। অল্পসময়ের মধ্যে যেন অনেক কিছু হয়ে গেলো।
বললে না কে মেয়েটা?
কার কথা জানতে চাইছ? শশী বাঁকা করে চোখ। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। বেশ করুণ দেখায়। বিবর্ণও বটে।
অনেক আছে নাকি তোমার জীবনে? প্রশ্নটা রুচিসম্মত নয়। খাওয়া মুখে ওঠা বন্ধ হয়ে যায় সৌরভের। অবিশ্বাসের জোয়ার জেগে উঠেছে। ভাটা না হওয়া পর্যন্ত স্রোতের গ্রাস থাকবে। হঠাৎ করে বিশাল আকাশটা যেন দুই চোখের সামনে চলে এলো সৌরভের। অদেখা, অজানারা জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে সম্মুখে। নিজের সরল বিশ্বাস দিয়ে দেখা জগৎটা আদতে অদেখাই ছিল বোধহয়। এমন এক অনুভূতির তলে তলিয়ে যায় সৌরভ। আর শশী উত্তরের অপেক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে। দুটো প্লেটের খাবার সবটুকু আর শেষ হতে পারে না।
আমি জানি তোমার না পাবার অনেক কষ্ট আছে। তোমাকে সন্তান দিতে পারিনি।
প্লিজ শশী !

মেয়েটা তোমাকে খুঁজেছে। বসেনি ঘরে। একটা চিঠি দিয়ে গেছে। এগিয়ে দেয় শশী। নদীর লেখা চিঠি। চিঠিটা কোনো খামে বন্দি নয়। মুক্ত হয়ে আছে। যে কেউ তার অক্ষর আর শব্দের স্পর্শ নিতে পারে। চোখের সামনে নদীর ছবি ভেসে ওঠে। নদী লিখেছে- জগতে অধিক সংখ্যক মানুষ সব সম্পর্ককেই এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দেয়। সব সম্পর্কের ভেতর শারীরিক যোগসূত্র খোঁজে। কেনো যে করে এসব। ব্যতিক্রম আছে। যারা শরীর নয়, স্পর্শ চায় অন্তরের। কঠিন হলেও সত্য এটা। তেমন দলের একজন আমি। আমি আপনাকে ভালোবাসি এবং সবচাইতে বেশি, এই কথাটা আমি বেশ জোরালোভাবে বলতে পারি। আরো একটা কথা বলি, একটা নদী থাকল আপনার, ঢেউহীন। কখনো ইচ্ছে হলে চোখ বন্ধ করে নদী দেখবেন। নদীর স্বচ্ছ জলের ভেতর মন চাইলে নিজেকে দেখবেন। কতটা শ্রদ্ধা পেলেন তা সহজেই অনুমান করতে পারবেন। ভালো থাকুন স্যার।

একবার নয়, অনেকবার পড়া হলো নদীর লেখা কথাগুলো। হঠাৎ মনে হলো শশী নেই। এঘর, ওঘর কোথাও নেই। রাতের আঁধারে শশী চলে গেছে তার বাবার বাড়ি। সূচি দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে। সৌরভ বুঝে নিল সূচির মনেও একটা গল্প দাঁড়িয়ে গেছে হয়তো।