তিনটি ওয়াকা ॥ অনুবাদ: আরশাদ উল্লাহ্‌


‘ওয়াকা’ (Waka) এবং তান্‌কা (Tanka) কবিতা নিয়ে অনেকেই বিভ্রান্তিতে পড়ে। আসলে ‘ওয়াকা’ এবং ‘তানকা’ কবিতার মাঝে কোন পার্থক্য নেই। ওয়াকা ও তানকা ৩১টি ‘অঞ্জি’ বা ‘ধ্বনি’তে লিখে একই পদ্বতিতে। অর্থাৎ ৫, ৭, ৫, ৭, ৭= ৩১ ধ্বনিযুক্ত বর্ণের ছোট পাঁচটি লাইনে। ‘ওয়াকা’ নাম ব্যবহার করা হতো জাপানের Emperor Meiji পিরিয়ডের পূর্বে (২৩ অক্টোবর, ১৮৬৮-৩০ জুলাই, ১৯১২) তারপর অনেকে ওয়াকাকে ‘তান্‌কা’ বলে। প্রকৃতপক্ষে এখন দুটো নামই ব্যবহৃত হয়। ‘হ্যাকুনিন্‌ ইসশু’ কাব্যগ্রন্থটি হাজার বৎসর পূর্বের কবিদের লেখা ওয়াকা কবিতার সংকলন। এই গ্রন্থে ছয় শতাব্দি থেকে এগার শতাব্দির বিখ্যাত কবিদের একটি করে সর্বমোট একশ ওয়াকা রয়েছে।
সেই ওয়াকা সংকলন গ্রন্থ থেকে তিনটি ওয়াকার বাংলা অনুবাদ এখানে-


সম্রাট তেনজি Emperor Tenji

সম্রাট তেনজি (জন্ম: ৬২৬, মৃত্যু: ৭ জানুয়ারি, ৬৭২) ছিলেন জাপানের ৩৮তম সম্রাট। আদিকালে জাপানের রাজ দরবারে অধিকতর কাব্য চর্চা হতো। নিম্নের ওয়াকা কবিতাটি সম্রাট তেনজির লেখা।


শরৎ ঋতুতে
শস্য কাটা জমিতে
খড়ের ডেরা
ছেঁদা গুমটি নিচে
শিশিরে ভিজা জামা

(ওয়াকাটিতে ঋতুর কথা রয়েছে। সেকালে জমির ধান কাটার মৌসুমে জমির পাশে ডেরা তৈরী করা হতো। তাতে কৃষক জমি পাহারার দেবার জন্য থাকতো। ফসল কেটে ধানগাছ বাঁশে ঝুলিয়ে শুকানো হতো। কবি এমন একটি ডেরাতে শিশির ভিজা জামা দেখে কবিতাটি লিখেছেন। অল্প কথায় প্রকৃতিকে চোখের সামনে তুলে ধরেছেন।)



অনো নো কোমাচি Ono no Komachi

অনো নো কোমাচি একজন স্বনামধন্য মহিলা কবি। তাঁর জন্ম ৮২৫ সালে এবং মৃত্যু ৯০০ সালে। তিনি শ্রেষ্ঠ ছয় জন ওয়াকা কবিদের একজন। কথিত আছে যে তিনি ছিলেন অপরূপ সুন্দরী এবং বিচক্ষণ মহিলা কবি। তিনি জাপানের প্রাচীন ছত্রিশ জন অমর কবিদের একজন।


বিবর্ণ পুস্প
নিষ্প্রভ শুষ্ক ক্ষীণ
শূন্য অন্তরে
এভাবে বেঁচে থাকা
নাগাড়ে বৃষ্টি দেখা


(কবি ফ্যাঁকাসে বিবর্ণ ফুল দেখে নিজেকে তাঁর বর্তমান অবস্থার সাথে তুলনা করেছেন। শুভ্র সতেজ ফুল ঝরে পড়ার পূর্বে তার সতেজ রূপ হারিয়ে ফেলে। তা দেখে কবি তাঁর বয়সের কথা ভাবছেন এবং তাঁর রূপ যে এখন বিবর্ণ মলিন তা বুঝতে পেরে ওয়াকাটি লিখেছেন। অবিরাম বৃষ্টিতে ফুলের পাপড়ি ঝরে পড়ছে। তা দেখে তাঁর বিষণ্ণ জীবনের কথা ভেবে বলেছেন, বাকি জীবন কি নাগাড়ে বৃষ্টি দেখেই কাটিয়ে দিবেন। ওয়াকাটিতে কবির মনের অব্যক্ত বেদনা ব্যক্ত হয়েছে।)


ইছে Ise


ইছে’র জন্ম ৮৭৫ সালে এবং মৃত্যু ৯৩৮ সালে। জাপানের ইছে প্রদেশে তাঁর জন্ম। তিনি রাজদরবারের খ্যাতনামা একজন মহিলা ওয়াকা কবি ছিলেন। একসময় তিনি প্রিন্স তাৎচুইয়োশির প্রেমিকা ছিলেন। পরে সম্রাট উদার উপপত্নি হন। তাঁদের সন্তান ছিলেন প্রিন্স ইয়ুকি আকারি। লেডি ইছে নামেও তিনি পরিচিত। তাঁর ওয়াকাগুলিতে সময়ের বিবর্তন পরিলক্ষিত হয়।


‘নানিওয়া’র ঐ
নল-টুকরোর মতো
ক্ষণিকের কথা
দেখা হবেনা কভু
আভাসে বুঝা গেল


(নানিওয়া সাগর মোহনাতে নলখাগড়া রয়েছে। সেগুলি শুকিয়ে গেলে গাঁট ভেঙ্গে অনেক ছোট ছোট টুকরা হয়। ওয়াকাতে একটি ছোট টুকরাকে স্বল্প সময়ের সাথে তুলনা করেছেন। প্রেমিকের সাথে সাক্ষাতের পরে দীর্ঘদিন তাদের সাক্ষাৎ হয়নি। তাই প্রেমিকা দীর্ঘ প্রতিক্ষার পরে প্রেমিককে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, সেই সাক্ষাতের পরে বিদায় নিয়ে চলে গিয়েছ। তখন কি আমাকে ইঙ্গিত করেছিলে যে এ জনমে দুজনের আর দেখা হবে না? )