তুচ্ছ থেকে অত্যুচ্চ শিখরে ॥ সুশীল সাহা



‘এসো এসো হে তৃষ্ণার জল,
ভেদ করো কঠিনেরে ক্রূর বক্ষতল কলকল কলকল’।
১৩২৯ বঙ্গাব্দের ৪ বৈশাখে (ইংরেজি ১৭ এপ্রিল ১৯২২) লেখা ও সুরারোপিত এই গান গীতবিতানে প্রকৃতি পর্যায়ের গ্রীষ্ম ঋতুর পর্যায়ভুক্ত। এই গানের নির্মাণ হয়েছিল শান্তিনিকেতনে নলকূপ স্থাপনের শুভসূচনার গান হিসেবে। উপলক্ষটি অতি সাধারণ, কিন্তু গানটিকে কবি নিয়ে গেলেন এক অসামান্য উচ্চতায়। এই গানেই তিনি জুড়ে দিলেন এই পংক্তিগুলো,
‘মরুদৈত্য কোন মায়াবলে
তোমারে করেছে বন্দী পাষাণশৃঙ্খলে।
ভেঙ্গে ফেলে দিয়ে কারা এসো বন্ধহীন ধারা,
এসো হে প্রবল, কলকল ছলছল’।

এই নলকূপ খননের একটি ছোট্ট ইতিহাস আছে। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন আমেরিকা যান, তখন সেখানে অখিল চক্রবর্তী নামের এক তরুণ ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। রবীন্দ্রনাথ কথাচ্ছলে তাঁকে বলেন, তিনি যেন ওখান থেকে নলকূপ খননের বিদ্যা আয়ত্ত করে আসেন। এর বেশ কিছুদিন পরে (১৯২২ সালে) তিনি দেশে ফিরে শান্তিনিকেতনেই তাঁর অধীত বিদ্যার প্রথম পরীক্ষা করতে যান। এজন্যে তিনি কোনও পারিশ্রমিক নেননি। শুধু চেয়েছিলেন আশ্রমবাসীরা যেন তাঁর সঙ্গে কাজ করেন। বীরভূমের রুক্ষ কঠিন মাটির বুক চিরে তৃষ্ণার জল নিয়ে আসার সেই অদম্য আগ্রহকে উৎসাহ প্রদানের জন্যে কবি এই গানটি রচনা করেন। যদিও তখন প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় নি। নীচের মাটি অত্যন্ত শক্ত হবার কারণে জল আনার সেই প্রচেষ্টা মাঝপথে পরিত্যক্ত হয়। কিন্তু এই অসামান্য গানটি আমরা পেয়ে গেলাম কবির কাছ থেকে। গ্রীষ্মঋতুর গান হিসেবে এর মর্যাদা অপরিসীম।

এই ঘটনার ১৪ বছর বাদে ১৯৩৬ সালে এই প্রচেষ্টা সফল হল। শান্তিদেব ঘোষ লিখেছেন, ‘দ্বিতীয়বার যখন নলকূপের জল সরবরাহের ব্যবস্থা সফল হল, সে সময় কাজের দায়িত্ব যে বাঙ্গালী ব্যবসায়ীটি গ্রহণ করেছিলেন, তাঁকে অভিনন্দিত করবার ব্যবস্থা হয়। সেই সভায় প্রায় দু-ঘন্টা পূর্বে নলকূপের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে গুরুদেব গান বেঁধে দিলেন ‘হে আকাশবিহারী নীরদবাহন জল’। এই বছর বীরভূম জেলা দারুণ খরার প্রকোপে পড়েছিল। এই গান রচনার কয়েকদিন আগেই রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে ভুবনডাঙ্গা জলাশয়ের পঙ্কোদ্ধারকর্ম সফল হয়েছে, সমবায় পদ্ধতিতে’।

উপলক্ষ্য অতি সাধারণ। কিন্তু সেই সাধারণ ঘটনাটিকেই সামনে রেখে এমন একটি গানের জন্ম দিয়ে তাকে অসাধারণ করে তুললেন কবীন্দ্র রবীন্দ্রনাথ। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধ তাঁর কয়েকটি গানের জন্মক্ষণের অতি সাধারণ বিষয়কে অবলম্বন করে তাকে অসাধারণত্বে পৌঁছে দেবার বিষয় নিয়ে কয়েকটি কথা বলার প্রয়াসমাত্র। গানের নির্মাণের নেপথ্যের কিছু ঘটনাকে সামনে রেখেই এই অভিযাত্রা। আপাততুচ্ছ বিষয়ও যে কখনও কখনও গম্ভীর কিছু ভাবনার জন্ম দেয়, তা নিয়েই এই অবলোকন। ভাবনার গভীরতা এবং মননের উচ্চতা থাকলে তুচ্ছ বিষয়ও অত্যচ্চ শিখরে আরোহন করতে পারে যে!

কবির একটি বিখ্যাত গান ‘লিখন তোমার ধূলায় হয়েছে ধূলি’। এই গানটির জন্ম ইতিহাস সম্পর্কে নির্মলকুমারী মহলানবিশ লিখেছেন, ‘গানটা যখন প্রথম কবির মুখে শুনলাম, শেখাতে গিয়ে বললেন, ‘জানো এ গানটা লেখা হল কেমন করে, ‘চাতালে বসে দেখলুম গ্রীষ্মের শুকনো হাওয়ায় লাল কাঁকরে রাস্তার উপর ফরফর করে ছেঁড়া চিঠির টুকরো উড়ে চলেছে। কেমন যেন মনের মধ্যে একটা ছবি তৈরি উঠল যে একদিন যে চিঠির কত আদর ছিল আজ তা অনাদরে পথের ধুলোর উপর উড়ে চলে যাচ্ছে।এই ছবিটাতে মন উদাস হল বলেই সঙ্গে সঙ্গে গান আপনি তৈরি হয়ে উঠেছে। মনে করলে আশ্চর্য লাগে যে কত সামান্য উপলক্ষ ধরে এক একটা কবিতা লেখা হয়েছে। (নির্মলকুমারী মহলানবিশ লিখিত রবীন্দ্রনাথের পত্রাবলীর টীকা, দেশ, ১৯ কার্তিক ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ )। এই বর্ণনা থেকেই বোঝা যায়, একটি সামান্য উপলক্ষকে কবি তাঁর কল্পনাশক্তি দিয়ে কী অসামান্য করে তুলেছেন। গানটি শুনলে যে বেদনার্ত মনের ভাব স্পষ্ট হয় তা কিন্তু ওই তুচ্ছ ঘটনার উর্ধ্বে। এক বেদনাবিধুর চিত্রকল্প কবির কলমে উঠে আসে। সুরের আবেশে মনকে বিষণ্ণ করে তোলে।

‘দুই হাতে কালের মন্দিরা যে সদাই বাজে’ রবীন্দ্রনাথের একটি অসাধারণ গান। শান্তিনিকেতনে বসে গানটি কবি লিখেছিলেন ১৯২৩ সালের ১৩ এপ্রিল। গানটি যখন গীত হয়, চোখের সামনে ভাসে সৃষ্টি স্থিতি আর প্রলয়ের এক দুর্মর ছবি। অথচ এই গানটি রচনার নেপথ্যে আছে এক বালিকার দুই হাতে মন্দিরা বাজিয়ে নাচের এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। অমিতা সেন লিখেছেন এই গানটির স্মৃতি, ‘রবীন্দ্রনাথ কাথিয়াবাড়ে গিয়ে দুই হাতে মন্দিরা বাজিয়ে মেয়েদের নাচ দেখে মুগ্ধ হন। গরবার মতো সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়েদের নাচ ছিল না এটা। খেটে খাওয়া গরিব ঘরের মেয়েরা নাচত এই নাচ। রবীন্দ্রনাথ কাথিয়াবাড় থেকে মা এবং মেয়ে দুজনকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন। মনে আছে এই মা মেয়ের মন্দিরা বাজানোর নাচ আমরা প্রথম দেখেছিলাম দ্বারিকের দক্ষিণে লেবুকুঞ্জের প্রাঙ্গনে রবীন্দ্রনাথের পাশে বসে।

রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছেতে তখন আশ্রমকন্যাদের কয়েকজন এদের কাছে বিশেষ পদ্ধতিতে মন্দিরা বাজাতে শিখে নেন। এই মন্দিরা বাজানোর রীতি একেবারে অন্যরকম। দুই হাতে দুটি মন্দিরা নিয়ে করতালের মতো আমরা গানের সঙ্গে যে ভাবে মন্দিরা বাজিয়ে থাকি একেবারেই সেভাবে বাজানো নয়। ডান হাতের বাঁ আঙ্গুলে এক এক জোড়া মন্দিরা সুন্দর করে জড়িয়ে নিয়ে, দুই হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কী সুন্দরভাবে তারা বাজাত। মাটিতে বসে দুটি হাত ঘোরাচ্ছে আর মন্দিরা মিষ্টি আওয়াজে বেজে চলেছে, সঙ্গে সঙ্গে মেয়েদের দেহের কী সুন্দর সুষমায় দোলার ভঙ্গি। আমাদের মধ্যে যাঁরা বড়, মঞ্জুদি, মিনুদি, মানসীদি, বড় অমিতা, গৌরীদি, বাবলিদি, বাসুদি, লাবুদি এবং কৃতী ঠাকুরের নববিবাহিতা পত্নী সবিতা দেবী এবং আরো কেউ কেউ ওদের কাছে ওইভাবে মন্দিরা বাজাতে শিখে নিয়েছিলেন। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ রচনা করলেন গান–
‘দুই হাত
কালের মন্দিরা যে সদাই বাজে
ডাইনে বাঁইয়ে দুই হাতে’।
(‘নৃত্যরচনায় রবীন্দ্রনাথ’; শারদীয় যুগান্তর, ১৩৮৮ বঙ্গাব্দ)

ভাবতে আশ্চর্য লাগে, কীভাবে একটি অতি সাধারণ ঘটনা জন্ম দেয় অমন একটি অসাধারণ গানের। একইভাবে আশ্চর্য হতে হয় তাঁর আরেকটি গানের ইতিকথা জেনে। গানটি হল, ‘অনেক কথা যাও যে বলে কোনও কথা না বলি’– এই গানটি তিনি লিখেছিলেন পালিতা পৌত্রী নন্দিনীর অতি শৈশবের আধো আধো স্বরে অনর্গল কথা বলার চেষ্টা দেখে। রচনাকাল ১৯২৬ সালের ৪ এপ্রিল। গানের কথা জন্ম দেয় একটি চিত্রকল্পের, যা অতি সহজবোধ্য কিন্তু তার মধ্য দিয়েই কবি বলে দিয়েছেন বিশ্ব চরাচরের মনুষ্যকুলের একে অপরের ভাষা বুঝতে না পারার চিরকালীন এক অমরগাথাকে।

অনেক অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে কবির স্বরচিত কবিতা ও গানের প্রাপ্তি ঘটেছে অনেকের। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ সুশোভন সরকার বিয়ে করেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের কন্যা রেবাকে (বাবলি)। শান্তিনিকেতনের ছাত্রী হিসেবে বাবলি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের বিশেষ স্নেহধন্যা। এঁদের বিয়ে উপলক্ষ্যে গুরুদেবের কাছ থেকে আসে দুটি কবিতা, উপহার হিসেবে। প্রথমটি বিখ্যাত গান ‘দোলে প্রেমের দোলনচাঁপা’। অপরটি কবির আরেকটি গান, ‘ফাগুনের নবীনের আনন্দে’র অন্য ভার্সান। সেটি এমন,
‘ফাগুনের নবীন আনন্দে
বাণী মোর গাঁথিলাম ছন্দে।
পথ হতে নিক তুলি
পাখির কাকলিগুলি
ভরা হোক বকুলের গন্ধে।
চলে যাক মিলনের পান্থ
দখিনের বাতাস অশান্ত।
তারি হাতে হোক লেখা
পলাশের রাঙ্গা রেখা
সুভাগিনী তোমার সীমান্তে’।

মূল গানের কাঠামোটি একেবারেই ভিন্ন। ব্যক্তিগত অংশ বদলে দিয়ে গানটিকে সর্বজনীন করে তুলেছেন কবি। এখানেই কবির শ্রেষ্ঠত্ব। তিনিই পারেন একটি ব্যক্তিগত আশীর্বাণীকে এমন সুন্দর গানে রূপান্তরিত করতে। বর্ষাঋতু নিয়ে রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য গানের একটি হল, ‘ঝরঝর বরিষে বারিধারা’। ঘোর বর্ষার অবিরাম বর্ষণের এক অপরূপ সুন্দর ছবি তিনি এঁকেছেন এই গানে। এই গানেরই দ্বিতীয় লাইন হল, ‘হায় পথবাসী, হায় গতিহীন, হায়, গৃহহারা’। এই গান প্রসঙ্গে কবি তাঁর ‘ছিন্নপত্রাবলীর পত্র ২২৯’-এ লিখেছেন, ‘তার মধ্যে এই হতভাগ্য গৃহহারা ব্যক্তিটি স্টিমারের ছাতের উপরে আপাদমস্তক ভিজে একেবারে কাদা হয়ে গিয়েছিল। … আমি কাল পরশু প্রায় মাঝে মাঝে সেই গানটা গাচ্ছিলুম। গাওয়ার দরুন বৃষ্টির ঝরঝর, বাতাসের হাহাকার, গোরাই নদীর তরঙ্গধ্বনি একটা নতুন জীবন পেয়ে উঠতে লাগল– চারিদিকে তাদের একটা ভাষা পরিস্ফুট হয়ে উঠল এবং আমিও এই ঝড়-বৃষ্টি-বাদলের সুবিশাল গীতিনাট্যের একজন প্রধান অভিনেতার মধ্যে দাঁড়িয়ে গেলুম। সঙ্গীতের মতো এমন আশ্চর্য ইন্দ্রজালবিদ্যা জগতে আর কিছুই নেই—এ এক নূতন সৃষ্টিকর্তা। আমি তো ভেবে পাইনে, সঙ্গীত একটা নূতন মায়াজগৎ সৃষ্টি করে না এই পুরাতন জগতের অন্তরতম অপরূপ নিত্যরাজ্য উদ্ঘাটিত করে দেয়। গান প্রভৃতি কতকগুলি জিনিস আছে যা মানুষকে এই কথা বলে যে, তোমরা জগতের সকল জিনিসকে যতই পরিস্কার বুদ্ধিগম্য করতে চেষ্টা করো না কেন এর আসল জিনিসটাই অনির্বচনীয় এবং তারই সঙ্গে আমাদের মর্মের মর্মান্তিক যোগ–তারই জন্যে আমাদের এত দুঃখ, এত সুখ, এত ব্যাকুলতা। (২৯.৯.১৮৯৫)

বলাবাহুল্য কবির নিজের ভাষাতেই উল্লিখিত একটি অতি সাধারণ ঘটনা কীভাবে এমন একটি গানের জন্ম দেয়। গীতবিতানের বিচিত্র পর্যায়ভুক্ত একটি গান হল, ‘জোনাকী কী সুখে ওই ডানা দুটি মেলেছ’। এই গানের কেন্দ্রে যে অর্থাৎ যাকে ঘিরে এই গান সেই ‘জোনাকী’ একটি অতি সাধারণ জীব। অন্ধকার রাতে যার বিস্তার আলোর মালায়, সেই আলো দেখেই মুগ্ধ কবি। প্রকৃতির এই সামান্য জীবটিকেই কবি এই গানে তাকে মহিমান্বিত করে তুললেন। অতি ক্ষুদ্র ওই প্রাণীটিকেও কবি দিলেন এক অসাধারণ মর্যাদা। লিখে ফেললেন এমন একটি গান। লিখলেন অনায়াসে,
‘তুমি আঁধার-বাঁধন ছাড়িয়ে ওঠ, তুমি ছোটো হয়ে নও গো ছোটো,
জগতে যত আলো সবায় আপন করে ফেলেছ’।
এইভাবেই কবি মর্যাদা দেন সকলের অবজ্ঞাত এক ছোট্ট জীবকে, যে আঁধার বাঁধন কাটিয়ে উঠে জগতের সব আলোকে আপন করে নেবার ক্ষমতা অর্জন করেছে। কবি তাকেই বলেছেন, ‘তুমি ছোট হয়ে নও গো ছোটো’। এইভাবে দেখতে পারাটাও একটা ক্ষমতা, যা রবীন্দ্রনাথের মতো একজন কবির চিত্ত ও সত্তা জুড়ে ছিল আজীবন।

১৮৯৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর কবি রচনা করেছিলেন একটি গান, যার প্রথম পংক্তি হল, ‘ওলো সই, ওলো সই’। ১৩০২ বঙ্গাব্দের ৫ বৈশাখে রচিত এই গান শুনলেই চোখের সামনে ভাসে দুই বান্ধবীর অন্তরঙ্গ আলাপনের দৃশ্য। প্রকৃতপক্ষে এই গান দু’জন বান্ধবীদের উদ্দেশ্যেই কবি রচনা করেছিলেন। চিত্তরঞ্জন দাশের বোন সে যুগের বিখ্যাত গায়িকা অমলা দাশ ছিলেন কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। শ্রীমতী দাশ ঠাকুরবাড়ির একজন নিয়মিত সদস্যাই ছিলেন। তিনি প্রায়ই জোড়াসাঁকো যেতেন। কবির লেখা অনেক গান তাঁর কাছেই শিখেছেন। রবীন্দ্রনাথ গান লেখা ও তাতে সুরারোপ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই করতেন। সুর ভুলে যাবেন বলে কাছে পিঠে যাকে পেতেন গানটা শিখিয়ে দিতেন। অমলা দাশের পরম সৌভাগ্য হয়েছিল এমন বেশ কয়েকটি গান শেখার। দাশ পরিবারের আরেক বিখ্যাত গায়িকা সাহানা দেবী তাঁর মাসিমা অমলা দাশ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘কবিপত্নীর সঙ্গেই ছিল মাসিমার সবচেয়ে বেশি ভাব। তাঁকে কাকিমা বলে ডাকতেন। এই দুই সখীর একত্র বসে অন্তরঙ্গভাবে গল্পালাপাদির একটি চিত্র রবীন্দ্রনাথের গানে, গানটি হচ্ছে, ‘ওলো সই, ওলো সই’। গানটি রবীন্দ্রনাথ নানা জায়গায় গেয়েছেন। ইতিহাসবিদ সুশোভন সরকারের স্মৃতিচারণায় তার উল্লেখ আছে। এই গান প্রসঙ্গে রবিজীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল লিখেছেন, ‘গানটির মধ্যে উভয়ের বিশ্রম্ভালাপের সকৌতুক ইঙ্গিত থাকতে পারে, কিন্তু এই সময়ে তাঁরা কলকাতাতেই ছিলেন, শিলাইদহ আসেন অনেক পরে (রবিজীবনী ৪, পৃষ্ঠা ৭৯)। এই তথ্যটির দ্বারা আমরা বুঝতে পারি দুই বান্ধবীর অনুপস্থিতির কালেও কবির মনে তাঁদের নিবিড় সখ্যের স্মৃতি তাঁর মনে জাগরূক ছিল। এই গান তাই একেবারে ব্যক্তিগত হয়েও এক অদ্ভুত নৈর্ব্যক্তিকতার জন্ম দেয়। কেননা এই গানেই তো কবি লিখেছেন,
‘আমি একা বসি সন্ধ্যা হলে আপনি ভাসি নয়নজলে,
কারণ কেহ শুধালে নীরব হয়ে রই’।
এভাবেই একেবারে ব্যক্তিগত উচ্ছ্বাস থেকে রচিত একটি গান মর্যাদা পেয়ে যায় সর্বজনীনতার, অসামান্য নৈর্ব্যক্তিকতার।

বসন্তঋতুর একটি বিখ্যাত গান, ‘আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ সুরের বাঁধনে’। যেমন কথা তেমন সুর। এই গান শ্রোতার হৃদয়ে বসন্তের এক পরম অনুভবকে জাগিয়ে দেয়। এই গানও কবি রচনা করেছেন একজন মানবীকে সামনে রেখে। তিনি আর কেউ নন, অমিতা সেন ওরফে খুকু; সে যুগের একজন বিখ্যাত গায়িকা। এ গানের প্রথম প্রকাশ ঘটে ১৯৩৯ সালের বসন্তকালে। এই গানের সঙ্গে শ্রীমতী সেনের অনুষঙ্গ প্রসঙ্গে লিখে জানিয়েছেন আরেক অমিতা সেন, অর্থাৎ ক্ষিতিমোহন সেনের কন্যা তাঁর ‘শান্তিনিকেতনে আশ্রমকন্যা’ গ্রন্থে (পৃ-২২), ‘মৃত্যুর আগে অমিতা শান্তিনিকেতনে ফিরে এসে কিছুকাল বাস করে। সেই সময় সকাল সন্ধ্যায় গুরুদেবকে সে গান শোনাতে যেত। গুরুদেব ওর গান শুনতে ভালবাসতেন। আগ্রহে ওর জন্যে অপেক্ষা করে থাকতেন। অমিতা এলেই যে-সব গান ওঁর শুনতে ইচ্ছে হত সে-সব গান ওকে ফরমাশ করতেন। অমিতা একটার পর একটা গান গেয়ে যেত।

এই সময় তিনি একদিন ‘আমি তোমার সঙ্গে’ গানটি শুনতে চান। খুকু তাঁকে গেয়ে শোনালে তিনি হেসে তাকে বললেন, কী রে, গানটা শুনে তোর কি কিছু মনে পড়ছে? উচ্চস্বরে হেসে উঠল খুকু। প্রাণখোলা হাসিই ছিল তার স্বভাব। রবীন্দ্রনাথ সেদিন বলেছিলেন, ওকে উদ্দেশ করেই আমি গানটা বেঁধেছিলাম।
সেখানে তখন যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা পরে অমিতাকে বলেছিলেন, পরম সৌভাগ্যের এমন দামি কথাটা তুমি মনের মধ্যে চেপে রাখলে? আমরা হলে উচ্চকণ্ঠে গেয়ে বেড়াতাম। উত্তরে অমিতা বলেছিল, ও কথা গুরুদেব মুখে বললেও আমি কি বুঝি না এই গানের কী গভীর অর্থ? এই গভীর অনুভূতি কি কোনো ছোট আধার ধারণ করতে পারে? ওঁর এই ভাব কোন গভীরে, কোন পরমার দিকে বয়ে যাচ্ছে, আমি তো উপলক্ষ মাত্র’। এই অনুভবই রবীন্দ্রনাথের সব গানেরই সারাৎসার। অর্থাৎ উপলক্ষ যাই হোক কেন, গান যখন সবার অন্তরে দোলা দেয়, অন্তরে জাগায় অনির্বচনীয় আনন্দ, তখন তার উপলক্ষ গৌণ হয়ে যায়। ক্ষুদ্র তুচ্ছ হয়ে যায় তা। যাকে সামনে রেখে গান রচনা করা হয়েছে, সে তখন আড়ালে পড়ে থাকে। গানের বাণী ছুঁয়ে যায় এক সার্বজনীন অনুভবে।

রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথের চতুর্থ পুত্র সুধীন্দ্রনাথের সঙ্গে চারুবালাদেবী বিয়ে উপলক্ষে রচিত হয় তাঁর বিখ্যাত গান, ‘বাজিল কাহার বীণা মধুর স্বরে’। গানের পাণ্ডুলিপির নীচে কবির স্বাক্ষরসহ লেখা আছে ‘সুধীর বিবাহদিনে’। এই তথ্য প্রশান্তকুমার পালের রবিজীবনীতে ( ৪র্থ খণ্ড, পৃ-৫) পাওয়া যায়। এই গানটি লিখে কবি নিজেই নিজের সমালোচনা করেন। তাঁর ছিন্নপত্রাবলীর ১১৫ নম্বর পত্রে তিনি লিখেছেন, ‘এক একটা গান আছে তার আস্থায়িটা বেশ, কিন্তু অন্তরাটা ফাঁকি… আস্থায়ীতে সুরের সমস্ত বক্তব্যটা সম্পূর্ণরূপে শেষ হওয়াতে কেবল নিয়মের বশে একটা অনাবশ্যক অন্তরা জুড়ে দিতে হয়। যেমন আমার ‘বাজিল কাহার বীণা মধুর স্বরে’ গানটা –তাতে সুরের কথাটা গোড়াতেই শেষ হয়ে গেছে, অথচ কবির মনের কথাটা শেষ না হওয়াতে গান যেখানে থামতে চাচ্ছে কথাকে তার চেয়ে বেশি দূরে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে’। উপলক্ষের কারণে রচিত হওয়ার জন্যে সব গান রচনায় রবীন্দ্রনাথ যে খুশি ছিলেন, তা নয়। ১৮৯৫ সালের ১ মার্চে লেখা এই চিঠিতে তার ইঙ্গিত স্পষ্ট। পারলে তিনি বাড়তি পংক্তিগুলো বাদ দিতেন, তেমন আভাস আছে এই চিঠিতে। তার মানে সব সময় অতি সাধারণ ঘটনা উচ্চমানের গানের জন্ম দিলেও কবি সব সময় নিজের কাজে সন্তুষ্ট ছিলেন না। অবশ্য এই গান আজও শ্রোতৃহৃদয়ে আলোড়ন তোলে, নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে স্রষ্টা যাইই বলেন না কেন!

উদাহরণ আর বাড়িয়ে লাভ নেই। বলার বিষয়টি ব্যক্ত করেছি রবীন্দ্রনাথেরই কয়েকটি গানের জন্মবৃত্তান্তের উৎস বিচার করে। ওই একটাই তো বলার কথা। আপাততুচ্ছ ঘটনাকে অবলম্বন করে নির্মিত তাঁর গানের যে সার্বজনীনতা তারই এক ঝলক নিয়ে আসার চেষ্টা করলাম মাত্র। উৎস যাই হোক, গানের অন্তস্থিত ভাব এবং সুরের বিন্যাসে যে তাঁর গানগুলো এত দিন ধরে মানুষের মনে আনন্দ বেদনা স্বস্তি সান্ত্বনা কিংবা উদ্দীপনার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, সেটাই সবশেষ কথা। ব্যাপারটা যতই তুচ্ছ হোক না কেন, সে অত্যুচ্চ শিখরে পৌঁছে যায় আপন অন্তরাত্মার বৈভবে।