দাম্পত্যের একাকিত্ব : সাধুগদ্যে ‘নষ্টনীড়’-এর ভিন্ন পাঠ ॥ তরুণ কুমার দত্ত



যদিও আজিকার ‘স্বামী’রা ‘নষ্টনীড়’-এর মত ১৩০৮ বঙ্গাব্দের ভুপতি নহে। ‘স্ত্রী’রা চারুলতা নহে। এমন ‘দেবর’রাও ঠিক অমল নহে। তবু…। অজস্র বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে যখন নাজেহাল ১৪২৩ বঙ্গাব্দের বাঙালি দাম্পত্য, তখন নষ্টনীড়-এর ভূপতি, চারু আর অমল-রা আসিয়া পড়িতে চাহে, বলাই বাহুল্য নিঃসঙ্গ দাম্পত্যের আলোচনায়। যদিও প্রশ্ন রহিয়াই যায়, এই একাকিত্ব কি একই সঙ্গে এক ও একাধিক প্রণয় সম্পর্ককে প্ররোচিত করে, সোসাল সাইটে বা তাহার বাহিরে? ঠিক যেমন প্রশ্ন রহিয়াই যায়, চারুলতার একাকিত্বই কি অমলের সঙ্গে তাহার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে প্ররোচিত করে? এমনও কি হইতে পাড়িত-চারু ও ভূপতির নিরবিচ্ছিন্ন দাম্পত্য ‘সঙ্গ’র আতিশয্য সম্পর্ককে সংকটগ্রস্থ করিয়া তুলিতে পারিত?

‘নষ্টনীড়’ পাঠ করিয়া এ প্রশ্নের উত্তর পাইবার সুযোগ হয় না। যদিও ভিন্নতর রবীন্দ্রপাঠে এর খানিক আভাস মেলে। রবীন্দ্র-মননে অন্যত্র পাই দম্পতির অবিচ্ছিন্ন মিলনেও একরকম ক্লান্তি আসে যা একাকিত্ব অপেক্ষাও দুঃসহ যন্ত্রণার। গায়ে গায়ে লাগিয়া থাকিলে, চোখে চোখ, হাতে হাত বা তালে তাল মিলাইয়া চলিলেই একাকিত্ব দূর হইবে এবং তাহা মধুর হইতে মধুরতর হইবে এমন যুক্তি তাহার মনে আসে নাই।

যাহাই হউক, আজকের দিনের আমাদের এই আলোচনায় একাকিত্বের সঙ্গে ‘নষ্টনীড়’ অপ্রাসঙ্গিক হইয়া পড়ে নাই। তাহার যতই ভিন্নতর ব্যাখ্যা থাকুক না কেন। নষ্টনীড়ে রহিয়াছে নৈকট্যের সেই দুর্ভেদ্য দূরত্ব যখন নরনারী নিকটতম সম্পর্কেও কথা খুঁজিয়া পায় না। এই গল্পের ঘটনাগুলি, তৎকালীন তথাকথিত ‘নবজাগরণ’-এ জাগ্রত সম্পন্ন বাঙালি পরিবারের অন্তপুরের প্রতিদিনের কাহিনী।

চারুলতা ভূপতির স্ত্রী, অমল চারুর সমবয়সী দেবর। ভূপতি সংবাদপত্র সম্পাদনায় ব্যস্ত, নিরবসর কাজের লোক। স্ত্রীর দিকে চাহিবার অবসর তাহার ছিল না, স্ত্রীর ভালবাসা যে মূল্য দিয়া কিনিতে হয়, একথা তাহার মনে কখনও জাগে নাই। তাহার একটা সাধারণ সংস্কার ছিল স্ত্রীর ওপর অধিকার কাহাকেও অর্জন করিতে হয় না, ‘স্ত্রী ধ্রুবতারার মত নিজের আলো নিয়েই জ্বালাইয়া রাখে- হাওয়ায় নেবে না, তেলের অপেক্ষা রাখে না’। এই সংস্কারের ওপর নির্ভর করিয়া ভূপতি কর্মসমুদ্রে ঝাঁপাইয়া পড়িল। এরই মধ্যে বালিকা বধু চারুলতা ধীরে ধীরে যৌবনে পদার্পণ করিল। খবরের কাগজের সম্পাদক এই মস্ত খবরটি ভালো করিয়া টের পাইল না। ‘যে সময় স্বামী স্ত্রী প্রেমোন্মেষের প্রথম অরুণালোকে পরস্পরের কাছে মহিমায় চির নূতন বলিয়া প্রতিভাত হয়, দাম্পত্যের সেই স্বর্ণপ্রতিভামণ্ডিত প্রত্যুষকাল অবচেতন অবস্থায় কখন অতীত হইয়া গেল কেহ জানিতে পারিল না। নূতনত্বের স্বাদ না পাইয়া উভয়ে উভয়ের কাছে পুরাতন পরিচিত অভ্যস্ত হইয়া গেল’। ধনীগৃহে চারুলতার কোন কর্ম ছিল না। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিধ্যবিত্ত অথবা গরিব পরিবারের মেয়েদের মত সাংসারিক ব্যস্ততা চারুর ছিল না। উনিশ শতকের শেষ সময়ে বাঙালি রমণীদের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার ঘটিয়াছে অথচ তাহার উপযোগী পরিবেশ তেমন তৈরি হয় নাই যাহাতে তাহার কর্মসংলগ্নতা একাকিত্ব ঘোচাইতে পারে। কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় অথবা তাহার মতো মহিলা সেকালীন সমাজে কমই ছিল। ‘ফলপরিণামহীন ফুলের মত পরিপূর্ণ অনাবশ্যকতার মধ্যে পরিস্ফুট হইয়া উঠাই তাহার চেষ্টাশূন্য দীর্ঘ দিনরাত্রির একমাত্র কাজ ছিল। …কাজের আবরণ ভেদ করিয়া স্বামীকে অধিকার করা চারুর পক্ষে দুরূহ হইয়াছিল’। এরূপে চারু-ভূপতির দাম্পত্যে একটি নিঃশব্দ দূরত্ব তৈরি হইতে লাগিল। ‘স্ত্রীসঙ্গের অভাবই চারুর পক্ষে অত্যন্ত শোকাবহ, সম্পাদক এইরূপ বুঝিল এবং শ্যালকজায়া মন্দাকিনীকে বাড়িতে আনিয়া সে নিশ্চিন্ত হইল’। মন্দার আগমনেও চারুর একাকিত্ব ঘুচিল না। মানসিকতায় মন্দা ছিল চারুর অনেক দূরবর্তী। তাহার সেই নিঃসীম নির্জনতা ঘোচাইতে ঝঞ্ছাবাহিত অমলের আবির্ভাব।

‘ভূপতির পিসতুতো ভাই অমল থার্ড ইয়ারে পড়িতেছি, চারুলতা তাহাকে ধরিয়া পড়া করিয়া লইত; এই কর্মটুকু আদায় করিয়া লইবার জন্য অমলের অনেক আবদার তাহাকে সহ্য করিতে হইত। …ভূপতি চারুলতার প্রতি কোনো দাবি করিত না, কিন্তু সামান্য একটু পড়াইয়া পিসতুতো ভাই অমলের দাবির অন্ত ছিল না। তাহা লইয়া চারুলতা প্রায় মাঝে মাঝে কৃত্রিম কোপ এবং বিদ্রোহ প্রকাশ করিত; কিন্তু কোনো একটা লোকের কোনো কাজে আসা এবং স্নেহের উপদ্রব সহ্য তাহার পক্ষে অত্যাবশ্যক হইয়া উঠিয়াছিল’। এমনিভাবে অমল ও চারুর মধ্যে দেবর-ভাজের একটি মধুর সম্বন্ধ গড়িয়া উঠিতে লাগিল সত্য, কিন্তু তাহার অপেক্ষা আরো বেশি সত্য হইল- অমলের সঙ্গ উপলক্ষ করিয়া চারুর যৌবন বিকশিত হইতে লাগিল। অস্বীকার করিবার উপায় নাই- যে ঘটনার পৌবাপর্ষের ভেতর দিয়া অমল ও চারুর বৎসরের পর বৎসর কাটিয়াছে, তাহাতে প্রেম-বিকাশ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, শুধু স্বাভাবিক নয়, বাস্তব জীবনে তাহা নিয়তই ঘটিয়া থাকে। অমল অপেক্ষা চারুর মধ্যে তাহারই অজান্তে ধীরে ধীরে কামগন্ধহীন এক প্রেম জাগিতে শুরু করিল। এত কাণ্ড সত্ত্বেও ভূপতির মনে যে কোনরূপ সন্দেহ দেখা দিল না তাহা ভাবিয়া অবাক হইতে হয়। ভূপতি তখনও ‘চারু ও অমলের সখিত্বে আনন্দ বোধ করিত। এই দুইজনের আড়ি ও ভাব, খেলা ও মন্ত্রণা তাহার কাছে সুমিষ্ট কৌতুকাবহ ছিল’। দাম্পত্যের বিষয়ে ভূপতির এই সংবেদনহীনতা, অনাগ্রহ শেষ পর্যন্ত তাহার স্ত্রীসহ সকল কিছু কাড়িয়া লইয়াছে।

অমল-চারুর সম্পর্ক গড়িয়া উঠিয়াছে বাগান তৈরি ও সাহিত্যচর্চা ঘিরিয়া। বাগান তৈরি হয় নাই বটে কিন্তু ক্রমশ অমলের সাহিত্য-যশোলিপ্সার গাছে ফুল ফুটিল এবং তাহার সৌরভ চারু ও অমল এই দুইজনের জগৎ অতিক্রম করিল। অমল চারুকে অতিক্রম করিল, আগে তাহার প্রতিষ্ঠা ছিল শুধু চারুর কাছে, এখন সে দশজনের প্রতিষ্ঠার মধ্যে দাঁড়াইয়া শতজনের প্রতিষ্ঠার দাবি করিল। চারু তাহাতে ব্যথিত হইল, অমল যে ক্রমশ তাহার নীড় হইতে বাহির হইয়া ডানা মেলিতেছে, ইহাতে তাহার নবজাগ্রত নারীত্বে সে আঘাত পাইল। মন্দাকিনী এতদিন অমলকে বিশেষ একটা কেহ বলিয়া মনে করে নাই। আজ তাহার স্থুল রুচি ও প্রবৃত্তি লইয়া ‘মন্দা যখন দেখিল অমল চারিদিক হইতে শ্রদ্ধা পাইতেছে তখন সেও অমলের উচ্চ মস্তকের দিকে মুখ তুলিয়া চাহিল। অমলের তরুণ মুখে নব গৌরবের গর্বোজ্জ্বল দীপ্তি মন্দার চক্ষে মোহ আনিল’। সেই মোহে অমল নিজেকে ধরা দিতে বাধ্য হইল। এ দিকে তখন চারুর মনে ঈর্ষার ছায়া ঘনাইতে আরম্ভ করিয়াছে। স্থির করিল, সেও সাহিত্য সৃষ্টি করিবে এবং অমলকে দেখাইয়া দিবে, মন্দাকিনীর চেয়ে সে অনেক বড়, অনেক বেশি কাম্য। কিন্তু হইল বিপরীত। চারুর রচনা ও অমলের রচনা পাশাপাশি রাখিয়া কাগজে যে সমালোচনা তাহাতে চারুরই জয়, সমালোচক অমলকে নিন্দাবাণে লাঞ্ছিত করিলেন। চারু ও অমলের ব্যবধান বাড়িয়াই গেল, এবং অমল ক্রমশ মন্দার দিকেই ঝুঁকিয়া পড়িল। চারুর মনে একদিকে ব্যবধানের বেদনা, আর একদিকে ঈর্ষার জ্বালা : এই দুইয়ের নিষ্পেষণে যখন তাহার সমস্ত হৃদয় মথিত ও ভরাক্রান্ত, তখন ভূপতির কর্মসমুদ্রে সংবাদপত্র তরুণী টলমল করিয়া উঠিল মন্দার স্বামী উমাপদের অসততায়। এই সব কিছুতে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হইতে পারিত। ছবিতে ওয়াশের কাজের মতো লেখক সব চড়া রঙ ধুইয়া দিয়াছেন- কেবল আভাসটুকু আছে। ফলে- প্রতিক্রিয়া যতটা তীব্র জমা হইবার কথা ভূপতির মনের গভীরতা তাহা শুষিয়া লইল। ভূপতির ভাই উমাপতি অপরাধী হইলেও নায়িকাকে তাহা কখনো জানিতে দেওয়া হইল না।

ম্লানমুখে চিন্তা ভারাতুর হৃদয়ে বহুদিন পরে ভূপতি শান্তি খুঁজিতে আসিল স্ত্রী চারুর কাছে। কিন্তু চারু তখন ‘নিজের দুঃখে সন্ধ্যাদীপ নিবাইয়া জানালার কাছে অন্ধকারে বসিয়াছিল’। ভূপতি নিরাশ হইয়া ফিরিয়া গেল। ইতিমধ্যে মন্দা স্বামীকে লইয়া বিদায় হইয়া গেল। কিছুদিনের মধ্যেই ভুপতির সংবাদপত্র-তরণীও ভরাডুবি হইল। চারু তখনও নিজের দুঃখভারে অবনত, ভূপতির বিপদের দিকে দৃষ্টি দিবার মত হৃদয়ের অবস্থা তাহার নয়। কিন্তু সে বিপদ যে কত বড় এবং সেই বিপদও দায়িত্ব মাথায় লইয়া দাদা এক অসহায়ের মতন নিঃশব্দে দাঁড়াইয়া আছেন তাহা শুধু বুঝিল অমল। এক মুহূর্তে সে তাহার নিজের দায়িত্ব সম্বন্ধে সচেতন হইল, নিজের কর্তব্যবোধে মাথা তুলিয়া জাগিয়া উঠিল এবং হয়ত বা নিজের অতীতের দায়িত্বলেশহীন জীবনযাত্রার জন্য ব্যথিতও হইল। এমন সময় সুযোগ আসিল অমলের বিবাহের এবং বিবাহের পরই শ্বশুরের খরচে বিলাত যাইবার। বিনা দ্বিধায় এবং বিনা বাক্যব্যয়ে অমল রাজী হইল এবং বিবাহের পরই বিলাত চলিয়া গেল। তাহার প্রতিজ্ঞা, মানুষ হইয়া উঠিয়া দাদার বিপদের অংশ মাথায় লইতে ইহবে। সে জানিল না, বুঝিতেও পারিল না, দাদার সুখ ও শান্তির নীড়টি ইতিমধ্যেই নষ্ট হইয়া গিয়াছে।

এদিকে চারু আশ্চর্য হইল, ব্যথিত হইল এই ভাবিয়া যে অমল এত সহজে বিবাহ করিতে রাজী হইল কী করিয়া, এত সহজে তাহাদের মধুর সম্বন্ধ ভুলিতে পারিল কী করিয়া এবং তাহাকে একটি কথাও না বলিয়া একান্তভাবে চলিয়াই বা যাইতে পারিল কী করিয়া। ‘নিজের হৃদয়-প্রাচুর্যের সহিত তুলনা করিয়া চারু অমলের শূন্য হৃদয়কে অত্যন্ত অবজ্ঞা করিতে অনেক চেষ্টা করিল, কিন্তু পারিল না। ভেতর ভেতর নিয়ত একটা বেদনার উদ্বেগ তপ্তশূলের মত তাহার অভিমানকে ঠেলিয়া ঠেলিয়া তুলিতে লাগিল’। চারু নিজে ভাবিয়াছিল, অমল চলিয়া যাওয়ার আগে তাহার এই ব্যবধান সে নিজেই ঘুচাইয়া ফেলিবে, কিন্তু ‘বিদায় দিবার সময় চারুর মুখে কোনও কথাই বাহির হইল না। সে কেবল বলিল, চিঠি লিখবে ত অমল? অমল ভূমিতে মাথা রাখিয়া প্রণাম করিল- চারু ছুটিয়া গিয়া শয়নঘরে দ্বার বন্ধ করিয়া দিল। …যেমন গুরুতর আঘাতে স্নায়ু অবশ হইয়া যায় এবং প্রথমটা বেদনা টের পাওয়া যায় না, সেইরূপ বিচ্ছেদের আরম্ভকালে অমলের অভাব চারু ভাল করিয়া যেন উপলব্ধি করিতে পারে নাই’। তা কেবল দেবর-ভাজ সম্বন্ধ ছিন্নের যন্ত্রণা বলিয়াই মনে হইয়াছিল।

ভাবের ঘরে এই চুরি তাহার কাছে ধরা পড়িল অকস্মাৎ, বিচ্ছেদের অব্যাহিত পরেই। তারপর আরম্ভ হইল দিনের পর দিন নীরব ক্রন্দন। ‘অবশেষে যতই দিন যাইতে লাগিল ততই অমলের অভাবে সাংসারিক শূন্যতার পরিমাপ ক্রমাগতই যেন বাড়িতে লাগিল। নিকুঞ্জবন হইতে বাহির হইয়া সে হঠাৎ যেন কোন মরুভূমির মধ্যে আসিয়া পড়িয়াছে- দিনের পর দিন যাইতেছে, মরুপ্রান্তর ক্রমাগতই বাড়িয়া চলিয়াছে। এ মরুভূমির কথা সে কিছুই জানিত না’।

…‘অবশেষে চারু একেবারে হাল ছাড়িয়া দিল- নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করায় ক্লান্ত হইল- হার মানিয়া নিজের অবস্থাকে অবিরোধে গ্রহণ করিল। অমলের স্মৃতিকে যত্নপূর্বক হৃদয়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করিয়া লইল। ক্রমে এমনি হইয়া উঠিল, একাগ্রচিত্তে অমলের ধ্যান তাহার গোপন পর্বের বিষয় হইল- সেই স্মৃতিই যেন তাহার জীবনে শ্রেষ্ঠ গৌরব’। চারুর এইরূপ অবস্থা হইল কেন? আসলে স্বামী নামক প্রাতিষ্ঠানিক বিগ্রহ বা আইডিয়ালটিকে যত্ন, সেবা, শ্রদ্ধা ও পূজা সেই সময় স্ত্রীর মনে ছোটবেলা হইতে শিখাইয়া, পড়াইয়া গাঁথিয়া দেওয়া হইত। দম্পত্য প্রেম তখনও সমাজ ভাল চোখে দেখিতে শুরু করে নাই। চারুর কর্মহীন নিরবচ্ছিন্ন অবসরের দিনগুলিতে দাম্পত্য প্রেমের অভাব এমন সুতীব্র হইয়া ছিল যে অমলের সহিত কৌতুক-কলহ প্রীতির সম্পর্ক- সহজ মধুর সম্পর্ক এমন প্রেমের পর্যায়ে চলিয়া গিয়াছিল বলিয়াই অমলের বিচ্ছেদ চারুর জীবনকে এমন মর্মান্তিক নিঃসঙ্গ করিয়া দিয়াছিল। চারুর নিঃসঙ্গ দিন যাপনের ছবি লেখক এমনভাবে বর্ণনা করিলেন যাহাতে মনে হয় স্বচক্ষে দেখাকেও তাহা অতিক্রম করিয়া যায়।

‘গৃহকার্যের অবকাশে একটা সময় সে নিদিষ্ট করিয়া লইল। সেই সময় নির্জনে গৃহদ্বার রুদ্ধ করিয়া তন্ন তন্ন করিয়া অমলের সহিত তাহার নিজ জীবনের প্রত্যেক ঘটনা চিন্তা করত। উপুড় হইয়া পড়িয়া বালিশের উপর মুখ রাখিয়া বারবার করিয়া বলিত-অমল, অমল, অমল / সমুদ্র পার হইয়া শব্দ আসিত-বৌঠান, কী বৌঠান/ চারু সিক্ত চক্ষু মুদ্রিত করিয়া বলিত- অমল, তুমি রাগ করিয়া চলিয়া গেলে কেন? আমি তো কোন দোষ করি নাই/ তুমি যদি ভাল মুখে বিদায় লইয়া যাইতে তাহা হইলে বোধহয় আমি এত দুঃখ পাইতাম না। অমল সম্মুখে থাকিলে যেমন কথা হইত, চারু ঠিক তেমনি করিয়া কথাগুলি উচ্চারণ করিয়া বলিত, অমল, তোমাকে আমি একদিনও ভুলি নাই। একদিনও না, একদণ্ডও না। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পদার্থ সমস্ত তুমিই ফুটাইয়াছ, আমার জীবনের সারভাগ দিয়া প্রতিদিন তোমার পূজা করিব’।

‘এইরূপে চারু তাহার সমস্ত ঘরকন্না তাহার সমস্ত কর্তব্যের অন্তঃপুরের তলদেশে সুড়ঙ্গ খনন করিয়া সেই নিরালোক নিস্তব্ধ অন্ধকারের মধ্যে অশ্রুমালা সজ্জিত একটি গোপন শোকের মন্দির নির্মাণ করিয়া রাখিল। সেখানে তাহার স্বামীর বা পৃথিবীর আর কাহারও কোনও অধিকার রহিল না। …তাহারই দ্বারে সে সংসারের সমস্ত ছদ্মবেশ পরিত্যাগ করিয়া নিজের অনাবৃত আত্মস্বরূপে প্রবেশ করে এবং সেখানে হইতে বাহির হইয়া মুখোশখানা আবার মুখে দিয়া পৃথিবীর হাস্যালাপ ও ক্রিয়াকর্মের বঙ্গভূমির মধ্যে আসিয়া উপস্থিত হয়’।

চারুর ভেতর ও বাহিরে, অন্তরে অন্তরে হৃদয় জুড়িয়া অমল রহিয়া গেল। চারু-ভূপতির দাম্পত্যের শীতলতার মধ্য দিয়া চারুর মধ্যে যে গভীর নিঃসঙ্গতার সৃষ্টি হইয়াছিল সেই নিসঙ্গত চারুর জীবনে আবার অন্যভাবে ফিরিয়া আসিল। নির্জনতার, নিঃসঙ্গতার সহস্র হস্ত গভীর গহ্বরের মধ্যে চারু পা বাড়াইল। প্রশ্ন- অমল চারুর শূন্যতাকে কী- এমন ভাবে পূর্ণ করিতে চাহিয়াছিল যে তাহার বিচ্ছেদে চারুলতা একেবারেই বিপর্যস্ত হইয়া পড়িল? আসলে অমল চারুর কোন শূন্যতাকেই- কোন নিঃসঙ্গতাকেই পূরণ করে নাই বরং তাহার একাকিত্বকে আরো গভীরভাবে জাগাইয়া তুলিয়াছে। আমলের সাহচর্য তাহার মেধা, মনন ও কল্পনাকে বাড়াইয়া তাহার মধ্যে অতিরোমান্টিকতার সৃষ্টি করিয়াছিল।

যাইহোক চারু নিজের মনের গভীরে যে গোপনে শশাকের মন্দির গড়িল তাহাও চারুকে সত্যি কতটুকু শান্তি দিতে পারিল? লেখক বলিলেন- ‘চারু তাহার বৃহৎ বিষাদের মধ্যে একপ্রকার শান্তিলাভ করিল এবং একনিষ্ট হইয়া স্বামীকে ভক্তি ও যত্ন করিতে লাগিল। ভূপতি যখন নিদ্রিত থাকিত চারু তখন ধীরে ধীরে তাহার পায়ের কাছে মাথা রাখিয়া পায়ের ধুলা সীমান্তে তুলিয়া লইত। সেবাশুশ্রুষায় গৃহকর্মে স্বামীর লেশমাত্র ইচ্ছা সে অসম্পূর্ণ রাখিত না। …সমস্ত কাজকর্ম সারিয়া ভূপতির উচ্ছিষ্ট প্রসাদ খাইয়া চারুর দিন শেষ হইয়া যাইত’। কিন্তু বৃথাই চারুর চেষ্টা, বৃথাই এই সাধন-যোগ। দাম্পত্য প্রেমের মধ্যে তো আর যত্ন-ভক্তি-শ্রদ্ধা-পূজা এইসব নাই। চারু যেন ভক্তি পূজা, আরাধনা দ্বারাই দাম্পত্যকে বাঁচাইয়া রাখিতে চাহিল। তাহাতে তো দাম্পত্য প্রেম বাঁচে না, এমনকি টিকিয়া থাকাই ভীষণ দায়। আবার মনে হয়। চারু যেন হৃদয় আর দাম্পত্য-‘কর্তব্য’কে পৃথক করিয়া বাঁচাইতে চাহিয়াছিল। এমন এক তীব্র অন্তদ্বন্দ্বের মাঝে পড়িয়া চারু স্বামী, সংসার, সুখ সবই হারাইয়া বসিল।

শেষে তবে ভূপতির কথায় আসি একটু কাছ হইতে। ভূপতি একবার মনে মনে কহিল কাগজখানা গিয়া এবং অনেক দুঃখ পাইয়া এতদিন পরে আমি আমার স্ত্রীকে আবিষ্কার করিতে পারিয়াছি। ভূপতি চারুর কাছে স্বীকার করিল ‘আমি সর্বদা তোমার কাছে আসতে পারি নে চারু, সে জন্য আমি অপরাধী, কিন্তু আর হবে না। এখন থেকে দিনরাত কাগজ নিয়ে থাকব না। আমাকে তুমি যতটা চাও ততটাই পাবে’। ভূপতির আর একটি অনুভবে দাম্পত্য জীবনের আর একটি মনোস্তাত্বিক দিক উন্মোচিত হয়। ভূপতির উপলব্ধি ‘বারো বৎসর কেবল খবরের কাগজে লিখিয়া স্ত্রীর সঙ্গে কি করিয়া গল্প করিতে হয় সে বিদ্যা একেবারে খোয়াইয়াছি’। স্ত্রীকে লইয়া গল্প করা ভূপতি খুব সহজ মনে করিয়াছিল। কার্যত সে বুঝিল সভাস্থলে বক্তৃতা করা ইহার চেয়ে সহজ। চারুর দাম্পত্য প্রেম পাইতে ভূপতি শেষে জগৎ সংসারের আর সমস্ত ছাড়িয়া একমাত্র চারুর নিকট হইতে তাহার জীবনের সমস্ত আনন্দ আকর্ষণ করিয়া লইতে চেষ্টা করিয়াছে। এই একাগ্র চেষ্টা দেখিয়া ও নিজের অন্তরের দৈন্য উপলব্ধি করিয়া চারু ভীত হইয়া পড়িয়াছিল। ভূপতির কী চাই, কী হইলে সে তৃপ্ত হয় তাহা চারু ঠিকমত জানে না এবং জানলেও তাহা চারুর পক্ষে সহজে আয়ত্তগম্য নহে। ভূপতি চারুর হৃদয় জয় করিতে চাহিয়াছিল- কিন্তু শুধু স্বামীত্বে নির্ভর করে নাই। এমনকি চারুকে তুষ্ট করিতে সাহিতা চর্চা করিয়াছে, তাহার পক্ষে যা ছিল প্রাণান্তকর। লেখকের মনে হইয়াছে- ‘ভূপতি যদি অল্পে অল্পে অগ্রসর হইত তবে চারুর পক্ষে হয়তো এত কঠিন হইত না। কিন্তু হঠাৎ একরাতে দেউলিয়া হইয়া রিক্ত ভিক্ষাপাত্র পাড়িয়া বসাতে সে যেন বিব্রত হইয়াছে’। প্রথমে না হইলেও ধীরে ধীরে চারু-অমলের সম্পর্ক বিষয়ে ভূপতির মনের গহনে একটু একটু করিয়া প্রশ্ন আর সংশয় জমিতেছিল। অমলের খবর নিতে চারুর প্রিপেড টেলিগ্রাম- একটি ছোট ধাক্কা, কিন্তু ফল ছিল প্রবল। পূর্বের প্রতিটি ঘটনা চারু-অমলের কথা মান-অভিমান বিদ্যুৎ-চমকের মত সম্পূর্ণ অন্য তাৎপর্যে ভূপতির কাছে ধরা দিল। প্রতারিত স্বামী নিজের স্বাভাবিক প্রীতি-প্রবণতা বর্জন করিয়া শুধু স্ত্রীর মন পাইবার জন্য সাহিত্য রচনার পরধর্ম বরণ করিয়াছিল। সেই লজ্জা তাহাকে চাবুক মারিতে লাগিল। এটি ভূপতির শান্ত সংযত প্রকৃতির দিক হইতে অনেকটা অসংগত কলিয়াই ইহার শুরুর আরো বেশি। কিন্তু এই যন্ত্রণার বিক্ষুব্ধ প্রকাশের চাইতেও ভূপতির দিক হইতে আরও গুরুত্বপূর্ণ, অন্য পুরুষে অর্পিতচিত্ত চারুর সম্পর্কে গভীর মমতায় নিজের হৃদয়াবেগের উর্ধ্বে ওঠার চেষ্টা।

স্ত্রীকে অসতী বলিয়া ঘৃণা করিতে পারিলে সে বাঁচিয়া যাইত। কিন্তু তাহার শিক্ষাদীক্ষা, নবযুগের উদারচিত্ত মানবিকতা, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর মমতা, ব্যক্তিস্বভাবের শান্ত সংযম ও স্বল্পবেগ বিচারপ্রবণতা এবং সর্বোপরি চারুর প্রতি সদ্য বিকশিত যৌবন প্রণয় তাহার মনে মিশ্র অনুভূতির বহু সংখ্যক সূতীক্ষ্ম সূচীমুখ বিদ্ধ করিতে লাগল। ভূপতির ভাবনা ব্যাখ্যা করিয়া লেখক বলিলেন- ‘তখন আপনার জীবনকে চারুর জীবন হইতে দূরে সরাইয়া লইয়া- ডাক্তার যেমন সাংঘাতিক ব্যাধিগ্রস্ত রোগীকে দেখে, ভূপতি তেমন করিয়া নিঃসম্পর্ক লোকের মত চারুকে দূর হইতে দেখিল। ঐ একটি ক্ষীণশক্তি নারীর হৃদয় কী প্রবল সংসারের দ্বারা চারিদিক আক্রান্ত হইয়াছে। এমন লোক নাই যাহার কাছে সকল কথা ব্যক্ত করিতে পারে, এমন কথা নহে যাহা ব্যক্ত করা যায়, এমন স্থান নাই যেখানে সমস্ত হৃদয় উদঘাটিত করিয়া দিয়া সে হাহাকার করিয়া উঠিতে পারে-’

প্রথম বাক্যে লেখক যে নিরাসক্ত বিচারের কথা বলিয়ছেন তা স্থপতিকে একটা অননা সাধারণ ব্যক্তিত্ব দিয়েছে, কিন্তু আরও বড় কথা পরের বাক্যগুলিতে রহিয়াছে। চারু সম্পর্কে ঐ উপলব্ধি যে মানস দূরত্বের ফল তাহার কারণ নববিকশিত প্রেম, -যে প্রেমিক সে হইয়া উঠিয়াছিল চারু অন্য পুরুষের ভালোবাসায় পুষ্পিত হইয়া উঠিবার পর। চারুর নীরব হাহাকারে সে নিচ চিত্তকে মিলাইয়া দিয়াছে। এই দূরে সরাইয়া লইয়া… দেখিবার মধ্যে গৃঢ়ভাবে নিজেকে মিলাইয়া একান্ত করিয়া দেওয়া আছে।

এই প্রেম, এই একাত্মতা এবং দুর্ভেদ্য দূরধিগম্য দূরত্ব-দুই-ই সত্য। তাই ভূপতি চারুর কাছ হইতে, নিজের কাছ হইতে পালাইতে চাহিয়াছে মহীশূরে, আবার শেষ মুহূর্তে তাহাকে সঙ্গে লইতে চাহিয়াছে। সরল ভূপতি মমতায় বিরূপতায়, প্রশান্তিতে অধীরতায় জড়াইয়া এক জটিল মানুষে পরিণত হইয়াছে। সবশেষে যদিও ভূপতি সমস্ত বুদ্ধি ও চৈতন্য দিয়া বুঝিল তাহার নীড় নষ্ট হইয়া গিয়াছে, আর তাহ জোড়া লাগিবে না। সংসার তাহার কাজে একেবারে শুষ্ক জীর্ণ হইয়া গেল। চারুরও বুঝিল নষ্টনীড় আবার গড়িয়া তোলার চেষ্টা বৃথা। চারু ও ভূপতি এই দুই হৃদয়ে হৃদয়নাথ একটি আসন পাওয়া আর বসিতে পারিলেন না। কল্যাণ করিয়া মঙ্গলডোরে দোহার হাত বাধা হইলনা। দাম্পত্যের এই ধু-ধু একাকিত্বে কাহার কতটুকু দায় তাহা লেখক দেখাইয়াছেন। ঘটনার ফাঁকে ফাঁকে দাম্পত্যকে ঘিরে সাহিত্যিক ভাষায় এক গভীর মনোবিশ্লেষণ উপস্থিত করিয়াছেন তিনি। লেখকের উপলব্ধিকে আমাদের চেতনার রঙে রাঙাইয়া মনের গভীরে হৃদয় জুড়িয়া স্থান দিতেই এই প্রবন্ধের প্রয়াস।

শেষেরও শেষে একটি বড়সড় ‘কিন্তু’ রহিয়া গেল। সেই ‘কিন্তু’টি হইল রবীন্দ্রনাথ তাহার ‘নষ্টনীড়’-এ ‘সেই সময়ে’ দাঁড়াইও স্বামী-স্ত্রী ব্যতীত খান দুই চরিত্র উপস্থিত করিয়াছেন। যাহা সেই সময়ে মোটেও সচরাচর নয় বরং ‘এই সময়ে’ খুবই সচরাচর। তবে কি তিনি একশো বছর পরে গড়িয়া ওঠা তথাকথিত নিউক্লিয়ার পরিবারকে মানসচক্ষে অবলোকন করিয়াছিলেন? যদি নাও করিয়া থাকেন এমনটা মনে করিতে অসুবিধা কিসে- একশ বছর পরে।