দীপ্র তপন : পাঠকের চোখে ॥ মারজানা সাবিহা শুচি



‘যুদ্ধে যাওয়ার আগে, যখন আমি তাকে যেতে দিতে চাইনি, সে বলেছিল, ‘আম্মা, পাকিস্তানী বাহিনী অন্যায় করছে। এই অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতেই হবে। সেদিন তার চোখে- মুখে প্রতিশোধের যে আগুন ঝরে পড়ছিল, হানাদারদের বিরুদ্ধে যে আক্রোশ, ঘৃণা ফুটে উঠেছিল তা দেখে তাকে বাধা দেওয়ার শক্তি আমার আর ছিল না’- কথাগুলো একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মায়ের। এই একটি কথাতেই বোঝা যায় দেশের জন্যে যারা আত্মদান করতে পারেন তাদের কতটা অদম্য মনোবল আর অপরিসীম দেশপ্রেম থাকে।
শহিদ মুক্তিযোদ্ধা বদিউল আলম তপন ছিলেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম গেরিলাদলের এক বীরযোদ্ধা।

ক্র্যাক প্লাটুন- এই নামটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সমীহের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। এই দলের গেরিলা-যোদ্ধারা অসীম সাহসের সঙ্গে অপারেশন পরিচালনা করতেন ঢাকা শহরে। যেসব অপারেশনের বীরত্বগাঁথা ছড়িয়ে পড়েছিল সবখানে। এই দলেরই অন্যতম দুঃসাহসিক মুক্তিযোদ্ধা বদিউল আলম তপন, যার বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতা সহযোদ্ধারা সব সময়েই স্মরণ করেছেন অসীম শ্রদ্ধায়।
শহিদ বদিউল আলমকে ঘিরে তাঁর নিকট-আত্মীয়, বন্ধু, সহপাঠী এবং অবশ্যই সহযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ, কিছু আলোকচিত্র, কিছু কবিতা নিয়ে সাজানো সমৃদ্ধ স্মারকগ্রন্থ ‘দীপ্র তপন’।

এই স্মারকগ্রন্থের লেখাগুলোকে কয়েকটি ভাগে সাজানো হয়েছে।
প্রথম অংশ স্মৃতিকথা : অগ্নি আঁচে। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বদিউল আলমের আত্মপ্রকাশ, তার ভূমিকা, সাহসিকতা, বিভিন্ন অপারেশন, ধরা পড়া, যুদ্ধদিনের নানা স্মৃতিতে সাজানো এই অংশ। দারুণ তথ্যসমৃদ্ধ সকল লেখা। যেমন, শহিদ বদিউল আলমের বন্ধু, ক্যাডেট ও মুক্তিযোদ্ধা কাজী মোহাম্মদ আলী আনোয়ার এর বর্ণনায় জানতে পারি, কোন রকম আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না নিয়েই বদিউল আলম দুর্ধর্ষ যোদ্ধা হয়ে উঠেছিলেন। তার বেপরোয়া মনোভাব ও দুর্দান্ত সাহসের জন্যেই এটা সম্ভব হয়েছিল।
এসব লেখা দিয়ে শুধু আমরা শহিদ বদিউল আলমকেই জানি তা নয়, আসলে এর মধ্যে দিয়ে আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকেই ভালভাবে জানতে পারি। যুদ্ধের দিনগুলিকে আরেকটু নিবিড়ভাবে অবলোকন করতে পারি।
মুক্তিযোদ্ধা আবুল বারাক আলভী তার স্মৃতিচারণে লিখেছেন, পাকবাহিনী তাকে গ্রেফতারের পর শহিদ বদিউল আলমের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল বন্দীশালায়, আরো অনেকের সঙ্গে, যদিও কথা বলার কোন সুযোগ হয়নি। সবার চেহারায় ছিল নির্যাতনের প্রচণ্ড ছাপ। এখানেই বদিউল আলমকে শেষবারের মত দেখা যায়। তারপরে আর কোনদিন কেউ তাকে দেখেনি।
মুক্তিযোদ্ধা মামুন-অর-রশিদ তার স্মৃতিচারণে লিখেছেন, শহিদ বদির শেষ দিনগুলির কথা। মেরে ফেলার আগে শহিদ বদিউল আলমের জন্য নিয়ে আসা হয় পোলাও-মাংস-আইসক্রিম এইসব বিশেষ খাবার। যা ছিল মৃত্যুর আগাম বার্তা। কী নির্দয় মানসিকতা ছিল পাকসেনাদের তাও বোঝা যায়। বদিউল আলম অবশ্য সেই খাবার খাননি। এরপর তাকে নিয়ে চলে যাওয়া হয়, সেই ঘরে আর কখনো তিনি ফিরে আসেননি।
বইটির দ্বিতীয় অংশে আছে শহিদ বদিউল আলমের পরিবারের সদস্য, নিকট আত্মীয় এবং বন্ধুদের স্মৃতিচারণ। এই অংশের নাম স্মৃতিকথা : শোক-সমুদ্রে। বদির শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যের দিনগুলি, পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক, তার ছাত্রজীবন, রাজনৈতিক জীবন–অনেক কিছু জানা যায় লেখাগুলো পড়লে। কিভাবে একজন যুবক, যার সামনে সোনালী ভবিষ্যতের হাতছানি ছিল-সে অদম্য এক মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তুচ্ছ করলো নিজের জীবন। আমরা জানতে পারি শহিদ বদির জীবনের নানা দিক। এ অধ্যায়ে লিখেছেন শহিদ বদির ভাই-বোন, খালা, মামা এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ট বন্ধুরা। তাদের লেখায় আমরা পরোপকারী, কখনো অন্যায় মেনে না নেওয়া, পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল, আবার প্রতিবাদী, একরোখা তেজী এক যুবককে চিনতে পারি। শহিদ বদির মামা খালেদ আহমাদ খানের লেখায় জানা যায় মুক্তিযুদ্ধের সময় তপন তার সহযোদ্ধাদের নিয়ে প্রায়ই জাওয়ার গ্রামের এই মামাদের বাড়িতে আসতেন। কখনো একাই আসতেন। নানী বলতেন, খাওয়া দাওয়া ঠিকমতো করতে। তপন বলতেন- ‘নানু দোয়া করবেন- অপারেশনের কাজ আগে- তারপর খাবার। স্বাধীনতার চিন্তা, অপারেশনের চিন্তায় খাবারের কথা মনে থাকে না’। কতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা, স্বাধীনতার জন্য কী অপরিসীম ক্ষুধা ছিল তাদের মনে, পেটের ক্ষুধা সেখানে ম্লান হয়ে গিয়েছিল। এমন সব সংগ্রামী যোদ্ধারা ছিলেন বলেই তো আমরা মাত্র নয় মাসে অর্জন করতে পেরেছিলাম এদেশের স্বাধীনতা।

বইটির তৃতীয় অংশের নাম ইতিহাস-নির্মাতারা : সোনার আখরে। এখানে বিভিন্নজনের লেখা, বই বা পত্রিকা থেকে সংকলিত বেশ কিছু প্রতিবেদন রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা বদিউল আলমের অংশ নেওয়া বিভিন্ন অপারেশনের বিবরণ। যেমন সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের মেয়েকে উদ্ধার, অপারেশন জর্দার টিন, ফার্মগেট চেকপয়েন্ট, সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন রেকি এসব অপারেশনের বিস্তারিত বর্ণনা পাই এখানে। স্বপন, কাজী, রুমী, আলম-এইসব অসম সাহসী বীরমুক্তিযোদ্ধারাও অংশ নিয়েছিলেন এসব অপারেশনে। তাদের কথাও এখানে আমরা পাই। গেরিলাদল কতটা দুঃসাহসী এবং দুর্দম ছিলেন তা আমরা জানতে পারি এসব বিবরণ পড়ে। দেশের প্রথম গেরিলাদলের ছবি, অপারেশনের ম্যাপও আছে এই অংশে।
এর পরের অংশ আলোচনা : অনির্বাণ। শহিদ বদিকে নিয়ে আলোচনা করেছেন বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ যারা হয়ত তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না বা দেখেননি কখনো।
অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ার সময়ই তপন একটি ম্যাগাজিন বের করেন, যার নাম দ্য ওয়ার্ল্ড ফ্রম ক্রেজি অ্যাঙ্গেলস। এই ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ এবং তপনের লেখা বিভিন্ন ইংরেজি গল্প এবং প্রবন্ধ দিয়ে সাজানো হয়েছে বইটির পরবর্তী অংশ, কীর্তিমানের সৃষ্টিশীলতা। তার বিবিধ বিষয়ে জ্ঞান, ইংরেজি ভাষার উপর দখল, সৃজনশীলতা ফুটে উঠেছে এসব লেখায়।
বিভিন্নজনের আলোচনায় তপনের জীবনের নানা ঘটনা নানা পর্যায়ের উপর আলোকপাত করা হলেও বইতে সংক্ষিপ্তভাবে আবারো তার জীবনবৃত্তান্ত সংযুক্ত করা হয়েছে। স্মৃতির জানালায়, যখন পড়বেনা মোর পায়ের চিহ্ন এবং তপনালোকে- এই অংশগুলোতে রাখা হয়েছে তপনের পরিবার ও নানা বয়সের ছবি, তার নিজের হাতের লেখা, তার স্মৃতিবিজড়িত নানা স্থানের ছবি, তার লেখা চিঠি, পোস্টকার্ড ও সংগৃহীত বইয়ের ছবি, সম্মাননা ও প্রকাশনার ছবি।। এছাড়াও বইটিতে আছে শহীদ তপনকে নিয়ে লেখা কয়েকটি কবিতা। সব মিলিয়ে সংগ্রহে রাখার মত একটি বই। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে জানার মধ্য দিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধকে আরো বিশদভাবে জানতে পারছি, সেই সময়টাকে জানতে পারছি নানান চোখে নানান দিক থেকে, এটাও বড় পাওয়া।
বইয়ের শুরুতেই দেওয়া একটা উদ্ধৃতি দিয়ে আলোচনাটি শেষ করি।
‘বাবা, যদি ধরা পড়ে যাস, গ্রেনেডের ক্লিপটা টানতে দেরি করিস না। নিজে তো যাবি, ওদের ক’জনকে নিয়ে যেতে পারিস। ওরা বড় টর্চার করে মারে, সইতে পারবি না’-তপনের বাবা বলেছিলেন। কতটা শক্ত মনোবলের অধিকারী একজন বাবা। কিন্তু না, অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা পড়ায় বদিউল আলম তা করতে পারেননি। দুর্ভাগ্য তার। ১৯৭১-এর আগস্টে পাক-সেনাদের হাতে ধরা পড়েন তিনি। বন্দীশালার অত্যাচারেই প্রাণ হারান শেষ পর্যন্ত। কতটা নির্মম অত্যাচার তাকে সহ্য করতে হয়েছে তা আমরা পুরোটা জানিনা, অনুমান করতে পারি শুধু। তবে এটুকু নিশ্চিত জানি যে ভয়ংকর অত্যাচারেও তিনি হার মানেননি। কোন গোপন তথ্য জানাননি পাক সেনাদের। এই অসীমসাহসী দেশপ্রেমিক যোদ্ধাকে নিয়ে এমন একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করাটা অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার। এই পথ ধরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আরো অনেক বীরসেনানীকে নিয়ে লেখা হবে- এই আশাও রাখি মনে।

স্মারকগ্রন্থটির গ্রন্থনার কাজ দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত যত্নের সাথে করেছেন রুবিনা হোসেন। সেপ্টেম্বর ২০২০-এ বইটি প্রকাশিত হয়েছে রচয়িতা প্রকাশন থেকে। প্রকাশক লুৎফুল হোসেন নিজেই করেছেন সুদৃশ্য প্রচ্ছদ। প্রচ্ছদ, মুদ্রণ, অলংকরণ, অন্দরসজ্জা সর্বোপরি সংকলিত লেখার ব্যাপকতা বিবেচনায় অসাধারণ একটি বই নিঃসন্দেহে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নতুন একটি সংযোজন।