দীর্ঘ কবিতা ॥ অলোক সেন



পাতার আসন

এসেছ। বেশ, পা-দুখানি রাখ।

বাতাস সুগন্ধবাহি, ধরো,
পাতার সৌজন্যে রাখা ফল।

তরঙ্গ বহিছে মৃদু
ঝলমল আলোর গোলক
কোলাহল দিশাহারা

সময় নাড়ায় কড়া,
কটাহে আগুন, মুণ্ডপাত;
মৃত্যুর সাথে সহমরণের সাক্ষাৎ।

নানা বাঁকে পথ
পায়ে পায়ে, জুড়িগাড়ি কিংবা
ওই যে ঘটরঘটর – সন্ধ্যাকাল—
বর্ষা নেমেছে বুঝি। দিকভুল হল।

হাওয়া এল,
ঘরে স্নিগ্ধ তাপ,
মনে হয়, বাসনা মিটিবে এইবার।

পুরনো চিঠির বাক্সে ভাঙা লিপি
বড় অমনোযোগী—
দেওয়ালের পাশে আক্ষেপে হাসে
অক্ষরমালা।

ধ্বনিময় মৃদু চলাচল
ভাঙা হরফের গায়ে,
লুকোন প্রেম ডাকে –
হারানো ছন্দের কলি,
ডাকে কলঙ্ক রেখা।

এসো না হে, বস,
দ্যাখো, পাতাজুড়ে পূত মন্ত্র লেখা।

২.
আড়াল রেখ না
ও মুগ্ধ থলিকা

যে ছবি মুগ্ধতা ঢাকা
তার যে আদল ওই নীলে
ও মেঘ, অক্ষরে বিদ্ধ করে
ভেজালে
আঁখির গহনে এনে, লুকোন মেদুর

পাঞ্জাবি জিনসের ওপর।

ছিল না কালো মান্ধাতা,
অদূরে শহর –
হাঁটা আলপথ ধরে
জেনেও বন্ধ হয়নি হাঁ মুখ,
জানে চপ্পল কোথায় থামা।

ওগো শ্যাম ও বাজার,
তুমিই প্রণয়,
নিবেদিত;
হারাতে হারাতে চিনেছিল যে
সুদীর্ঘ রেলের পথ
দক্ষিণ থেকে উত্তর –
কলকাতা কেমন শহর?
অনর্থক সন্ধানে –
বাহ্য-ঘর, খাঁটা—
মা গঙ্গা সর্বংসহা।

তখন একাগ্র, জানে
বাগদেবী, শোভা কুচযুগ,
আরাধনা;
নীল-সাদা ফ্রক, কালো চোখ
দেবী—
স্কুল হাই সেকেন্ডারি।

ফেরা কি সহজ, ফেলে আসা পথে!

পথিকের পায়ে থাকে পথ –
ক্ষ্যাপাকে কে চেনে,
যত খই উড়ে এসে ঢেকেছে সে পথ
শ্রীচরণে নমঃ, আগুন অন্তিমে

আভা তার মূখে এসে জাগে
চরৈবেতি, চরৈবেতি—
পাথর হাতে ক্ষ্যাপা, জন্ম ও জন্মান্তর।


৩.
পাঠকক্ষ-২
শব্দের অসীম আনাগোনা
জ্ঞানের পরিধি উদ্দাম
ত্যক্ত যত কিছু
পুনরাসীন

লুপ্ত বোধিবৃক্ষ,
দ্রাক্ষাবনে মুগ্ধ কলম
উত্তরহীন
যেহেতু, কোনও প্রশ্ন নেই
যেহেতু কোনও যাজ্ঞবল্ক মৈত্রেয়ী নেই
সময় থমকে, উড়ছে শ্মশান ভস্ম

আবার রাত্রি গভীর
ঠকঠক, ঠকঠক—
পাঠকক্ষের দরজায় কড়া নড়া

কে আজ অতন্দ্র।

৪.
হে বিভ্রম, কেন এই রাতে জাগাতে এসেছ
কেন চিত্তে ঘা দাও পুরনো, চেনা শব্দে
কেন চেতন অচেতনের দ্বন্দ্বে ধুপ

বাস্তবিক, দেখেছে কে বস্তুর আড়াল।
মহাজন নহে তো কল্প মানুষ, কিছুটা পার্থিব
ইহাকে গাড়োল জেনে রেখেছেন দু’ইঞ্চি ফাঁক,
কথায় কথায় মায়াবনে দ্যুতিময় শব্দজাল –
নীচে যে গহিন জল

জল সেই ঘোলা আর কালো
মীন শায়রে তবুও খেলা
ছায়ার অতীত,
ঢেউ আর ঢেউ, পাখার ঝাপট
স্থলে ও সলিলে, দেখ,
কপটাচার, শুক্তিহীন তরঙ্গের মালা

নৌকা ওঠে আর নামে;
ধীবরও ফেলেছে জাল তালে তালে।

কড়া নড়ে গভীর রাতের দুয়ারে

কে, কে এসেছে সংগোপনে!

৫.
অবারিত প্রবেশ ও প্রস্থান
গ্রন্থ আর গ্রন্থকীট—
পাঠকক্ষ অর্গলহীন

মৌ বনে সেই যে পতন
মধু আর মধু,
হুল শূন্য বিবেক

সে-ও পাল্টি খেল অবশেষে!
অথচ জ্ঞানবৃক্ষের শাখায় শাখায়
কত না ভোজ্য— স্বাদু ও গুরু,
তবু নিমজ্জন অক্ষের বিক্ষেপে!

কী দান দেবে হে, প্রতিদানে?

দরজায় একে একে ঊনপঞ্চাশ পবন
ক্যাঁচকোঁচ, ক্যাঁচকোঁচ