ফকির ইলিয়াসের দীর্ঘ কবিতা

পথের প্রথম পেখম

স্রোতের দিকে হেঁটে গেলেই পৃথিবীকে
বেশ অসমান্তরাল মনে হয়।
কিংবা এই যে নেশাগ্রস্থ প্রহর বিছিয়ে
শুয়ে আছে একটি নদী,
তাকেও মনে হতে পারে জীবনের ঘুমরাজ্য-
যারা ঘুমায়, আর যারা ঘুমাতে পারে না
তাদের সকলেরই যৌথ রাজবসতি।

আমি কবির পাঁজরে অনেক স্রোতের
বসতি দেখেছি। দেখেছি অনেক মানুষের
শিরদাঁড়ায় ঝুলে আছে অর্ধমৃত একটি মাছি
অথচ মানুষটি শার্ট পরে আছে, জ্যাকেট
গায়ে দিয়ে দিব্যি নিবারণ করছে শীত,
অপেক্ষা করছে বসন্তের।

মনে পড়ছে, বসন্তের যৌবন ঘেরা ফাগুণকে
ফিরে আসার জন্য নিবেদন জানিয়ে আমি
একবার একটি চিঠি লিখেছিলাম।
সেই চিঠি গিয়ে পড়েছিল এক
ডাকাতের হাতে। ডাকাতটি লালকালি দিয়ে
চিহ্নিত করেছিল আমার চিঠি, আমার শব্দাবলি
আর বলেছিল,
যে শব্দ উচ্চারণ করতে দাঁত ভেঙে যায়
তা আবার চিঠি হলো নাকি।

আমি হেসেছিলাম। জানতাম, নেশা কিংবা পেশায়
দখলদার হলেও হায়েনাদের দেহেও রক্ত থাকে।
কিন্তু এই দূরাচারীর কথা শুনে আমার
মনে হয়েছিল, সে কোনোদিন মেঘগল্প পড়েনি।
হাত রাখেনি শিশিরকন্যার নিমগ্ন অগ্নির ভেতর।

জানি, অগ্নিপালন একজীবনে সব মানুষের
হয় না। প্রচণ্ড শীতে খড়ের কুণ্ডুলি জ্বালিয়ে
সবাই উষ্ণ করতে পারে না হাতের তালু।
তবু আমরা অগণিত উষ্ণতার গল্প শুনি,
অগণিত ঝিনুকজলের ছায়ায় আমরা খুঁজি
নিজেদের প্রতিবিম্ব।

তাছাড়া, নিজেকে বাঁচাতে এই পৃথিবীতে
আর যারা যারা ফেরারী হয়েছিল,
এবং বিক্রি করেছিল নিজেদের আয়ু,
তারা উন্মাদ ছিল কোন পুষ্পের প্রেমে।
কোন বিরহমঙ্গল পড়ে তারা লিখেছিল
নিজেদের রোজনামচা।

সকল আত্মকাহিনিই সত্য নয়। সকল
জোনাকি গভীর অন্ধকারে দেখাতে পারে না
নিজস্ব আলোর ঝলক। তবু এই তল্লাটে
কেউ কেউ দিয়াশলাই বিক্রি করে, কেউ কেউ
একটি মোমবাতি কর্জ নেয়,
প্রতিবেশীর ঘর থেকে।

আমি অসংখ্য মোমবাতির সাথে যাপন
করেছি ঘনরাত। সাক্ষাত পাবো বলে
যে চাঁদের অপেক্ষা করেছি যুগের পর যুগ-
সেই চাঁদ আমার উঠোনে নামায়নি
তার চরণযুগল।
তারপরও যে লাটিম গাছের ছায়ায় চিরনিদ্রায়
শায়িত আছেন আমার দাদাপীর,
আমি তাঁর সমাধির দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে
তাকিয়েছি-
মধুগঙ্গা নদীর জলটুকু চিহ্নিত করতে করতে
ভেবেছি, লাঠি! আহা দাদাপীরের হাতের লাঠি!
তুমি আমাকে মানুষ হিসেবে দাঁড়াবার শক্তি দিও,
একটি বয়সে এসে যেন আমি তোমার
ওপর ভর করে হলেও দাঁড়াতে পারি।

আচ্ছা, মানুষকে জীবনে দাঁড়াতে কি খুব
বেশি অবলম্বন লাগে।
হয়তো লাগে- অথবা লাগে না।
লাগে না- এজন্য বললাম,
কারণ আমি আকাশের অশ্রুর মাঝে
বেঁচে থাকতে চাইনি। চাইনি নির্জন দুপুর
আমার ছায়া পাচার করুক দেশে দেশে।
চাইনি; যে কোনও অচিন নগরে
কেউ আমার নাম ধরে ডাকুক।
কারণ মানুষের সব পরিচিতি সবসময়
সার্বজনীন হয়ে উঠে না। সবাই সকলের কাছে
হতেও পারে না প্রিয়পাত্র।

যে লোকটি আমার চোখের সামনেই চিরতরে
অন্ধ হয়ে যাচ্ছিল,
তারই পাশে দাঁড়িয়ে একজন তরুণী বলেছিল
আমি আমার একটি চোখ তোমাকে দিয়ে দিতে চাই।
তুমি আমার চোখ দিয়েই দেখবে পৃথিবীর
প্রেমের শ্বেতপাথর,
আমার রেটেনায় যুক্ত থাকবে তোমার স্নায়ু।

লোকটি সেই প্রস্তাবে রাজী হয়নি। বরং বলেছিল-
অন্ধত্বের একক গরিমা আছে। ব্রেইল সভ্যতার
যুগে স্পর্শের অনলেই অনুভব করা যায়
অনেক বৃত্ত ও তার ব্যবচ্ছেদ।

আমি জীবনের ব্যবচ্ছেদকে সমুদ্রের সাথে
ভাগাভাগি করেছি বহুবার।
জাহাজের ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে ভেবেছি,
জাহাজ ঢেউগুলো অতিক্রম করে;
নাকি ঢেউয়ের শাসন মেনে উজিয়ে যায় জাহাজ।

গেল বার যখন প্যারিসে বেড়াতে গিয়েছিলাম,
তখন সেক্সপিয়ার বুক শপের সামনে দাঁড়িয়ে
গান গাইছিলেন এক পথগায়ক।
তার গানের মর্মার্থ ছিল এই-
‘পাটাতন চুইয়ে জল উঠছে একটি ছোট্ট জাহাজে
সমুদ্র পাড়ি দেবার জন্য যারা যাত্রী,
তারা উল্লাস করছে আনন্দে।
জাহাজটি ডুবে যাবে মধ্য সাগরে, জেনেও
তাদের কোনও ভয় নেই। কারণ তারা সলিল
সমাধির জন্যেই এই ছোট্ট জাহাজে চড়েছিল’…

মৃত্যু, মানুষের একটি নির্মল আনন্দের নাম।
মৃত্যুর সাথে দেখা হলেই মানুষ ভুলে যায়
বিগত বিচ্ছেদ, ভুলে যায় সুর তোলা সোনালী
বেহালার গান, মন্দিরার টুংটাং আওয়াজ;
অথবা ঢোলকের দম ফাটানো তাল-লয়।

আর যারা ছবি আঁকেন সেই মৃত্যুর,
যারা চিত্রকর; তাদের মেশানো রঙ দেখে দেখে
নিজের মনের মাধুরী ছিটায় কিছু মানুষ।
যাদের কোনো প্রতিপক্ষ নেই। যারা একপক্ষের
সূর্যকে সাক্ষী রেখে যেতে চায় স্মৃতিমেঘে।
যারা আয়ুর দরবারে প্রতিদিন ছিটিয়ে দেয় পুষ্প,
ছিটিয়ে দেয় আগর-চন্দন।

আমি সবসময় পৃথিবীর সকল সুবাসের পক্ষেই
দেখিয়েছি আমার পক্ষপাত।
শত ব্যর্থতা বুকে নিয়ে হেসেছি চন্দ্রের সাফল্যে।
মানুষকে আহ্বান জানিয়েছি ব্যাপক নক্ষত্রযাত্রায়।
যারা গভীর রাতে সকল কৃত্রিম আলো
নিভিয়ে অবগাহন করতে পারে চন্দ্রমহিমায়,
তাদের বলেছি-
ধীরে চলো হে মানুষ। নিজের সকল ক্ষুদ্র
যোগাড়ের ভেতরই খুঁজে নাও আত্মা এবং
অস্তিত্বের বীজমহল, এই
মাটিকেই মানো মন্ত্রের মতো।

আমি মন্ত্রধ্যানী বৃষ্টিকে কাছে ডেকেছি-
আমি বহুগুণী ভেষজকে মেনেছি পথ্য-
আমি পথের পত্রসমাবেশে দাঁড়িয়ে,
পাতাদের বলেছি, তোমরা মানুষের কল্যাণেই
অমর হয়ে থাকো। কাছে রাখো মানুষকে;
যাতে তারা পত্রপল্লবের মতো সংঘবদ্ধ হয়।

আমি জানি, একদিন আমার দেহের অস্তিত্ব
থাকবে না। কিন্তু পদছাপ থাকবে তো।
যে পাখির স্বাধীনতায় আমি দেখেছিলাম
পথের প্রথম পেখম-
তাকেই আমার প্রতিদ্বন্ধী মনে হয়েছে চিরকাল;
কারণ মানুষ মাত্রেই একটি পাখির
লালন-পালনকারী-
একটি পিঞ্জরের নির্বাক পাহারাদার।