‘দুষ্পাঠ্য দুটি চোখ’ বাস্তব ও পরাবাস্তব জীবনের প্রতিফলন ॥ হিরণ্য হারুন


সময়ের শিলালিপিতে আমাদের জীবন যাপিত হয়, কবিতা লিপিবদ্ধ হয়। সময়ের যাত্রায় আমরা অতীতে যাই স্মৃতি হয়ে, ভবিষ্যৎ দেখতে পাই আলোকপথে।
কবি সময়ের বাহক, কবিতার প্রফেট। যাপিত জীবনে কবিতা আমাদের ধারণ করে তার চরণে চরণে, শব্দে শব্দে, অক্ষর ভেঙে ভেঙে।
কবি আক্তারুজ্জামান লেবু’র কবিতাগ্রন্থ ‘দুষ্পাঠ্য দুটি চোখ’ বাস্তব ও পরাবাস্তব জীবনের প্রতিফলন।
‘একটি দীর্ঘশ্বাসের চিঠি পাঠালাম/ অবসরে পড়িও/ আমার ঠিকানাটা কাঁচের মতো/ সাবধানে ধরিও’।
কবিতার এই পঙক্তিগুলো বিশ্লেষণ করা দুরূহ, কিন্তু তা অনুভূতিময়, এযেন আমাদের কথা বলছে, এযেন আমার, আপনার জীবন, সময়ের প্রেমময় ঋজু পথ অথচ উঁচু-নিচু।

কবি আক্তারুজ্জামান লেবু’র কবিতায় বারংবার তার ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়। কবিতাগুলো যখন আমরা পাঠ করি তখন তা হয়ে যায় আমাদের ব্যক্তিগত─ আমাদের ব্যক্তিগত বিষণ্নতাবোধ, ভালোবাসা, হাসি, কান্না, বিরহ।
‘যতই আঘাত করো / ততই ভালোবসতে ইচ্ছে হয়/ আমার ইচ্ছেগুলো এমনি যাতনাময়’।
এই পঙক্তি যেন সেই চিরচেনা আমাদের কথা, রবি ঠাকুরের কথা ‘সখী, ভালোবাসা কারে কয়। সে কি কেবলই যাতনাময়’।

‘দুষ্পাঠ্য দুটি চোখ’ কার চোখ। আমার, আপনার, নাকি সমাজের?
একজন বাবার─
‘বাবাকে বেচে খেয়েছি অনেক দিন,/ তার দুষ্পাঠ্য দুটি চোখ আর অসহায় দুপুরগুলোকে / আমি আর কারো কাছে বেচবো না ভেবে চুপ করে থাকি’।
একজন মায়ের─
‘মা, আমার সামনে তোমার চোখদুটো কি গোপন করা যায় না?
আমার কাছে ওই চোখদুটো যে তোমার বেদনা দেখার আয়না’।

কবিতাগ্রন্থটি উপমায় ভরপুর। কবি তার জীবনবোধকে দেখেছেন সন্ধ্যায়, হেমন্তের ধূসর মাঠে অথবা─
‘বাবার চোখ/ সন্ধ্যার ব্যাবচ্ছেদ ডেকে আনে’
কবিতা কি? সময়ের আপেক্ষিকতায় ব্যক্তিগত অনুভূতি নাকি সময়কে বিক্রি করে ব্যক্তিকে উপমায় বেঁধে অলঙ্কারে সজ্জিত করে সার্বজনীন সর্বোৎকৃষ্ট দর্শন।
‘তবু কারো কারো সন্ধ্যাজুড়ে বৃষ্টি হলে / চিরতরে চলে যাবার সময় হয়ে আসে’।
হেমন্ত আসে।
‘তবু আমার শেষ পত্র হেমন্তের কাছেই রেখে যাবো। / লিখে যাবো না পাওয়ার বিশুদ্ধ ব্যকরণ,/ অনন্তের স্তবক’।

কোনদিকে হাঁটো তুমি পথিক, কোন পথে লেখো কবিতা। কি চাও এই জীবনে শেষ সময়ে, আপনি কি প্রেমিক ওহে কবি─

‘নারী, শুনেছি তুমি ট্রেনকে পরাজিত করতে পারো/
কোকিলের সুর ধরে এ-কথা বলে যায় প্রেমিক হৃদয়’।
এই কবিতাগ্রন্থটি প্রচলিত অঙ্কের হিসাবে ছন্দে খেলানো না কিন্তু পাঠক কোথাও ধ্বনি বিপর্যয়ে পড়বে না, ধ্বনিত প্রবাহ তাকে একটা ছন্দ দিবে হয়তো প্রচলিত ভাষায় আমরা বলে থাকি গদ্যছন্দ। কবিতাগ্রন্থটির আরো একটি বড় গুণ এখানে দুর্বোধ্যতা নেই, অন্তঃস্থভাব একটি সরল অর্থোবোধকতা তৈরি করেছে। যদিও তা অত সরল না। কেউ যদি মনে করেন পাঠ করা মাত্রই কবিতার স্পর্শের অনুভূতি পেতে হবে, সেক্ষেত্রে কবি স্পর্শ জাগাতে পেরেছেন আমাদের হৃদয়ে।


দুষ্পাঠ্য দুটি চোখ ॥ প্রচ্ছদ : কিংশুক ভট্টাচার্য ॥ প্রকাশনী : সবুজস্বর্গ ॥ মুদ্রিত মূল্য : ২০০ টাকা অথবা শুভেচ্ছা মূল্য।