দৃশ্যের আড়ালে দৃশ্য ও অন্যান্য ॥ বাবুল আনোয়ার

কবি বাবুল আনোয়ার। জন্ম ২৬ ডিসেম্বর ১৯৬০, নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলাধীন বড়ভিটা গ্রামে। আশি দশকের শুরু থেকে লেখালেখিতে সক্রিয়। প্রথম কবিতার বই ‘তবুও রয়েছি জেগে’ প্রকাশ পায় ১৯৯১ সালে। প্রকশিত বইয়ের সংখ্যা ১৩। কবির জন্মদিনে আমাদের শুভেচ্ছা। স.স


দৃশ্যের আড়ালে দৃশ্য

দৃশ্যের আড়ালে কতশত দৃশ্য
পড়ে থাকে বিবর্ণ বিবরে
প্রণয়ের স্বরলিপি
প্রথাসিদ্ধ ভালোবাসা
কারণে অকারণে লেখা নাম
দৃশ্যের আড়ালে কতশত দৃশ্য
হারিয়ে যায় দুর্বোধ্য বুননে
সত্য ও স্বপ্নের দূর পরাভবে
কেউ কেউ অকারণে উজ্জ্বল
কেউ কেউ অবোধ্য পরাভবে
জলে জোছনায়
ম্লান আলোয় লুকায় মুখ
বুকে পোষে বিরূপ নির্জনতা
সভ্যতার চারুপাঠ
অশোধিত মাতৃজঠরের ঋণ
কতশত দৃশ্য বিষণ্ণ আর্তির ছোঁয়ায়
অনুরাগের অন্ধকারে পড়ে থাকে
মুক্ত মাঠে বাতাসের হিল্লোলে
সখ্য হয় না উর্বর মৃত্তিকার
মেঘে বৃষ্টিতে প্রাণে বাজে না নিক্কন
দৃশ্যের আড়ালে কতশত দৃশ্য
মায়াবী মৌণতায়
মৃত নীল আভায় সুদূরের ছবি আঁকে।

বাবার মুখ

বাবা তোমাকে দেখি না বহুদিন
দিন ও রাত্রির কোলাহলে
তবু তোমার উপস্থিতি বর্ষার মেঘ
হয়ে বৃষ্টি ঝরায়
আমি রৌদ্র, খরায় ভিজে
ঘরে ফিরি, পাই না তোমায়
তোমার জন্য ফোটে না কোন ফুল
কাঁদে না কোন রাত জাগা নদী
অভিমানে নুয়ে পড়ে বুকের বাগান
বাবা, তোমাকে দেখি উজ্জীবনের
ব্যথিত আঁধারে- বিষাদের গানে
আমার প্রাণের গহীন চত্বরে
তোমার মুদ্রিত চোখে রনাঙ্গণের আগুন
সন্তানের অপরাজিত মুখ উজ্জ্বল বিভায়
কালের অক্ষরে দোলা দিয়ে যায়।

শীত

শীত আসে কুয়াশার কান্না ভেজা
মুদ্রিত চোখে
শীতল মগ্নতায় জেগে থাকে
ভাঁট ফুলের সৌরভ
নদীটিও গুটিয়ে ফেলে জলের কাঁপন
নিশ্চুপ ঘুমিয়ে থাকে দ্যুতিময় শস্যের মাঠ
গৃহত্যাগী বাউলের ধ্যানস্থ একতারা
ক্ষীণ উষ্ণতায় মেপে নেয়
ফেলে আসা পথের অনুরাগ
পতিত ভূমির তৃষিত দহন।

ইচ্ছা অনিচ্ছার খসড়া

সুনসান রোদে পৌষের বিকেলে
তুমি পেরুতে পারতে ওইটুকু পথ
ভাবতে পারতে অসুৃখী রাতের
বিরহ গাঁথা, বিষণ্ন বকুল
পাঁজরের ভাঁজে থাকা হলুদ আর্তনাদ
সারমেয় সময় থেকে খুঁজে নিতে পারতে
খুঁটে খাঁওয়া জীবনের সায়াহ্ন অন্ধকার
পাখিদের মতো হিম লাগা সন্ধ্যায়
উষ্ণতার চাদরে ঢেকে শীতার্ত শরীর
খুঁজে নিতে পারতে ব্যথিত জলের নদী
সুনসান রোদে পৌষের বিকেলে
আসতে পারতে অথচ আসো না
বেদনায় গড়ে তোল অথৈ পাথার।

টানাপোড়েন

সাতসকালে বুকের ভেতর স্বপ্ন হলো জমা
ব্যাকুল হয়ে জানতে চায় কাছের নিরুপমা
স্বপ্নগুলো হাওয়ার তোড়ে ভেসে ভেসে আসে
কুরুস কাঠির নিপুণ ছোঁয়ায় শিল্প হয়ে ভাসে
এমন সময় দুঃখগুলো পাতার মতো ঝরে
তাড়িয়ে নিয়ে হারিয়ে যায় দূরের পথ ধরে
দুঃখ এবং স্বপ্ন নিয়ে আমার হলো কাল
আগের মতো সবকিছু বিরুদ্ধেই বহাল।

যে ডাকে সে পর হয়ে যায়

জানালায় বসে আছে ফেরারী দুুপুর
কান্না ভেজা আলোর কন্দরে
কে নিবে পার করে
যোজন যোজন মাইল শূন্যতার মোড়
যেখানে নিশ্চুপ চুনিয়া- আর্কেডিয়া
কবি রফিক আজাদ
যে ডাকে সে পর হয়ে যায়
অদূরে মর্মমাখা বিষাদের নীলে
মাইপোশে ভরে রাখা দুঃখের মতো
চাঁদের নরম আলোয় ঝিম মেরে
নুয়ে পড়ে নদী
বলাকারা ভুলে যায় দিগন্তের পথ
যে ডাকে সে পর হয়ে যায়
বিনম্র হাওয়ায় জোছনা ও বৃষ্টির ভেতর।

খণ্ড পদাবলি

শুষে নিতে পারলে ভালো হতো
তোমার দুঃখগুলো
মুছে দিতে পারলে ভালো হতো
পারিজাত সব ধুলো।

২.
জল গড়িয়ে জলের দিকে
রাত্রি গড়ায় দিনে
তুমি শুধু গড়িয়ে যাও
উতল হাওয়ার বীণে।

৩.
একটি আকাশ অনেক দূরে
তোমার আমার থাক
দুটি নদীর যুগল ধারা
একটি হয়ে যাক।

৪.
পথ পেরুতে পেরুতে পথিক
পথের মগ্নতায় কবি।

৫.
দূরে যাও দূরে, সরে যেও না।

আঁতাত

জানালা খুলে দেখি আকাশ আর মেঘ
তুমি দূরে গিয়ে সরে বাড়াও উদ্বেগ
ঘুম নেই দু’চোখে ঘোরে কাটে রাত
শুয়ে থাকে নিশ্চুপ গোপন আঁতাত।

একদিন

একদিন মেঘ হয়ে গেলে প্রাণ
পাখিদের সাথে হবে না ওড়াওড়ি
নক্ষত্রের প্রগাঢ় আলোয়
ভিজিয়ে শরীর
কোন এক দূর মুলুকে
অন্ধকারে একা নিরবে
বাজবে না হেমন্তের গান

দেখা যাবে না আর কোন দিন
একদিন মেঘ হয়ে গেলে প্রাণ।

দীর্ঘ বৈঠক শেষে

পৃথিবীর সব চেয়ে দীর্ঘতম কোন রাতে
তোমার আমার এক দীর্ঘ বৈঠক হবে
জোছনা গলে গলে অনুরাগের নদী
হিংসা গলে গলে হবে সবুজের বন
দীর্ঘতম আলাপে দীর্ঘ দুঃখগুলো
অনন্ত আকাশ জুড়ে মিশে যাবে
দুরন্ত হাওয়ায় অসীম শূন্যতায়
সেই কাহিনী জানবে না কেউ, লিখবে না
দূর থেকে আরও দূরে আমরা দুজন
দূরগামী পথে অনুগামী হবো পরস্পর।