দেশান্তর ও অন্যান্য ॥ ফরিদ আহমদ দুলাল

দেশান্তর

অগ্রজ বন্ধুর মুখে যখন পালিয়ে বাঁচার কাহিনি শুনি
মানবিক সত্তা স্বার্থান্ধ হবার গল্পে জাগে বিষাদ সিম্ফোনি;
বন্ধুর নির্দয় হবার আড়ালে ছিলো না কামান্ধতার গন্ধ
গোপনে হয়তো বা ছিলো মানসিক দ্বন্দ্ব
তারচেয়ে অধিক ছিলো লোভ
ধর্মান্ধতা ছিল তার প্রকাশ্য প্রবোধ!
কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হেঁটেছে যারা হাতে রেখে হাত
আজন্ম যাদের প্রীতি ছিলো খুব, ছিলো না সংঘাত,
সোহাগে যে হাত মুখে তুলে দিতো নলা
মুছে দিতো ঘাম সাঁকোর ছায়ায় ডেকে নিতো লাজুক মৌরলা,
স্বার্থ-লোভ মোহে সে হাতে হঠাৎ ছোরা দৃশ্যমান।
হায় মানবিকতা। রিপুর প্ররোচনা লহমায় হয়ে ওঠে পিশাচ সমান।
শত স্মৃতি পিছুটান মমতার মায়া কাতর অন্তর
অতঃপর খুইয়ে সর্বস্ব পালিয়ে বাঁচা অনিবার্য দেশান্তর।

জীবনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে অতীত স্মৃতির বিষাদ কেন খোঁড়া?
বিচ্ছেদের ভাঙা সাঁকো লাগবে কি জোড়া?
জৌলুশ হারিয়ে পেয়েছি আশ্রয় ছাদ আহামরি কিছু নয়
সংসার-স্বজন-পরিজন নিয়ে নেই কোনো অস্বস্তি-সংশয়,
সম্পদ হারিয়ে নেই সামান্য সন্তাপ
মন শুধু ভুলে যেতে চায় স্বার্থান্ধ বন্ধুর পাপ।

তবুও অশ্রুসজল অগ্রজ বন্ধুর বয়সী দু’চোখ কাঁদে
অলক্ষে নাড়ির টান কান্না হয়ে থাকে জীবন অমোঘ ফাঁদে।



মুখ ও মুখোশ


মুখটা আড়াল করে যদি মুখোশে নিজেকে ঢাকো
মুখোশ কখনো মুখ নয় সে কথা স্মরণে রাখো;
শহর-নগর-বাণিজ্যবিতানে মুখোশের নিত্য চলাচল
বাহার যতই থাক কাঠ নয় মুখোশটা অসার বল্কল।
মুখগুলো সব প্রকৃতির পাখি আকাশের মেঘ
মুখগুলো জলের উপর ছুটে চলা বাতাসের গতিবেগ;
মুখগুলো নদী স্রোতে মৃদু জলের কম্পন জলে ভাসা হাঁস
মুখোশ নদীশাসন-বাধ জলের অবাধ সাঁতার ফেরায় বারোমাস।
মুখোশ নেকাবে ঢাকা স্থুল প্রতারণা
ক্ষতের উপর মিথ্যে প্রলেপ সঞ্চিত প্রবঞ্চনা।
মুখ শ্রাবণের বৃষ্টিধারা আষাঢ়ের বজ্রপাত
মুখোশ সলজ্জ মধ্যরাত ভাদ্রের উত্তাপ গোপন সন্তাপ।

ঐশ্বর্যের বার্তা নিয়ে মুখোশ যখন কাছে আসে
ভুল করে ভাবি হয়তো সে আমায় ভুলে ভালোবাসে
রাজ্যের বিষাদ মুখোশের বুকে থাকে না প্রণয়
নিভৃতে মুখোশ পোষে অপরাধবোধ সতত মুখের ভয়;
স্বার্থান্ধতা-মোহ-লোভ মুখোশে আড়াল করে পাপ
সতত সিজদায় পড়ে ভুলে যেতে চায় মনস্তাপ,
মুখোশের রূপ-লাবণ্য কৃত্রিম সুখ-বহুগামিতায়
মুখ অরূপ-অনিন্দ্য মৃত্তিকার স্পর্শে জাগে অনন্য বিভায়;
মহাকালের ঘাতক বর্ণিল মুখোশ সর্বাংশে অসমাপিকা
মুখ প্রশান্তিতে থাকে যদি বুক খুলে দেয় উদার-মৃত্তিকা।



কবি


কবিতা কখন সদানন্দ সুশোভিত হয়ে যায়
কলহাস্যে কবিতা কখন গান গায়?
কবিতা কল্যাণকামী সমুদ্রাভিমুখী যদি হয়
মৃত্তিকার অন্তরাত্মা ছুঁয়ে সহিষ্ণুতা-প্রবচন কয়;
কবিতা বৃষ্টির বিশুদ্ধ-সুপেয় জল প্রার্থনায় তাকে পাবে
ডোবায় কেন সে যাবে? কেন পঙ্কে-কাদায় সাঁতরাবে।

ঘোলা জলে মাছ ধ’রে যারা মাছের ন্যায্যতা ভাঙে
বাতাসের সারল্যে দেয়াল তুলে আহাজারি করে যায়নি গাঙে
তারা পরিযায়ী-জ্ঞানপাপী, কবি নয়
কবির মুখোশ পরে করে অভিনয়;
‘চকচক করিলে হয়না সোনা’ জানে না এ গ্রামীণ সত্যের পরিচয়
সত্যালিঙ্গনে কূপমণ্ডূক-জন্মান্ধ শঠের ভয়
কূট তর্কে মজে ভাবে বিপুল বিজয়।
ত্রিকালদর্শী-মহর্ষি-ঋষি কবি সত্যের পূজারী
সহিষ্ণু মৃত্তিকা কবি আলোর দিশারী।

অবিচল সত্য প্রকাশে পরে না স্তুতির বল্কল
তোষামোদে-ভাঁড় নয় থাকে তার সত্যের সম্বল।
কাপুরুষ! যার সত্যের সমুখে দাঁড়াবার ভয়
মিথ্যার বেসাতি করে প্রয়োজনে লেজ নাড়ে
স্তাবকের জন্যে রাখে কড়ির সঞ্চয়।
ক্রীতদাস-স্পার্টাকাস কবি সিসিফাস
কবির খামারে মুক্তো নয় কেবল দ্যুতির চাষ।