দ্বিতীয় দশকের কবিতার প্রবণতা ॥ মাসুদ মুস্তাফিজ



কবিতা এবং সংগীতের আপাত বিচ্ছেদ সচেতনভাবেই ঘটেছে আজকের কবিতায়- আগামীর কবিতায় কী ঘটবে তা আমরা বলতে পারিনা। সমকালীন কবিতা নিয়ে লেখা কঠিন। দ্বিতীয় দশকের কবিতার গতিপ্রকৃতি কাব্য প্রকরণের এক নতুন ধারা। এ দশকের কবিতার শরীর এক মোহনীয় লাবণ্যে ঢাকা থাকে। বোধের দাবি অনির্বায তবে এ দাবির ভেতর শক্তি, সৌর্ন্দয না থাকলে যথার্থ কাব্য হয়ে ওঠে না। এই রচনার আলোচ্য কবিরা হলেন- গালিব রহমান, হানিফ রাশেদীন, শঙ্খচূড় ইমাম, বঙ্গ রাখাল, মাজহার সরকার, শফিক সেলিম, হাসনাত শোয়েব, পলিয়ার ওয়াহিদ ও জব্বার আল নাঈম।

গালিব রহমানের কবিতায় রয়েছে এক ধরনের দায়বদ্ধতা। এই তরুণ কবির কবিতার ভাষা নমনীয়, কোমল স্বরে রচিত তাঁর কবিতায় একটা টানটান অনুভূতির শ্লেষ থাকে। কোথায় যেন একটা মোহনীয় বোধ পাঠককে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। একটি দৃষ্টান্ত- ‘যথেষ্ট বসত হয়েছে তোমার/ এবার নির্বাণ হতে চলো/ অতৃপ্তির এই মাঠের কামসমুদ্রে/ আকীর্ণ আলোর ভিটা/ তোমাকে শুষে নিয়ে করেছে গর্ভধারণ/ ধাত্রীর হিমাঙ্গলে মৃত হবে নাকি?/ এইবার তবে চলো নিরাকারে মিশি’ (বসত থেকে শূন্যে)।

হনিফ রাশেদীনের কবিতায় দ্রোহ ও মানবিক প্রেম কাজ করে যা কবিতাকে এক উঁচ্চমাত্রায় পৌঁছে দেয়। এ কবির কবিতায় নিহিত বোধের শক্তি খুবই প্রবল। রাশেদীনকে বলা যায় চিন্তাশীল কবি। তাঁর কবিতায় এক আলো ও অন্ধকারের অপার রহস্য খেলা করে। একটি দৃষ্টান্ত- ‘নিজেকে মনে হচ্ছে যেন অনেক লক্ষ বছর প’রে/ কবর থেকে উঠে আসা; এই আমি প্রতিটি পদক্ষেপে/ মানুষ হয়ে উঠি, হৃদয়ের প্রাচুর্যে পুলকিত হ’য়ে উঠি;/ খসে প’ড়ে অতি ঘনিষ্ঠ খোলস-আমার বহিরাবরণ।’ (বৃত্তের বাইরে)।

শঙ্খচূড় ইমামের কাব্য ভাষায় চমক আছে। তাঁর কবিতায় জীবন জিজ্ঞাসায় কাব্যিক শক্তির পরিচয় মেলে। স্বর্গীয় আবেগের ব্যবহার উৎসরণের দ্যোতনায় বিশ্বস্ত হয়ে ওঠে। এ কবির বিষয় চেতনায় টোট্যালিটির আলাদা জাগানিয়া বোধ আছে। দৃষ্টান্ত- ‘বাতাসে পাতা কুড়াবার গান ভেসে যায়/ ইনসোমনিয়ার পথ ধরে দুটি চোখ/ সোনালি ধান দেখে। সেই সব ধান/ ইলিশের মৌসুমে কুয়াশা ঝরায়।’ (আমার নাম)

বঙ্গ রাখাল এ সময়ের পরিচিত নাম। তাঁর কবিতায় প্রেম, স্বপ্ন আর স্মৃতিচারিত বিষয়ে কেন্দ্রীকতা কাজ করে। রাখাল যেন কবিতায় হয়ে উঠেন স্বপ্নচাষী। বঙ্গ রাখালের কবিতায় প্রেমের বোধকে জাগিয়ে রাখে স্বপ্নশিহরণে। দৃষ্টান্ত- ‘এক বিন্দু সটাং দীর্ঘশ্বাসের লালায় তীরবিদ্ধ যন্ত্রণার বাজিকর সেজে ঊর্মিকে বলেছি- সবুজাভ প্রজাপতি হলে দেখতে পাবে- দৃষ্টির অগোচরে পোয়াতি নারীর বুক ঘরে প্রেম’ (প্রেমিক হতে চাইনি)। বঙ্গ রাখাল আমাদেরকে প্রেমের তাড়নায় আবদ্ধ করে রাখেন উষ্ণ আবেগে। তাঁর কবিতার বিষয় ও শব্দের সারল্যে আলাদা কথা বলে যেন প্রেমিক প্রেমিকার প্রাণবন্ত আলাপন। রাখালের কবিতায় এক ধরণের শব্দ মোহমুগ্ধতা কাজ করে। তাঁর কবিতা পাঠে এক প্রতীতি জেগে ওঠে।

মাজহার সরকার প্রাক অগ্রসর কবি। তাঁর কবিতায় প্রচণ্ড আকর্ষণ আছে, আছে বুকভরা তৃপ্তি। দৃষ্টান্ত- ‘এমন যৌথ দুঃখ দরকার, সারা রাত মদ আরা গিটার বাজিয়ে কাটাবো। আগুন জ্বালিয়ে গোল হয়ে বসবো। গলায় গলায় কাঁদবো। কান্নার সঙ্গে বুকের গরম রক্ত যেন ছিটকে আসে। আমি এখন উৎসবের কিছুই দেখছি না। আমাদের পকেট ভরা রাজার মুখ’ (যৌথ দুঃখ)।

শফিক সেলিমের কবিতায় এক ধরণের মায়াময় আচ্ছন্নতায় নারী-প্রেম আর প্রকৃতির সমাহার ঘটে। কবিতায় জলজ চেতনা কিংবা নদীতে চাঁদের দৃশ্য দেখা অন্যদিকে মেঘবৃষ্টির খেলা তাঁর কবিতায় ধরা পড়ে। দৃষ্টান্ত- ‘জলে ভিজতে ভিজতে জলের স্বভাব পেলাম/ আমাদের নদীগুলো জলে ভরা থাকে বলে/ পুরুষেরা ক্রমাগত রহস্যলীলায় পিতা হয়।’ (জলজন্ম)।

হাসনাত শোয়েব এ দশকের সম্ভাবনাময় কবি। তিনি কবিতার ভেতর পৃথিবীকে অন্য চোখে দেখেন। দৃষ্টান্ত- ‘পৃথিবীর সান্ধ্যভাষায় কথা বলছে মহাজাগতিক পাখিরা। আকাশের যতোটা নিচ থেকে তুমি আকাশ দেখো? সন্ধ্যার পর যেসব শব্দ বাতাসে ভাসে তা পতঙ্গধ্বনি মাত্র। পৃথিবীর যে কোন ভাষার পাখিরা তাই একা। নিজের আকাশটাকে- আকাশ তো কেবল পার্সিয়ান ফিল্মমেকারদের অসুখের নাম।’ (পৃথিবীর সান্ধ্যভাষা)। কবি এখানে শব্দের পর শব্দের সুষমা সাজিয়ে চমৎকার অনুসঙ্গে কাব্যরচনা করেন। তবে টানা গদ্যের ফর্ম গ্রহণ করলেও কবি উত্তরাধুনিকতা মেনে নেননি।

এ সময়ের কবি পলিয়ার ওয়াহিদ। তাঁর কবিতা- ‘গম বনে মানুষ হলাম- আমি তেতো শাক/ আকাশ উত্তীর্ণ হয়ে বুঝি/ ভুলে গেছি- মাটিবর্তী মানুষের গান!’ (মাটিয়ালি মন)। চমৎকার প্রেক্ষাপটের একটি মাটি ঘেঁষা কবিতা। কবির চিন্তা আর চিত্রপট যে কোন পাঠককে স্পর্শ করবে। এ কবির কবিতায় একটা নিজস্ব ঘরোনা আছে।

জব্বার আল নাঈম এর কবিতায় সমকালীন চিন্তার প্রতিফলন ঘটে। শ্রেণি আর বর্ণবাদ বিরোধী চেতনার উজ্জ্বল ছবি তার কবিতা। যুগপৎ চিন্তার দ্রোহে এই কবির কবিতার শরীর শিল্পের ধারক। দৃষ্টান্ত- একজন কালো মানুষের সামনে প্লেটভর্তি শাদাভাত!/ কালো কালি লিখে শ্বেত ইতিহাস;/ পানির পাত্রের রূপ পাল্টায় প্রকৃতি!/ আমরা কালো চোখে সুন্দরের বর্ণনা লিখি।’ (বর্ণবাদ)।

সাম্প্রতিক সময়ের কবিতার বৈশিষ্ট্যই হলো স্বাতন্ত্র্য নির্মিতি। বলা যায় কাব্যের রোমান্টিক ধরন-ধারণ সম্পূর্ণ ভিন্নতা পাচ্ছে। একজন প্রকৃত কবির পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা এবং সর্বোপরি পূর্বোক্ত কবিদের কাব্যদর্শন, সৌন্দর্য ও সংহার রক্ষায়। আর এখান থেকেই সাম্প্রতিক কবির বহুমাত্রিক কাব্য প্রবণতার ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক উভয় দিক উন্মোচন করা সম্ভব। আধুনা তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক পরিবর্তন ও প্রকাশনা ব্যবস্থার সীমাহীন উন্নতি সাধন হয়েছে, এর থেকে মুখ ফেরানো কঠিন। এক্ষেত্রে কবিকে তাঁর অন্তর শক্তির ওপর ভর করে এগুতে হয়।