দ্বিতীয় বেদনা, তৃতীয় উপলব্ধি ॥ শফিক হাসান




কবিতা যদি অনিরাময় একটি অসুখ হয়, বই প্রকাশের বাসনাকেও বোধকরি এর বাইরে রাখার সুযোগ নেই। শুধু নিজের মতো লিখে গেলে, বই প্রকাশ না করলে কী ক্ষতি হয় একজন লেখকের? তিনি কি অলেখক হিসেবে বিবেচিত হবেন?
আদতে বইয়ের সঙ্গে লেখক হয়ে ওঠার একটা ব্যাপার থাকেই। বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে লিখে একজনের পক্ষে লেখক হয়ে ওঠা কঠিন। পাঠকেরও এত দায় পড়েনি, খুঁজে-বেছে লেখককে যথাস্থানে বসিয়ে দেবে। বইয়ের ভেতরেই থাকে লেখকের রকমারি ভাবনার নির্যাস। ক্ষমতার নিদর্শন। তার রুচি, উপলব্ধি, বোধ এসব সনাক্ত করতে বইয়ের বিকল্প হয় না। সব লেখা লেখকের প্রিয়ও নয়। শেষপর্যন্ত মান বিচারে সেরা লেখাটিই সংকলনের স্থান পায়। প্রয়োজন বোধে প্রকাশিত লেখাকে লেখক আবার লেখেন, পুনর্লিখন করেন বা আমূল বদলে দেন।

প্রথম বই কোনটি, এমন প্রশ্ন কেউ আমাকে করলে তা আমার বিব্রত বোধ করার জন্য যথেষ্ট। ২০১৩ সালে বইমেলায় প্রকাশিত হয় আমার দুটি বই। যেখানে একটিও হওয়ার কথা নয়, সেখানে দুটি! তালগোল পাকানোর মতো অবস্থা। প্রথম বইয়ের সঙ্গে মিশে থাকে লেখকের হাসি-কান্নার ইতিহাস। পাঠকের দরবারে লেখকের স্থানও অনেকাংশে নির্ধারণ হয়ে যায় এসময়েই। অমর একুশে গ্রন্থমেলায় একত্রে প্রকাশিত দুটি বই হচ্ছেÑ গল্পগ্রন্থ : প্রতিদিন একটি খুন, রম্যগল্পগ্রন্থ : সবার উপরে ছাগল সত্য। দুটি বই-ই আমাকে বিস্তর আনন্দ-বেদনায় ভাসিয়েছে, ডুবিয়েছে। তবে আনন্দ একসময় ফিকে হয়ে এলেও বেদনা রেখে গেছে গভীর ক্ষত। সেই ক্ষতে এখনো, অমাবস্যা রাতে ব্যথা জানান দেয়। বইমেলার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তাতে পুড়ে যায় সম্ভবত ২৩টি স্টল।

আমার দুটি বইয়ের প্রকাশনীই ভুঁইফোড়। একজন সৌখিন, অন্যজন বাণিজ্যিক প্রকাশক। মেলায় তাদের স্টল নেই। ‘প্রতিদিন একটি খুন’ গল্পগ্রন্থের যারা পরিবেশক, মেলায় ২২ ফেব্রুয়ারি সে স্টলে বইটি ওঠে, কিন্তু ও রাতেই অগ্নিকাণ্ডে স্টলে থাকা সব বই পুড়ে যায়। বইটি ছিল পাঁচ ফর্মার। ফর্মা মেলানোর জন্য গল্পের অধ্যায় নতুন পৃষ্ঠা থেকে শুরু করা হয়েছে। অথচ প্রকাশক চাইলে বইটি বাড়িয়ে ছয় ফর্মা কিংবা কমিয়ে সাড়ে চার ফর্মায়ও আনতে পারতেন। কিন্তু তা না করে, বইয়ের আকার ছোট রাখতে বাদ দিয়েছেন কিছু গল্প। আবার ফর্মা মেলানোর জন্য এমন কিম্ভুত মেকআপ দেওয়া হয়, যা অপ্রত্যাশিত। বইয়ের পাতা ঢেউ খেলানো। পুরনো স্যাঁতস্যাঁতে কাগজে ছাপলে এমন হয়। অনেক সময় প্রেসের গাফিলতির কারণেও। কম্পিউটারের ভার্সনজনিত সমস্যায় ‘ণ্ড’ (ণ+ড) ভেঙেছে। দেখতে না চাইলেও প্রকাশক ট্রেসিংয়ের প্রিন্ট দেখিয়েছিলেন। ফন্ট ভাঙার বিষয়টি তাকে জানালে, বলেছিলেন ‘এটা ঠিক করব। রাতে আমিও শুরু থেকে শেষপর্যন্ত চেক দেব। দেখব অন্য কোনো সমস্যা আছে কিনা’। পরে সেসবের আর কিছুই ঠিক করেননি। হয়ত আমাকে খুশি করতেই এসব বলেছিলেন। চেক করার বিষয়টিও ছিল নিছক কথার কথা।

‘সবার উপরে ছাগল সত্য’ রম্যগল্পের বই। বিভিন্ন ফান ম্যাগাজিনসহ নানা জায়গায় প্রকাশিত লেখার সংকলন। প্রকাশককে প্রস্তুত করে দিয়েছিলাম চার ফর্মার বই। প্রকাশ হওয়ার পরে দেখা গেল সেটা তিন ফর্মা! আমাকে না জানিয়েই পৃষ্ঠাসংখ্যা কমানো হয়েছে। অথচ ‘পুস্তিকা’ প্রকাশের পক্ষপাতী ছিলাম না, এখনো নই। পরে জানা গেল, আসল রহস্য। বাংলা একাডেমিতে স্টলের আবেদন করার শর্ত হিসেবে চলতি বছরে নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রকাশিত বই থাকতে হয়। স্টল পাওয়ার চালাকিতে প্রকাশক আমাকে বলির পাঁঠা বানিয়েছেন। এমন আরও অনেককে। যেনতেনভাবে ‘বইয়ের’ সংখ্যা বাড়ানোই ছিল তার লক্ষ্য। সেখানেও বড় কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু ইনারে পর্যাপ্ত পৃষ্ঠা না রাখা, না জানিয়ে এক ফর্মা কমিয়ে ফেলা এসব ভালো লাগেনি। শেষপর্যন্ত অবশ্য তার ভাগ্যে শিকা ছেঁড়েনি; মেলেনি স্টল। বইটি বিক্রি হয়েছে লিটলম্যাগ চত্বরের বয়রাতলায়। ফিনফিনে বইটির দাম রাখা হয় ১২০ টাকা। ‘ন্যায্য মূল্য’ হতে পারতো ৭০/৮০ টাকা। উচ্চমূল্যে বই ক্রয়ের কথা বন্ধুবর মাইনুল এইচ সিরাজী, শিরীন সুলতানা সম্পা জানান। প্রকাশককে দামের বিষয়ে জানালে তিনি বলেন, ‘বেশি লিখলেও কমিশন বেশি দিচ্ছি। ৫০ পার্সেন্ট ছাড় দিয়ে দাম ৬০ টাকা’। অথচ চেনা-জানা কেউই ৯০ টাকার কমে কেনার সুযোগ পাননি। একটি বই থেকেও নেই, অন্যটির গলাকাটা মূল্য। পুড়ে যাওয়া স্টল পুনরায় নির্মাণ করা যায়নি। সুতরাং বইটি কেঁদেছে অচেনা বন্দরে।

সবার উপরে ছাগল সত্য রম্যগল্পগ্রন্থটির প্রচ্ছদ করেছিল প্রথম আলোর ফান ম্যাগাজিন আলপিন’র কার্টুনিস্ট আরিফুর রহমান। ততদিনে সে নরওয়ে’তে স্থায়ী। সেখান থেকেই ইমেইলে প্রচ্ছদ পাঠায়। প্রতিদিন একটি খুন গল্পগ্রন্থের প্রচ্ছদ করেছিলেন পীযুষ দস্তিদার। তাকে সৌজন্য কপি দিতে গেলে বলেন, ‘বইটির কিছু রিভিউ করাও। প্রচার-প্রচারণাও জরুরি।’
উত্তর দিলাম, ‘আমার বইয়ের রিভিউ ছাপবে কে?’
পীযুষদা শীর্ষস্থানীয় একটি দৈনিকের কথা উল্লেখ করে বললেন, ‘সাহিত্য সম্পাদক আমার ঘনিষ্ঠ। তুমি ইমেইলে আমার কথা লিখবে’।
নাদিম মজিদকে বলার পর তিনি ছোট্ট একটি গ্রন্থালোচনা লিখে দিলেন। সাময়িকীতে পাঠালাম। ছাপাও হল কয়েক মাস পরে। খবরটা পীযুষদাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করলাম। সেলফোনে কল করে তাকে জানাতেই বললেন, ‘আমি জানি বিষয়টা। ও (সাহিত্য সম্পাদক) কল করে আমার কাছ থেকে সত্যতা নিশ্চিত হয়েছে’। তব্দা মেরে যাই সাহিত্য সম্পাদকের ‘অনুসন্ধান’ দেখে। দেড়-দুই শ’ শব্দের লেখাটি তিনি ‘বিশ্বাস’ কিংবা ‘নিজ দায়িত্বে’ ছাপতে পারেন নি। সম্পাদক-চরিত্রের ওই অবিশ্বাসের ক্ষত এখনো আমাকে বিপর্যস্ত করে।

বইটির দ্বিতীয় রিভিউ ছাপা হয় সেবা প্রকাশনীর সহযোগী মাসিক ম্যাগাজিন রহস্যপত্রিকায়। এরপরও বেশ কিছু আলোচনা লিখেছেন কেউ কেউ। বইটি উৎসর্গ করি জনপ্রিয় লেখক সুমন্ত আসলামকে। ‘সবার উপরে ছাগল সত্য’ উৎসর্গ করা হয় আমার ভাগ্নে-ভাগ্নি, ভাতিজা ও ভাতিজিদের। মোট ১০৪ জনের ডাকনাম ছাপা হয়েছিল। প্রকাশক কিংবা মেকআপম্যানের উটকো মাতব্বরিতে উৎসর্গপত্রের নান্দনিকতা রক্ষিত হয়নি। এতজনকে উৎসর্গ করার পেছনে একটি গল্প ছিল। বড় খালাম্মা মারা গেলে, তাঁকে শেষ দেখা দেখতে গিয়েছি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। সেখানেই অনেকের সঙ্গে দেখা। এরা আমারই নিকটাত্মীয় অথচ জীবনে কারও সঙ্গে দেখাই হয়নি। এক খালাত বোনের ছেলে আবার একটি ব্যাংকের ম্যানেজার। দেখা হল তার সঙ্গেও। ভাবনাটা তখনই মাথায় আসে। অপরিচয়ের গণ্ডি পেরোতে সিদ্ধান্ত নেই এদেরই উৎসর্গ করব রম্যগল্পগ্রন্থটি। এক দঙ্গল দামালকে বই উৎসর্গ করার ফল খুব একটা সুখকর ছিল না। কেউ কেউ গালমন্দও করেছে এমন ‘উদ্ভট’ উৎসর্গে। একদিন লিটলম্যাগ চত্বরে বসে, নিঝুম বিকেল। এসময় আসে এক প্রেমিক জুটি। মেয়েটি হাতে তুলে নেয় বইটি। উৎসর্গপত্রে নামের বহর দেখে বয়ফ্রেন্ডকে বলে, ‘ও (লেখক) ইচ্ছা করলে আমার নামটাও রাখতে পারত।’
তরুণটি বোধহয় সনাক্ত করতে পারে আমাকে। তাই প্রেমিকাকে ঝাড়ি দিয়ে সামনে হাঁটা ধরেল দুজনে। দুই বছর পর বইটি অন্য একটি প্রকাশনী থেকে বের হয়। সে মুদ্রণও শেষের পথে। আগামী বছর হয়ত নতুন সংস্করণ আসবে। অন্যদিকে প্রতিদিন একটি খুন গল্পগ্রন্থের তিনটি সংস্করণ বেরিয়েছে এপর্যন্ত। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পরই আবিষ্কার করি, কিছু লিখতে পারিনি। পাপমোচন করতে দ্বিতীয় সংস্করণ। তাতেও তৃপ্ত হতে পারিনি বলে তৃতীয় সংস্করণে হাত দিতে হয়। প্রতিটি সংস্করণেই ভিন্ন প্রকাশক; প্রয়োজনীয় সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত করেছি নতুন নতুন গল্পও। ছোটগল্পগ্রন্থের ফ্ল্যাপ লিখে দিয়েছিলেন এমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান; রম্যগল্পগ্রন্থের ফ্ল্যাপ উন্মাদ সম্পাদক আহসান হাবীব।
দুটি বই-ই পর্যায়ক্রমে জাতীয় গণগ্রন্থাগার ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বাৎসরিক বই ক্রয় প্রকল্পে নিয়েছিল। অবাক কাণ্ড, প্রতিদিন একটি খুনের দুই কপি পৌঁছেছিল যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কংগ্রেসে। ওখান থেকে কীভাবে অর্ডার এল তখনো বুঝিনি, এখনো জানি না। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্রকৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী লেখক সৈকত হাবিব প্রথম দিকে কাছের মানুষদের মজা করে বলতেন, ‘এই সেই লেখক, যার বই লাইব্রেরি অব কংগ্রেস কেনে।’

প্রকাশকের কাছে ফিরি আবার। দুটি বইয়ের প্রকাশকই আমার স্বল্প পরিচিত। অচেনা গন্ধ থাকতেই তারা প্রস্তাব দিয়েছিলেন বই করবেন। ‘প্রতিদিন একটি খুন’ বইয়ের প্রকাশক জেলা শহর থেকে ঢাকায় এসে থিতু হওয়ার চেষ্টা করছেন তখন। এক বন্ধু পরিচয় করিয়ে দিলেন তার সঙ্গে। এর কিছুদিন পরই তিনি বললেন, ‘আমি তরুণদের প্রাধান্য দিই। আপনার বই করতে চাই’।
নিকট অতীতে প্রকাশকদের দেওয়া অপমানের গ্লানি ভুলে আনন্দিত হ্ই। এতদিনে একজন মহান মানুষ পাওয়া গেল তাহলে। পাণ্ডুলিপি হস্তান্তর শেষ। ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখ যায়, ১৫ তারিখ যায় বই আর আসে না। যেহেতু লেনদেন নেই জোর গলায় কিছু বলতেও পারি না। ১৭ তারিখে প্রকাশক কল দিলেন। কিছু টাকা ধার চান তিনি। বেশ বড় অঙ্কের টাকা। তখন একটি মাসিক ম্যাগাজিনে কাজ করি। বেতন পাই ১০ হাজার টাকা। উদ্বৃত্ত টাকা তাই থাকার কথাও নয়। আমি যতই পারব না বলি, প্রকাশক আবার কল করেন। করতেই থাকেন। নানা সমস্যা দেখান। একপর্যায়ে বুঝে যাই, বইকে হাতিয়ার করে টাকা ধার চাইছেন জোরালভাবে। ত্যক্তবিরক্ত হয়ে ফেব্রুয়ারি মাসের বেতনের পুরো ১০ হাজার টাকা তুলে দিই তার হাতে। যদিও জানতাম না, কপর্দকশূন্য অবস্থায় এই নিষ্ঠুর ঢাকা শহরে কতদিন চলতে পারব। বস্তুত, টাকা পাওয়ার পরপরই শুরু হয় বই প্রকাশের তোড়জোড়। বই তো বের হল, পুড়েও গেল- এদিকে ধার দেওয়া টাকা তো আর ফেরত পাই না। দুই মাস নীরব অপেক্ষার পর বুঝে যাই, এই ‘ধারের’ টাকা আর ফেরত পাওয়া যাবে না। পর্যায়ক্রমে বই কিনে কিনেই সমুদয় টাকা পরিশোধ হয়।

‘সবার উপরে ছাগল সত্য’ বইটি স্টল পাওয়ার জন্য ‘সংখ্যা’ হিসেবে কাজ করেছে, আগেই বলেছি। ওই সময় ফকিরাপুলে ঘনঘন যেতে হত আমাকে। প্রকাশক কাজ করাতেন দুই জায়গায়। আরামবাগে গ্রাফিক্সের কাজ, ফকিরাপুলে কম্পোজের। গ্রাফিক্সের কাজ বলতে ইন্টারনেট থেকে ছবি নামিয়ে প্রচ্ছদ বানানো পরবর্তী আউটপুট নেওয়া। ফকিরাপুলের গরম পানির গলি পেরিয়ে সুশীতল একটি জায়গায় কম্পিউটারের দোকানে কম্পোজ ও প্রুফের কাজ সারতেন প্রকাশক। সেই দোকানের কম্পোজিটর একজন মহিলা। একদিন প্রকাশক জানালেন, লেখকদের পাণ্ডুলিপি কম্পোজ করতে করতে ভদ্রমহিলা নিজেও লেখক হয়ে গেছেন। লিখে ফেলেছেন একটি উপন্যাস ‘বেদনার বৃত্তে’। তাকে বললাম, ‘আপনার বই আমি কিনব।’ নবীন লেখক মৃদু হাসলেন খুশিতে। পরে বোধহয় সেই বই আর বের হয়নি। প্রকাশকেরও মোহভঙ্গ হওয়ায় ধীরে ধীরে সরে এলেন প্রকাশনা থেকে। পরের বছরের বইমেলায় তার টিকিটিও দেখিনি।

আমার বই করার স্বপ্ন জেগেছিল কিশোরবেলায়, চট্টগ্রামে। প্রথমে বইয়ের কথা উচ্চারণ করেছিলেন ইউসুফ স্যার। তিনি কীভাবে যেন আমার লেখালেখির বিষয়টা জেনেছিলেন। একদিন ডেকে পাঠান। তখন সাপ্তাহিক চলতিপত্রে ‘গর্দভ কথন’ নামে রম্য কলাম লিখি নিয়মিত। স্যার একদিন আমার উপস্থিতিতে অন্য শিক্ষকদের কলামটা পড়ে শোনান। শেষমেষ এও বলেন, ‘শফিক তো এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক’।
আমার অপরিণত আবেগ ছিল সত্য, তাই বলে স্যারের অলীক উপাধিতে খুশি হওয়ার মতো অবস্থা ছিল না।
কিছুদিন পরে স্যারের কাছে আবার গেলে বললেন, ‘তোমার একটি বই প্রকাশ করতে কত টাকা লাগবে?’
আন্দাজে ঢিল ছোড়ার মতো করে বলি, ‘এই হাজার দশেক!’
স্যার বললেন, ‘ঠিক আছে। প্রস্তুতি নাও। প্রয়োজনে আজাদীর প্রদীপকে এখানে ডাকিয়ে এনে ছবি আঁকিয়ে নেব’। চট্টগ্রামের স্থানীয় দৈনিক আজাদীর ফিচার পাতাগুলোর অলংকরণ করতেন প্রদীপ সাহা। তিনি কেন আমার মতো আনাড়ি একজনের জন্য কাজ করবেন; তাও নিজ বলয়ের বাইরে এসে। অনুভূতি স্পষ্ট না হলেও এটুকু বুঝেছিলাম, এভাবে হয় না। শিল্পীরা এত সহজ ও সস্তা নন। একসময় ঝিমিয়ে পড়ে আবেগ। ইউসুফ স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়। ঢাকায় চলে আসি ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে। তারপর তো আরও বেশি দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। দেখা বা কথা হয়নি একবারও।

তিক্ত অভিজ্ঞতায় ফিরি আবার। ‘সবার উপরে ছাগল সত্য’র পরবর্তী (দ্বিতীয়) সংস্করণের প্রচ্ছদ যিনি করেন, রামপুরায় তার বাসার কাছে গিয়ে সিডিতে প্রচ্ছদ আনার সময়ে খামে ভরে সম্মানী দিয়ে আসি। পেমেন্ট দেওয়ার মাস খানেক পর তিনি জানান, একটি নোট জাল। সঙ্গে জাল টাকার বিষয়ে তিনি ফেসবুকেও পোস্ট দেন। লেখক-প্রকাশককে ঘায়েল করার এমন বড় সুযোগ পেয়ে হামলে পড়লেন অনেক ফেসবুকবাসী। যদিও এর আগে আমি কল করে জানিয়েছিলাম, আরেকটা ‘আসল নোট’ পৌঁছে দেব। তিনি জানান, লাগবে না। এখানে আমার কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল না। সেই তিনি যে পরে এমন রসাল স্ট্যাটাস দেবেন বুঝতে পারিনি। যেহেতু তোপের মুখে নিজের ‘আসামি পরিচয়’ প্রকাশ করার সুযোগ ছিল না, সব মন্তব্য-হুল হজম করি নীরবে। ‘প্রতিদিন একটি খুন’ গল্পগ্রন্থের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংস্করণের প্রচ্ছদ শিল্পী ছিলেন ধ্রুব এষ ও রাজিব রায়। এখানে অন্তত জাল নোটের (!) লেনদেন ছিল না।

কথায় কথা বাড়ে। রাত বাড়ে। দিন বাড়ে। শব্দ বাড়ে। কথা ফুরায় না। প্রথম বই কোনটি, কোনটি বলব প্রথম এ বিষয়ে বরাবরই দোটানায় ভুগি। তাই প্রথম বই খুঁজতে যাই না। দুটিকেই প্রথম বই হিসেবে বিবেচনা করি। প্রথম দুই বইয়ে প্রচুর ভুলভাল ছিল সত্য, তবে সেটা আমার জন্য একধরনের শিক্ষা। বেদনা তো আনন্দেরই সহোদর! প্রকাশকদের উপরেও এখন আর কোনো খেদ বা ক্ষোভ নেই। যেভাবেই হোক, তারা বই প্রকাশ করেছিলেন বলেই তো পায়ের নিচে মাটি পেয়েছি। বুঝতে শিখেছি, ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, যেতে হবে কত দূরে; কোন পথে।