‘দ্য গোল্ড রাশ’ : আবিষ্কার ও নির্মাণে চার্লি চ্যাপলিন ॥ মিনতি ঘোষ

স্যার চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিন জুনিয়র, জগৎখ্যাত চার্লি চ্যাপলিন নামে । জন্ম ১৬ এপ্রিল, ১৮৮৯। বর্ণাঢ্য জীবনে শীর্ষবিন্দু ছুঁয়েছেন খ্যাতি ও বিতর্ক দুয়েরই। শিশুশিল্পী হিসেবে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন রঙ্গশালায় ১৪ বছর বয়সে কাজ শুরু। পরে মঞ্চ ও কৌতুকাভিনেতা। হলিউড চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হন ১৯ বছর বয়সে। শুরু থেকেই নিজের চলচ্চিত্রগুলো পরিচালনা করতেন। নির্বাক চলচ্চিত্র যুগের অন্যতম মৌলিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব চ্যাপলিনের অমর কীর্তির মাঝে রয়েছে দ্য গোল্ড রাশ, সিটি লাইট্স, দ্য কিড, মডার্ন টাইমস, দ্য সার্কাস ও দ্য গ্রেট ডিক্টেটর। অভিনীত শেষ ছবি ‘এ কাউন্টেন ফ্রম হংকং’। অভিনয় করেছেন আশির অধিক চলচ্চিত্রে। মৃত্যু ২৫ ডিসেম্বর ১৯৭৭। প্রয়াণ দিবসে মিনতি ঘোষ- এর গদ্যে জগৎখ্যাত এই শিল্পীর স্মৃতিতে শ্রদ্ধা। স.স.


১৯২৫ সালের ২৬ জুন হলিউডের ইজিপসিয়ান থিয়েটারে দ‌্য গোল্ড রাশের প্রথম প্রদর্শন- প্রিমিয়ার শো। সে এক ধুন্ধুমার কাণ্ড। চার্লি চ‌্যাপলিনের ছবি, প্রথম শো… সমস্ত টিকিট নিঃশেষ। এক সপ্তাহ ধরে ঐ হলের সামনের অংশ অত‌্যন্ত সুদক্ষ শিল্পীরা ধৈর্যের সঙ্গে সাজালেন, যাতে মানুষ যে ছবিটি দেখতে চলেছেন, তার দৃশ‌্যাবলী সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়। ইজিপসিয়ান থিয়েটারের সিড গ্রাওম‌্যান (Sid Grauman) এই ছবিটিকে ঐতিহাসিক করার জন‌্য ছবি শুরুর আগেই আর এক দৃশ‌্যের অবতারণা করলেন। পর্দা উঠতেই দেখা গেলো বরফ জমাট উত্তর গোলার্ধের ছবি, সীল মাছেরা রাশি রাশি বরফের পর ভীড় করে আছে, নড়ছে চড়ছে, বরফ খণ্ডের ওপর ওঠার চেষ্টা করছে… পর মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে নৃত‌্যরত এস্কিমো মেয়েরাও তাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে। এরপর আসছে বরফের সঙ্গে সামঞ্জস‌্য রেখে খুব ঝকমকে পোষাক পরা আকর্ষণীয়া মেয়েরা, তারাও অতি চমৎকার নাচছে… এর পেছনে আইস স্কেটিংয়ের দল, মিস লিলিয়ান পাওয়েলের বেলুন শো এবং সর্বশেষে মন্টি কার্লো ডান্স হলের দৃশ‌্য। যেমন আশা করা গিয়েছিল- সেই ছোটখাট মানুষটির নানা রকম মজার, হাস‌্যকর বোকামির পসরা নিয়ে শুরু হলো দ‌্য গোল্ড রাশ। কিন্তু ছবি যত এগোয় একটু যেন অন‌্য রকম লাগছে। সোনার খনি খুঁজতে গিয়ে বোকা লোকটা একের পর এক বিশাল ঠোক্কর খাচ্ছে- ঠোক্কর খেয়েও বোকা হাসিটা অম্লান।

ক্রিসমাসের দিন নিজের সাধ‌্য মতো খাদ‌্য, পানীয়ের ব‌্যবস্থা করে বন্ধুর ছোট্ট কেবিনে প্রেমিকার জন‌্য অপেক্ষারত চার্লি- এদিকে প্রেমিকা ভুলেই গেছে নিমন্ত্রণের কথা- অপেক্ষা করতে করতে এক সময় ঘুমিয়েই পরে চার্লি, তার স্বপ্নে বল ডান্স, ফর্কে বেঁধানো ব্রেডের টুকরো নৃত‌্যরত পায়ের উড়ান… এ এক অনবদ‌্য দৃশ‌্য। অস্কার বিজয়ী লেখক-পরিচালক মাইকেল হাজানা ভিসিয়াস (Michel Hazana Vicius) বলেছিলেন, ‘the sequence with the bread is like the Mona Lisa’.)

অন‌্য আর একটি দৃশ‌্য দর্শককে সাময়িক আনন্দ দিলেও তার মধ‌্যে ফুটে ওঠে জৈবিক তাড়নার এক অত‌্যন্ত নিষ্ঠুর ছবি। ছোট্টখাট্ট, নিরীহ চার্লিকে ক্ষুধার্ত বিগ জিম ম‌্যাক রূপী বিশালদেহী ম‌্যাক সোয়াইন সম্মোহিতের মতো মুরগী ভাবছে… বা খিদের কারণে বুট সিদ্ধ করে খাওয়া- বুটের উপরের অপেক্ষাকৃত নরম অংশ ম‌্যাককে দেয় চার্লি, যেন মাংসের ফিলেট, জুতোর পেরেক যেন মাংসের হাড়- তাও ম‌্যাককে দিতে চায়। আর একটি শ্বাস-রোধকারী দৃশ‌্য- প্রবল তুষার ঝড়ে খাদের কিনারায় দুলতে থাকা কুঁড়ে- যাতে আশ্রয় নিয়েছে ম‌্যাক আর চার্লি- যে কোন মুহূর্তে তা উপড়ে নিচের খাদে গিয়ে পড়তে পারে… একবার এপাশ, আরেক বার ওপাশে গিয়ে ভারসাম‌্য রাখছে ঐ লিটল ম‌্যান।

সেদিন ছবি প্রদর্শনের পর খুব উত্তেজিত চার্লি চ‌্যাপলিন- আবেগে ফুটছেন। স্বভাব-নার্ভাস চার্লি কিন্তু সেইদিন খুব বলিষ্ঠ ভাবে তাঁর এই অক্ষয় কীর্তি দ‌্য গোল্ড রাশের বিষয়ে বক্তৃতা দেন। নায়িকা জর্জিয়া (​Georgia) বলেন, ‘He really felt it was the greatest picture he had made. He was quite satisfied’. তিনি সত‌্যি সত‌্যি এ ছবিকে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ ছবি বলে মনে করেছেন। তিনি খুবই সন্তুষ্ট। এ ছবির কথা তিনি ভাবতে শুরু করেছিলেন ১৯২৩ সালের সেপ্টেম্বর কি অক্টোবর মাস থেকে। এই সময়ে কোন একদিন তাঁর ইউনাইটেড আর্টিস্টের পার্টনার ডগলাস ফেয়ারব‌্যাঙ্কস এবং তাঁর স্ত্রী মেরী পিকফোর্ডের নিমন্ত্রণে ব্রেকফাস্টে তাঁদের বাড়িতে গেছেন। ব্রেকফাস্টের পর স্টিরিওগ্রামে ছবি দেখতে দেখতে তাঁকে ভীষণ ভাবে নাড়িয়ে দেয় সীমাহীন লাইনে দাঁড়ানো ভাগ‌্যান্বেষীদের দল- যারা ১৮৯৮ সালে দুরাগম‌্য চিলকূট পাস অতিক্রম করার চেষ্টা করছে- ক্লোনডাইক (Klondike) স্বর্ণখনি তাদের অভীষ্ট স্থান। এ ছাড়া আর একটি বইও তাঁকে প্রবল ভাবে ছবি করতে আগ্রহী করে তোলে।

১৮৪৬ সালে মালগাড়িতে করে উনত্রিশ জন পুরুষ, আঠার জন মহিলা এবং তেতাল্লিশ জনের একটি দল নিয়ে জর্জ ডোনার (George Donner) কলিফোর্নিয়ার দিকে যাত্রা করেন। পাঁচ-ছ মাস সময় লাগে যেতে। কিন্তু পঞ্চম মাসে শুরু হয় প্রবল তুষার ঝড়। তাঁরা সিয়েরা নেভাডায় আটকে পড়েন। দশ জন পুরুষ আর পাঁচ জন মহিলার একটি দল সাহায‌্য আনার জন‌্য পাহাড় ডিঙানোর জন‌্য যাত্রা করে, তাদের মধ‌্যে পাঁচ জন পুরুষ পথেই মারা যায়- অন‌্যরা বেঁচে থাকে তাদের মাংস খেয়ে। কোন সাহায‌্য আসার আগেই যারা ক‌্যাম্পে ছিল, তাদের অনেকেই মারা যায়- এখানেও যারা বেঁচে থাকলো তারা ঐ বন্ধুদের মাংস খেয়ে, মরা কুকুর, মরা গরুর চামড়া, এমনকি নিজেদের জুতোর চামড়া খেয়ে বেঁচে থাকলো- সাতাশি জনের মধ‌্যে বেঁচে থাকলো মাত্র বিয়াল্লিশ জন। চার্লি ঠিক করলেন এই বিষয় নিয়েই তিনি ছবি করবেন। তিনি এই রকমই একটি ছবির মধ‌্যে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘tragedy stimulates the spirit of ridicule… ridicule, I suppose, is an attitude of defiance : we must laugh in the face of our helplessness against the force of nature’. সোজা কথায় তিনি বলতে চাইলেন, প্রাকৃতিক শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের অসহায় অবস্থার সামনে আমাদের প্রাণ খুলে হাসতে হবে। যা হোক কাজ শুরু করলেন চার্লি।

১৯২৩ সালের ডিসেম্বরের তিন তারিখে প্রথম ড্রাফট জমা দিলেন। ১৯২৪-এর ফেব্রুয়ারীতে শুরু হয় স‌্যুটিং। প্রথমে ট্রাকির বরফ ঢাকা সিয়েরা নেভাডায় শুরু হয় কাজ। সোনার খনির সন্ধানে চলেছে ভাগ‌্যান্বেষীরা- ছশো এক্সট্রা নিয়ে আসা হলো সাক্রামান্টো শহর থেকে- ডোনার সামিটের কর্মচারীরা ঐ একটা দৃশ‌্যের জন‌্য পথ তৈরী করে দিলো। কিন্তু এখানকার প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় সবাই অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকলো। ফেব্রুয়ারীর কুড়ি তারিখ থেকে চব্বিশ তারিখ পর্যন্ত স‌্যুটিং চললো। চার্লিও ইনফ্লুয়েনজায় আক্রান্ত হয়ে হসপিটালে ভর্তি হলেন। এবার স্টুডিওতে ফিরে আসতে হলো। স্টুডিওতে ফিরে এসে দেখা গেল বুড হোয়াইট তাঁর ভালুক নিয়ে হাজির, কয়েকদিন পর নিয়েমেয়ার এলেন তাঁর দশটি কুকুর নিয়ে। ইতিমধ‌্যে দ‌্য কিডের সেই স্বপ্নপরী লিলিটা ম‌্যাকমারিকে নায়িকা হিসাবে চুক্তিবদ্ধ করা হয়েছে- যাঁর নতুন পেশাগত নাম হলো লিটা গ্রে, সপ্তাহে পঁচাত্তর ডলারের বিনিময়ে, যদিও পরবর্তী সময়ে চার্লির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার ফলে তিনি গর্ভবতী হন এবং তাঁর জায়গা নেন জর্জিয়া হেল (Georgia Hale)। স্টুডিওর মধ‌্যে বরফ রাজ‌্য করার জন‌্য ধুন্ধুমার কাণ্ড শুরু হয়- প্রচুর কাঠ, কৃত্রিম বরফ, আর তুষারের জন‌্য আনা হয় দুশো টন প্লাস্টার, দুশো পঁচিশ টন নুন, একশ ব‌্যারেল ময়দা। তুষার ঝড়ের জন‌্য আরো চার গাড়ি কনফেট্টি (কাগজের নকল মিস্টি)। ছবি শেষ হতে সতের মাস সময় লাগে- যেখানে সেই সময় মাত্র তিরিশ দিনের মধ‌্যে এক একটি ছবি শেষ হতো। খরচ হয় ৯২৩,৮৮৬.৪৫ ডলার। ২৩০০০০ ফিট ফিল্ম তোলা হয়, পরে অবশ‌্য চার্লি এডিট করে ১০০০ ফিটে আনেন, শুধু বুটের দৃশ‌্যই তোলা হয় তেষট্টি বার।

ছবি বড় বড় শহরে ভালই চলে, কিন্তু অন‌্যত্র ফ্লপ করে- কেননা মানুষ, চার্লিকে হাসির খোরাক হিসাবেই প্রথমে গ্রহণ করেছিল, কিন্তু আপাত হাসির মোড়কে চার্লি চ‌্যাপলিন মানুষের কয়েকটি মৌলিক চাহিদাকে এ ছবিতে তুলে ধরতে চেয়েছেন- খাদ‌্য, অর্থ, গ্রহণযোগ‌্যতা, ভালবাসা ও প্রেম। আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউটের মতে পৃথিবীর একশ শ্রেষ্ঠ চলচিত্রের মধ‌্যে দ‌্য গোল্ড রাশ একটি। বিখ‌্যাত চিত্র সমালোচক জেফ্রি ভ‌্যানস (Jeffry Vance)এই ছবিকে বলেছেন, ‘The most spectacular image of silent film comedy’.

আজকের দিনে, সর্বকালের এই অন‌্যতম শ্রেষ্ঠ চলচিত্রকার চার্লি চ‌্যাপলিনকে অন্তরের শ্রদ্ধা জানাই ।

( তথ‌্য সূত্র : David Robinson – Chaplin : His Life and art এবং গুগুল)