নদীমগ্ন বাউলের গান : মাটিগন্ধা মানুষের আখ্যান ॥ মীর রবি



‘মায়ের মনের যতো কথা’ হয়ে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি মেলবন্ধনের সুর তোলে। বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্যের নানা পর্যায়ের গমন-আগমনের ভেতর বস্তুবাদের ঊর্ধ্বে ভাবকল্পে শেকড়ের ঘ্রাণে স্ফূর্ত করে কাব্যাঙ্গন। বলা যায়, নির্দিষ্ট মতবাদে কবিতার যাত্রা বন্ধুর পথের আবার শেকড়চ্যুত যাত্রাও বিপথগামিতার নামান্তর-কিন্তু এরপরও কথা থাকে-সেই ভাববাদেরই। আমাদের আদিসত্তা ভাববাদ ব্যতিরেক নয়? ভাববাদ ও বস্তুবাদের দ্বান্দ্বিক তত্ত্বে না গিয়েই বলতে পারি বাংলা কবিতা ‘সহজ সত্যের মতো ঝলমলে’ রোদ। আর এই বাংলার মাটি গায়ে মেখে, রোদে গা এলিয়ে সহজ-সরল মানুষের জীবনের কথা লিখে গেছেন বাংলার লোককবিরা। আর সেই লোককবিদের লোকভাষাকে অন্তরে লালন করে যে কজন কবি আধুনিক বাংলা কবিতায় জয়ধ্বনি করে যাচ্ছেন, তাদের একজন মতিন রায়হান। বাউলস্বভাবী ভাষা ও বয়ানের ভেতর বুনন করেছেন কবিতার শরীর। ট্র্যাডিশনাল ধারার কবিতায় তার দখল দক্ষ কুমোরের মতোই। খুব সহজেই তার কবিতা এই কৃষিজ অঞ্চলের নারী-পুরুষের শ্রম ও ঘামের জীবনালেখ্য হয়ে ওঠে। তাই তিনি বলতে পারেন-‘কখনোবা নদীগুলো মানুষের বুকের উপর দিয়ে ছুটে যায়/মাঝেমধ্যে মৎস্য-শিশুরা থেকে থেকে কাদামাটিজলে মাথা ঠোকে/আর হিজলের ডালে বসে পানকৌড়ি কানিবক লোলুপ তাকায়।’ (এই কৃষিজনপদে)

আবহমান বাংলার রূপবৈচিত্র্য যে মায়ামমতায় অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে-সেই সঙ্গে আছে জীবনবাস্তবতা-তা তিনি নিপুণভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন তার কবিতায়; আবার প্রাকৃতিক বিপর্যয়-প্রকৃতির সংকটেও তিনি উচ্চারণ করেন-‘নদীরা হারিয়ে গেলে সবুজ শিশুরা শুধু কাঁদে/কান্নার আগুনে জ্বলে ধিকিধিকি সমুদয় স্মৃতি/কথা নয়, মুখ বুজে পড়ে থাকে দিকচিহ্ন, কিছুটা উদ্ধৃতি!’ (নদীবিষয়ক)

খুব সহজেই টের পাওয়া যায়-মতিন রায়হান বাংলার জল-বায়ু-মাটি থেকে কবিতার রসদ সংগ্রহ করেন। উপমা-উৎপ্রেক্ষা ব্যবহার ও শব্দরুচি তাকে ভিন্নতর অবস্থানে পৌঁছে দেয়-একেবারে গ্রামীণ সরলতার কাছে। যা থেকে আমরা ‘সহজ সরল প্রান্তজনা’র কবিও বলতে পারি তাকে। তিনি যেভাবে প্রকৃতিকে ‘সহজ গদ্যের মতো’ করে চেনেন বলে জানিয়েছেন-তেমনি বলেছেন নগর-জীবনের সঙ্গে গ্রামীণ-জীবনের অজ্ঞতার কথা। শহরজনকে দেখাতে চেয়েছেন চারদেয়ালের বাইরে থাকা বিশাল এক বাংলাকে। নদীবিধৌত বাংলার গ্রাম, গ্রামের মানুষজন ও তাদের সংস্কৃতিকে আলিঙ্গন-করা এই কবি পঙক্তিতে পঙক্তিতে বাঙালির জীবনযাপনের নানান আবহকে প্রতিপাদ্য করে তুলেছেন। নদী প্রসঙ্গ-মানুষের তৃষ্ণা-মান-অভিমান ও কান্নার গল্প হয়ে উঠেছে তার নদীমগ্ন কাব্যভুবন, মানুষের সঙ্গে যে নাড়ির টান-নদীর যে সম্পর্ক-সেই সম্পর্ককে সবুজ লোকালয় হতে সুদূর দিগন্তসীমায় মিলিয়ে বলেছেন-‘নদীশিকস্তি মানুষের সহজ-সরল প্রতিবেশী আমি’।

বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীই কৃষক। কৃষিপ্রধান এই জনগোষ্ঠীই আমাদের লোকসংস্কৃতির মূল ভিত্তি। তাদের মনস্তত্ত্বই প্রতিফলিত হয়েছে লোককৃষ্টিতে। এই প্রবহমান লোককৃষ্টি মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালির মানস প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করে শিল্প-সাহিত্যের ভেতর দিয়ে। প্রাবন্ধিক যতীন সরকারের ভাষায়-“লোকসাধারণ-সৃষ্ট সাহিত্যের মুদ্রিত রূপও আছে। বাজারে-বন্দরে প্রায়ই এক শ্রেণির ‘কবিতা’ বিক্রি হতে দেখা যায়। সুর করে এসব কবিতা পাঠ করে জনতাকে এগুলো কিনতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। এসব কবিতা লোক মনস্তত্ত্বের মূল্যবান আকর।” এই লোক মনস্তত্ত্বের যেসব সৃষ্টিকে মূল্যবান বলা হচ্ছে-তা আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যের স্বাক্ষর। কিন্তু আমরা সেইসব চিহ্নকে আধুনিক বাংলা কবিতায় কতটুকু ধারণ করেছি? জসীম উদ্দীন ও আল মাহমুদ ব্যতীত এইসব লোকসম্ভারকে আধুনিকীকরণে সেরূপভাবে কেউ এগিয়ে আসেননি। বাংলাদেশের কৃষকসমাজের যেসব স্মৃতিক্ষরণ-তা আমরা কবি মতিন রায়হানের কবিতাতেই এখন খুঁজে পাই। তাই তার পক্ষেই জীবনানন্দীয় ঘোরে বলা সম্ভব-‘আবার এসেছি ফিরে বাহুলগ্ন জীবনের তীরে/অদ্ভুত বোধেরা নাচে ধীরলয়ে ইশারা-ভাষায়/কারা খোঁজে আতিপাতি খররোদে মানুষের ভিড়ে/জীবন-নদীর ঢেউ দৃশ্যময় তুমুল আশায়…’ (দরিয়াগাথা)

মতিন রায়হান তার কবিতায় অযাচিত আবরণ বা অলংকারের আশ্রয় নেননি। তিনি তার কবিতায় পরিমিতিবোধের শর্তকে মান্য করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি কবিতায় আলোকিত অস্তিত্বের ধারক। যথার্থ পাঠক তার কবিতায় নদী ও বাউলের সহজিয়াতে শুধু মগ্ন হয়েই উঠবেন না-পাঠতৃপ্তিতেও মুগ্ধ হয়ে উঠবেন। সেই মুগ্ধতার পাঠ মিলবে নিম্নোক্ত কয়েকটি পঙ্ক্তিতে-‘ও নদী তোর বুকে জলের খেলা/জোয়ারভাটা, উথালপাথাল ঢেউ/নদীর স্বজন, পর ভাবে না কেউ/উজানে ধায় জীবননদীর ভেলা!’ (নদী)

বলতেই হয়-ছিলেন এক কবি-মতিন রায়হান-যিনি নগরের পথে গড়েছেন-কবিতার গ্রাম। ভোরের কুয়াশায় পা ভিজিয়ে, মুখে রোদ মেখে যিনি নগর থেকেই ‘সবুজ শস্যের প্রেম গোলাভরা ধান ঢেঁকির সানাই’-এ পৌঁছে গেছেন সোজন বাদিয়ার ঘাট, দেখিয়েছেন পল্লিজননীর মুখ-যেখানে ‘স্বপ্নে কিংবা পরাস্বপ্নে/নতুন ফসলের ঢেউ খেলে যায় মখমলি-রোদে/শুভবোধ আর শুভকথা যত/ছড়িয়ে পড়েছে দেখো পথে-প্রান্তরে’ (মনবাউল ও ডানাসত্য)-‘আদিগন্তরেখা ছুঁয়ে’ গড়ে তোলে কবির নিজস্ব ভুবন। এই ভুবনের সন্ধানেই কবি বলতে পারেন-‘মনবাউলের ডাক এলে সব ছেড়েছুড়ে যেতে পারি/যোজনবিজন পথ’।

কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন-‘কাব্যের ভেতর লোকশিক্ষা ইত্যাদি অর্ধনারীশ্বরের মতো একাত্ম হয়ে থাকে না; ঘাস, ফুল বা মানবীর প্রকট সৌন্দর্যের মতো নয়; তাদের সৌন্দর্যকে সার্থক করে কিন্তু তবুও সেই সৌন্দর্যের ভিতর গোপনভাবে বিধৃত রেখা উপরেখার মতো যে জিনিসগুলো মানবী বা ঘাসের সৌন্দর্যের আভার মতো রসগ্রাহীকে প্রথমে ও প্রধানভাবে মুগ্ধ করে না-কিন্তু পরে বিবেচিত হয়-অবসর তার বিচারককে তৃপ্ত করে।’ জীবনানন্দের মতকে সমর্থন করে মতিন রায়হানের কবিতাকে বিচার করলে বলা যায়-তার কবিতায় তৃপ্ত হতে গেলে শুধু প্রকৃতিকে দেখলে হবে না, প্রকৃতির সৌন্দর্যকেও শুধু অবলোকন করলেও হবে না-ঘাস, ফুল, লতা, পাখি, নদী ও মানুষ এসবের সামষ্টিকতার যে মানবীয় রসবোধ রয়েছে তাকেও অনুধাবন করতে হবে। যা বিধৃত হবে যথার্থ কাব্যমহিমায়। ‘নিত্যকার দিনযাপনের সমূহ আনন্দ ও ক্লেশ, রতিবিভ্রম’ সবকিছুকে ছাপিয়ে পৌঁছে দেবে মনের বিপুল ক্ষুধার জগতে।

জটিলতামুক্ত সহজ ও সরল পথই সুন্দরের। যেখানে সরলতা নিত্য খেলা করে-সেখানেই খুঁজে পাওয়া যায় সুন্দরের সুন্দরতম দিকটিকে। আর সেই সহজ সুন্দর খুঁজে পাওয়া যায় নাগরিক যন্ত্রণার বাইরে প্রকৃতির কাছে গেলে। কবি মতিন রায়হান তার ‘নদীমগ্ন বাউলের গান’ কবিতার বইয়ে ঠিক সেই জায়গাটিতে নিয়ে যান বারবার নদী ও মানুষের চাওয়া-পাওয়া, না পাওয়া, সুখ-দুঃখের ভেতর বাউলিয়া করে তোলে আমাদের নাগরিক মনকেও। ‘মেঘ ও মৃত্তিকার ঘ্রাণে’ বাউল-করা তার কবিতার মাঠে ছড়িয়ে পড়া যায় রাখালের হাতছাড়া হওয়া গরুর বাছুর বা বালিকার কাছ থেকে ছুট দেওয়া ছাগলছানার ফুর্তির মতো করে। পাঠ করা যায় জীবনবোধের সহজ-সুন্দর অধ্যায়টিকে-বলা যায়-‘আবার এসেছি তীরে মায়াময় শস্য-ভরা নাও/পরান পাখিরে ডাকো, উজাগর প্রাণ খুলে গাও।’ (দরিয়াগাথা) আর তখন যেন তার কবিতার শব্দ গান হয়ে ভাসে তার কানে। আমরা দেখতে পাই-‘পাখিরা উড়িয়া যায় আকাশে-বাতাসে/জলাভূমি ধরে রাখে পালকের ছায়া/শরতের কাশফুলে শুভ্রতার মায়া/কেমন নাচিয়া ওঠে প্রশ্বাসে-নিশ্বাসে!’ (সময় বহিয়া যায়)।

আবার প্রকৃতি ও প্রেয়সীকে এক সুতোয় বেঁধে তিনি বলেন-‘আমি মৃত্যুকে দেখি রোজ বাদামি আগুনে জ্বলছে/মৃত্যু তোমাকে দেখে ডাঁশা পেয়ারার উদাসীন সবুজে/আর তুমি আমাকে দেখো মৃত্যুর অনিবার্য চিত্রকল্পে/আমাদের এই দেখাদেখিতে ভীষণ বিব্রত আজ/পৃথিবীর সবগুলো খরস্রোতা নদী/ওরা প্রায় ভুলে যাচ্ছে উজানের সমূহ স্মৃতি’ (দেখাদেখি)
এই ভুলে যাওয়ার ভেতর থেকেই তার নাগরিক চেতনায় শেকড়ের স্মৃতি পিছু ডাকে। এই পিছুডাক পশ্চাৎপদতা নয়-নতুন সৃষ্টির জন্যে অস্তিত্বকে জাগিয়ে দেওয়া। যে জন্যে কবি মতিন রায়হান নদীর কাছে সবুজ বাতাসের কথা পাড়তে পারেন আর লোকালয়ের ভয়ানক ঘূর্ণিঝড়েও শঙ্কিত হতে পারেন, শেষতক ‘বেদনার অসীম নীলে’-এই সত্যই উচ্চারিত হয় যে প্রকৃতিকে ভালোবাসতে না জানলে আমাদের জন্মকথার মৃত্যু ঘটে।

নদীমগ্ন বাউলের গান ॥ মতিন রায়হান, প্রচ্ছদ ॥ আল নোমান, অলংকরণ ॥ সমর মজুমদার, প্রকাশক ॥ বেহুলাবাংলা, পৃষ্ঠা ॥ ৬৪, মূল্য ॥ ১৭৫ টাকা