নিঃসঙ্গতার মুখোমুখি ॥ মামুন মুস্তাফা



জন্মসূত্রেই মানুষ একা। তার এই একাকিত্ব সমগ্র জীবনের নিত্যসঙ্গী। ‘বিলাসী’ এই একাকিত্বকে সাথী করে অসুস্থ স্বামীর সেবা করে গেছে বিরুদ্ধ সমাজব্যবস্থার বিপরীতে দাঁড়িয়ে। সেই সমাজের মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়নি নিঃসঙ্গ বিলাসীর শূন্যতা পড়ে দেখার। সেই শূন্যতা অনুভব করেছিলেন একজন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। আর তাই এই অপরাজেয় কথাশিল্পীর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল ‘বিলাসী’র মতো চরিত্র নির্মাণ। আবার জনারণ্যে থেকেও ‘হৈমন্তী’র একাকিত্ব ছিল সম্পূর্ণ তার নিজস্ব। সেই একাকত্বি ছুঁয়ে দেখা সম্ভব হয়নি হৈমন্তীর শ্বশুর বাড়ির কারো পক্ষে, এমনকি স্বয়ং অপুরও। কিন্তু তাকে পাঠ করেছিলেন নিবিড়ভাবে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাই বুঝি শেষ পর্যন্ত অপুর পক্ষে বলা সম্ভব হয়েছিল ‘হৈমন্তী আমার সম্পত্তি নয়, সম্পদ’। মূলত শরৎ বাবু বিশ্ব পর্যটক হয়ে প্রচলিত সমাজকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, আর নিজের নিঃসঙ্গতাকে ধারণ করেছেন সেই সমাজের মানুষের ভেতরে। অন্যদিকে রবি ঠাকুর একান্নবর্তী পরিবারের সন্তান হয়েও ছেলেবেলা থেকে উপলব্ধি করেছেন, এক হা হা শূন্যতা। তার সেই শূন্যতা লক্ষ করেন সমাজব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিমানুষের অভ্যন্তরে।

তবে কি লেখক মাত্রেই নির্জনতা প্রিয়? আমি মহাসড়কের নিঃসঙ্গতা দেখেছি। এত কোলাহল, যন্ত্রচালিত যানের দৌরাত্ম, শশব্যস্ত মানুষের ছোটাছুটি, হকারের চিৎকার, হাজারো মানুষের সোরগোল- তবু মহাসড়ক একা, শূন্য। তাকে ব্যবহার করে ঘটে নগর উন্নয়ন, সমাজপতির উত্থান; তার বুকেই আবার দুর্ঘটনা, রক্তপাত, বিভীষিকাময় মৃত্যুর মতো নির্জনতা- এসবই তো নীরবে দাঁড়িয়ে দেখে মানুষ। ওই নিঃস্ব মানুষের মতো একা এই মহাসড়ক, রাজপথ। মধ্যদুপুরে চিরধরা রোদের হলকা নিয়ে একা রাজপথ, আবার মধ্য রজনীতে আলো-আঁধারে নির্জন সড়ক মৌনকাতর। আমার গমনেচ্ছু পা থমকে যায়। আমার নিঃসঙ্গতার রাজসাক্ষী ওই রাজপথ? গন্তব্যে পৌঁছুতে পৌঁছুতে মনে হয় আগামীকালের উদিত সূর্যের মধ্য দিয়ে যে সমাজ জেগে উঠবে তার সঙ্গে একুশ শতকের মানুষের সম্পর্ক কতটুকু? স্বার্থপরতার দলিল লেখা ছাড়া আর কোনো উইল নেই জাগতিক সংসারে। আর তাই ‘রতন’কে একা করে ফিরে যায় পোস্ট মাস্টার; রাজলক্ষ্মী একাকিত্বকে সঙ্গী করে প্রতীক্ষার প্রহর গোনে আর নিঃসঙ্গ শ্রীকান্ত ছুটে বেড়ায় পথে প্রান্তরে; কুসুম নিঃস্ব, শূন্য হয়ে ফেরে পিতৃভিটায়।

কবির নিঃস্ব হতে নেই। অথচ কবি তার ঐশ্বরিক অনুভূতিতে পতিত কোনো কংক্রীটের দরদালানের নিঃসঙ্গতাও ছুঁয়ে দেখেন। সেই না-অস্তিত্বের বাড়িটির ভেতরের যন্ত্রণা, ক্ষত- ওই শরীরে জড়ানো ভাঙা চুড়ির ক্রন্দন, নিশিত চুলের হাহাকার বাড়িটির উত্তুঙ্গ ফসিলে কবি অবলোকন করেন। এ বাড়ি তখন পৃথিবীর কোনো বাড়ি থাকে না, এ যেন কবির মনোজলোকে তৈরি এই মর্ত্যে ঘটে যাওয়া সমাজ-মানুষের স্বকাল সংকট। তাই আমাকেও বলতে হয়েছে কখনো ওই নির্জন বাড়িটির জীবাশ্ম-কাহিনি, ছায়াবাড়ি ঘন হলো লৌকিক সময়ে।

কবি কখনো নির্জনতা প্রিয় নয় বরং কবির নির্জনতা ছুঁয়ে যায় সকালের উদিত সূর্য, অসল দুপুর, চির ধরা রোদ, বিকালের মৌনতা, আঁধারের চিবুক, এমনকি রাত্রির শরীর। যুগে যুগে তস্কর সমাজের লোলুপ মানুষের স্বার্থপরতা কবিকে করেছে নিঃস্ব, ভারাক্রান্ত, একাকী। তাই বিশ শতকে এই বাংলাদেশের কবির কণ্ঠে গীত হয়েছে, ‘কবির কাছে যাও হে পর্যটক,/কোনো রাষ্ট্রকে সে শুল্ক দ্যায় না।/তার রুক্ষ্ম পিঠ চেনে চাবুকের মার’। কবি তাই সময়পাবক। নিশীথ রাতের ঘুমকে বিদীর্ণ করে জেগে উঠেছে আমার নির্জনতা। মধ্য যামের শূন্য রাতের মতো তখন আমিও শূন্য। কোথায় দারা-পুত্র-পরিবার? তখন আমারও ‘শিখাসীমন্তিনী’ পৌনঃপুনিকভাবে চিত্রিত করে অনাশ্রয়ী পৃথিবীর কথা। তারও আগে সমাজব্যবস্থার বিচ্ছিন্নতায়, মানব-অস্তিত্বের সংকটে গীত হয় জীবনগাথা ‘কুহকের প্রত্নলিপি’। আবার অস্তিত্বের প্রশ্নে জাতিসত্তার সংকটে রণক্ষেত্রে একাকী, নিঃসঙ্গ যোদ্ধার নির্জনতা বিৃবত হয়েছে ‘একাত্তরের এলিজি’ কবিতাগ্রন্থে। এ সবই একজন কবির সমাজব্যবস্থায় নির্ণিত স্বকাল সংকটে দীর্ণ সময় এবং তার নির্জনতা, নিঃসঙ্গতা, শূন্যতা ও হাহাকারের পদাবলী মাত্র।

সমাজ অভ্যন্তরে সংঘটিত আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবদমন, মানবিক শূন্যতার বিপর্যয় লেখক সত্তায় দাগ কাটে। তখন প্রচলিত লোকাচার, রীতি-নীতি, প্রথার বিপরীতে দাঁড়িয়ে লেখক-সত্তা মাত্রেই অনুভব করেন এক ধরনের শূন্যতা। সেই নিঃসঙ্গতার ভিতরে লেখকের মৌন যন্ত্রণা বাসা বাঁধে তার অহোরাত্রে। সেরকম নির্জন হা হা শূন্যতার ভেতরে জগতের সকল কবি-দার্শনিক-লেখক কলম নামক অস্ত্র তুলে ধরেন মানবিক বিপর্যয় উত্তরণে। আর তাই রচিত হয়েছে রুশ বিপ্লব, ফরাসি বিপ্লব, গৌরবময় শিল্প বিপ্লব। যে ক্ষোভ আর যন্ত্রণার ভেতরে রচিত হয়েছে ওয়্যার এন্ড পীস, লা মিজারেবল, হ্যামলেট এবং এই বাংলায় গোরা, মৃত্যুক্ষুধা কিংবা কবিতায় রূপসী বাংলার মতো কবিতাগ্রন্থ, সেখানেও রয়েছে অপ্রাপ্তি, হাহাকার, শূন্যতা আর নিঃসঙ্গতার চিত্ররূপ।

তবে শুধু দুঃখ আর যন্ত্রণায় নয়, অনেক আশা-স্বপ্ন আর ভালবাসার ভেতরেও শূন্য হতে থাকে একজন কবি ও লেখক। স্মৃতিমুগ্ধতা, মনোজৈবনিক কামনা-বাসনা, নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা মানবমনের চিত্তকে করে দীর্ণ ও অবসন্ন। সে লক্ষ্যেই মহাভারতের কৃষ্ণ রাধার প্রেমকে পিছে ফেলে তাকে শূন্য করে এগিয়ে যায় উত্তরণের পথে তথা মানবকল্যাণের আকাঙ্ক্ষায়। তাই বুঝি চরম শূন্যতার মাঝে পূর্ণতা পেয়েছে কৃষ্ণের সেই উক্তি- ‘বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলে দেয়’।

আর তাই কখনো কখনো কবির পূর্ণতা স্বয়ং কবিকেই বিচ্ছিন্ন করে কাছের মানুষ থেকে; তার সাফল্য তাকেই নিঃস্ব করে ক্রমান্বয়ে; জনগণের ভালবাসায় সিক্ত চরম দেশপ্রেমিকও পতিত হন আস্তাবলে। পেট্রিয়ট আমাদের সে কথাই বলে। অন্যদিকে প্রকৃতির কাছে সমর্পিত মানুষ প্রকৃতির ভেলায় চরে জেনে যায় তারও (প্রকৃতির) মনোবিকলন! প্রকৃতির নির্জনতা ছুঁয়ে মানুষ শূন্য হতে থাকে। তাই আমাকেও বলতে হয়েছে- হেমন্তের অভ্যেসদোষে তুমি কেবল ‘সলিটারি রীপার’। কবির উপলব্ধি তখন এমনই যে, আশার বালুচরে নিঃসঙ্গতা চিক চিক করে নকল সোনার মতন।

সুতরাং একজন সফল লেখক তার সাফল্যে যেমন নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন, তেমনি আমজনতার কাতারে দাঁড়িয়ে মানুষ হিশেবে তিনি যখন ব্যর্থ হয়ে যান, সেই তখনও সমান ভাবে তিনি শূন্য হয়ে ওঠেন। তখন বিবেকের আয়নায় ধরা পড়ে তার নির্জন চেহারা। সেই নিঃসঙ্গতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাকেও বলতে হয়, ‘এইতো দিলাম মেলে হাত দুটো সামনে তোমার/সাদা দুটো তালু, নেই কিছুই সেখানে আর’। অথবা ‘হে মায়া! হে অকিঞ্চন জীব! ছাড়ো আলিঙ্গন।/দ্যাখো না ফুরিয়ে এল রাত? ছাড়ো হাত। মধ্যরাতেই/ডাক এসে গেল। ফিকে কৃষ্ণাতে রোদশী’।

যুগে যুগে সকল সমাজব্যবস্থায় একজন কবির বাস। কবির ভালোলাগার পশ্চাতে কিংবা ভারাক্রান্ত হৃদয়ের অলিন্দে সাধারণ মানুষের চরাচর দেখা যায় না। কিন্তু একজন কবি ও লেখক সমাজমানুষের আশানিরাশা ও স্বকাল সংকটের পশ্চাতে অনুভব করেন আমজনতার নির্জনতা, হাহাকার, শূন্যতা। তখন তাকে ঘিরেই কবিও নিঃসঙ্গতার মুখোমুখি হন। সেই নিঃসঙ্গতা কবির ব্যক্তিজীবনকেও ছাপিয়ে যায় তার সকল সাফল্য ও ব্যর্থতার চরিতার্থতায়।

মানুষ সামাজিক জীব- এরিস্টটলের এই ভাবনা সর্বাংশে সত্য হলেও, অষ্টাদশ শতকে এসে সমাজের সাথে ব্যক্তিমানুষের সংযুক্তি শিথিল হতে থাকে কালপরিক্রমায় এ-দুয়ের মধ্যকার সঙ্গতিশূন্যতা ও নানাবিধ বৈনাশিকতার ভেতরে। এই বিচ্ছিন্নতা বাহ্যিক ও অন্তর্মুখী উভয়দিক দিয়েই ঘটে থাকে। মূলত পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিজীবন নিঃসঙ্গতার অক্টোপাসে তখনই জড়িয়ে পড়ে, যখন বহির্জাগতিক অসঙ্গতি ও চিত্তজাগতিক জটিলতা মানুষের মনে বাসা বাঁধে। একজন কবিও এর ব্যতিক্রম নন।