নিঃসঙ্গ ট্রেন ॥ লতিফ জোয়ার্দার


আমার জন্মের পর হয়ত কোনো উৎসব হয়নি। কোন আয়োজন ছিল না আমাকে নিয়ে। তবে তিনবোনের পরে আমার আর্বিভাব আমার মায়ের কাছে অসামান্য সুখের ছিল। কিন্তু কোনদিন বাবার অনুভূতির কথা কেউ বলেনি আমায়। তবে দুই বছর বয়সে বাবাকে হারানো ছিল আমার জন্য বড় নিঃসঙ্গতা। যখন বুঝতে শিখলাম তখনই একাকিত্ব পেয়ে বসে আমায়। সবার থেকে সবকিছু থেকে একা থাকতে ভালো লাগতো আমার। হঠাৎ করে আমার বিশ্বসংসার তছনছ হয়ে যায়। আমার যখন এক বছর বয়স, তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। যুদ্ধের ভয়াল থাবা আর পরিবারের আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে আমার বড় হওয়া ছিল আমাদের পরিবারের আরো এক সংকট। জাতীয় মহাসড়কের কাছে আমাদের বাড়ি হওয়াতে, যুদ্ধের সময় আমাদেরকে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে মা-বোনদের সঙ্গে পালিয়ে থাকতে হয়েছে। সেই শিশুকালের কোনো স্মৃতি আমার না থাকলেও আমি যখন বড় হলাম- মা-বোনদের কাছে সেই সময়ের গল্প আমায় আলোড়িত করতো। আমি যখন বড় হলাম, তখন আমার চারপাশে পরিবর্তনের ছোঁয়ায় কিছু মানুষের বদলে যাওয়াটা আমার জন্য ছিল স্মৃতির বিভ্রাট। তখন আমার মনে হত, কোনো এক ঝরা পাতার মত একলা আমি। একবিন্দু শিশিরের মত একলা আমি। এক বৈশাখের তাপদাহের মত একলা আমি।

হৃদয়, মন অথবা আমার বুকের সব কোলাহল শেষে যেমন একলা আমি। অনন্ত যাত্রাপথে একলা আমি। এভাবেই দিনশেষে রাত্রী আসে। গভীর রাত্রীতে ঘুম ভেঙে দেখি, আমার চারপাশে কেউ নেই। নিঃসঙ্গ নক্ষত্রের মত জেগে আছি আমি। অতঃপর নিজেকে কোনো এক নিঃসঙ্গ ট্রেনের যাত্রী মনে হয় আমার। মনে হয় এই নিঃসঙ্গ ট্রেনে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। হতে পারে এই নিঃসঙ্গতাই আমার একাকিত্ব। মনে হয় কত শতাব্দী এই একাকিত্ব বয়ে বেড়াচ্ছি আমি। অসীম শূন্যতাই আমার একাকিত্ব। একাকিত্বই আমার শূন্যতা। গাঢ় গভীর অন্ধকারে আমি একাকিত্বের কাছে থাকি। কখনো কখনো আমার কবিতার মত এই জীবনে একাকিত্ব আসে আমার।
‘আমি ঘুমালে রাত্রী ঘুমিয়ে পড়ে
অথচ আটচল্লিশ বছর বয়স জেগে থাকে।
কখনো মনে হয়
চিরন্তন কিছু তৃষ্ণা বয়ে বেড়াচ্ছি এই বুকে একা।
লোকালয়ের বাইরে আমি সবুজ মাঠ
একটা শবযাত্রার মত নিস্তব্ধতায় হারিয়ে যাচ্ছি’।

অতঃপর মহাকালের যাত্রাপথে অন্ধ বধিরের মত আমি একাকিত্ব নিয়ে বসে থাকি । কোনো স্মৃতি নেই আমার। কোনো বিস্মৃতি নেই আমার। মনে হয় আমার পৃথিবীতে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। কিছু কিছু নিস্তব্ধতার মত আমার জীবনে চুপিচুপি একাকিত্ব আসে। মাতৃগর্ভে সেই যে একাকিত্ব ছিলো আমার। কবরের নিস্তব্ধতার মত, একদিন এমন একাকিত্ব আসবে আমার জীবনে। তা যেন সব আমার অনুভবে ছিল। তা যেন সবই এখনো আমারই আছে। আমি অনন্ত পথ মাড়িয়ে তার সঙ্গী হয়েছি যেন দীর্ঘশ্বাসের মত একা। সঙ্গীবিহিন পথ আমার। ছুটে চলছে নির্মমতার শেষ প্রহরের কাছে।

কলেজ জীবনে এসে অনুভব করেছিলাম, এক ভয়াবহ একাকিত্বে বসবাস আমার। তখন একদিকে এরশাদ বিরোধী রাজনীতি। আর অন্যদিকে আমার বুকের শূন্যতা। ভালোবেসে না পাওয়ার বেদনা আমাকে আরো বেশি একা করে দিয়েছিল। নিজেকে তখন নির্জন ছায়া মনে হত। কেউ যেন সেই ছায়ায় এসে অবিকল আমার মত আর একটা ছায়া দেখতে না পায়। সবকিছু থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইলাম। অথচ কত কত বেদনার রাত আমার। কত কবিতার মত দীর্ঘশ্বাস আমার। মিছিলের কবি হতে চাইলেও পারিনি। প্রতিবাদে রাজপথ কাঁপাতে চাইলেও তার ডাগর চোখ আমাকে ঘুমতে দিত না। র্নিঘুম রাতে আমার একাকিত্ব ছিল বলে তন্ময়তার ঘোরে কবিতারা সব হারিয়ে গেল একদিন।

সেই যে ছোট্টবেলায় খেলার মাঠে দলছুট হয়েছিলাম। সেই যে আমার কাঁধে একাকিত্ব এসে ভর করেছিলো। মাঠের বাইরে আমি এক অবুঝ বালক। মনে হত সবার থেকে ভিন্ন আমি। সবার থেকে আলাদা আমি। আমাকে সঙ্গ দেবার কেউ নেই। আমার কোনো বন্ধু বলে কেউ নেই। স্কুলে যাবার সময়ও কেউ আমার সঙ্গী হত না। আমায় হাত ধরে কেউ স্কুলে পৌঁছে দিত না। নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলতে বলতে একা হয়ে যেতাম আমি। মনে হত আমার মতই আমার বাড়ির উঠোন, বাড়ির শেষ সীমানায় তালগাছটাও যেমন। সেও কী একা। একাকিত্বের সঙ্গে বসবাস তার। এভাবেই দিন যেতে যেতে যৌবনের সঙ্গে যখন দেখা হলো, দুরন্ত যৌবন আমাকে বুকের আগুনে পুড়িয়ে একা করে দিল। তখন আমার মনে হল, প্রকৃতই একা আমি। একা হবার জন্যই একা আমি।
‘কোথাও আর কেউ নেই
দু-হাত বাড়িয়ে দিয়েছি ওই আকাশের দিকে
তারপরও মনে হবে
আমাদের কত যুগ কত বসন্ত পেরিয়ে
হয়নিকো দেখা’।

হয়তো যৌবনে উচ্ছ্বল নদীর মত যে প্রেম ছিল আমার। হয়তো প্রচণ্ড আবেগি ছিলাম আমি। হয়তো ভালোবেসে একদিন রাজা হতে চেয়েছিলাম। একদিন যে ভালোবাসার জন্য ব্যাকুল ছিলাম আমি, একদিন তার কাছেও পরাজিত হয়ে আরো বেশি একা হয়ে গেলাম। এখন আমি ঘোরের সঙ্গে থাকি। এখন আমি বিষণ্নতার ধুলো মাখি। সব হারিয়ে সব খুঁজি আমি। এই জীবনে হয়তো সবই বাকি। অবশেষে নিজেরে দিলাম সামান্য কিছু ফাঁকি। সব ব্যকুলতা হারিয়ে আমি হয়েছি একলা একা পাখি।