নিখোঁজ ॥ শোয়াইব আহমদ



সন্ধ্যা হয়ে গেছে কিন্তু নিহার এখনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়ী ফিরেনি। নিহারের মা নুরুন্নাহার বেগম বিকেল থেকেই ঘর-বার করছেন। নিহার তো কখনো এতো দেরি করে না। ও তো সব সময় দুপুরের মধ্যেই ক্যাম্পাস থেকে চলে আসে। আর যদিওবা কখনো দেরি হয়, সেটা ও আগেই জানিয়ে দেয়। কখনো না জানিয়ে নিহার দেরি করে না। নুরুন্নাহার বেগমের তিন মেয়ে দুই ছেলে। বড় দুই মেয়ে তারপর দুই ছেলে আর একদম ছোটটি মেয়ে। ছেলেমেয়ে কারো পড়ালেখা এখনও শেষ হয়নি। বড় মেয়ে মেডিকেলে পড়ছে। এখন ইন্টার্নীশিপ করছে। ওর আসতে মাঝে মধ্যেই দেরি হয়। নিহার মেজ, এবার মাস্টার্স ফাইনাল দিবে। নুরুন্নাহার বেগমের সব ছেলেমেয়েই লেখা পড়ায় ভালো। ছেলে দুটির একজন মেডিকেলে থার্ড ইয়ারে আরেকজন এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। আর ছোট মেয়েটি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। বড় মেয়ে নীগার আর মেজ মেয়ে নিহার ছাড়া আর সকলেই সময়মতো ঘরে ফিরেছে। আজ অবশ্য নীগারের আসতে দেরি হবে। ও আগেই জানিয়ে দিয়েছে কিন্তু নিহার তো কিছু বলে যায়নি। বড় ছেলে নয়ন সন্ধ্যার মুখে মুখে ঘরে ফিরতেই নুরুন্নাহার বেগম ছেলে কে বলেন, ‘নিহারতো এখনো ফেরেনি।’
– চলে আসবে, হয়তো কোন কাজে আটকে গেছে। আর তাছাড়া ক্যাম্পাস থেকে বাসের শেষ ট্রিপটা তো এখনো আসেনি। ধৈয্য ধরেন, চলে আসবে আপা। নবীন কি ফিরেছে?
– হ্যা, নবীন তো দুপুরের গাড়িতেই ফিরেছে। বিকেলে মাঠে গেছে।

এই কথা বলতে বলতেই নবীন হই হই করে ঘরে ঢুকলো। ঘরে ঢুকেই কোন দিকে না তাকিয়ে চিৎকার করে ছোট বোনকে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘নীলা, সবার চা খাওয়া কি শেষ? আমার চা টা জলদি করে নিয়ে আয়’। এই কথা বলে উঠানের কলপাড় থেকে হাত মুখ ধুয়ে ঘরে ঢুকতেই দেখে মা, বড় ভাই, ছোট বোন কেমন চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে।
‘কি হয়েছে? তোমরা এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন?’
‘নিহার এখনো ফিরেনি, ছোট খোকা’। নুরুন্নাহার বেগম বলে উঠলেন।
– কি বলছেন, আম্মা। মেজ আপা এখনো ফেরেনি?
– না রে, আমি তো সেই কথাই বলছি। আমার তো কিছুই ভালো লাগছে না। তুই কি একটু দেখবি বাবা?
– আচ্ছা ঠিক আছে আমি বাস স্টপেজের দিকে যাচ্ছি।
এই কথা বলে, নবীন আর এক মূহুর্ত দেরি না করে বের হয়ে গেলো। নবীন বেরিয়ে যেতেই নুরুন্নাহার বেগম হঠাৎ মেঝেতে বসে পড়লেন। সাথে সাথে নয়ন আর নীলা এসে নুরুন্নাহার বেগম কে ধরে বিছানায় বসায়। নয়ন বলে উঠলো, ‘আপনি এতো অস্থির হচ্ছেন কেন, আম্মা? আপা নিশ্চয়ই চলে আসবে।’ নুরুন্নাহার বেগম বড় ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোর বাবাও কিন্তু একদিন এভাবে নিখোঁজ হয়েছিল, আর কিন্তু ফেরেনি।’ এই কথা শুনে নয়ন আর নীলা স্তম্ভিত হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। কোন কথা আর ওদের মুখে আসেনা। ওদের বাবা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নিখোঁজ হন, তারপর তাঁর আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। নুরুন্নাহার বেগম অনেক কষ্টে সংসার আগলে রেখেছেন। পাঁচ ছেলেমেয়েকে মানুষ করছেন। নয়ন হঠাৎ বলে উঠে, ‘আমি ক্যাম্পাসের দিকে যাচ্ছি, তবে আপনি শক্ত হোন। এভাবে ভেঙে পড়বেন না।’ এই বলে নয়ন বেরিয়ে পড়ে। নয়ন বেরিয়ে যেতেই, আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামে। এ অবস্থায় নুরুন্নাহার বেগম খুব অসহায় বোধ করতে থাকেন। ছোট মেয়ে নীলা নুরুন্নাহার বেগমকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে, আর নুরুন্নাহার বেগম বিড়বিড় করে আল্লাহকে ডেকে চলেছেন।
নীগার, নয়ন, নবীন কেউই এখনো বাড়ি ফিরেনি। এদিকে বৃষ্টি থামারও কোন লক্ষণ নেই। নুরুন্নাহার বেগমের মনে এখন আতঙ্ক এসে ভর করেছে। দরজা খোলা রেখে নুরুন্নাহার বেগম আর নীলা বারান্দায় বসে রয়েছে। দৃষ্টি খোলা দরজা ছাপিয়ে রাস্তার দিকে। যদিও বৃষ্টির কারণে কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।

মসজিদে এশার নামাজের আজান হচ্ছে। বৃষ্টির ঝাপটাও অনেক কমে এসেছে। নুরুন্নাহার বেগম হঠাৎ দেখতে পেলেন খোলা দরজা দিয়ে কেউ যেন ঢুকছে। উনি জোরে বলে উঠলেন, ‘নিহার এসেছিস?’
– আমি নীগার, আম্মা। কেন নিহার এখনো ফিরেনি?
নুরুন্নাহার বেগম নীগারকে জড়িয়ে ধরে মুখের দিকে তাকিয়ে আতঙ্ক আর অসহায়ত্ব ভরা কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘না, নিহার এখনো ফিরেনি।’ নীগার আর কাল মুহুর্ত দেরি না করে, পাশের বাড়ির চাচিকে নীলার কাছে রেখে মাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। প্রথমে ওর সব বন্ধু বান্ধবীদের বাড়িতে গেলো। কিন্তু কেউই নিহারের কোন খবর দিতে পারলো না। এরপর গেলো ওর ডিপার্টমেন্টের বন্ধুদের বাসায় কিন্তু ওরাও কোন কিছু বলতে পারলো না। তবে নিহারের ডিপার্টমেন্টের এক ব্যাচ জুনিয়র অনু বললো যে দুপুরের দিকে নিহার আর ওর বন্ধু রঞ্জুকে একসাথে ক্যাম্পাসে দেখেছে। এর চেয়ে বেশী তথ্য আর অনু দিতে পারেনি। ‘তুমি কি রঞ্জুর বাসা চেনো?’ নীগার অনুকে জিজ্ঞেস করলো।
– রঞ্জু তো মেসে থাকে। আমি ওর মেস চিনি। যাবেন আপা?
– হ্যা, যাবো চলো।
রাত প্রায় বারোটা বাজে। অনু আর মাকে সাথে নিয়ে রঞ্জুর মেসে গিয়ে উপস্থিত হয় নীগার। রঞ্জুর খোঁজ করতেই, রঞ্জু বেড়িয়ে আসে, ‘জ্বি বলুন। আমিই রঞ্জু।’
– নিহার এখনো বাড়ী ফিরেনি। ওর কোন খোঁজ জানো?
– জ্বি, না… না। আমি কিছু জানি না।
– আজকে দুপুরে নিহার তোমার সাথে ছিল না?
– জ্বি ছিল, কিন্তু আমি তো দুপুরেই চলে এসেছি।
এমন সময় নুরুন্নাহার বেগম রঞ্জুরকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি সত্যিই কিছু জানো না, বাবা ‘
-জ্বি, না।

এই কথা বলে রঞ্জু চোখ নামিয়ে নেয়। নীগার, মা নুরুন্নাহার বেগমকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসে। রাত সাড়ে বারোটা বাজে। নিহার এখনো ফিরেনি। নয়ন আর নবীন ক্যাম্পাসে গিয়েছিল। হলে ওদের যেসব বন্ধু রয়েছে ওদের নিয়ে নিহারের ডিপার্টমেন্টের যেসব ছেলে মেয়ে হলে থাকে তাদের সকলের সাথে দেখা করে এসেছে। কেউই নিহারের কোন খোঁজ দিতে পারেনি। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বাসাতেও ওরা গেছে। ওনারাও কেউ কিছু বলতে পারেননি। একটা জলজ্যান্ত মেয়ে এভাবে কর্পুরের মতো উড়ে গেলো। কেউ কিচ্ছু বলতে পারছে না। এরই মধ্যে এক শিক্ষক বলেই বসলেন, ‘দেখো গিয়ে, কোন ছেলের হাত ধরে পালিয়েছে।’ নবীন চিৎকার করে বলে উঠে, ‘আমার আপা মোটেও অমন নন।’
-‘চুপ করো। ভালো মেয়েরা কখনো নিরুদ্দেশ হয় না’- এই কথা বলে, ঐ শিক্ষক মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দেন।
এদিকে এলাকায় খবর হয়ে গেছে, নিহার এখনো ফেরেনি। ওদের বাড়িতে অনেকে এসে ঘুরেও গেছে। অনেকে ফিসফাস শুরু করেছে, ‘মেয়ে মনে হয় কারো হাত ধরে পালিয়েছে। ছিঃ ছিঃ বড় বোনকে রেখে কেউ এভাবে পালায়, ছিঃ।’

নয়ন আর নবীন ফিরে এসে জানালো, কোন খবর নেই। নীগার এবার নয়নকে নিয়ে প্রথমে থানায় গেলো। একটা ডায়েরি করে দুই ভাই বোন হাসপাতালে গেলো। কিন্তু নিহারের কোন হদিস নেই। রাত দুইটা, নীগার আর নয়ন ঝিপঝিপ বৃষ্টির মধ্যে রিকশা করে বাড়ি ফিরছে। দুই ভাই বোনের মুখে কোন শব্দ নেই। দুই জনকে দেখে মনে হচ্ছে, হঠাৎ করে ওদের বয়স অনেক বেড়ে গেছে। দুই ভাই বোন দুই দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিজেদের কান্না লুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছে।
নুরুন্নাহার বেগমকে বিছানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাথে আছে পাশের বাড়ির চাচি আর নীলা। নুরুন্নাহার বেগম কিছুক্ষণ পর পর উঠে জিজ্ঞেস করছেন, ‘নিহার কি ফিরেছে?’। নীগার আর নয়ন বসার ঘরে বসে আছে। নবীন নিজের ঘরে। কারোর চোখে কোন ঘুম নেই। এরকম রাত ওদের জীবনে এর আগেও একবার এসেছিল, যেদিন ওদের বাবা নিখোঁজ হয়। আজ তেমন আরেকটি রাত। নবীনের ঘর থেকে ভেসে আসছে গুমরে ওঠা কান্নার শব্দ। এই কান্নার শব্দ রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে চুড়ে ওদের অসহায়ত্বকে প্রকাশ করছে। ফজরের আজান হচ্ছে। ধীরে ধীরে আকাশ আলো হয়ে উঠছে। কিন্তু নুরুন্নাহারের পরিবারে আতঙ্ক, শোক আর অসহায়ত্বের আঁধার। এমন সময় সদর দরজায় সাইকেলের শব্দ। কিছুক্ষণ পর কড়া নাড়ার শব্দ। হুড়মুড় করে সব ভাই বোন উঠে আসে। নয়ন গিয়ে দরজা খুলে দেখে, থানা থেকে লোক এসেছে। পুলিশকে দেখেই নীগার মাথা ঘুরে পড়ে যায়। নয়ন পুলিশকে জিজ্ঞেস করে, ‘কোন খবর আছে?’
– জ্বি আপনাদের একবার থানায় আসতে হবে। একটা ডেডবডি পাওয়া গেছে। রেপ কেস। ধর্ষণ করে মেয়েটাকে নৃশংস ভাবে হত্যা করেছে। চেহারা দেখে চেনার উপায় নেই। কিন্তু তারপরও তো আইডেন্টিফাই করতে হবে। এর জন্য আপনাদের একবার আসতে হবে।

নীগার আর নয়ন আবার ছুটে যায় থানায়। দূর থেকে নীগারের চোখ পড়ে, নীহারের জন্মদিনে প্রথমবারের মতো কিনে দেওয়া লাল শাড়ীর পাড়ে। পাড়ে আবার সোনালী জরির কাজ রয়েছে।