নৈঃশব্দ্যের জমিন : ব্যক্তিগত পাঠ ॥ জারিফ এ আলম


মাহফুজ মুজাহিদের দ্বিতীয় কবিতার বই নৈঃশব্দ্যের জমিন। বইটি প্রকাশ পায় ২০১৯ সালে। মাহফুজ বরাবরই তার কবিতায় প্রতিশ্রুতিশীল। শব্দের দ্যোতনায় গেঁথে রাখেন মানব মনের নানা অভিব্যক্তি। মৃত্যুকল্পনা, মানব মনের দ্বিধা-দ্বন্দ্বের চড়াই-উতরাই, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, জীবনের অনেক জিজ্ঞাসা তার কবিতায় উঠে আসে। ব্যবিলীয়নীয়, মিশরীয় সভ্যতাসহ প্রাচীনকালের যেসব সভ্যতার কথা আমরা জানি, তাতে জানা যায়, তখনকার মানুষেরও আগ্রহ ছিল মৃত্যু বিষয়ে। মানুষ শুধু নয়, সব প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।

মাহফুজ মুজাহিদকেও এই ভাবনা তাড়িত করে। মৃত্যু বিষয়ক ভাবনা তার বেশ কিছু কবিতায় চোখে পড়ে। মৃত্যু মানুষের অনিবার্য নিয়তি; যা চিন্তা চেতনায় তীক্ষ্ণ ফলার মতো গেঁথে থাকে। মৃত্যু এক অমোঘ সত্য। যা সব সময় পিছু নেয়। ‘রাত ও মৃত্যুময় অন্ধকার’, ‘স্ব-ঘোষিত মৃত্যু ফরমান’, ‘বোধ’ প্রভৃতি কবিতায় মাহফুজের মৃত্যুবিষয়ক ভাবনা চোখে পড়ে। ‘ঘুড়িজীবন’ কবিতায় মাহফুজ বলছেন-
‘ভবঘুরে সুখের আশায়
দুঃখগাঁথি তলায় তলায়
জানি নাকো মৃত্যু আমার
সুতীক্ষ্ণ এক সুঁচের ফলায়
(ঘুড়িজীবন)

আধুনিক মানুষের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সব কিছুর মিশেলে গড়ে উঠেছে শহরকেন্দ্রিক সভ্যতার বুনিয়াদ। যার কারণে মানুষ ছোটে শহরের পানে, জীবন জীবিকার সন্ধানে। কেউ ছোটে উচ্চ জীবনধারার প্রতিবিধানে। শহর নিয়ে মানুষের থাকে নানারকম ভাবনা। মাহফুজ মুজাহিদ তার নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে সে বিষয়টি তুলে আনতে প্রয়াসী হয়েছেন কবিতায়,
আলোর নগর জুড়ে পথিকেরা দিকভ্রান্ত-অন্ধ উন্মাদ
অথচ; রাতের কালো শহরে-শরীর কতো চেনা…।
পাহাড়িয়া নদী বয়ে চলে এখানে-ওখানে-অচেনাবন্দরে
রাত পেরুলেই অন্ধকার-বিমূর্ত এই আলোরনগরে।
(বিমূর্ত এই আলোরনগরে)

মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্নতা বোধ প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠছে। যার কারণে আগের সেই যৌথ পরিবারও এখন লুপ্তপ্রায়। একই ফ্লাটের কয়েকজন অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও মুখ দেখা হয় না কারোর। এই যে মানুষের একমুখিতা এটা মানুষকে সমাজ বিচ্ছিন্ন করেছে তো বটেই সেই সঙ্গে পারস্পারিক বন্ধুভাবাপন্ন পরিবেশটিও আজ কমে এসেছে অনেকটাই। কবি যেহেতু এই সমাজেরই একজন তাকে সমাজের সেই পরিবেশ প্রতিবেশ আলোড়িত করে। এবং তিনি সেইসব ছেঁকে তুলে আনেন ভাবনার সারাৎসার। আর এই কারণে বলতে পারেন,
একজন ষোড়সী; একজন কিশোরী; একজন বধূ
একজন নৌকো; একজন কলসি; একদল কৃষক
দ্বীপবন্ধ আধো আলোছায়ায় নেচে ওঠে নিজস্বতায়
পৃথিবীর মতোন; একলা জগত-নিঃশব্দ্যের চিৎকারে…
(নৈঃশব্দ্যের জমিন)

মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব, তাদের আনন্দ-বেদনা, যাপিত জীবনের টানাপেড়েন এসব কিছুসত্ত্বেও কোনো কিছুর নিয়ন্ত্রণ নেই। মানুষের জীবন অনন্তহীন নয়। সীমার ভেতরে সে অসীম হয়ে ওঠে নিজের কর্মযজ্ঞে। যে পথ ধরে সে হেঁটে যায় সে পথের পথিক যারা তারা তার কথা স্মরণ করে তার কর্মের গুণে। তার কীর্তির জন্যে। আবার পথও পথিকের মনে শিহরণ জাগিয়ে তোলে প্রচণ্ড ভাবালুতায়। কবির কলমে তাই অক্ষয় হয়ে ধরা দেয় এভাবে,
তবুও পথ, পথিকের মুখে এঁকে দেয় সকালের রোদ
বুনোগন্ধ মেখে রেখে দেয় অনন্ত স্নেহের মাটিতে…

মাহফুজ মুজাহিদ তার নৈঃশব্দ্যের জমিন কবিতাগ্রন্থে সমসময়ের নানা অভিঘাত তুলে ধরতে প্রয়াসী হয়েছেন বারবার। কিছু কবিতায় ভাবভাবনার পুনরাবৃত্তি ঘটলেও পাঠযোগ্য কবিতা চোখে পড়বার মতো। মাহফুজ তার সময় আর যাপন চিত্রের বয়ান করেছেন কবিতায়। মাহফুজ মুজাহিদের কবিতা সম্পর্কে সত্তর দশকের কবি মাহমুদ কামাল এর কথা দিয়ে লেখাটি শেষ করছি। তিনি বলেছেন, ‘প্রখর বাস্তবতা তার কবিতাকে কখনো তেজস্বী করেছে-আবার মুঠোবন্দি হাত শীতল হয়েছে ‘নৈঃশব্দ্যেরজমিন’ই। মাহফুজ মুজাহিদের কবিতা তাই ক্ষুৎকাতর জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। এই ছবিতে যেমন প্রেম আছে, বাস্তব জীবনের নানা অলিন্দের কথাও আছে’।