নৈঃশব্দ্যের ধ্বনি প্রকরণ ও অন্যান্য ॥ মনজুর রহমান


নৈঃশব্দ্যের ধ্বনি প্রকরণ

একটা নিঃসঙ্গ আঁধার মধ্যরাতে এসে ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতর
সারারাত আমার হাত ধরে নিবিড় সান্নিধ্যে বসে,
আমাকে তার সোনারঙ গল্প শোনায়…
সেখানে মুখর অন্তঃপুরে, হলুদ পাখিদের বিস্তর কোলাহল ছিলো
নদীর উষ্ণ জলে জ্যোৎস্নার কারুকার্য আর
মাছেদের সাথে ছিলো আলোর অবাধ সন্তরণ।
সে জলে সাঁতার দিয়ে, একদিন সেও মাছেদের সাথে ভাসতে ভাসতে
ঢুকে পড়ে এক অন্ধকার শীতল গহ্বরে
সেদিন থেকে তার সর্বাঙ্গ ঢেকে যায় কালো বরফের আচ্ছাদনে…

আমি তার গল্প শুনি, তার দীর্ঘশ্বাসের স্বর-
ক্রমাগত ক্রন্দনের সুরে আবহসঙ্গীতের মতো বাজে
আকাশ থেকে হিম পতনের ধীরচিত্রের মতো
আমার শরীরের ওপর খসে পড়ে কুচি কুচি শীত
সেই প্রবল হিমের অন্ধকার আমাকে একটু একটু গিলে নিলে
আমি তার বধির গহ্বরে প্রবেশ করি
আমার সর্বাঙ্গ অনুভূতিহীন হয়ে পড়ে
কোন প্রত্যঙ্গকে আমি আর আলাদা করে চিনতে পারি না
সেই নিকষ অন্ধকারে,
আমার অতি সূক্ষ্ম এক আমিত্ব শুধু বেঁচে থাকে মাত্র
ভরহীন, আকারহীন, চক্ষুহীন সেই আমি, শুধু অনুভূতিকে সঙ্গী করে
ধ্বনিহীন বিষাদময়তাকে জাপটে- কাঁপতে কাঁপতে অন্ধকারে ডুবে
অনন্ত নৈঃশব্দ্যের ধ্বনি প্রকরণ মুখস্ত করি।


জলরঙে আঁকা পোট্রেট

এ আমার অনির্বাণ দহনের রাত
পাশ ফিরে শুয়ে গেলেই-
তুমি এসে পিঠে রাখো হাত
দুর্লঙ্ঘ্য বাসনার তীর ছুটে যায় অলীক পিপাসায়,
কে আছো দাঁড়িয়ে? চোখের গহীনে?
সীমানার ওই পাড়ে, সেই তুমি, সীমাহীন দূর সুদূরিকা।
তবু দূরভাষে কথাদের মূর্ছনা,
অন্ধকারে- ঠোঁটের খুব কাছে নুয়ে আসে যেন;
ফিসফিস গুঞ্জনে না ছোঁয়ার মত করে ছুঁয়ে যাও-
নিঃশ্বাসে নেশা নেশা- ছাতিমের ঘ্রাণ।
অধরাই থেকে গেলে তুমি, বুঝি স্পর্শেই সমূহ পতন।
তবু প্রেম এসে রোজ তীব্র শাসায়
প্রেমিকের হাতে থাকে পাপ নয়, স্বর্গীয় তাপ,
ছুঁয়ে দিলে শিহরণে কুঁড়িরাও ফুল হয়ে যায়
প্রেম আর পাপ পাশাপাশি হাঁটে না কখনো
অধরা আক্ষেপে দু’চোখের লালিমায়-
রাতভর জেগে থাকে স্পর্শের নির্ভুল আকুতি।
তোমাকে কখনোই পারি না ছুঁতে
এই আক্ষেপে, দুই হাতে ছুঁয়ে দেখি শ্রাবণের জল
বেদনার ক্যানভাসে
খাদহীন প্রেমের পোট্রেট আঁকে জলরঙ।


ঘোর

নীরবতা বললো কানে কানে
স্তব্ধতার আগল দিলাম খুলে
এবার শোন নৈঃশব্দ্যের সুরে
আঁধার চিরে মৌনস্বরের গান
কথানদী দিচ্ছে সাঁকো পাড়ি
নদীর ওপর কথার বসতবাড়ি
শব্দ যেন শরীরী এক প্রত্নগন্ধা নারী
তিমিরগর্ভ ফুঁড়ে ওঠা অতীত নগরী।

নৈঃশব্দ্যের নিবিড় সংকেতে
অধরপ্রসূন আপেলরঙে ফোটে
স্বর্ণগ্রীবায় অলকচূর্ণ রাশি
স্বেদবিন্দুর জলের ছোঁয়ায় সিক্ত
নুনপিপাসু রাতের তামস ঠোঁটে
মৃত্যুকুসুম লুটায় স্বর্ণ ত্বকে
মহাকালের মুগ্ধ আঁধার ক্ষণে
মায়াকোমল বৃত্তচূড়ায়-
বিমূর্ত রাত ফোটে।