নোঙর ও অন্যান্য ॥ রেজাউদ্দিন স্টালিন


নোঙর

চোখে দিগন্ত নিয়ে যে মেয়েটি জানালায় তাকে আগে দেখিনি কখনো
শুনেছি তার ভ্রুর রক্ত ঈগল

তার কথা শুনিনি কোনো পড়শির মুখে অদৃশ্য থেকে আসে সান্ধ্যভাষা বাঁকানো গ্রীবার সৌন্দর্য দেখিনি চিবুকের ঈশানে তীব্র অগ্নিপরীক্ষা
দেখিনি চোখের চূড়ায় বাষ্প
শুনেছি ক্রুশের চাপে দুমড়ে যাওয়া হৃদয় আর মোমবাতির জমাট বাঁধা সাদা বারুদ কপালের কপিলাবস্তু

পড়িনি তার পদধ্বনি
দেখেছি আত্মার নৈঋতে হৃৎপিণ্ডের ঘণ্টা প্রান্তরে ভেসে যেতে সবুজ ব্যবধান

জানালা থেকে সে কখনো মুখ না সরাক বিকেলের প্রতিরোধে ফিরে যাক সন্ধ্যা
কোনো হুইসেল ছেড়ে না যাক অজানায় প্রতিধ্বনি জোড়া দেয়া স্বপ্নের সেতু অসমাপ্ত থাক

মমির বিস্ময় ছিঁড়ে বেরিয়ে আসুক অতীত
কেন কেবলই আত্মাহুতির কক্ষপথে- হানা দেয় ওর গ্রহ
আর দিন-রাত্রির উৎস খুঁজতে
চোখ প্রদক্ষিণ করে ভবিষ্যৎ

মেয়েটি কোনো অমিমাংসিত নগরের বাসিন্দা নয় কিংবা কোনো বিষাদমাখা অনুপস্থিতি
ওর জানালার মুহূর্তে লেপ্টে আছে অশ্বক্ষুর

হয়তো কোনোদিন জানা হবে না নাম পছন্দের খাদ্য তালিকা
কোন ফুলের সে প্রজাপতি

কেনো গাঙচিলের ডানার আঘাত তাকে ভেঙে ফেলে- আবার ফিরিয়ে আনে বর্তমানে
কোন দোয়েলের শিষে চমকে ওঠে ওর জানালা
ঘোর শ্রাবণের আশ্বাসে সে মেঘ তাকে ধমক দেয় কোন বজ্রপাত

পিতাকে প্রহরীরা স্বর্গে নিয়েছে কোন প্রহরে মা ভাইয়ের অপেক্ষায় মাছ বুনেছে উঠোনে
দীর্ঘ চুম্বনের চিতায় সে দাউদাউ
কোন শহর সিংহের গর্জনে সে অরণ্য

সে কি দেখেনি চোখ বাঁধা বন্দী কবিতা
দূরে কমলা বনে কাকের অমঙ্গল দিগন্তে পেঁচিয়ে ওঠা ছায়ানাগের শীর্ষ

স্মৃতির উপকূলে আছড়ে পড়ে কোন নোঙর
যেখানে বারবার ফিরে আসে ফেনার রাজ্য ওর পলক কখনো অস্ত যায় না
যতক্ষণ না চোখ থেকে খসে পড়ে অকাল বৈশাখ

ব্যবচ্ছেদ

কৈশোরে যে চোখ ছিলো স্বচ্ছতোয়া নদী
তা’ ভরে উঠেছে আবর্জনায়
নেতা অভিনেতা আমলার উচ্ছিষ্ট
কৈশোরের স্মৃতি বাঁচিয়েছে অন্ধত্ব থেকে
বর্তমান ব্যবচ্ছেদ করে বেরিয়ে আসে শৈশবের স্কুল

সবুজ নদী গলা বাড়িয়ে ডাকে
সবুজ আকাশ মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়
সবুজ দুপুর এগিয়ে দেয় ঠাণ্ডা পানি
আর ঝড়ের রাতে নীল নক্ষত্র ঝরে পড়ে
টুকরো টুকরো ঘটনা জুড়ে
পৌঁছুতে হয় তারুণ্যে
খেজুর রসের খোঁজে কতবার তাকিয়েছি শীতের দিগন্তে
যেখানে বসে আছে
স্কুলের সাদা ড্রেস পরে শত শত বক

কতদিন কাকের বৈদিক বচন শুনিনা
হঠাৎ দূরে অসীম নৈঃশব্দ ভেঙে
জেগে উঠছে সন্তানহারা ঘুঘুর কান্না
হেলিকপ্টার নিচের দিকে তাকিয়ে চক্কর দিচ্ছে
মনে পড়ছে মাছরাঙার কথা

এই নগরে আবেগ বদল করে বাঁচতে হয়
উপবাস আর ভোজন ভরা চোখ
শুনতে হয় শয়তানের আশীর্বাদ
স্মৃতি এক নীরব ঘাতক
তবু নরক থেকে বাঁচতে
তার হাতে ধরা দিই বার বার

দায়

যে ঘরে দরোজা নেই
তার কি প্রয়োজন প্রহরীর
ভ্রূণ ধারণে অক্ষম যে গর্ভ
তার কেনো প্রসব যন্ত্রণা
উড়তেই হবে কেনো
যদি না থাকে ডানা তার
প্রবাহ পুতে রাখে যে স্রোত
তাকে স্রোতস্বিনী হতে কে দিব্যি দেয়
মৃত্যুকে ভয় পায় যে জীবন
তাকে বাঁচতে কে বলে

ফলহীন বৃক্ষ সেতো অগ্নি উপাসক

শেকলের শব্দে যে অভিভূত
তাকে মুক্তি দেবে কে