পাখিদের ভাষার যত বীজগণিত ॥ তৃষ্ণা বসাক




‘কবিতা রচনার মুহূর্তে আমি কমিউনিকেশনের সমস্যা নিয়ে একেবারেই মাথা ঘামাই না। তখন আমি নিঃসঙ্গ- আমারই সঙ্গে কথা বলায় ব্যস্ত। নিজের মধ্যে ঢুকে ঢুকে ঢুকে নিজেকেই চিন্তা করাই। চিন্তার ভাষায় খুব ঠারঠোর থাকে, ইঙ্গিত থাকে- তখন হাতের লেখা হয় শর্টহ্যান্ডের মতো। যে কবিতা মুহূর্তে উদ্ভাসিত হয়, তখনই না লিখলে নয়, তার বেলা এইরকম।’ (উত্তর দ্বাদশ, গদ্য সংগ্রহ, মণীন্দ্র গুপ্ত)
তৌফিক জহুরের কবিতা এইরকম। মুহুর্তের উদ্ভাসে উজ্জ্বল। বৌদ্ধিক অনুশীলনের থেকে হৃদয়ের সংবেদন দিয়েই তাঁর কাব্যচরিত্রের গঠন বোঝা যায়। আমাদের শরীরকে যেমন তিনভাগে ভাগ করেছেন জ্ঞানীরা, এক-নাভির নিচে, দুই- নাভি থেকে কণ্ঠ আর তৃতীয়টি, কণ্ঠ থেকে মস্তিষ্ক পর্যন্ত। কবিতার তেমন তিনটি স্তর, লিবিডো বা আদিম প্রকৃতির স্বর বা অবচেতন, হৃদয়ের স্তর বা চেতন এবং মস্তিষ্কের স্তর বা অধিচেতন। যদিও কোন ভালো কবির ক্ষেত্রেই এই ভাগগুলো একেবারে বায়ু নিরুদ্ধ কামরার মতো নয়, অর্থাৎ একজন ভালো কবি যে কেবলই অবচেতনের কবিতা লিখে যাবেন, অন্য দুটি স্তরে প্রবেশের চেষ্টাও করবেন না, তা নয়। একজন প্রকৃত কবির মধ্যে সবকটি স্তরই মিলে মিশে থাকে, তবে এটা ঠিক যে তার মধ্যে কবির প্রবণতা এবং ক্ষমতা, চর্চা এবং যাপন, পরিবেশ এবং লালন সব মিলিয়ে একটি বিশেষ ঝোঁক ফুটে ওঠে। আর তখনই তাকে আমরা একটি নাম দিয়ে চিহ্নিত করি, একটি তকমা দেগে দিই। খুব সহজ উদাহরণ হচ্ছে, কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর এত অসাধারণ সব প্রেমের গান, কবিতা সত্ত্বেও, তাঁকে দেগে দেওয়া হল বিদ্রোহী কবি হিসেবে। এই যে দেগে দেওয়া- এর মধ্যে কিন্তু একটা রাজনীতি আছে। নীরবতা দিয়ে মেরে ফেলা। নজরুলের অন্য দিকগুলো নিয়ে যাতে চর্চা না হয়, পাঠকের মনোযোগ এইভাবে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। চিহ্ন বিষয়টাই তো রাজনৈতিক। খেয়াল করলে আমরা দেখবো, মানব সমাজ যতই তার যোগাযোগের ভাষাকে, সংলাপকে, সম্পর্ককে চিহ্ন দিতে দিতে এগিয়েছে, ততই মানব সমাজ পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, একা হয়ে গেছে, আর এই চিহ্নায়নের সুবিধা তুলেছে কিছু মুষ্টিমেয় মানুষ। ধর্মের চিহ্ন, ভাষার চিহ্ন, লিঙ্গের চিহ্ন। আজ এই সময়ে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকালে অচিহ্নিত কিছু প্রায় চোখেই পড়ে না, যা পবিত্র, শর্ত নিরপেক্ষ, নিষ্কলুষ।
এসবের পরেও তৌফিকের কবিতার কাছে এলে পাঠক হিসেবে তাঁর গোত্রটি চিহ্নিত না করে উপায় থাকে না। যতো পড়া যায়, ততোই স্পষ্ট হয়ে ওঠে তিনি হৃদয়শোণিতের কবি, ইম্পালস তাঁর কবিতার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। আর কবিতার উপাদান তিনি যেমন সংগ্রহ করেন শৈশব, স্মৃতি, বন্ধুতা, প্রেম থেকে, তেমনি নাগরিকতার চাপে হারিয়ে যাওয়া জীবিকাও তাঁর দৃষ্টি এড়ায় না।
‘বাড়ির পাশে খাঁচায় ভরে কিছু পাখি একজন প্রায় নিয়ে আসে
কিছু কিছু পাখি আমার বেশ পরিচিত
পাখির আওয়াজ শুনতে শুনতে
আমার নদীর কথা মনে পড়ে
নদী মানে কিশোর বেলার হার না মানা গান
কতদিন নদীতে ডুবসাঁতার আর গামছায় হাত পেঁচিয়ে
বাইন মাছ ধরেছি,

এখনো কি পাখিরা মনের আনন্দে সাঁতার কাটে বুড়ো আকাশে।
জানিনা। তবে আজকাল খাঁচার ভেতরের পাখির উতলা চাহনি
দেখতে দেখতে সহসা আবিষ্কার করি
পাখিদের ভাষার যত বীজগণিত

পাখির খাঁচায় নেমেছে আজ অমাবস্যার আঁধার
বিকিকিনির হাটে নাচে মোমের আলো।’
(পাখি বিক্রি কাহিনি-১)

এই পাখি এবং পাখিওলা তৌফিকের কবিতায় আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া সারল্যের প্রতীক হয়ে বারবার আসে।
কবি জানেন,
‘পাখিদের বিউটি পার্লারের দরকার হয় না
পাখিদের সংসার নেই, বাজার করতে হয় না
শিশু পাখি কখনো যায় না স্কুলে
মেয়ে পাখি বানায় না রুটি পতির জন্যে
পাখিদের কোন মোবাইল ফোন নেই
পাখিদের জীবনে নেই কোন ট্র্যাফিক জ্যাম
একটা অদ্ভুত সরলতার মধ্য দিয়ে পাখিরা
বেঁচে আছে বেঁচে ছিল বেঁচে থাকবে চিরটাকাল।’
(পাখি বিক্রি কাহিনি-২)

এই পাখি তো পেরিয়ে যায় দেশ কাল ধর্মের সীমানা। তাই কবি লেখেন
‘আমার ভেতর যে পাখিটির বাস
ধর্ম জাতি দেশ ও বর্ণের
রোদ কি স্পর্শ করতে পারে কোনকালে তার আনন্দ আস্তানা’
স্বাধীন মাতৃভূমিতে ঘাসের জাজিমে শুয়ে কবি টের পান দমের পাখি গান গাইছে হৃদয় আঙিনায়।
‘… বুঝি, অনুভব করি হেগেলের
ঈশ্বর সৌন্দর্যের মত অপরূপ প্রকাশ
আমার ভাষা। ‘ আ মরি বাংলা ভাষা’
সেই ভাষার গান বেজে ওঠে প্রতিটি বাড়ি পাড়া মহলায়।
‘মিছিল কখনো শেষ হয় না-
মনে রেখো অ আ ক খ থাকবে।’

শুধু পাখি নয়, পিঁপড়ের প্রতীক চিহ্ন ব্যবহার করে তৌফিক দেখতে চেয়েছেন মানব সভ্যতার ইতিহাস। মানুষ আগুন আবিষ্কারের আগে থেকেই শৃঙ্খলিত জীবন যাপন করত পিঁপড়েরা, মৃতদেহের মধ্যে থেকে খাদ্যের সন্ধান করত। পিঁপড়ের জীবন থেকে মানুষ কিছুই শিখতে পারেনি।
‘অন্ধকার কবরে নিষ্প্রাণ মানুষ
কিছুই করতে পারে না। অথচ পিঁপড়ে সমাজ
অন্ধকার কবরে আলোহীন পথে
সারিবদ্ধভাবে প্রবেশ করে অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে
তাদের রিজিক খুঁজে বার করে’
একটি অসাধারণ কবিতা। যে কবিতা লেখার জন্যে একজন কবি সারাজীবন অপেক্ষা করেন।
তৌফিকের কবিতায় যেমন আসে মহাখালী, পোড়াদহ, তেমনি এসেছে কলকাতা কলেজ স্ট্রিট, বড়বাজার।
‘কলকাতা আমি হাজির’ কবিতায় তিনি স্মরণ করেছেন তাঁর পিতামহকে যিনি টাঙ্গায় চেপে এ শহর ঘুরতেন, রোপণ করতেন কত শীতের আদর, ‘আমিই শীত আমিই তোমার চুম্বন’।
ভাবতে ভালো লাগে তৌফিক সেই অখণ্ড বাঙলা ভাষার একজন স্পন্দমান অস্তিত্ব। তিনি আরও লিখুন, তাঁর কবিতায় আমরা সীমান্ত না মানা বাংলা ভাষার সোদা ঘ্রাণ পাই প্রাণ ভরে।
কবিতা বইটির সৌষ্ঠব চমৎকার। কিন্তু কিছু বানান ভুল পীড়া দ্যায়।


পাখি বিক্রি কাহিনি ॥ তৌফিক জহুর ॥ প্রকাশক: বাঙালি ॥ প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০১৯ প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ ॥ মূল্য : ১৫০ টাকা।