পিতৃদায় ॥ শোয়াইব আহমদ




‘এই রঞ্জু দেখতো, দুধওয়ালা বোধহয় দুধ দিয়ে গেছে। নিয়ে আয়’। মনিজা বেগম চিৎকার করে ছেলেকে বললেন। এই বাড়ীতে সকাল শুরু হয় বাজারের মতো হাঁকডাক দিয়ে। মনিজা বেগম এই বাড়ীর বড় বউ। এই বাড়ী বলতে ‘বনলতা লজ’। এলাকার মধ্যে অন্যতম বাড়ী। মনিজা বেগমের শ্বশুর জনাব আতাউল্লাহ খান দেশভাগের সময় বারাসাত থেকে এসে এই শহরে থিতু হয়েছেন। মনিজা বেগম স্বাধীনতার পরপরই এই বাড়ীতে বউ হয়ে আসেন। এই বাড়ীতে প্রথম যেদিন মনিজা বেগম পা রেখেছিলেন, তখন তার এই বাড়ীটিকে মনে হয়েছিল বাজার। এতো মানুষ এর আগে উনি কখনো দেখেনি। ওনার নিজের শ্বশুরের দশ ছেলে মেয়ে তার ওপর তিন চাচা শ্বশুর আর দুই ফুপু শাশুড়ি আর তাদের ছেলেমেয়েসহ প্রায় পঞ্চাশ-ষাট জন মানুষের বাস। আগে সবাই একসাথেই থাকতো। পরে আতাউল্লাহ খানের ভাই বোনেরা নিজ নিজ বাড়ীতে উঠে গেছে। তারপরেও এই বাড়ীতে এখনো প্রায় ত্রিশ জন মানুষের বাস। আতাউল্লাহ খানের ছেলেমেয়েরা একে একে বড় হয়েছে। তাদের বিয়ে হয়েছে, তাদের আবার ছেলেমেয়ে হয়েছে। তিন ছেলে অবশ্য বাইরে ফ্ল্যাট কিনে উঠে গেছে। শুধু মনিজা বেগম এই বাড়ী থেকে বের হতে পারেন নি। যদিও মনিজা বেগম প্রতিদিনই বলেন, এই বাড়ীতে আর একদিনও থাকবেন না। এটা বাড়ী না বাজার। রাত দিন চৌদ্দ গুষ্ঠির খাবারের আয়োজন করতে করতে তার জীবন শেষ। তিনি আর থাকবেন না এই বাড়ীতে। কিন্তু যখনই তার শ্বশুর তাকে ডাকে সঙ্গে সঙ্গে তিনি শান্ত বৌমা হয়ে যান। বিয়ের দিন থেকেই আতাউল্লাহ খানকে মনিজা বেগমের নিজের বাবা বলেই মনে হয়েছে। আশৈশব অনাথ মনিজা বেগম নিজ বাবাকে খুঁজে পেয়েছেন শ্বশুরের মধ্যে। তার উপর শাশুড়ির মৃত্যুর পর থেকে মনিজা বেগমের শ্বশুর মনিজা বেগমের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। আর এখন তো উনি সবসময়ই অসুস্থ। বিছানা নিয়েছেন তাও বছর ঘুরে এলো। এখন তো মনিজা বেগম ছাড়া তার এক মূহুর্তও চলে না।

‘কি রে রঞ্জু গেলি, বার বার দুধওয়ালা বেল টিপছে শুনতে পাচ্ছিস না? আর কাজের ছেলেমেয়েগুলো কোথায় থাকে, আল্লাহ জানে’। মনিজা বেগম আবার হাঁক ছাড়লেন ছেলের উদ্দেশ্য।
– এই তো যাচ্ছি আম্মা।
বলতে বলতে রঞ্জু দরজা খুলতে যায়। রঞ্জু মনিজা বেগমের ছোট ছেলে। এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে। রঞ্জুর বড় এক ভাই আর এক বোন আছে। ভাইয়ের পড়ালেখা শেষ, চাকরি করছে একটা ব্যাংকে। এখনো বিয়ে করেনি, তবে কথা বার্তা চলছে। বোনটির বিয়ে হয়ে গেছে পড়তে পড়তেই। এখন এমএ করছে। থাকে শ্বশুরবাড়ী।

দরজা খুলে রঞ্জু দেখে ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক ভদ্র মহিলা। বয়স ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তবে দেখে ওর মায়ের চেয়ে একটু বড় বলেই মনে হলো রঞ্জুর। সৌম্য শান্ত চেহারা। চেহারার এক ধরনের ব্যক্তিত্ব ফুটে রয়েছে, যা যে কাউকে মুগ্ধ করবে।
‘আসসালামু আলাইকুম, কাকে চাইছেন’?
– এটা কি আতাউল্লাহ খান সাহেবের বাড়ী?
– জ্বি।
– তোমার নাম কি?
– জ্বি, রঞ্জু।
– তোমার বাবার নাম কি?
– ফয়জুল্লাহ খান। কিন্তু আপনি কে সেটাতো বললেন না। আর কার কাছে এসেছেন?
এমন সময় মনিজা বেগম আবার চিৎকার করে উঠলেন, ‘কি রে রঞ্জু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কার সাথে কথা বলছিস? দুধওয়ালা আসেনি? কি রে কথা বলছিস না কেন’? এই কথা বলতে বলতে মনিজা বেগম নিজেই দরজার কাছে এসে দাঁড়ান।
– জ্বি, আপনি?
– আমি মিসেস মরিয়ম । ভারত থেকে এসেছি। জনাব আতাউল্লাহ খান সাহেবের কাছে।
– জ্বি।

মনিজা বেগম আর রঞ্জু খুব অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। মনিজা বেগম বিয়ে হওয়ায় পর থেকে কখনো দেখেননি তার কোন আত্মীয়কে ভারত থেকে আসতে। আসলে তার শ্বশুরবাড়ীর লোকজন সব একসাথে ওপারে থেকে এপারে চলে আসেন। ওপারে ওদের আর কোন আত্মীয় আছে কি-না, মনিজা বেগম সেটা জানেন না। সবচেয়ে বড় কথা এই বাড়ীতে তাদের বারাসাতের বাড়ী নিয়ে কোন আলোচনাই হয় না। মনিজা বেগম বিয়ের পর একবার বারাসাতের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন কিন্তু মনিজা বেগমের শ্বশুর কথার কোন উত্তরতো দেনইনি বরং হাবে-ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন, এই বিষয় নিয়ে ভবিষ্যতে কেউ যেন কোন কথা না তোলে। সেই মনিজা বেগম যখন সাত সকালে কাউকে দরজার সামনে দেখে, যে ভারত থেকে এসেছে তখন অবাক হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না।
– আমি কি বাইরের দাঁড়িয়ে থাকবো। মিসেস মরিয়ম জিজ্ঞেস করলেন।
এই কথা শুনে মনিজা বেগম শশব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘ও হ্যা তাই তো, আপনি বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। আসুন আসুন ভিতরে আসুন। রঞ্জু তুই উনার ব্যাগটা নিয়ে আপাতত ড্রয়িং রুমে রেখে দে। আমি তোর বাবাকে পাঠাচ্ছি’। এই কথা বলে মনিজা বেগম, মিসেস মরিয়মকে বসার ঘরে বসতে দিয়ে স্বামীর কাছে গেলেন।

– এই শুনছো?
– কি, চা এনেছ?
– রাখো তোমার চা। ভারত থেকে এই সাত সকালে এক ভদ্রমহিলা এসেছেন। নাম বললেন মরিয়ম, আব্বার কাছে এসেছেন। তুমি চেনো? আমি বসার ঘরে ওনাকে বসিয়ে এসেছি।
– কি বললে।
ফয়জুল্লাহ খান একেবারে চমকে উঠেছেন, ‘কি নাম বললে’।
– মিসেস মরিয়ম কিন্তু তুমি এতো চমকে উঠলে কেন?
– কিছু না। তুমি কি বাবাকে জানিয়েছ?
– না, এখনো জানাইনি। কিন্তু কে উনি?
মনিজা বেগমের এই কথার কোনো উত্তর না দিয়ে ফয়জুল্লাহ খান দ্রুত বসার ঘরের দিকে গেলেন। মনিজা বেগম স্বামীর এইভাবে চমকে ওঠা আর তাড়াহুড়ো করে বসার ঘরে ছুটে যেতে দেখে নিজের কৌতুহল আর চেপে রাখতে না পেরে নিজেও ছুটলেন স্বামীর পিছু পিছু।
ফয়জুল্লাহ খান বসার ঘরে ঢুকতেই মিসেস মরিয়ম উঠে দাঁড়ালেন। ফয়জুল্লাহ খানের চেহারায় বিস্ময় ভাব এখনো রয়েছে। বিস্মিত এবং জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ফয়জুল্লাহ খান মরিয়মের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। কারও মুখে কোন কথা নেই। এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ঘরের মধ্যে। মনিজা বেগম বসার ঘরের দরজার বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন। ফয়জুল্লাহ খান আর মিসেস মরিয়মের চেহারা দেখে ভিতরে ঢোকার আর সাহস পাননি তিনি ।

অল্প সময়ের মধ্যে মিসেস মরিয়মের আসার খবর বাড়ীর সকলেই জেনে যায়। এমনকি ফয়জুল্লাহ খানের যে ভাই-বোনেরা অন্যত্র থাকেন তারাও মিসেস মরিয়মের আসার খবর পেয়ে চলে এসেছেন এ বাড়ীতে। বাড়ীতে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ। কেমন গুমোট একটা ভাব। সবার চোখে মুখে প্রশ্ন মিসেস মরিয়মকে নিয়ে। মনিজা বেগম বসার ঘরেই মিসেস মরিয়মের সকালের নাস্তা পাঠিয়ে দিয়েছেন। ইতিমধ্যে সকলে জানতে পেরেছেন কে এই মরিয়ম।
আতাউল্লাহ খানের জীবনে যে এতোবড় একটা ঘটনা আছে, সেটা জেনে মনিজা বেগম খুবই অবাক হন এবং একই সাথে এক ধরনের কষ্টও অনুভব করেন। মিসেস মরিয়ম আতাউল্লাহ খানের প্রথম সন্তান। ফয়জুল্লাহ খান আর মিসেস মরিয়ম পিঠাপিঠি ভাই বোন। দেশ ভাগের পর তখনো আতাউল্লাহ খানের পরিবার এদেশে আসেননি। ওনার ইচ্ছেও ছিল না বারাসাত থেকে আসার। কিন্তু এরমধ্যেই ঘটে যায় এক হৃদয় বিদারক ঘটনা। দেশভাগ হয়ে গেলেও মাঝে মধ্যেই হিন্দু মুসলিম সংঘাত বেধে যেতো। সেরকমই এক সংঘাতের সময় একরাতে একদল সন্ত্রাসী ষোল বছরের মরিয়ম কে তুলে নিয়ে যায়। আতাউল্লাহ খান ওদের সাথে কোন ভাবেই পেরে উঠেননি সেদিন। অনেক চেষ্টা করেছিলেন মেয়েকে হায়েনাদের হাত থেকে রক্ষা করতে কিন্তু পারেনি। এদিকে দাঙ্গার কারনে পুলিশের কাছে গিয়ে কোন লাভ হয়নি। উল্টা অপবাদ শুনতে হয়েছিল। পুলিশ বলেছিল, ‘আপনার মেয়ে প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়েছে আর আপনি এসেছেন থানায় রিপোর্ট লিখতে। যে কোন ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়া আপনাদের কাজ। আপনাদের জন্য তো পাকিস্তান তৈরি হয়েছে সেখানে না গিয়ে এখানে পড়ে আছেন কেন? যান যান আমাদের বিরক্ত করবেন না। দুই দিন পরে দেখবেন মেয়ে ঠিকই বাড়ি ফিরে এসেছে।’- এই বলে ঐ সময় পুলিশ আতাউল্লাহ খানকে সাহায্য না করে ফিরিয়ে দেয়। কয়েকদিন পরে মরিয়ম ফিরে আসে ঠিকই কিন্তু ততক্ষণে সে আর আগের মরিয়ম নেই। হায়েনারা মরিয়ম কে তুলে নিয়ে সারারাত ধর্ষণ করে, রাস্তার পাশের এক জঙ্গলে ফেলে যায়। ঐ জঙ্গলে মরিয়ম কতক্ষণ পড়ে ছিল নিজেও জানে না। যখন জ্ঞান ফেরে তখন নিজেকে একটা হাসপাতালে দেখতে পায়।

মরিয়ম জানতে পারে অনিল গোমেজ নামে এক ভদ্রলোক তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। ভদ্রলোক বারাসাতে নতুন পোস্টিং নিয়ে এসেছেন। আদতে উনি চন্দননগরের বাসিন্দা। দাঙ্গার পরদিন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় উনি দেখতে পান, জঙ্গলের ভিতর থেকে একটা পা বের হয়ে আছে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখেন কোন জনমানুষ নেই। ভয়ে ভয়ে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে দেখেন কিশোরী বয়সের একটি মেয়ে পড়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল মেয়েটির উপর দিয়ে কি বয়ে গেছে। ভদ্রলোক প্রথমে ভেবেছিলেন, মেয়েটি বোধহয় মারা গেছে। কিন্তু কাছে গিয়ে বুঝতে পারেন এখনো প্রাণ আছে। ভদ্রলোক আর দেরী না করে মেয়েটিকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। দুই দিন যমে মানুষের টানাটানি শেষে মেয়েটি সুস্থ হয়ে উঠে। ভদ্রলোক মেয়েটির সাথে কথা বলে, ওর বাড়ীর ঠিকানা নিয়ে মেয়েটিকে ফিরিয়ে দিতে আসে। কিছুক্ষনের মধ্যে মরিয়মের ফিরে আসার কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এলাকায় লোকজন আতাউল্লাহ খানের বাড়ীর উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে, মরিয়মকে দেখার জন্য। একজন ধর্ষিতাকে দেখার জন্য। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে মরিয়মকে বারংবার ধর্ষণ করতে থাকে সমাজ। সবশেষে সমাজ রায় দেয়, মরিয়মকে ঘরে তোলা যাবে না। ও থাকলে, এলাকার মেয়েরা নষ্ট হয়ে যাবে। কোন মেয়ের বিয়ে হবে না। ওদের কথা শুনে মনে হয়, মরিয়ম যেন নিজ ইচ্ছায় ধর্ষিত হয়েছে। আতাউল্লাহ খান অনেক চেষ্টা করেছিলেন, মেয়েকে ঘরে তুলতে, ফিরে পেতে, কিন্তু পারেননি। এমনকি ওনার আত্মীয় স্বজনরাও সমাজপতিদের সাথে এক হয়ে ওনাকে আঘাতের পরে আঘাত করেছে। ওনার মেয়ে নষ্টা বলতেও ছাড়েনি। সকল প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে এক পর্যায়ে বাধ্য হন সমাজের কাছে নতিস্বীকার করতে। বাধ্য হন মরিয়মকে ঘর থেকে বের করে দিতে, মরিয়মের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে। মরিয়মকে বের করে দেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে আতাউল্লাহ খান স্ব পরিবারে বারাসাত ছেড়ে পূর্ব পাকিস্তানের এই ছোট্ট শহরে চলে আসেন। আর কখনো ফিরে যাননি নিজের প্রিয় জন্মভুমিতে। সেই থেকে তার পরিবারে বারাসাত এবং মরিয়মকে নিয়ে কোন কথা বলা নিষেধ। মরিয়মের বিষয়টি বড়রা জানলেও ছোটরা কেউ জানতো না। আর এই বিষয় নিয়ে কেউ কোন কথাও বলতো না। কারন আতাউল্লাহ খান মনে করেন, মরিয়মকে ফিরিয়ে দিয়ে উনি অন্যায় করেছেন, পাপ করেছেন। এই পাপের কোন প্রায়শ্চিত্ত নেই। আর সেই থেকেই তিনি আত্মগ্লানিতে ভুগছেন।

এদিকে বাড়ী থেকে মরিয়মকে বের করে দেওয়ার পর, মরিয়ম অসহায় হয়ে পড়ে। নিজের পরিবার, জন্মদাতা বাবা তাকে ত্যাগ করেছে। এখন সে কোথায় যাবে? মরিয়ম সিদ্ধান্ত নেয় আত্মহত্যা করবে। বাড়ী থেকে বের হয়েও দ্বিধাগ্রস্থের মতো হাঁটতে থাকে। এদিকে মরিয়মকে বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে অনিল কিছুটা দুরে এলাকা থেকে বের হওয়ার মুখে একটা দোকানে এসে বসে। মরিয়মকে নিয়ে যখন অনিল এলাকায় ঢোকে, তখন এলাকার লোকজনের চেহারা দেখে বুঝতে পেরেছিল, অবস্থা সুবিধার না। আর সেই জন্যই অনিলের এই দোকানে বসে থাকা। মরিয়মকে দ্বিধাগ্রস্থ ভাবে হাঁটতে দেখে, অনিল এসে মরিয়মের হাত ধরে। অনিলকে দেখে মরিয়ম অদ্ভুত দৃষ্টিতে অনিলের দিকে তাকিয়ে থাকে। একপর্যায়ে অনিলকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠে, ‘আমাকে বাঁচালেন কেন? কেন আমাকে বাঁচালেন?’ এরপর একটু স্থির হয়ে আবার অনিলকে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি আমার আরেকটা উপকার করবেন? আমাকে মরতে সাহায্য করবেন? আমি মরতে চাই, আমি মরতে চাই।’ এই কথা বলেই মরিয়ম কান্নায় ভেঙে পড়ে।

অনিল মরিয়মকে শক্ত করে ধরে বলে, ‘তুমি বাঁচবে। তোমাকে বাঁচতেই হবে।’
অনিল মরিয়মকে নিজের বাসায় নিয়ে যায়। অনিলের পরিবারে ওর মা ছাড়া আর কেউ নেই। অনিলের মা মরিয়মকে নিজ ঘরে আশ্রয় দেন। মরিয়ম কিছুটা সুস্থির হওয়ার পর উনি মরিয়ম এবং অনিলের সম্মতি নিয়ে ওদের বিয়ে দেন। মরিয়মের নতুন নাম হয় মরিয়ম গোমেজ। বিয়ে হওয়ার পর অনিল চেষ্টা তদ্বির করে চন্দননগরে ফিরে যায়। ওখানে মরিয়ম পড়ালেখা শেষ করে একটা স্কুলে চাকরি নেয়।
সেই ঘটনার প্রায় চল্লিশ বছর হয়ে গেছে। চল্লিশ বছর পরে আজ মরিয়ম হঠাৎ কেন এই বাড়ীতে এলো? পরিবারের সদস্যরা ঠিক বুঝতে পারছে না ওদের আসলে এই মূহুর্তে কি আচরণ করা উচিত। মনিজা বেগমও বুঝতে পারছেন না, উনি কি করবেন। ফয়জুল্লাহ খানকে ডাকতে গিয়ে মনিজা বেগম দেখেন, ফয়জুল্লাহ খান মিসেস মরিয়মের পায়ের কাছে বসে অঝোর ধারায় কাঁদছেন আর বলছেন, ‘বুবু আমাদের মাফ করে দে। আমাদের মাফ করে দে বুবু। আমরা মহাপাপী’। মিসেস মরিয়ম, ফয়জুল্লাহ খানকে বলছেন, ‘কাঁদিস না, খোকা। কাঁদিস না। আমার আর কোন অভিযোগ নেইরে খোকা। আমি শুধু আব্বাকে একটিবারের জন্য দেখতে এসেছি। দেখতে দিবি?’ এই কথা বলেই মিসেস মরিয়মও কান্নায় ভেঙে পড়েন।

দরজার ওপাশ থেকে সব শুনে মনিজা বেগমের চোখও ভিজে ওঠে।
আতাউল্লাহ খানের ঘরে বিছানার পাশে চেয়ারে মরিয়ম বসে আছে। মাথার কাছে মনিজা বেগম আর পায়ের কাছে ফয়জুল্লাহ খান। মরিয়ম আতাউল্লাহ খানের হাত ধরে আছে, ‘আব্বা, আমি আবার এসেছি’। বলেই মরিয়ম হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। কাঁদতে লাগলেন ফয়জুল্লাহ খান, মনিজা বেগম। ঘরের বাইরে অন্যান্য সদস্যদের চোখেও পানি।এদিকে আতাউল্লাহ খান এক দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন আর বিড়বিড় করে বলছেন, ‘আমাকে মাফ করে দে মা। আমি হতভাগা পিতা। তোর জন্মদাতা হয়েও তোকে রক্ষা করতে পারিনি। আমাকে মাফ করে দে, মা। আমাকে মাফ করে দে। তুই আমাকে মাফ না করলে, আল্লাহও যে আমাকে মাফ করবে না। আমাকে মাফ করে দে মা, আমাকে মাফ করে দে।’
মরিয়ম বাবার হাত ধরে বলে, ‘আমার কোন অভিযোগ নেই, আব্বা। আপনিও আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন।’ এই কথা বলার পরপরই আতাউল্লাহ খান তার আত্মজা, তার প্রথম সন্তান মরিয়মের হাতটা জোরে চেপে ধরেন। আর তার ঠিক পরের মূহুর্তেই হাতটা আলগা হয়ে যায়। আতাউল্লাহ খানের চেহারায় একটা শান্তির ছায়া। যেন পিতৃদায় থেকে মুক্তি পেলেন আতাউল্লাহ খান।