প্রথম গান, শেষ গান ॥ সুশীল সাহা



রবীন্দ্র গীতসুধারসে একবার যে সত্যিকারের অবগাহন করেছে, তাঁর পক্ষে ওই গানের মোহপাশ থেকে মুক্ত হওয়া বেশ কঠিন ব্যাপার। আসলে রবীন্দ্রনাথের গানের এমন কিছু দুর্নিবার আকর্ষণ আছে যা কোনওভাবেই অস্বীকার করা যায় না। সমগ্র গীতবিতানে ছড়িয়ে আছে মানুষের নানা সুখ-দুঃখের নানা অভিঘাত। হর্ষ বিষাদ উৎফুল্লতা শোক সান্ত্বনা হতাশা ভয় হতে অভয়মাঝে উত্তরণের এমন সন্নিবেশ সত্যিই দুর্লভ। কথা এবং সুরের এমন অপরূপ মেলবন্ধন বাংলা গানে এর আগে এইভাবে সত্যি সত্যি আসেনি। বিভিন্ন রাগের থেকে সুচয়িত বিন্যাস এবং লোকজ সঙ্গীতের অনুরণন কেবল নয়, দেশি বিদেশি বিভিন্ন সুরের এক অসামান্য সমাবেশ ঘটিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে, যা শুনতে শুনতে শোতৃহৃদয় কেবল তৃপ্তই হয় না, তাঁর অন্তরে ঘটে এক অভূতপূর্ব অনুভব। তাঁর এই গান ভারতীয় তথা বাংলা সঙ্গীত ঘরানায় এক অভূতপূর্ব সংযোজন। তাই এই গান বারবার শোনার, অন্তর দিয়ে আত্মস্থ করার।

এমন যাঁর গানের সম্ভার, যার শুরু তাঁর বাল্যকাল থেকে এবং শেষ অর্থাৎ মৃত্যুর অনতি অতীতে, তাঁর লেখা প্রথম ও শেষ গান কোনটি, তা জানার কৌতূহল তো সাধারণ শ্রোতার থাকতেই পারে। সেই কৌতূহল থেকেই এই নিবন্ধ রচনার সুচনা এবং বলাবাহুল্য অনাগত পাঠকের সঙ্গে তা ভাগ করে নেবার অদম্য সাহসে কিছু প্রস্তাবনা, কিছু অনুমান এবং সামান্য কিছু ধারণার আদান প্রদানে নিমগ্ন হতে চাইছি সামান্য সংগৃহীত পাথুরে প্রমাণসহ, অবশ্য কোনও জ্ঞানগর্ভ সন্দর্ভ রচনার বিন্দুমাত্র উৎসাহ আমার নেই।

আমরা জানি ঠাকুরবাড়ির আবহ ছিল বরাবরই মুক্ত সংস্কৃতির বাতাবরণে আবদ্ধ । দেবেন্দ্রনাথ সারদা দেবীর চতুর্দশ সন্তান ও অষ্টম পুত্র রবীন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন সুন্দর একটি সাঙ্গীতিক পরিবেশে, যার ফলে অতি শৈশবকাল থেকে তাঁর কণ্ঠে শুধু নয়, তাঁর হৃদয় জুড়ে ছিল কেবল গান আর গান। শ্রদ্ধেয় প্রশান্তকুমার পাল তাঁর রবিজীবনী গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে লিখেছেন, ‘রামমোহন হিন্দুস্থানী সঙ্গীতের কাঠামোয় বেশ কিছু ব্রহ্মসঙ্গীত রচনা করেছিলেন। পরবর্তীকালে দেবেন্দ্রনাথ এই ঐতিহ্য বজায় রেখেছিলেন এবং দ্বিজেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ ও গণেন্দ্রনাথ হিন্দি গান ভেঙ্গে ব্রহ্মসঙ্গীত রচনায় যথেষ্ট উৎসাহ দেখিয়েছিলেন। যদু ভট্টের মতো নামী সঙ্গীতশিল্পীরা জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে বসবাস করেছেন। এর ফলে তখন সেখানে একটি বিশুদ্ধ সাঙ্গীতিক পরিবেশ গড়ে উঠেছিল’। যদু ভট্ট সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের সশ্রদ্ধ অভিব্যক্তি তাঁর পরবর্তীকালের লেখাতেই স্পষ্ট, ‘যদু ভট্টের মতো সংগীতভাবুক আধুনিক ভারতে আর কেউ জন্মেছে কিনা সন্দেহ’। (কৈফিয়ৎ, ভারতী, বৈশাখ ১৩২৩ বঙ্গাব্দ, পৃষ্ঠা ১৬)। ডালহৌসী পাহাড়ে গিয়ে দেবেন্দ্রনাথকে বালক রবীন্দ্রনাথের গান শুনিয়ে মুগ্ধ করার কথা আমরা জানি। এছাড়া দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ছিল সঙ্গীতে অসীম অনুরাগ। তাঁর অজস্র সৃজনকর্মের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাই অতি শৈশবকাল থেকেই তাঁর ভেতরে সঙ্গীত সম্পর্কে এক অনন্য আকর্ষণ কাজ করে। তাঁর সৃজনকর্মের প্রায় সূচনালগ্নে সঙ্গীত রচনায় লিপ্ত হতে তাঁকে দেখা যায়।

তাঁর লেখা প্রথম গান হিসেবে যা অনুমিত হয় সেটি হল, ‘গগনের থালে রবি চন্দ্র দীপক জ্বলে’। কবির বয়স তখন এগারো। ১৮৭৫ সালের ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় কলকাতার আদি ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে যে সকল গান গীত হয়েছিল তার মধ্যে এই গানটিকে রবীন্দ্রনাথের রচনা বলে তত্ত্ববোধিনীর ফাল্গুন সংখ্যায় উল্লেখিত হয়েছে। গানটি গুরু নানকের বিখ্যাত ভজন ‘গগনময়ী থাল, রবি চন্দ্র দীপক বনে’র প্রথমাংশের অনুবাদ। (দ্রষ্টব্য, তত্ত্ববোধিনী ১৮৯৬ শকাব্দ, ১২৮১ বঙ্গাব্দ ফাল্গুন পৃষ্ঠা ২০৯)। গানটিকে সেখানে জয়জয়ন্তী রাগিনী আশ্রিত এবং ঝাঁপতালে নিবদ্ধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই গানটি ইতোপূর্বে রবীন্দ্রনাথের কোনও গীতসংগ্রহে মুদ্রিত হয় নি। আদি ব্রাহ্মসমাজ থেকে প্রকাশিত ‘ব্রহ্মসঙ্গীত স্বরলিপি’ দ্বিতীয় ভাগে এই গানটিকে জ্যোতিরীন্দ্রনাথের রচনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইন্দিরা দেবী লিখেছেন, ‘জ্যোতিরীন্দ্রনাথ একেবারে অক্ষরে অক্ষরে অনুবাদ করেছে।…কেউ কেউ ভুল ভাবেন এটি রবীন্দ্রনাথের’। (বিশ্বভারতী পত্রিকা, ১৩৫৬ বঙ্গাব্দ ৮ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা, পৃষ্ঠা ২০৫)। ওদিকে ‘শনিবারের চিঠি’ ১৩৪৬ বঙ্গাব্দের মাঘ সংখ্যায় বলা হয়েছে, ‘রবীন্দ্রনাথ মনে করেন গানটি তাহার রচনা’। বিতর্কের সূচনা এখানেই। ‘রবি জীবনী’র রচয়িতা প্রশান্তকুমার পাল লিখেছেন, ‘আমাদের অনুমান পদ্যানুবাদটি রবীন্দ্রনাথেরই কৃত। ফাল্গুন সংখ্যায় অনুবাদসহ মূল রচনাটি প্রকাশিত হবার কয়েকদিন পরেই রবীন্দ্রনাথ পিতার সঙ্গে বোলপুর হয়ে অমৃতসর আসেন। খুবই সম্ভব যে, তিনি তত্ত্ববোধিনী মারফত রচনাটির সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। অমৃতসরে পিতার সঙ্গে যখন গুরু-দরবারে উপস্থিত থাকতেন তখন অন্যান্য শিখ-ভজনের সঙ্গে এই গানটিও তিনি শুনেছিলেন, এমন সম্ভাবনার কথা সহজেই ভাবা যেতে পারে। আর এই যোগাযোগের অভিঘাতে সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ ভজনটির অনুবাদ করেন। তত্ত্ববোধিনী-তে প্রকাশিত পাঠের সঙ্গে গদ্যানুবাদ দেওয়া ছিল এবং দেবেন্দ্রনাথ গানটি জানতেন, সুতরাং গুরুমুখী ভাষার অর্থ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা হবার কথা নয়। আমাদের এই আনুমানিক সিদ্ধান্ত যদি বিদগ্ধজনের সমর্থনযোগ্য হয়, তবে এটিই রবীন্দ্রনাথ রচিত প্রথম ব্রহ্মসঙ্গীত বলে গণ্য হবে। অবশ্য প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘গীতবিতান কালানুক্রমিক সূচী’ প্রথম খণ্ডে (১৯৭৩) গানটিকে সূচীর প্রথমেই স্থাপন করা হয়েছে’। (রবি জীবনী পৃষ্ঠা -১৫০)। তবে যে ব্যাপারটি পুরোপুরি অনুমানভিত্তিক সেটিকে কি একজন কবির প্রথম কীর্তি হিসেবে গণ্য করা যায়? এই সংশয় কিন্তু কিছুতেই দূর হয় না। ভবিষ্যতের কোনও গবেষক হয়ত আরো কিছু তথ্য প্রমাণ দিয়ে সত্যিটাকে সবার সামনে আনবেন। তবে এই গান যদি রবীন্দ্রনাথের লেখাও হয়, তিনি কিন্তু এতে সুরারোপ করেননি। সেদিক থেকে এই গানটাকে পুরোপুরি রবীন্দ্রনাথের গান বলে গণ্যও করা যায় না। আমাদেরকে তাই কবি রচিত এর পরের গানটির দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হয়।

এর পরের গান, ‘জ্বল জ্বল চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ’, যার প্রথম প্রকাশ ঘটে ১৮৭৫ সালের নভেম্বর মাসে। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ১৪ পেরিয়েছে। গানটি জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ‘সরোজিনী’ নাটকে প্রথম ব্যবহৃত হয়। এই গান প্রসঙ্গে স্বয়ং নাট্যকারের জীবনস্মৃতি গ্রন্থে এইভাবে বিধৃত আছে, ‘রাজপুত মহিলাদের চিতাপ্রবেশের যে একটা দৃশ্য আছ, তাহাতে পূর্বে আমি গদ্যে একটা বক্তৃতা রচনা করিয়া দিয়াছিলাম। যখন এই স্থানটা প্রুফ দেখা হইতেছিল, তখন রবীন্দ্রনাথ পাশের ঘরে পড়াশুনা বন্ধ করিয়া চুপ করিয়া বসিয়া বসিয়া শুনিতেছিলেন। গদ্য রচনাটি এখানে একেবারেই খাপ খায় নাই বুঝিয়া, কিশোর কবি রবি একেবারে আমাদের ঘরে আসিয়া হাজির। তিনি বলিলেন, এখানে পদ্যরচনা ছাড়া কিছুতেই জোড় বাঁধিতে পারে না। প্রস্তাবটা আমি উপেক্ষা করিতে পারিলাম না- কারণ, প্রথম হইতেই আমারও মনটা কেমন খুঁত খুঁত করিতেছিল। কিন্তু এখন আর সময় কৈ? আমি সময়াভাবের আপত্তি উত্থাপন করিলে, রবীন্দ্রনাথ সেই বক্তৃতাটির পরিবর্তে একটা গান রচনা করিয়া দিবার ভার লইলেন, এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ‘জ্বল জ্বল চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ’ গানটি রচনা করিয়া আনিয়ে আমাদিগকে চমৎকৃত করিয়া দিলেন’। (পৃষ্ঠা ১৪৭)। রবীন্দ্রনাথ তখন স্কুল পালানো বালকমাত্র, স্কুলের বই ছাড়া অন্যান্য অনেক বই নিয়ে অনেক আগ্রহ তাঁর, মন দিয়ে গান শেখার চেষ্টা করেন। অনেকের মতে ‘তার কিছুই হল না’ গোছের। এই রবীন্দ্রনাথকে দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বলা যায় ‘প্রমোশন’ দিয়ে এরপরেই নিজের কাজে শামিল করে নিলেন। এই ‘জ্বল জ্বল চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ’ গানটি অমনভাবে রচনা করে দেবার জন্যে তাঁর প্রতিভা সম্পর্কে নিঃসংশয় হয়েছিলেন তিনি। ‘সরোজিনী’ নাটকের মঞ্চসাফল্য আসে অনেকটাই এই গান থেকে। স্বয়ং নটি বিনোদিনীর আত্মকথায় এই গানের উল্লেখ আছে। তবে সকলেই এই গানটি জ্যোতিরিন্দ্রনাথের রচনা বলেই জানতেন। কিন্তু এই নাটক প্রকাশ হবার ৩৭ বছর পরে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নিজেই বসন্তকুমার চট্টপাধ্যায়ের কাছে আপন জীবনস্মৃতির বর্ণনা করতে গিয়ে গানটি রচনার উপরোক্ত ঘটনাটি বলেন। বলাবাহুল্য তারপর থেকেই এই গানের রচয়িতা হিসেবে রবীন্দ্রনাথেরই নাম সর্বত্র ব্যবহৃত হতে থাকে। অবশ্য ততদিনে রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টিকর্মের জন্যে দেশ ও দশের কাছে অত্যন্ত আদরণীয় হয়ে উঠেছেন। তবু তাঁর গান রচনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এই গানটির এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। তবে এই গানটিতে সুর দিয়েছিলেন সম্ভবত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নিজেই, রবীন্দ্রনাথ নয়। তাই এই গানটিকে পুরোপুরি রবীন্দ্রনাথের গান হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের লেখা গানে সুরারোপ করতে শুরু করেছেন আরো কিছু পরে।

কবির ষোলো বছর বয়সকালে রচিত এবং সুরারোপিত যে গানটির সন্ধান আমরা পাই সেটি হল ‘গহন কুসুম-কুঞ্জমাঝে’। ১২৮৪ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ সংখ্যা ভারতী-তে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। কবির ‘ভানুসিংহের পদাবলী’ কাব্যগ্রন্থের এটি প্রথম কবিতা। পরের কবিতাগুলো আরো অনেক পরের লেখা। এই গান সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘একদিন মধ্যাহ্নে খুব মেঘ করিয়াছে। সেই মেঘলা দিনের ছায়াঘন অবকাশের আনন্দে বাড়ির ভিতরে এক ঘরে খাটের উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া একটা স্লেট লইয়া লিখলাম ‘গহন কুসুমকুঞ্জ-মাঝে। লিখিয়া ভারি খুসি হইলাম’। এই গানের ভাষা অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক। ১৮৭৫ সালে বাবার সঙ্গে নৌকাভ্রমণে গিয়ে অনেকগুলো বইয়ের মধ্যে কিশোর রবি ‘গীতগোবিন্দ’ খুঁজে পান। তখন অবশ্য ওই বই পড়ে তার গুঢ়ার্থ বোঝার মতো বয়স তাঁর হয়নি। তবে লেখাগুলোর ভাষা ও ছন্দ তাঁকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করেছিল। এই ভাষা ও ছন্দের টানে তিনি অসংখ্যবার ওই বইটি পড়েছিলেন। তাঁর মনের মধ্যে ওই একই ছন্দনির্ভর ভাষা তাঁকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তাঁর বাঁধানো খাতা ভরে উঠেছিল নানারকম নোটে। এই প্রস্তুতির মধ্যে এসে পড়ল অক্ষয়চন্দ্র সরকারের কাছে শোনা এক জালিয়াত ইংরেজ বালক কবি চ্যাটার্টনের কাহিনি। ইনি খুব অল্প বয়সেই প্রাচীন কবিদের ভাষা ও ছন্দ অনুকরণ করে লিখেছিলেন ‘Rowley Poems’. এই কাব্য তৎকালীন পণ্ডিতদের কীভাবে প্রতারিত করেছিল সেই নাটকীয় কাহিনি রবীন্দ্রনাথকে খুবই পুলকিত করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, নিজের কুকর্ম ধরা পড়ার পর সেই ইংরেজ কবি কিন্তু মাত্র আঠারো বয়সেই আত্মহত্যা করেছিলেন। জীবনস্মৃতিতে তিনি লিখেছেন, ‘আপাতত ওই আত্মহত্যার অনাবশ্যক অংশটুকু হাতে রাখিয়া, কোমর বাঁধিয়া দ্বিতীয় চ্যাটার্টন হইবার চেষ্টায় প্রবৃত্ত হইলাম’। অর্থাৎ ওই বয়সেই রবীন্দ্রনাথ ব্রজবুলি ভাষার অনুকরণে লিখে ফেলেন, ‘গহন কুসুম কুঞ্জমাঝে’। এবং বন্ধু প্রবোধচন্দ্র ঘোষকে দেখালে তিনি প্রাচীন এক পদকর্তার রচনা ভেবে চমৎকৃত হন। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ এই রহস্য গোপন রাখেন না এবং অত্যুৎসাহে ওই একই পদ্ধতিতে পরে আরো অনেক গান লেখেন। কিছুদিন পরে (১২৯১ বঙ্গাব্দ) সেই গানগুলো একত্র করে ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ নামে কবির একটি কাব্য প্রকাশিত হয়। এই গানে সুরারোপ রবীন্দ্রনাথ নিজেই করেন। ভারতী-তে প্রকাশিত এই গানে ‘বিহাগড়া’ রাগিনীর উল্লেখ আছে। যদিও পরবর্তীকালে জ্যোতিরীন্দ্রনাথ এই গান তাঁর ‘অশ্রুমতী’ নাটকে মলিনার গান হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তাতে যে সুরারোপ করা হয়েছে তাতে ‘ঝিঁঝিঁট’ রাগের উল্লেখ আছে। সম্ভবত সেটি সেই সুর জ্যোতিরীন্দ্রনাথ নিজেই করেছিলেন। কারণ ওই সময় রবীন্দ্রনাথ বিলেতে ছিলেন। যা হোক পরবর্তীকালে আমরা যে গানটি পাই তা বিহাগড়া রাগেই নিবদ্ধ। তাই এই গানটি সর্বতোভাবে রবীন্দ্রনাথ লিখিত এবং সুরারোপিত বলে একেই তাঁর প্রথম গান হিসেবে ভাবতে আর কোনও সন্দেহের অবকাশ থাকে না।

এইভাবে শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের গানের অভিযাত্রা। সারাজীবনে অসংখ্য কবিতা গল্প উপন্যাস নাটক প্রবন্ধ চিঠিপত্র লেখার পাশাপাশি অজস্র গান রচনা করে গেছেন তিনি। নিজের লেখা গানে সুরারোপ করেছেন। শান্তিনিকেতনের মতো অমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা দেশ বিদেশ ঘোরা অজস্র ছবি আঁকার ফাঁকে ফাঁকে তিনি রচনা করে গেছেন প্রচুর গান। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা অনুষঙ্গে সেইসব গান এমনভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে যে রবীন্দ্রনাথের গান বাঙালির এক অহঙ্কারের জায়গা দখল করে নেয় এবং এর স্থায়িত্ব সম্পর্কে প্রায় সকলেই নিঃসন্দিহান হন।

স্বভাবতই তাঁর আশি বছরের জীবৎকালে রচিত অজস্র গানের ডালির শেষ গান কোনটি, তা নিয়ে নিশ্চয়ই আমাদের কৌতূহল থাকবেই। এবার তাঁর সেই শেষ গানটি নিয়েই কয়েকটি কথা জানাতে চাই। জানলে অবাকই হন অনেকে যে, তাঁর রচিত জীবনের শেষ গানটি হল, ‘হে নূতন দেখা দিক আরবার’, যা রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পালনের এক অবশ্যম্ভামী অনুষঙ্গ হিসেবে এই গানের জন্মলগ্ন থেকেই স্বীকৃত। এই গানের জন্ম ২৩ বৈশাখ ১৩২৯ বঙ্গাব্দ, অর্থাৎ ৬ মে ১৯৪১। এই গানের জন্ম বৃত্তান্তে ঢোকার আগে এই ঠিক আগের গানটি নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। গানটি হল, ‘ওই মহামানব আসে’। এই গান রচনার কয়েকদিন আগে অমিয় চক্রবর্তীর কাছে রবীন্দ্রনাথ বিবৃত করেছেন তাঁর ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধের বিষয় এবং ওই প্রবন্ধের বিষয়ের সঙ্গে এই গানের যোগ খুব স্পষ্ট। ১৩২৯ সালেরই ১ বৈশাখ প্রবন্ধটি পড়েন নববর্ষের অভিভাষণ হিসেবে। মৈত্রেয়ী দেবীকে মুখে মুখে বলে যে দীর্ঘ কবিতাটি লিখেছিলেন কবি, তারই সংক্ষিপ্তকরণ হল গানে। দেশের সেই ঘোর দুর্দিনের সময়েও তিনি শুনতে চেয়েছিলেন মহামানবের পদধ্বনি, তাঁর আগমনের আগাম বার্তাও দিয়েছিলেন গানে।

ক্রমশ শরীর ভেঙ্গে পড়ছিল তাঁর। এমন এক সময়ে ১৯৪১ সালের ৬ মে তারিখে জন্ম হল নতুন একটি গানের, ‘হে নূতন দেখা দিক আরবার’। নিজের জন্মদিনকে মাথায় রেখে ১৩০৬ বঙ্গাব্দে, যখন তাঁর বয়স মাত্র আটত্রিশ, রচনা করেছিলেন অবিস্মরণীয় একটি গান, ‘ভয় হতে তব অভয়মাঝে নূতন প্রাণ দাও হে’। এই গান প্রথমে কবিতা হিসেবে লিখিত হয়ে কবির ‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয়েছিল ‘জন্মদিনের গান’ শিরোনামে। কিছুদিন পরেই এটিতে তিনি সুরারোপ করেন। তবু একে সেইভাবে জন্মদিনে গাওয়ার উপযুক্ত গান হিসেবে অনেকেই হয়ত বিবেচনা করেননি। তাই তো তাঁর শেষ জন্মদিন উদযাপনের আগে নতুন একটি গান রচনার দাবি জানিয়েছিলেন কবির এক ঘনিষ্ঠ আপনজন শ্রদ্ধেয় শান্তিদেব ঘোষ। তাঁর লেখাতেই এর বর্ণনা আছে এইভাবে, ‘তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, আপনি নিজের জন্মদিন উপলক্ষে কবিতা লিখেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন, অথচ গান রচনা করলেন না, এটা ঠিক মনে হয় না। এবারের পঁচিশে বৈশাখে সমস্ত দেশ আপনার জন্মোৎসব করবে, এই দিনটিকে উপলক্ষ করে একটি গান রচনা না হলে জন্মদিনের অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হয় না’। প্রথমে কবির এতে আপত্তি ছিল, মৃদু হেসে বলেছিলেন, ‘আমি নিজের জন্মদিনের গান নিজে রচনা করব, লোকে আমাকে বলবে কী। দেশের লোক এত নির্বোধ নয়, ঠিক ধরে ফেলবে যে আমি নিজেকে নিজেই প্রচার করছি’। এইসব আপত্তি অবশ্য টিকল না একেবারেই। শেষে তাঁর লেখা জন্মদিনের কবিতাগুলো খুঁজে আনতে বলেন। ওই কবিতাগুলো থেকে ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত ‘জন্মদিনের কবিতা’ শীর্ষক দীর্ঘ কবিতার শেষাংশ কিছুটা অদল বদল করে তিনি নতুন একটি গানের নির্মাণ করে সুরারোপ করলেন। জন্ম হল একটি নতুন গানের, ‘হে নূতন দেখা দিক আরবার’। তাঁর সারা জীবনের গানের ডালির শেষ অর্ঘ্য। গাওয়া হল সে বছর পঁচিশে বৈশাখে। তখন কে জানত এটাই হবে তাঁর জীবনের শেষ গান? হ্যাঁ, এই বহুশ্রুত গানটাই রবীন্দ্রনাথের সুরারোপিত শেষ গান। পূরবী কাব্যগ্রন্থের সেই কবিতাটির যে অংশ থেকে এটি পুনর্লিখিত হল, সেটি দেখার কৌতূহল সাধারণ পাঠকের থাকতেই পারে। তাছাড়া সুরারোপের প্রয়োজনে গানের কথা কীভাবে বদলে দিলেন কবি, সেটিও জানার আগ্রহ সবার থাকবে। সেজন্যেই সেই অংশটুকু নীচে দেওয়া হল।

‘হে নূতন,
দেখা দিক বারবার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ
আচ্ছন্ন করেছে তারে আজি
শীর্ণ নিমেষের যত ধুলিকীর্ণ জীর্ণ পত্ররাজি।
মনে রেখো হে নবীন,
তোমার প্রথম জন্মদিন
ক্ষয়হীনÑ
যেমন প্রথম জন্ম নির্ঝরের প্রতি পলে পলে;
তরঙ্গে তরঙ্গে সিন্ধু যেমন উছলে প্রতিক্ষণে
প্রথম জীবনে।
হে নূতন,
হোক তব জাগরণ
ভস্ম হতে দীপ্ত হুতাশন।
হে নূতন,
তোমার প্রকাশ হোক কুজ্ঝটিকা করি উদ্ঘাটন
সূর্যের মতন।
বসন্তের জয়ধ্বজা ধরি,
শূন্য শাখে কিশলয় মুহূর্তে অরণ্য দেয় ভরি-
সেইমতো হে নূতন,
রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন।
ব্যক্ত হোক জীবনের জয়,
ব্যক্ত হোক তোমা-মাঝে অনন্তের অক্লান্ত বিস্ময়।
উদয়দিগন্তে ওই শুভ্র শঙ্খ বাজে।
মোর চিত্তমাঝে
চির-নূতনেরে দিল ডাক
পঁচিশে বৈশাখ’।

মূল কবিতার উপরোক্ত অংশটুকু এক তৃতীয়াংশ। তবু দীর্ঘ। দিতে হল নিজের লেখা একটি কবিতাকে সুরারোপের প্রয়োজনে গীতিকার-সুরকার রবীন্দ্রনাথ কীভাবে পালটে দিয়েছেন, সেটা বোঝার জন্যে। এই দীর্ঘ কবিতাংশকে রবীন্দ্রনাথ মাত্র দশ লাইনের গীত রূপান্তরে এক অনন্য মাত্রা দান করলেন। যেমন গান তার তেমন সুর। প্রতিটি পংক্তিতে যেন কবি ও সুরকার প্রাণের আবেগ আর মনের মাধুরী ঢেলে দিলেন, যা হয়ে উঠল পরবর্তীকালের তাঁর জন্মদিন উদযাপনের এক অত্যাবশ্যক গান। সেই অনন্য গানটি নীচে উদ্ধৃত করা হল।

‘হে নূতন,
দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।
তোমার প্রকাশ হোক কুহেলিকা করি উদ্ঘাটন
সূর্যের মতন।
রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন।
ব্যক্ত হোক জীবনের জয়,
ব্যক্ত হোক তোমামাঝে অসীমের চিরবিস্ময়।
উদয়দিগন্তে শঙ্খ বাজে,
মোর চিত্তমাঝে
চিরনূতনেরে দিল ডাক
পঁচিশে বৈশাখ’।

জন্মদিনের গান গীত হল মৃত্যুদিনের কয়েকমাস আগে। আজও এই গান রবীন্দ্রজয়ন্তী পালনের এক অচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। নিজের জন্মদিনকে মহীয়ান করে আমাদেরকেই দু’হাত ভরে দিয়ে গেছেন তিনি। এটি অবশ্য রবীন্দ্রনাথের শেষ গান, শেষের গান নয়।