প্রথম বই প্রথম ভালোবাসা আমার ॥ লতিফ জোয়ার্দার


শুধুমাত্র একটা বই প্রকাশ করতে না পারার ব্যর্থতায় লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছিলাম। অথচ কতদিন ভেবেছি, এই লেখালেখির জন্যেই জন্ম হয়েছে আমার। বুকের ভেতর ছিলো অনন্ত হাহাকার। কষ্টের চোরাবালি মাঝে মধ্যে ডুবিয়ে মারতে চাইতো। নব্বই দশকের শুরুতেই একদিন প্রকাশিত অপ্রকাশিত সব লেখা আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দিলাম। আর কোনদিন লিখবো না আমি। আমার মাথার উপর তখন সংসারের বোঝা। লেখালেখি আর সাহিত্য পত্রিকার ভুত কোথায় যে পালিয়ে গেল আমার। ডিগ্রি পরীক্ষার আগেই বইয়ের লাইব্রেরি দিয়ে বসলাম রাজাপুর বাজারে। কিন্তু আমার কোনোকিছুই স্থায়ী হয় না। বইয়ের ব্যবসাও বেশিদিন টিকলো না। অতঃপর আমি একটার পর একটা ব্যবসা বদল করেছি। কিন্তু কোনো কিছুই আমার যেন ব্যাটে-বলে এক হচ্ছিল না। এতকিছুর পরও আমার বুকের ভেতর অজস্র কবিতারা হেঁটে বেড়াতো। আবার লিখতে ইচ্ছে করতো আমার ।

অভাবের নানা বর্ণিল রঙের সঙ্গে কখন কীভাবে পরিচয় হয়েছিল বুঝতে পারিনি আজও। তখন একটা কাজ চাই আমার। যে কোনো কাজ। নইলে সংসার সীমান্তে ভেসে যাব আমি। কোনোই কুল-কিনারা পাব না আর। নিত্যদিন আমার সামনে কত রকম অভাব যে হেঁটে বেড়াতো। একটা কবিতার খাতাও কিনতে পারিনি আমি। তখন আমার মনে হতো লেখালেখি ছেড়ে দিয়ে বেশ ভালোই করেছি। কী আর হতো আমার লেখালেখি করে। এমন সময় এলাকার এক বড় ভাই স্বপ্ন দেখালো। আবার লেখালেখি শুরু করো তুমি। আমি তোমার বই প্রকাশ করে দেবো। সে সময় আমার মনে হলো আর কবিতা নয়, সাধারণ মানুষের কাছে যেতে চাই আমি। সাধারণ পাঠকের জন্য আবার লিখবো আমি। এ যাত্রায় রোমান্টিক উপন্যাস লিখতে শুরু করলাম। ফর্মা দুই লেখার পর আর লেখা হলো না । সেই বড় ভাইও তখন আর কোনো আগ্রহ দেখালো না। ‘খুব জানতে ইচ্ছে করে’ উপন্যাসটির আতুর ঘরে মৃত্যু হলো। কোনদিন সে আর আলোর মুখ দেখলো না।

২০০০ সাল থেকে এলাকায় বইমেলার শুরু। প্রথম দুই এক বছর বইমেলায় যাওয়া হয়নি আমার। আমি তখন এলাকার বাইরে থাকি। আজ এ জেলা তো কাল আরেক জেলায়। যেবার প্রথম রাজাপুর বইমেলায় প্রবেশ করি সেবার, সেদিন থেকে আবার নুতন করে নুতন অস্থিরতায় ভাসতে থাকি আমি। এত বড় বইমেলা। হাজার হাজার মানুষ, বইয়ের স্টলের সামনে ভিড় করে দাঁড়িয়ে। কেউবা বই কিনছে। কেউ আবার বই নেড়েচেড়ে দেখছে। অথচ আমি একা একাই বইমেলায় হেঁটে বেড়াই। যে ক’দিন বইমেলা চলে প্রতিদিন মেলায় যাই। তখন আমার কেমন কেমন যেন লাগে। মনে হয় আজ যদি আমার একটা বই থাকতো। একটা বই যদি প্রকাশিত হতো আমার। মাত্র একজন পাঠক যদি আমার সেই বই নেড়েচেড়ে দেখতো। মাত্র একজন পাঠক যদি আমার বই পড়তো। এসব অলীক চিন্তা এখানেই থেমে যেতে পারতো। তারপরও মাঝে মাঝে ভাবতাম, কত ছোট ছোট আশা আমার। অথচ একজীবনে সব আশাগুলোয় অপূর্ণই রয়ে গেল।

২০০৫ সাল তখন। বইমেলায় জন্য মাঝে মধ্যে মিটিং চলছে। যে স্থানে বইমেলা হয়, সেই মাঠ আমাদের গ্রামের একটা অংশ। এই গ্রামের সন্তান আমি। আমার মনে হয় এই বইমেলা আমার বুকের অংশ। আমার মনে হয়, আবার লিখতে শুরু করতে না পারলে, আমি হয়তো একদিন পাগল হয়ে যাব। যে করেেই হোক, যেভাবে হোক আমার একটা বই প্রকাশ করা চাই। সংসারের মানুষগুলোকে কষ্ট দিয়ে হোক। তিন বেলার জায়গায় দুইবেলা খেয়ে আরেক বেলার খাবারের পয়সা বাঁচিয়ে হোক। আমার একটা বই প্রকাশ করা প্রয়োজন। সামনে আবার বইমেলা আসছে, আমার নতুন একটা বই চাই এবার। কিন্তু এখনও লিখতে শুরু করিনি আমি। নভেম্বর মাস চলছে। সামনে সময় আর মাত্র তিনমাস। আমার বুকরে ভেতর তখন একটাই ভাবনা, হয়তো শুরু করলেই আমি একটা বই লিখে শেষ করতে পারবো। কিন্তু বলা যত সহজ, কাজ করে দেখানো তত সহজ নয়। তার উপর লিখলেই হবে না। বই প্রকাশের জন্য টাকার প্রয়োজন। তখনও আমি ভাবছি, সামনে বইমেলায় আমার একটা বই বেরুচ্ছে। তখন আমি স্বপ্ন দেখছি, বইমেলার স্টলে স্টলে আমার নতুন বই। আমার বই কেনার জন্য লম্বা লাইন, দাঁড়িয়ে আছে কত কত পাঠকেরা।

বেশ কয়েকদিন লেখার চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। একটা কবিতার লাইনও লিখতে পারিনা আমি। একটা কবিতাও লিখতে পারিনা আমি। নতুন করে আবার আমার মনে হলো, একটা সমসাময়িক বিষয় নিয়ে রোমান্টিক উপন্যাস লিখলে কেমন হয়। নিজে নিজের কাছে প্রশ্ন করে কোনোই উত্তর মেলে না। একদিন এক প্রকার জোর করেই লিখতে বসে যাই। মাত্র কয়েকটি লাইন লেখার পর আমার মনে হলো, যেমনি হোক আমি হয়তো আবার লিখতে পারবো। এই ভাবনার পর, সেদিন এতটাই আনন্দিত হয়েছিলাম যে, আমার চিৎকার করে আকাশকে বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, আমি আবার লিখতে পারছি আকাশ। আমার চিৎকার করে নদীকে বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, আমি আবার লিখতে পারছি নদী। আমার সাগরকে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, আমি আবার লিখতে পারছি সাগর। এই যে লিখতে পারার অপার আনন্দের মধ্যে আমি এখনও হেঁটে বেড়াই।
তখন তো আর এখনকার দিনের মত হাতে হাতে মোবাইল ফোন ছিলো না। যাদের ছিলো তারাও কল রেট বেশি হবার কারণে, ফোনে বেশি বেশি কথা বলতে পারতো না। হরহামেশাই একজন আরেকজনকে মিসড কল দিত। আর এমনি একটা মোবাইল ফোনের গল্প নিয়ে শুরু হলো আমার প্রথম বই, প্রথম ভালোবাসা ‘নো মিসড কল’ উপন্যাস। নিজের অতৃপ্তি, নিজের অপূর্ণতা নিয়েই মাত্র সাত দিনে লেখা শেষ হয়েছিল। অতঃপর বই প্রকাশের জন্য দৌড়াদৌড়ি। লেখা যেমনই হোক না কেন, আমি আমার গল্প দিয়ে পাঠকের কাছে যেতে চাই।

বাড়ির পাশেই পারিবারিক কবরস্থান। যেখানে আমার বাবা, যেখানে আমার দাদা-দাদী,বড় ভাই ঘুমিয়ে আছে। সেই কবরস্থানের কয়েকটি বুড়ো বৃক্ষের প্রতি চোখ পড়লো আমার। বাড়ির অন্যদের সম্মতি ছাড়াই কয়েকটা বৃক্ষের শরীর কাঁটাছেড়া হলো। সামান্য টাকায় এক ব্যাপারীর কাছে কয়েকটি বৃক্ষ বিক্রি করতে হল। সংসারের জন্য কিছু টাকা রেখে, একদিন বগুড়া গেলাম বই প্রকাশের জন্য। সস্তা প্রচ্ছদে, সস্তা বাঁধাইয়ে আমার প্রথম উপন্যাস ‘নো মিসড কল’ আলোর মুখ দেখলো। ভেবেছিলাম আমার এই সস্তা বই আর কে কিনবে। তাও আবার ১০০০ কপি। ফেব্রয়ারির আঠারো তারিখ থেকে এলাকায় ২০০৬ সালের বই মেলা শুরু হলো। মনে পড়ে, প্রথমদিন মাত্র তেরো কপি বই বিক্রির পর কী যে মন খারাপ আমার। কিন্তু পরের দিন থেকে বই বিক্রি বাড়তে থাকলো। শেষের দিকে তো এক প্রকার লম্বা লাইন পড়েছিল। একদিনে সাড়ে তিনশ কপি বই বিক্রি এই বইমেলার সব ইতিহাস ভেঙে দিয়েছিল। প্রথম মুদ্রণ এক হাজার, আর দ্বিতীয় মুদ্রণ পাঁচশ কপি বই বিক্রি যেন এখনো আমার কাছে স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হয়। সত্যি এমন কী ছিল যে পাঠক সেদিন বইটি কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। আজ আমার বইয়ের সংখ্যা আটাশ। অথচ এখনও আমার মনে হয়, আমার যতগুলো বই প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ লেখা হলো ‘নো মিসড কল’। তবুও প্রথম সন্তানের মত প্রথম ভালোবাসা আমার।