প্রথম বিয়োগ, প্রথম উচ্ছ্বাস ॥ শিকদার ওয়ালিউজ্জামান



এইখানে শুয়ে আছে হৃৎপিণ্ড আমার
এখানেই শুয়ে আছে হৃৎপিণ্ডের কবর
এইখানে শুয়ে আছে আমার পরম সুখ
এখানেই শুয়ে আছে আমার ফেরারী দুখ।

ধূসর অরণ্যের আকাশ। আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। আমার প্রথম বিয়োগ, প্রথম আবেগ। কেন লিখতে শুরু করেছিলাম জানি না। নবম শ্রেণিতে পড়াকালে কোন সুন্দরকে শব্দের গাঁথুনিতে সাজানোর প্রয়াস করেছিলাম। সেই তো শুরু…

এর পর কতোটা বছর, কতোগুলো মাস পার করেছি, কতো বিষণ্নতায় তার স্বাক্ষী মহাকাল; কতো চরণ অপুষ্টিতে মরেও গেছে তার কোন হিসেব নেই। ওখানেই সব বিচ্ছেদযন্ত্রণা। কবিতার কাছে আশ্রয় চেয়েছি, একাকিত্বের সঙ্গ বানিয়েছি। পুত্রবিয়োগ। তখনও সান্ত্বনা চেয়েছি সময়ের কাছে, কবিতার আঁচলে শুয়ে কাটিয়েছি অনেক অনেক রাত। প্রতি বসন্তে পাতারা ঝরে গেলে হারানোর কষ্ট ভাগ করে নিয়েছি প্রকৃতির সঙ্গে। পরতে পরতে চেতনা খোয়ানো দু’পেয়ে মানুষের জন্য অনুশোচনা তৈরি হয়েছে ভেতর-বাড়িতে।

নব্বইয়ের সময়টাতে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কাল কাটানোর শেষদিক। ১৯৯৯ সাল থেকেই কবি হওয়ার ব্রত। শতাব্দির শুরুতে শুরু করলেও ২০০১-এর পর দীর্ঘ সাত বছর কবিতার বিরতি। বিয়োগ-যন্ত্রণার সূচনাকাল। ২০০৮-এ ইশতিক চলে গেলে নিরন্তর একাকিত্ব আর বিষাদ ঘিরে ধরলে কবিতার সঙ্গে আমার আবার গেরস্থালি শুরু। এক চোখে স্বপ্ন আর এক চোখে বিষাদ; দুইয়ের মিশেলে বই প্রকাশের বীজ বুনতে শুরু করি মনোভূমিতে। কবিতার বই। ২০০৮ এর আগে আর পরে লেখা সব কবিতার মধ্য থেকে বাছাইকৃত কিছু কবিতা নিয়ে পাণ্ডুলিপি তৈরি করে দেন অগ্রজ কবি বীরেন মুখার্জী। পাণ্ডুলিপির নামকরণ হলো- ধূসর অরণ্যের আকাশ। বীরেন দা কম্পোজ করে যখন পাণ্ডুলিপি আমাকে দেখালেন, বেশ আপ্লুতই হয়েছিলাম। তারপর প্রকাশের অপেক্ষা। মুহূর্ত গুণে গুণে পার হতে থাকে বিভোরতায়।

ডিসেম্বর ২০১০। শীতের কুয়াশা কাটিয়ে ঢাকায় যাওয়া শুধুমাত্র ধূসর অরণ্যের আকাশ প্রকাশের ব্যাকুলতায়। বিভাস প্রকাশনীর রামশংকর দাদার সঙ্গে দেখা। পুরো নাম রামশংকর দেবনাথ। বিভাসের কার্যালয় বাংলাবাজারে। আমাকে আর বীরেন দাকে আপ্যায়নের পর রামশংকর দা পাণ্ডুলিপি প্রুফ দেখার জন্য হাতে ধরিয়ে দিলেন। সঙ্গে চুক্তিপত্র। যদিও চুক্তিপত্রের প্রায় কোন শর্তই পালন হয়নি। আমি পাণ্ডুলিপিটা ড. তপন বাগচীকে দেখিয়ে বললাম, দাদা বইয়ের প্রুফটা দেখে দিন। তপন দা আমাকে স্নেহ করেন। তিনি বইয়ের কিছু বানান শুদ্ধ করে দিলেন। এরপর দাদাকেই বইয়ের ফ্লাপ লিখে দিতে অনুরোধ করি। দাদা না করতে পারলেন না। দাদা লিখলেন, ‘শিকদার ওয়ালিউজ্জামান শতাব্দির প্রথমে আবির্ভূত হওয়া কবিদের প্রথম সারির একজন। তপন দা’র এই বাক্য আমাকে বেশ ধাক্কা দিল। শূন্য দশক বলি আর প্রথম দশক বলি, আমি তো এ দশকের কাউকেই তেমন চিনি না। দাদা লিখেছেন, রাজধানীর বাইরে থাকার কারণেই এই চিনাচিনির বিষয়টি হয়ে ওঠেনি। মোবাইল সংস্কৃতি তখনও এখনকার মতো বিস্তার ঘটাতে পারেনি। এখন মনে হয় মুঠোফোন বিস্তারটা বেশিই ঘটিয়ে ফেলেছে। যাহোক, তপন দা তার ফ্লাপে আমার ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি গ্রহণ করার কথাও লিখেছিলেন। সেই থেকে দিন-রাত, বছরের পর বছর প্রস্তুতিই গ্রহণ করছি। প্রস্তুত হওয়া আর হলো কই?

প্রথম বই প্রকাশে বীরেন দা, তপন দা আর রামশংকর দা- এই ত্রয়ী অভিযান শেষ। কিন্তু শিকদার ওয়ালিউজ্জামান এখনও প্রস্তুতির দেয়ালই টপকাতে পারে নি। এ এক দারুণ ঘোর আর বিচিত্র জগৎ। অগাধ তার সীমা-পরিসীমা। ২০১১, ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখে প্রকাশ হলো আমার কবিতার বই। যথারীতি অনেক উচ্ছ্বাস সঙ্গ করে বইমেলায় গেলাম, কিন্তু খুব বেশি উন্মাদনা ছিল না। কারণ আমার কবিতার সামর্থে আমি এখনও সন্দিহান। ঘোর কেটে গেলে দেখি একটাও কবিতা হয়ে ওঠেনি। তেমনটিই হলো বইমেলাতে। আশা ছিল বইটি হৃষ্টপুষ্ট হবে। পরিপাটিও হবে। কিছুই ছুঁতে পারলো না আমাকে। না কবিতা, না বইয়ের গেটাপ-মেকাপ। প্রকাশক মহোদয় অন্যের বইয়ের আইএসবিএন নম্বর আমার বইয়ে বসিয়ে দিয়েছেন।

মনমরা অবস্থা নিয়েও নজরুল মঞ্চে বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হলো। তপন দা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করলেন। সঙ্গে ছিলেন বীরেন দা, বন্ধু কবি খালেদ রাহী, রণি অধিকারী আর ঢাকায় পড়ুয়া আমার কিছু ছাত্র-ছাত্রী। বন্ধু রাহী আর রণি আমাকে যে উৎসাহ যুগিয়েছিল তা আজও ভুলিনি। ভোলা যাবেও না।

বই প্রকাশ মানেই কবিতাগুলোকে মৃত খাটে শুইয়ে রাখা। ইচ্ছে করলেও আর তার কপালে টিপ পরিয়ে সৌন্দর্যের আনন্দ উপভোগ করা যাবে না। এ এক নিরন্তর বিয়োগব্যাথা।
এখনও আমি আমার প্রথম বইটির দিকে তাকিয়ে থাকি। পৃষ্ঠা খুলে খুলে দেখি। স্মৃতি হাতড়াই। বইয়ের মলাট পুরনো হয়ে গেছে। বইয়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনেরও মলাট উল্টাই। ছেড়ে আসা প্লাটফর্মের অনেক কিছুই মনে পড়ে যায়। এই তো সেদিন, সবুজ মাঠের আইলপথে কিশোরবেলার দৌড়। নাটাইয়ের সুতোয় ঘুড়ির উড়াল। সন্ধ্যায় পাখিদের কিচিরমিচির। নদী আর পুকুরে মাছের সাঁতার। আরও কতো রকমারি স্মৃতি। হায়, ফেলে আসা সেই দিন। প্রেম, সময়, কালের মেঘ এপার থেকে ওপারে যায়। ওপারেই ধূসর আকাশ। ধূসর বন, ধূসর জীবন। চোখে জল নেমে আসে।

বন্ধু কবি মামুন রশীদ প্রথম বই প্রকাশের উত্তেজনা আবেগ আর অনুভূতি লিখতে বললো। প্রথম বই, প্রথম স্মৃতি। প্রথম সবকিছুতেই কতো কাতরতা। কতো পবিত্রতা এবং এগুলো জীবনভর থেকেই যায়। শুধু আমি কেন প্রতিটি লেখকসত্তাই প্রথম কথাটি শুনে শিউরে ওঠে। এমনটাই স্বাভাবিক। অনুজ কবি রাসেল মাহমুদ প্রথম বই প্রকাশের পর, কবিদের নিয়ে এক সাক্ষাৎকার ও আড্ডার আয়োজন করেছিল বইমেলায়। আমিও শরিক হয়েছিলাম রাসেলের আমন্ত্রণে। আমাদের অনুভূতি ও সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল জাতীয় পত্রিকায়। সেও এক পরম আনন্দ।

তপন দা কেন জানি লিখেছিলেন, কবি শিকদার ওয়ালিউজ্জামান স্বপথে অগ্রসর হয়েছেন সততা নিয়ে, এটাই আশাবাদের জন্ম দেয়। আশাবাদ কতোটা বাস্তবায়িত হয়েছে কিংবা হবে জানি না, তবে আমার প্রথম এই ভালোবাসার গ্রন্থটিকে সততার সঙ্গেই আর একবার সাজিয়ে দেখতে চাই। মাঝে মাঝে অতীত শিকার করতে আমার ভালই লাগে।