প্রসঙ্গ : উনিশ মে ॥ আশরাফ খান


বেশ কিছুদিন হলো বইটি হাতে পেয়েছি। ব্যস্ততার ফাঁকে পড়া শুরু করি বইটি। সাইফুল ইসলাম এর লেখা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ইতিহাস ভিত্তিক উপনাস ‘উনিশ মে’। লেখককে আগে থেকেই চিনতাম, জানতাম ছড়াকার হিসেবে। তার নামের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ‘মশাদের গান’ নামক ছড়ার বইয়ের মাধ্যমে। তারপর তার সঙ্গে দেখা হয়েছে দুই একটি সাহিত্য সভায়। কিছুটা সময় আলাপ গত বই মেলায়। ‘উনিশ মে’ সাইফুল ইসলামের আটাশি পৃষ্ঠার এই বইটি উনিশ শ একাত্তর সালে সিরাজগঞ্জ মহকুমা প্রশাসক শহিদ একে শামসুদ্দিনকে নিয়ে লেখা। বইটি মুক্তিযুদ্ধ শুরুর অবস্থা, যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং নিরস্ত্র বাঙালিদের যুদ্ধের উপযোগী সৈনিক হিসেবে গড়ে ওঠার এক কালজয়ী আখ্যান।

আর এই কাজ করতে গিয়ে পাকিস্তান সরকারের একজন আমলা কিভাবে হয়ে ওঠেন নেতৃত্ব স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, তারই আদোপ্যান্ত গ্রন্থিত হয়েছে বইটিতে। লেখক অত্যন্ত মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন উপন্যাসের একদম শুরুতে। পুরো উপন্যাসটি আঠাশটি পর্বে বিভক্ত। উপন্যাসের প্রথম পর্বে বলা যেতে পারে পুুরো উপন্যাসের সারাংশ উপস্থাপন করা হয়েছে। মনে হয় যেন শেষ থেকে শুরু। তারপর ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে নানা ঘটনা। উপন্যাসের পুরো ঘটনা মূলত সিরাজগঞ্জের মানুষের স্বাধীনতার পূর্ব প্রস্তুতি এবং পাক হানাদার বাহিনীর প্রতিরোধ পরিকল্পনা এবং আংশিক প্রতিরোধ সংগ্রামের কথা।

উপন্যাসটিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে উপনাসের প্রধান চরিত্রসহ অন্যান্য চরিত্র এবং স্থানের প্রকৃত নাম ব্যবহার। সর্বজন শ্রদ্ধেয় মোতাহার হোসেন তালুকদার, সৈয়দ হায়দার আলী, আমির হোসেন বুলু, এম এ রউফ পাতা, বিমল কুমার দাস, আবদুল লতিফ মির্জা, সোহরাব আলী সরকার, আলমগীর, বকুল, মিনা, খ. ম আকতার, ওহাব প্রমুখ (বইয়ের লেখা অনুযায়ী ডাক নেম) যেমন সিরাজগঞ্জের অতি সম্মানিত পরিচিত মুখ। ঠিক তেমনি পৌর মিলনায়তন, জলিলের হোটেল, কুসুমের টি স্টল, বড়পুল, মোক্তারপাড়, জেলখানার ঘাট, পাঙ্গাশি, তালগাছি, বাঘাবাড়ি, ঘাটিনা, সলপ স্টেশন প্রভৃতি স্থানগুলো অতি পরিচিত। এখানে কোন প্রতীকি চরিত্র বা স্থান ব্যবহার করেননি লেখক। বইটিকে সিরাজগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বললেও খুব একটা ভুল হবে না।
শহিদ শামসুদ্দিন ছিলেন মহকুমা প্রশাসক। একাত্তর সালে তার পোস্টিং ছিল পাবনা জেলার অন্তর্গত সিরাজগঞ্জ মহকুমায়।

ওয়ারলেসে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে শহিদ শামসুদ্দিন খবর জানাতে গভীর রাতে চলে যান ছাত্র সংসদ কার্যালয়ে। তারপর বিভিন্ন মিটিং মিছিলে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং যুদ্ধোপযোগী দিকনির্দেশনায় তিনি হয়ে ওঠেনে স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা কর্মীদের প্রিয়পাত্র। এক পর্যায়ে তিনি হয়ে ওঠেন তাদের অঘোষিত ক্যাপ্টেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। অতঃপর প্রশিক্ষণ শেষে নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করে সরকারি অস্ত্র তুলে দেন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। তার এই দুঃসাহসী কাজে তাকে সহযোগীতা করেন তৎকালীন এসডিপিও আনোয়ার উদ্দিন লস্কর। কিন্তু সে অস্ত্র পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য যথেষ্ট নয়। তাই তিনি অস্ত্র সংগ্রহের জন্য ছুটে যান ভারতে। কিন্তু কোন অস্ত্র সংগ্রহ করতে না পেরে হতাশ হয়ে ফিরে আসেন। তিনি রুট ম্যাপ করেন কিভাবে পাকিস্তানি মিলিটারিদের প্রতিরোধ করে সিরাজগঞ্জকে হানাদার মুক্ত রাখা যায়। প্রতিরোধ সেল ডিফেন্স তৈরি করা হয় বাঘাবাড়ীতে। বাঘাবাড়ীতে ব্যর্থ হলে ঘাটিনা নদীতে করা হয় দ্বিতীয় ডিফেন্স সেল।

সর্বশেষ সলপ স্টেশনের পাশে স্কুলঘরে মিটিংয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অণুপ্রাণিত করে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সিরাজগঞ্জে চলে আসেন এ কে শামসুদ্দিন। তারপর একটি নৌকা ভাড়া করে একান্ত সহচর আসমত এবং চাচাতো ভাই আবুল কাশেমকে নিয়ে অজানা গন্তব্যে যমুনার বুকে নিজেকে ভাসিয়ে দেন। আজ এ ঘাট কাল সে ঘাট। এ চর সে চর এভাবে নদীতে কাটে তার জীবন। এরই মধ্যে মানসিক এবং শারিরীকভাবে অনেকটা ভেঙ্গে পড়েন। চাচাতো ভাই কাশেমকে দিয়ে বিভিন্ন খবর সংগ্রহ করেন। মায়ের খবর নেন। মামা বাড়ীর খবর নেন। খবর নেন স্ত্রীর। একদিন কাশেম নৌকা থেকে নেমে চলে যায় টাঙ্গাইলে। যেখানে এ কে শাসমুদ্দিনের মামার বাড়ী এবং নিজের বাড়ী। কাশেম ফিরে এসে বলে- ‘চাচিমাকে (শামসুদ্দিনের মা) পাইনি। কেউ বলে মুধুপুরগড়ে চলে গেছে, আবার কেউ বলে, ইন্ডিয়ায়। সঠিক খবর কেউ দিতে পারে না। গ্রামের মধ্যে খুঁজতে খুঁজতে বাড়ীর কামলা শহীদকে পেলাম। সে-ও কিছু বলতে পারে না। তবে ভাবির (শামসুদ্দিনের স্ত্রী) একটা চিঠি পেয়েছি। সে কারো মাধ্যমে মামার বাড়ীতে পাঠিয়েছিল। তা গ্রামেরই কোন লোকের কাছে দিয়ে গেছে কেউ। এই যে সে চিঠি’।

চিঠিতে স্ত্রী লেখে- ‘এ চিঠি তোমার হাতে যদি পৌঁছে, আসতে বলব না, কারণ আমি জানি না যে, তুমি কি অবস্থায় কোথায় আছ। নিজের যত্ন নিও। সাবধানে থেকো। তোমার অনাগত সন্তান ভালো আছে। ইতি। তোমারই বেবী’। স্ত্রী চিঠি পাওয়া পরে মনের ভেতর কোন এক অজানা মোহ তাকে আলোড়িত করে। তাই নৌকার মাঝির পোষাক পড়ে ছদ্মবেশে ফিরে যান ধানমণ্ডি ২৬ নম্বর রোডের ওলি মিয়ার বাড়ীতে। যেখানে মামার বাড়ীতে রয়েছে তার অন্তঃস্বত্ত্বা স্ত্রী বেবি। মাত্র ছয় মাসে পূর্বে বিয়ে হয়েছে তাদের। কিন্তু সেখানেও শেষ রক্ষা হলো না তার। পরের দিন সকালে একদল পাকিস্তানি মিলিটারি তাকে ধরে নিয়ে যায়। তারপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি হায়েনা আখ মাড়াই করার ডলনা মেশিনে নির্মমভাবে পিষে হত্যা করে তাকে। লোমহর্ষক সে বর্ণনা পড়লে চোখে জল চলে আসে।

একাত্তরের দিনগুলো কতটা নির্মম ছিল তার চিত্র ভেসে ওঠে চোখের সামনে। লেখক তার বর্ণনা এবং উপস্থপনায় অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। কলম-কালির আঁচড়ে জীবন্ত করে তুলেছেন প্রতিটি ঘটনা, সংলাপ এবং চরিত্র।
একটিমাত্র বই, একটিমাত্র কবিতা এমনকি একটিমাত্র লাইনও কখনো কখনো অমর করে তোলে লেখককে।
আমার বিশ্বাস সাইফুল ইসলামের ‘উনিশ মে’ ঠিক তেমনি একটি কালজয়ী উপনাস হিসেব সমাদৃত হবে। উপন্যাসটি শ্রদ্ধেয় সাইফুল ইসলামকে অমর করে রাখবে যুগ যুগ ধরে।


উনিশ মে, সাইফুল ইসলাম, প্রকাশক : বেহুলাবাংলা, প্রচ্ছদ: আল নোমান, দাম : ২০০ টাকা।