পড়ন্ত বিকেলের মানসপ্রতিমা ॥ মনিজা রহমান


বিশাল কালো হোন্ডা সিআরভি চালিয়ে জেএফকে এয়ারপোর্টের দিকে চলছে নাদিয়া। মনের মধ্যে চলছে ঝড়। সেখানে কাকে দেখবে ও? তার মতো দেখতে কেউ? আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব নয়তো?

সেটা কিভাবে হবে? যার সঙ্গে কোনদিন দেখা হয়নি, তার কন্যার মা সে কিভাবে হয়? এতটা অলৌকিক তো কিছু ঘটতে পারে না। দেখা হয়নি কথাটা অবশ্য পুরোপুরি ঠিক নয়। অপরপক্ষ দেখেছে নাদিয়াকে আর মনের ফ্রেমে চিরদিনের জন্য বাঁধিয়ে রেখেছে, কিন্তু নাদিয়ার কোন সুস্পষ্ট স্মৃতি নেই। যা আছে হালকা ছায়ার মতো।
নিউইয়র্ক সিটিতে গাড়ি চালায় নাদিয়া আজ বিশ বছরের বেশি। কিন্তু কখনও এমন হয়নি। আজ হঠাৎ কেন যেন হাত কাঁপছে। স্টিয়ারিংয়ের ওপর কোন দখল নেই। স্বভাবজাত অভ্যাসের বশে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে যেন। কেন এমন হল? কেন এমন হয়? যে বয়সে যেটা মানায় না, সেটা কেন করতে গেল ও। বায়ান্নো বছর বয়সে এসে তো বাইশ বছরের আবেগ বুকে নিয়ে আবেগাক্রান্ত হওয়া মানায় না।

কেন সে ফিরতে চেয়েছিল ফেলে আসা জীবনের চৌকাঠে? শিউলী ফুলের গন্ধ ভরা কিংবা কৃষ্ণচূড়ার তীব্রতায় মাতাল সেই দিনগুলিতে? কেন সে এমনভাবে গলে গেল তার কথার ফাঁদে? হু হু করে আজ সমস্ত ঘটনা আছড়ে পড়ছে মনের সৈকতে।
– আপনি আগে রমনা পার্কে হাঁটতে যেতেন। আমরা তখন অনুশীলন করতাম মাঠে। আপনি আমাদের দেখে হালকা লজ্জা পেতেন। আপনার মধ্যে একটা লাজুক আর ভাবুক মন ছিল। যেটা ফুটে উঠতো আপনার চেহারায়। মনে আছে সেইসব দিনের কথা?
শুরুটা কি এভাবে হয়েছিল? কতকাল আগের ঘটনা। তবু সামান্য স্মৃতিচারণে কে যেন মনের মধ্যে দক্ষিণা বাতাস বুলিয়ে দিল। কে যেন বুকের মধ্যে ঢাক বাজায়। চোখের নীচে হালকা করে কনসিলার লাগাতে গিয়ে মেসেজটা দেখছিল নাদিয়া। চোখের নীচে বয়সের চিহ্ন। উবার এক্স কল করেছে। দুই মিনিটের মধ্যে চলে আসবে।

নাদিয়া নিউইয়র্ক সিটির এক স্কুলে টিচার এ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ করে। ড্রাইভ করে গেলে বাড়ি থেকে দশ মিনিটের দূরত্ব। বাসেও যাওয়া যায়। গাড়ি নেয় না, কারণ সেটাতে স্বামী মাসুদ উবার চালায়। নাদিয়ার প্রত্যেকদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে যায়। তাড়াহুড়া করে তাই উবার কল করে। উবারে উঠে প্রথমে আইডি কার্ড গলায় ঝোলায়। তারপরে মোবাইলের মেসেঞ্জার ওপেন করে মেসেজটা আবার পড়ে।

নাদিয়া কোনভাবে বার্তাপ্রেরককে নাম দেখে চিনতে পারছে না। দ্রুত মেসেজের রিপ্লাই দেয় ও। হাতে বেশি সময় নেই। ‘রমনা পার্কে হাঁটতে যাবার কথা মনে আছে। কিন্তু কিছুতেই আপনাকে মনে করতে পারছি না’।

‘আপনি আমাদের ক্লাবে মাঝেমধ্যে আসতেন। বিশেষ করে পরের দিন বড় ম্যাচ থাকলে অবশ্যই আসতেন। অনুশীলনের ফাঁকে ফাঁকে আমি খুব মন দিয়ে খেয়াল করতাম আপনাকে। ফর্সা সরু আঙ্গুল দিয়ে আপনি কি সুন্দরভাবে বলপেন আর নোটবুক ধরে রাখতেন। আমাদের সাক্ষাৎকার নিতেন। মনে নেই’?

স্কুল গেট দেখা যাচ্ছে। ‘পরে কথা হবে’ কোনক্রমে লিখে দ্রুত গাড়ি থেকে জোরে হাঁটতে থাকে নাদিয়া। আটটার আগে স্কুলের কার্ড পাঞ্চ করতে হবে। দুইটা বিশ মিনিটে ছুটি হয়। তারপরে বাসায় ফিরে খেয়েই একটা ঘুম দেয় নাদিয়া। শরীর এত ক্লান্ত থাকে। অনেক ভেবেছে বিকেলে না ঘুমিয়ে রাতে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়বে। কিন্তু সেটা হয়নি। মনের কোন জোর নেই। অনেক রাত জেগে সোশ্যাল মিডিয়াতে সময় কাটানো বাজে স্বভাবটা কাটাতে পারেনি। তদুপুরি নেটফ্লিক্সে সিনেমা দেখা আর ইউটিউবে সাম্প্রতিক সব ইস্যুতে বানানো ভিডিও দেখা তো আছেই।

ফেসবুকের চেয়ে ইন্সট্রাগ্রাম আসক্তি ইদানিং বেশি হয়েছে নাদিয়ার। নিজের ছবি পোস্ট করার মতো সাহস নেই। স্কুল থেকে প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়ে ফিরে পেট ভরে ভাত খেয়ে আর তারপর একটা লম্বা ঘুম দিয়ে স্বাস্থ্য যা হয়েছে, তাতে ছবি পোস্ট করার মতো অবস্থাতে নেই। অন্যের ছবি দেখে সময় কাটায়। সচরাচর কমেন্টস করে না। তবে নিয়মিত লাইক দেয়। ইন্সট্রাগ্রামে প্রিয় নায়ক নায়িকার ছবি দেখাটাই জীবনের সবচেয়ে প্রিয় আনন্দ। তাদের সমস্ত খবরাখবর রাখে। ছবি দেখার পরে আবার গুগলে সার্চ করে বিস্তারিত জেনে নেয়। জীবনে এখন এইটুকুই বিনোদন।

নাদিয়ার বেশি ভালোলাগে প্রিয় নায়িকা কিংবা মডেলদের বয়ফ্রেন্ড কিংবা সদ্য বিবাহিত স্বামীদের ছবি দেখতে। মন ভরে দেখে ও। ওর মনে হয় মানুষটা যেন আমারও কেউ হয়। নিজেকে নায়িকার জায়গায় কল্পনা করে। নাদিয়ার কল্পনা লাগামহীন। যে কারণে ওর মনে কোন দুঃখবোধ বেশীক্ষণ স্থায়ী হয় না। ওর সমস্ত অবয়বে সারাক্ষণ কেমন যেন একটা উদাস করা ভাব থাকে। পঞ্চাশোর্ধ বয়সে এত বেশি অন্যমনস্ক স্বভাবের কারণে স্বামী ও মেয়েদের কাছে কথা শুনতে হয়। তবু নিজেকে পাল্টাতে পারেনা নাদিয়া। স্কুলে সবাই ভাবে বোকাসোকা মানুষ। নিজেকে একটা খোলসের মধ্যে ঢুকিয়ে স্বপ্নের পৃথিবীতে বাস করতে ভালো লাগে ওর। মাঝে মধ্যে রোমান্টিক গান শুনলে মনটা একটু বিষণ্ন হয়ে যায় ঠিকই, একটু পরে নিজেকে বুঝ দেয়, আমি তো অনেক ভালো আছি। বায়ান্ন বছর বয়সেও দেখতে সেরকম বুড়ি লাগে না। এখনও সেজেগুজে বের হলে পথেঘাটে নারী পুরুষ উভয়েই তাকিয়ে থাকে, সেটাই বা কম কি।

তবে সেই পর্যন্ত। কেউ ভালোবাসার প্রস্তাব দেয় না। আমেরিকানদের কাছে সুন্দর ফিগার হল সৌন্দর্যের প্রধান মাপ কাঠি। ফেসবুক-ইন্সট্রাগ্রামে নাদিয়া হল ‘দেখন পার্টি’। সেলফির যুগে কেউ কেউ শুধু মুখের ছবি তুলে পোস্ট করে। নাদিয়ার সেটা ভালো লাগে না। ছবি তোলার ব্যাপারে কেমন যেন বৈরাগ্য চলে এসেছে। মাঝেমধ্যে ভাবে, ওজন কমিয়ে দারুণ একটা ছবি দিয়ে সবাইকে চমকে দেবে। কিন্তু সেই চমক দেওয়া আর হয় না। মনে হয় কোনদিনই হবে না।

শামীম নামের ওই এককালের খেলোয়াড়ের সঙ্গে ফেসবুকে পাকেচক্রে কিভাবে ‘বন্ধু’ হল, নাদিয়ার ঠিক মনে নেই। মাঝে মধ্যে হাই হ্যালো করত সে ম্যাসেঞ্জারে। নাদিয়া ওর লেখা পড়ত, কিন্তু কোন উত্তর দিত না। মেসেঞ্জারে কথা বলার ব্যাপারে সে খুব অলস। কোনরকম ঝামেলার মধ্যে যেতে চায় না। কিন্তু, একটা মেসেজ-একটা ছবিই পাল্টে দিল সবকিছু।

শীতকালের সন্ধ্যা এখানে খুব দীর্ঘ হয়। এত লম্বা সময় কিছু করার থাকে না। তবু নাদিয়ার শীতকাল ভালো লাগে। সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে ডিনারসহ সব কাজ শেষ করে ফেলে ও। তারপর নিরবিচ্ছিন্নভাবে বিশ্রামসহ নানা বিনোদনে ব্যস্ত থাকতে পারে। নাদিয়ার ক্যাব চালক স্বামী মাসুদ বিকেল চারটার দিকে কাজে বের হয়। ফেরে অনেক রাতে। তখন নাদিয়া দুই কন্যা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। নাদিয়া যেহেতু দিনের বেলা স্কুলে চাকরি করে সেই কারণেই মাসুদ রাতে কাজ করে। যাতে মেয়েদের স্কুলে কোন দরকার হলে মাসুদ ছুটে যেতে পারে।

নাদিয়ার দুই মেয়েই খুব লক্ষ্মী। কিছু বলতে হয় না। নিজেরাই নিজেদের সব কিছু করে। আসলে এত সুখে থাকাই কাল হয়েছে নাদিয়ার জন্য। ওজন শুধু বেড়ে চলেছে। ওজন কমানোর জন্য কোন অনুপ্রেরণাও বোধ করে না। মাঝে মাঝে আগেকার ছবি দেখলে বুক কাঁপিয়ে নিঃশ্বাস পড়ে এই যা। এই ছবিটা দেখেও বুকের মধ্যে কোথায় যেন ঘা পড়ল।

নাদিয়ার কম বয়সের একটা ছবি। মাত্র তখন রিপোর্টিং শুরু করেছে। একদম হালকা পাতলা ছিল তখন। লম্বা হালকা কোকড়া চুল। সবুজ আর কমলা রঙের একটা লম্বা কামিজ আর চুড়িদার সালোয়ার পরনে। ওড়না এক পাশে। উজ্জ্বল শ্যামলা অবয়বে যেন এক মায়াবতী। নাদিয়ার এখনকার চেহারার সঙ্গে কেউ মেলাতে পারবে না।

নিজের ছবি দেখে নিজেই চমকে যায় নাদিয়া।
এমনিতে ও খুব সৌন্দর্যপ্রিয়। তবে সৌন্দর্য উপভোগের এই তীব্র অনুভূতিকে কোন ব্যকরণে ফেলতে পারেনি নাদিয়া। নিজেকে প্রকাশের কোন মাধ্যম তার জানা নেই। ধার করা অনুভূতিও মনের মধ্যে অন্তসারশুন্যতার সৃষ্টি করে। গান, কবিতা কিংবা গল্প কোনটাই যেন বর্তমানে তার জন্য নয়। বায়ান্ন বছর বয়সেও সতের’র কিশোরী মনের উন্মুখ অস্থিরতা কি মানায়? মানায় না। মনের এই অস্থিরতা অবসন্ন করে রাখে নাদিয়ার শরীর, মন, সমস্ত সত্ত্বাকে। কোন কিছুতে কোন উৎসাহ খুঁজে পায় না। ভালো-মন্দে দিনগুলি কাটিয়ে দিতে হয় বলে কাটায়, অন্তরঙ্গ কোন সন্ধ্যার ভাবনা নেই এই জীবনে।

শামীম নামের এই মানুষটির দমকা হাওয়ার মতো আগমন-নাদিয়ার মনের ধুলোপড়া আস্তরণ উড়িয়ে দেয়। অনের দিন পরে পলেস্তারা উঠে যাওয়া পুরনো বাড়ির অলিন্দে এসে দাঁড়ায় এক ক্ষীণকায়া তরুণী। জীবনে প্রথম প্রেমের চিঠি আসে মধ্যবয়সে। স্কুল জীবনেও হয়ত এসেছিল। তাতে কোন গভীরতা ছিল না। কোন অনুভূতির প্রখরতা ছিল না। ঝরাপাতার মতো হারিয়ে গেছে সেই সব। এই চিঠি তো হারাবার নয়। কারণ এই চিঠি এসেছে ইমেইলে। মানুষ চলে গেলেও ইমেইল মুছে ফেলবে না কোন চিহ্ন। যে চিহ্ন আবার হৃদয় থেকে উৎসারিত।

খেলা ছেড়ে দিয়ে গার্মেন্টস ব্যবসা শুরু করে সফল হয়েছে শামীম। খেলোয়াড়ি জীবনে ও অত সফল ছিল না যদিও। বেশীরভাগ সময় কাটাতে হত সাইড বেঞ্চে। ক্লাব দলে শামীমের চেয়ে রাইট উইংয়ে তুখোড় এক ফুটবলার ছিল সেই সময়ে। পুরো নব্বই মিনিট খেলতে পারতো সমান তালে, ইনজুরিতে পড়ত না সেভাবে। শামীমের দোয়ায় সেই রাইট উইংগার ইনজুরিতে পড়বে এমন তো কোন কথা নয়। শামীম অবশ্য তেমন দোয়াও করেননি। সে তেমন মানুষ নয়। সব সময় খুব ঠাণ্ডা মেজাজের। এখন নারায়ণগঞ্জের বাড়ি থেকে প্রতিদিন কাক ডাকা ভোরে উঠে গাড়িতে রওনা হয় গাজীপুরের উদ্দেশ্যে। ট্রাফিক জ্যামে বসে থাকতে গিয়ে এসব চিঠি লেখে বলে জানায় সে।

নাদিয়া এখন প্রতিরাতে ঘুমাতে যাবার আগে হয় ফোনে শামীমের সঙ্গে কথা বলে, নয়ত কিছুক্ষণ টেক্সট বিনিময় করে। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে লোকটা কতখানি আসল। এটা কি আসলে সময় কাটানোর জন্য? ভদ্রলোকের হয়ত এটা নেশা তার কাছাকাছি বয়সী নিঃসঙ্গ নারীর সঙ্গে ভার্চুয়াল সম্পর্ক গড়ে তোলা। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও কোন খাদ খুঁজে পায় না। তবে কি তার ভালোবাসা নির্ভেজাল? এত বছর ধরে এত ভালোবাসা জমিয়ে রেখেছিল সে একজনের জন্য।

শামীমের একটা কথা অবশ্য অনেকদিনের সংশয় ভেঙ্গে দিয়েছিল। এক মেয়ে ও দুই ছেলের বাবা সে। বড় মেয়ের নাম রেখেছে নাদিয়া। নাদিয়া? কেন এই নামটাই রেখেছে সে? তারমানে সে এতটাই রেখাপাত করেছে তার মানসপটে যে নিজের সন্তানের নাম রেখেছে। এত ভালোবাসা নিয়ে কেন এত দিন নিরব ছিল সে? ভরা পূর্ণিমায় না এসে কেনই বা এল জীবনের অস্তায়মান দিনের সন্ধ্যায়।

‘এতদিন আসিনি কারণ তোমাকে খুঁজে পাইনি। খেলা ছেড়ে দেবার পরে ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। বাংলাদেশে ব্যবসা করা খুব কঠিন কাজ। কত জনকে খুশী করতে হয়। তারপর আছে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতা। পথে ঘাটে কর্ম ঘন্টা চলে যাওয়া। নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রতিদিন গাড়ীতে প্রথমে ঢাকা, তারপর গাজীপুরে যেতে হত। দিনে আট থেকে দশ ঘন্টা লেগে যেতে শুধু আসা যাওয়ায়’।

‘কি বল, আট-দশ ঘন্টা? তাহলে কাজ করতে কখন আর বাসায় গিয়ে ঘুমাতেই বা কখন’? নাদিয়া নিজে আরামের জীবন কাটিয়ে এসেছে বলে সবাইকে তেমন ভাবে। প্রবাস জীবনে প্রতি মুহূর্তে ওর মনে হয় ঢাকা থাকতে গাড়িতে করে শপিংমল আর বন্ধুদের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে আড্ডা দেয়া, বাসায় বুয়াকে ডাকতেই পানি নিয়ে দৌড়ে আসার সেই সুখের জীবনের কথা।

নাদিয়ার চিন্তার জাল ছিন্ন করে শামীম বলে ওঠে, ‘কয়েক বছর হল গাজীপুরে আমার গার্মেন্টসের অবস্থা স্থিতিশীল। প্রতিদিন আমাকে না গেলেও চলে’।
ফেসবুকে নাদিয়াকে খুঁজে পাওয়া প্রসঙ্গে বলে, একদিন একজন বলল, ফেসবুকে পুরনো বন্ধু খুঁজে পেয়েছে। কথাটা শুনে নিজেকে এত বেকুব লাগছিল যে বলার মতো নয়। কেন এত দিন এই সাধারণ চেষ্টাটুকু করিনি। এরপর ফেসবুকে তোমার নাম দিয়ে সার্চ দিয়েই পেয়ে গেলাম। নাদিয়া আখন্দ এমন নামের যুগলবন্দী তো খুব বেশী মানুষের নেই’।

নাদিয়া বুঝতে পারে ফেসবুকে ওর প্রোফাইল পিকচারটা শামীমের খোঁজাখুঁজিকে আরো সহজ করে দিয়েছে। প্রায় চব্বিশ বছর আগে যখন প্রথম নিউইয়র্ক শহরে আসে, সেই সময়কার একটা ছবি, সেন্ট্রাল পার্কের চেরি ব্লোজমের সময় তোলা হয়েছিল, যার সঙ্গে ঢাকার স্বল্পস্থায়ী রিপোর্টার জীবনের মিল থাকলেও বর্তমানের সঙ্গে মিল খুব সামান্য। নাদিয়ার মাঝেমধ্যে মনে হয়, শামীমের সঙ্গে কোন প্রতারণা করছে না তো । কারণ সেই দিনের সঙ্গে আজকের দিনের মানুষটির অবয়বের যে বড় ফারাক।
আশ্চর্য্য ঘটনা হল শামীম কখনও নাদিয়াকে দেখতে চায় না। প্রথমে ভেবেছিল শামীম হয়ত অনেকখানি পাল্টে গেছে। তাই সেও নিজেকে দেখাতে চায় না। কিন্তু মাসে দুই মাসে বিভিন্ন কনফারেন্স কিংবা বন্ধু পরিবারের সঙ্গে ঘুরতে যাবার ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে শামীম, সেটা দেখে ওকে তেমন খারাপ দেখতে মনে হয় না।

‘তুমি আমাকে দেখতে চাও না কেন’? একদিন জিজ্ঞাসা করে ফেলেছিল নাদিয়া হঠাৎ করে।
নাদিয়া জানে, ওর মতো সরল, নিজেকে কায়দা করে উপস্থাপন করতে না জানা মানুষ খুব বেশি মনোযোগ পায় না কোথাও। কিন্তু শামীমের কথা একদম আলাদা। হয় সে ওর মতো সহজ সরল কিংবা সহজ সরলে ভান করে রাখা শামীম এই মুহূর্তে পৃথিবীর একমাত্র মানুষ যে নাদিয়ার কথার প্রত্যেকটি দাড়ি কমা অখণ্ড মনোযোগ দিয়ে শোনে। যখনই ফোন করুক কিংবা টেক্সট করুক- কোন ব্যস্ততা দেখায় না। যেন নাদিয়াকে পেয়ে বহুদিন ধরে তৃষিত কোন পথিক এক অনন্ত নদীর সন্ধান পেয়েছে।

‘আমার কাছে তোমার যে ছবিটা আছে, সেই চেহারাটা আমার মনের ভেতরে চিরস্থায়ীভাবে গাঁথা আছে। পৃথিবীর কোন শক্তিশালী ইরেজারও সেটা মুছতে পারবে না। কত নারীকে দেখলাম কত জায়গায়, কিন্তু নিয়তির কি পরিহাস, কোন এক পড়ন্ত বিকেলে তোলা তোমার এই ছবিটাকে মন থেকে সরাতে পারলাম না’।

এভাবে দিন গড়ায় সুতোর বান্ডিল গড়ানোর মতো। তবু নাদিয়ার জীবন কিছুটা অর্থ পায়। ওর মনে হয় এবার হয়ত সে সুন্দর হতে পারবে, যদি কখনও দেখা হয় শামীমের সঙ্গে, সেই দিনের জন্য। ইস্ট রিভারের তীরে জল বয় এদিকে। শামীমের বাড়ির কাছের নদীর নাম কি জানে না নাদিয়া, মনে হয় শীতলক্ষ্যা হবে, সেখানেও স্রোত বয়।

‘নাদিয়া তো আমেরিকা যাচ্ছে’। একদিন ফোন করতেই হঠাৎ করে কথাটা বলে শামীম। নাদিয়ার বুঝতে কয়েক সেকেন্ড লাগে। সে তো আমেরিকায় থাকেই, সেখানে যাবার কি আছে? তারপর শামীমের পরের কথাতে বুঝতে পারে ওর বড় মেয়ে নাদিয়ার কথা বলছে। ওর নামে মেয়ের নাম রেখেছে শামীম, অন্তত তার ভাষ্যমতে। আমেরিকার উত্তর-পূর্ব দিকের স্টেট নিউ হ্যাম্পশায়ারের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে শামীমের মেয়ে। ঢাকা থেকে নিউইয়র্কে এসে তারপর সেখানে যাবে। শামীম আগেই বলছিল, মেয়ের পড়াশুনার মেধার কথা, যেটা ওর মতো মানুষের সন্তানের হবার কথা না, হয়ত নামের কারণেই হয়েছে। নাদিয়া প্রতিবাদ করে বলে- না, না আমি তেমন মেধাবী নই।
শামীমের কাছে এই নাদিয়া পৃথিবীর সুন্দরী শ্রেষ্ঠা, মেধায়-গুণে-বুদ্ধিমত্তায় অনন্যা। শামীম যাকে বিয়ে করেছে সে ছিল ওর কাছে একটা শরীর মাত্র। ভালোবাসার মেঘ থেকে ঝরে পড়া সবটুকু বৃষ্টি সে এক পাত্রে জমিয়ে রেখেছে সারাজীবন একজনের জন্য। শামীম যখন চোখ বুজে চুম্বন করেছে ওর স্ত্রীকে, তখন ওর হৃদয়ে আঁকা ছিল সবুজ আর কমলা রঙের কামিজ পরা এক তরুণীর ছবি। যখন স্ত্রীর শরীরে নিজের ভালোবাসার ভ্রুণকে স্থাপন করেছে তখনও মানসপটে ছিল তার ছবি।

নাদিয়ার বিশাল কালো গাড়িটা এক সময় থামে জেএফকে এয়ারপোর্টের টার্মিনাল ফোরের সামনে। ভেতরে অপেক্ষা করছে শামীমের মেয়ে নাদিয়া। নাদিয়ার মনের মধ্যে বুদ বুদ করে উঠছে একের পর এক প্রশ্ন, অনেক জিজ্ঞাসা, অনেক বিস্ময় ভরা অনুভবের। ও বুঝতে পারে না কি দেখবে একটু পরে?