ফররুখ আহমদ : প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধা ॥ অজয় দাশগুপ্ত


স্বৈরাচারের কবিতা লিখে দিতেন বা লিখে মন্ত্রী হয়েছিলেন এমন কবিও নন্দিত। সমাজে গৃহীত। শুধু মুসলিম রেঁনেসার কবি হবার অপরাধে কাঠগড়ায় থাকলেন ফররুখ আহমদ। অথচ তাঁর যৌবন ছিলো বাম ঘরানার। তাঁর সহপাঠী ছিলেন সত্যজিত রায়। তাঁর শিক্ষক ছিলেন বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র। তাঁর সতীর্থ ছিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। স্কটিশের ছাত্র চাকরির তাড়নায় বিএ পাশের পর আর পড়তে পারেন নি।
তাঁর কোন ভূমিকার জন্য তিনি এতো ব্রাত্য আধুনিক মহলে? তিনি সেই কবি যিনি ১৯৬৬ সালে পাকিস্তানি শাসকদের অপরিনামদর্শী আচরণের কারণে সিতারা ই হেলালের মতো খেতাব বর্জন করেছিলেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে তাঁর সমর্থন ও ভূমিকা ছিলো অসাধারণ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও ছিলো সমর্থন, একাত্মতা। তবু বাঙালির প্রগতিশীল নামে পরিচিত অংশটি তাঁকে নিলো না।

মাইকেল যেমন রামায়ণকে ঘিরে মহাকাব্য লিখেছিলেন হয়তো ইনিও চেষ্টা করেছিলেন মুসলিম মিথ নিয়ে। পারেন নি বা অতোটা যেতে পারেন নি। তাতেই তাঁকে ছুঁড়ে ফেলতে হবে? তাঁর মৃত্যুর পর কবি আল মাহমুদই কেবল, “ফররুখ আহমেদের কবরে শেয়াল” লিখেছিলেন খেদ জানিয়ে।
বাঙালি মুসলিম রেঁনেসার ভেতর দিয়ে প্রগতির মুক্তি চাইলেও তাঁকে একধরনের বয়কট করে বাংলাদেশের কবি ও কবিতা। এই বয়সে আমি যখন নির্মোহ দৃষ্টি দিয়ে দেখি তখন বলতে বাধ্য হই, এ ঘোর অন্যায়। আমাদের মতো হিপোক্রেট আর স্ববিরোধীদের কোন অধিকার নাই তাঁকে বন্দী করে রাখার।

ছেলেবেলা থেকে তাঁর ছন্দ আমার মনে দোল দিয়ে যেতো-
কত যে আঁধার পর্দা পারায়ে ভোর হল জানি না তা।
নারঙ্গি বনে কাঁপছে সবুজ পাতা।
দুয়ারে তোমার সাত সাগরের জোয়ার এনেছে ফেনা।
তবু জাগলে না? তবু, তুমি জাগলে না?


আর ফররুখ আহমদ মানেই আমার কাছে-
তুমি মাস্তলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে;
অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি।
রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?
দীঘল রাতের শ্রান্তসফর শেষে
কোন দরিয়ার কালো দিগন্তে আমরা পড়েছি এসে?

কি জানি বাপু, এখানে কোথায় সাম্প্রদায়িকতা আর কোথায় ধর্ম।
পরিণত বয়সে প্রয়াণ দিনে আপনাকে শ্রদ্ধা জানাতে আমার কোন অসুবিধা নাই কবি ফররুখ আহমদ।