ফারুক মঈনউদ্দীনের মুম্বাইযাত্রা ॥ ইলিয়াস বাবর


পরম্পরা থাকলেও আমাদের ভ্রমণসাহিত্য ঠিকঠাক স্বাস্থ্যবান হতে পারেনি। তার নানাবিধ কারণও আছে। কিন্তু নিভৃতে ভ্রমণসাহিত্য তার দেমাগ ধরে রেখে ঠিকই ফলিয়ে যাচ্ছে সোনালী ফসল। এদেশের ভূমিপুত্রদের আদি ও অকৃত্রিম মনোবাসনায় ভ্রমণসাহিত্যে ফুটে ওঠে দেশ, কখনোবা বিদেশের স্বাদ-সংস্কৃতি। সাহিত্যের এ মাধ্যমটিতে ফিজিক্যাল জার্নি ফরজ, সাথে একটা বিশ্লেষণভেজা মন। জিজ্ঞাসার ভেতর ক্রমাগত নিজেকে সঁপে দিয়ে স্থানিক জ্ঞানের সঙ্গে পৌরাণিক-ঐতিহাসিক সংযোগে বর্তমানকে নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করতে হয় একজন ভ্রমণসাহিত্য করা সৃজনকারকে। ফলে সাহিত্যের অন্যান্য মাধ্যমের মতো নয় ভ্রমণসাহিত্য, এ-বড় হৃদয়হীন হৃদয়জ কারবার। ভ্রমণসাহিত্যের সবচে বড় ঝুঁকি এই, এটি কালের বিচারে হারিয়ে যায় না, বরং কোন কোন মহৎ রচনা কাজ করে ঐতিহাসিক যোগসূত্র হিসেবে। সুতারাং অহেতুক আবেগমথিত শব্দমালা নয় বাস্তবের পিঠে সওয়ার হয়ে সত্যের মুখোমুখি হতে হয় ভ্রমণসাহিত্যকে, এখানেই এর মাজেজা।

ফারুক মঈনউদ্দীন এর কাজের ক্ষেত্র বেশ বিস্তৃত। পেশাগত জীবনে সফলতা তো আছেই, সাহিত্যের নানা শাখায়ও তার কাজ বেশ প্রশংসিত। কবিতা, অনুবাদ, ভ্রমণসাহিত্য, আরো অনেক কিছু। বাঙালিমাত্রই যতটুক কবিতাচর্চার কাছাকাছি যায় ঠিক ততটুক দূরত্বে থাকে ভ্রমণসাহিত্য রচনায়। এই কঠিন পথে ফারুক মঈনউদ্দীন এর যাত্রা বিপুল ও বিস্ময়জাগানিয়া। আপাদমস্তক সাহিত্য-পাওয়া মানুষ বলেই তার ভ্রমণসাহিত্য অন্যরকম স্বাদে ভরা, কবিতা-গদ্যের দারুণ মিশেল। ‘মোহিনী মুম্বাই’ ফারুক মঈনউদ্দীন এর ভ্রমণসাহিত্যের উজ্জ্বল বাতি যা একটি শহর হয়ে প্রায় পুরো দেশের আচারকে ধরার চেষ্টা করেছে। মুম্বাই হয়ে আমরা ভারতের নানা ভাষা-সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হই এখানে, কথা বলে উঠি নানান ছায়া ও কায়ার সাথে। ওপরতলার বড়লোকী কারবার নয় বরং মুম্বাইয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বয়ে বেড়ানো ইতিহাস-ঐতিহ্য-লোকমানস-রাজনীতি-সমাজনীতির সাথে যোগসূত্র রচনা করে ‘মোহিনী মুম্বাই’।

এলাম, দেখলাম, লিখলাম এমন ব্রত লেখকের ছিল না ফলত বহুধা বিমিশ্রিত যে স্রোত গোটা ভারত তো বটেই মুম্বাইয়ে বহমান তা ষোলআনা না হলেও প্রায়ই ওঠে আসে প্রাগুক্ত গ্রন্থে। ছোট ছোট গদ্যে, নানা শ্রেণী-পেশার মুখের সাথে কথা বলি আমরা, দেখে উঠি রাজনীতির সুস্থ্যতা ও কদর্য রূপ; এমনকি বাংলাদেশ সম্পর্কে আন্দাজে পোষণ করা অপঘাতী মন্তব্যও। হারিয়ে যাওয়া মোমের আলো, বেঁচেবর্তে থাকা মানুষের ছায়া, ক্রমধাবমান অর্থের আলোকবাতি কিংবা সিনেস্টারদের অন্যজগতের জীবন… কোনটাই বাদ দেয় না ‘মোহিনী মুম্বাই’। মুম্বাই কেমন দেখেছেন ফারুক মঈনউদ্দীন তা নয়, মুম্বাইকে কেমন বুঝেছেন বইয়ে তা-ই দেখে উঠি আমরা।

ও বৃক্ষ, ও সখা
‘মোহিনী মুম্বাই’ গ্রন্থে কংক্রিটের শহর মুম্বাইয়ের অদিবাসীদের বৃক্ষপ্রেম নিয়ে বেশ কয়েকটি দারুণ রচনা আছে। পৃথিবীব্যাপী বৃক্ষ নিধনের ডামাডোলের মাঝেও মুম্বাই বেশ এগিয়ে বৃক্ষপ্রেমে। একটি দেশের যে পরিমাণ সবুজ বন থাকা দরকার তার অনুপস্থিতির দরুণ নানা সমস্যায় জর্জরিত পৃথিবীর মহানগরগুলো। বহুমাত্রিক দূষণ আর অপচারে ভরা শহরে বৃক্ষ নিধনের পাশাপাশি বৃক্ষ রক্ষারও রয়েছে বিভিন্ন আয়োজন। মুম্বাইয়ের মতো অভিজাত ও বাণিজ্যিক শহরে বৃক্ষ রক্ষায় যে সামাজিক আন্দোলন তা ফারুক মঈনউদ্দীন খুব কাছ থেকে দেখেছেন বলে লেখায়ও এসেছে জ্যান্তভাবে। ‘শতায়ু বৃক্ষের প্রেমে’ রচনায় মুম্বাই শহরের শতবর্ষী তিনটি গাছ, যেগুলো কি না রাস্তার মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে তার বিশাল শাখাপ্রশাখা নিয়ে। না, এমন বেঢপ অবস্থান সত্ত্বেও বৃক্ষ তিনটি কেটে ফেলার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান বিভিন্ন বৃক্ষপ্রেমী সংগঠন। শেষতক কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়, বৃক্ষগুলো সমূলে উৎপাটিত করে রোপন করা হবে অন্যত্র তবুও নিধন করা হবে না। অথচ আমাদের দেশে এমনটি খুব কমই দেখা যায়। লেখকের ভাষায়ও তো বোঝা যায়, ‘… তবে যা-ই হোক না কেন, বৃক্ষপ্রেমীদের যুক্তি ও দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়ে যে এত বড় গাছগুলোকে স্থানান্তর করে বাঁচানোর চেষ্টা করা হবে, সেটাই বা কম কিসে?’ ‘বৃক্ষ রক্ষায় সবুজ প্রহরী’ রচনায় বৃক্ষ রক্ষার্থে মুম্বাই কর্তৃপক্ষের অভিনব পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বলাবাহুল্য, গ্রিন গার্ড বাহিনীর সদস্যদের জন্য নির্ধারিত বেতনের ব্যবস্থা থাকলেও অনেকেই সদস্য হওয়ার বিনিময়ে কোনো বেতন নেন না। বৃক্ষের এই প্রেম, এই স্বেচ্ছাশ্রম, তাও মুম্বাইয়ের মতো ব্যয়বহুল নগরে, ভাবা যায়?

সত্যিকার প্রেম ভেতর থেকেই উৎসারিত হয়, তা কে না জানে। ‘বর্ষায় বৃক্ষমঙ্গল’ রচনায় বর্ষায় মুম্বাই শহরের জনজীবন সেইসাথে বৃক্ষজীবনের ইতিবৃত্ত আঁকা আছে জীবন্তভাবে। মুম্বাইয়ের মাটির স্তর গঠনের দরুন গাছের হেলে যাওয়া, অতঃপর কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতায় আবারো বৃক্ষ দাঁড়িয়ে যায় আপন মহিমায়। বর্ষায় বৃক্ষের আনন্দধামে মুম্বাইয়ে বিভিন্ন স্পট কিংবা প্রতিষ্ঠানে কিভাবে বৃক্ষ ছড়িয়ে দেয় তার সবুজাভ সৌরভ তার বর্ণনা সেইসাথে নগর ঢাকার সাথে মুম্বাইয়ের প্রতিতুলনা পাঠককে চমকিত করে। আসলে বৃক্ষ আমাদের সখা, বাঁচার অন্যতম অবলম্বন। অথচ নানা অজুহাতে বৃক্ষনিধনে এগিয়ে যাই আমরাই; এই অমানবিকতার বিরুদ্ধে, আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ফারুক মঈনউদ্দীন এর এসব সরস রচনা আমাদের ভেতরের মানুষটিকে জাগাতে সহযোগিতা করবে নিশ্চিত।

কে তুমি হেঁটে যাও পেশার তারে
যুগে যুগে পেশার বির্বতন হয়, পেশার তারে জড়িয়ে পড়ে মানুষ। মুম্বাই ঐতিহাসিক শহর, কালের ধূলোয় এখানে যেমনি মিশে গেছে অনেক আদি পেশা তেমনি জেগে ওঠেছে নতুন নতুন পেশা। পেশার ভেতর দিয়েই মূলত একটি এলাকার জীবনযাত্রা ও বিশ্বাসের সুতোটি ধরা যায় প্রবলভাবে। ফারুক মঈনউদ্দীন তার ‘মোহিনী মুম্বাই’ গ্রন্থে মুম্বাইয়ের ঐতিহ্য-পরম্পরায় বেঁচে থাকা পেশা নিয়ে দারুণ সব তথ্য দিয়েছেন, নতুন প্রজন্মের আগ্রহ নিয়েও আলোকপাত করেছেন। ‘বদলায়নি ধীবরদের জীবনধারা’ রচনায় মুম্বাইয়ের ধীবর সম্প্রদায়ের বেঁচে থাকার যুদ্ধ, সমুদ্রে মাছ ধরা, মুম্বাইয়ের বাজারে জেলে রমণীদের তা বিক্রি করা, তাদের রীতিনীতি ইত্যাদির সমাহার প্রাগুক্ত লেখাটি। লেখক খুব কায়দা করেই ধীবর রমণীকূল, যারা কি না মাছ বিক্রি করে মুম্বাইয়ে, তাদের বর্ণনা দিয়েছেন, ‘মুম্বাইর মাছের বাজারের মূর্তিমান বৈশিষ্ট্য ধীবর রমণীকূল। এদের গলায়, কানে, হাতে ভারী ভারী গয়না, কায়দা করে পরা শাড়ি, পরিপাটি বাঁধা চুল, বয়সভেদে চুলে ফুলটুলও গোঁজা থাকে। কেউ কেউ চশমা পরিহিতা, ভিন্ন পরিবেশে দেখলে যাদের নির্দ্বিধায় স্কুল মিসট্রেস বলে ভ্রম হতে পারে।’

ধীবর সম্প্রদায়ের পুরুষেরা সমুদ্রে যায় মাছ ধরতে আর সেই মাছ বাজারে বিক্রি করে রমণীরা এই তথ্য মুম্বাই না গিয়েও পাঠক দেখতে পায় অক্ষরের বুকে। কিন্তু প্রজন্ম কেন পড়ে থাকবে এমন পেশায়? তাদের পেশা বদলের ইঙ্গিতও গ্রন্থকার রাখেন বৈকি, ‘নতুন প্রজন্মের ধীবর সন্তানদের ভেতর পারিবারিক পেশার প্রতি আনুগত্য ও আকর্ষণ ক্রমশ উঠে যাচ্ছে, কারণ সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ খুবই কষ্টসাধ্য পেশা।’ ‘মুম্বাইর ডাব্বাওয়ালারা’ আরেক ইন্টারেস্টিং লেখা। এরকম লেখার অবয়বে আমরা চাইলে মুম্বাইয়ের পরিবর্তনকে ধরতে পারি অনায়াসে। ডাব্বাওয়ালা কারা? লেখায় পড়া যাক, ‘তবু মেট্রোপলিটন মুম্বাইর অফিস যাত্রী অথবা কর্মজীবীদের দ্বিপ্রাহরিক খাদ্যাভ্যাসের একটা বড় বৈশিষ্ট্য ঘরে তৈরি খাবার। আর সেই খাবার পৌঁছে দেওয়ার জন্য রয়েছে ডাব্বাওয়ালারা।’ মুম্বাইয়ের মতো ব্যস্ত শহরে ডাব্বাওয়ালাদের এই পেশার বয়স প্রায় ১২০ বছর। বাড়িতে তৈরি খাবারের টিফিন সংগ্রহ করে তা আবার ঠিক সময়ে অফিসে সাপ্লাই দেয়া, বিকেলে আবারো সেই টিফিন ক্যারিয়ারটি খদ্দেরের বাড়িতে পৌঁছে দেয়া এবং ডাব্বাওয়ালারা এই কাজটি এতই নিখুঁতভাবে করে যে, এতে ভুল হয় না বলেই চলে। পেশার প্রতি তাদের আন্তরিকতা সুবিদিত, এমনকি ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য যখন ভারতে আসেন, সময় রাখেন ডাব্বাওয়ালাদের সাথে দেখা করার। ডাব্বাওয়ালাদের এই পেশায় আগমন ও এর ক্রিয়াশীলতা নিয়ে লেখকের বক্তব্য স্মরণযোগ্য, ‘…খাবারের বাটির সঙ্গে ছোট একটা চিরকুট হয়তো পৌঁছে যেত স্ত্রীর কাছ থেকে কর্মজীবী স্বামীর কাছে, যেটাতে লেখা থাকত যেকোনো প্রয়োজনীয় বার্তা। টেলিফোন এবং দ্রুতগামী যোগাযোগব্যবস্থাবিহীন নগরীতে তাহলে নিশ্চয়ই ডাব্বাওয়ালারাই ছিল আদি বার্তাবাহক।’ ‌মুম্বাইর কোলি সম্প্রদায়’ রচনাটিতেও মুম্বাইয়ের জেলে সম্প্রদায়, তাদের পেশা, তাদের সংগ্রাম ও দৈনন্দিন চেহারা লেখক আমাদের সামনে উন্মোচন করেন।

‘মুম্বাইতে আলিগড় তালা’ লেখাতেও আমরা বিখ্যাত আলিগড় তালার উৎপত্তি এবং এর সাথে জড়িতদের চিত্র দেখতে পাই। ক্রমাগত চায়না বাজারের দরুন আলিগড় তালার বাজার হারানো ও অন্য পেশায় চলে যাওয়ার মাধ্যমে আলিগড় তালাও সম্ভবত একদিন যাদুঘরে যাবে। এমনকি ‘মুম্বাইর ভূমিপুত্র ও ভাইয়ারা’ লেখাতেও বিভিন্ন পেশায় ক্রমাগত যুক্ত হওয়াদের সম্পর্কে বিস্তর ধারণা পাই। পেশার মাধ্যমে শহরকে চেনা, শহরের চরিত্রকে ধরা এবং এর মেজাজকে ভালোভাবেই বোঝা যায়। ফারুক মঈনউদ্দীন আগাগোড়াই কবি, ফলে তার ভ্রমণরচনা গতানুগতিক আলোচনা নয় বরং একটি শহরের ভেতরকার নির্যাসে ভরা চক্রবিধি।

পুরানের ভেতর জেগে থাকে নতুনের উল্লাস
ইতিহাসের উপাদান নিয়ে সমৃদ্ধ হয় বর্তমানের আয়না। মুম্বাই শহর বহু স্মৃতিমেধুর, ইতিহাসের নানা ঘটনাপুঞ্জ আর পদচিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আজতক। ‘পুরাকীর্তি সংরক্ষণে সচেতন নাগরিকেরা’ রচনায় মুম্বাইর গেট অভ ইন্ডিয়াকে স্থাপত্যবিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করতে সে দেশের নাগরিকদের প্রতিবাদ ও জোরালো ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন লেখক। যেকোন দেশের জন্যই এরকম ঐতিহাসিক নির্দশন গুরুত্বপূর্ণ, প্রাণসঞ্চারি। কিন্তু এসবের অঙ্গবিকৃতি, অবহেলা সহ্য করতে পারে না কোন সচেতন জনগোষ্ঠী। লেখক লেখারটির শেষ করেন এভাবেই, ‘ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা সংরক্ষণের ব্যাপারে জনগণ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উদ্যোগ থেকে আমাদেরও অনেক কিছু শেখার আছে।’ ‘ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণ’ রচনায় মুম্বাইয়ের রয়্যাল অপেরা হাউস সংরক্ষণ ও তদারকিতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সমূহের যে আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ দৃশ্যমান হয়েছে তা অকল্পনীয়। মজার বিষয় হচ্ছে অপেরা হাউস কোন সরকারি বা সংগঠনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান নয়, তা একান্তই ব্যক্তিগত সম্পতি।

ব্যক্তিগত হোক আর সমষ্টিগত হোক, পুরাকীর্তি সংরক্ষণে মুম্বাই কর্তৃপক্ষের এমন ব্যবহার আমাদের ভাবতে বাধ্য করে, পুরাণ-ইতিহাসমাখা কোন কিছুই ফেলনা নয়, তাতে লেগে থাকে দেশেরই ভূমিপুত্রদের রক্তঘাম, সাধনা আর সৌহার্দ্যের স্পর্শ। লেখক আমাদের দেশে বিদ্যমান উদাসীনতাকে চিহ্নিত করেন এভাবে, ‘ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি এ রকম উপেক্ষা দেখে মনে হয়, আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে ভয় পাই বলে ঐতিহ্য ধ্বংস করতে আমরা নির্মম, ইতিহাস বিকৃত করতে আমরা সিদ্ধহস্ত। বলা হয়, এ রকম জাতিকে ইতিহাস ক্ষমা করে না, কিন্তু ভবিষ্যৎও কি করবে?’ একইভাবে ‘মুম্বাইর জিন্নাহ হাউস’ রচনায়ও ভারতীয় তথা মুম্বাইবাসী ও কর্তৃপক্ষের পুরার্কীতি ও ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে যে নজির দেখা যায় তা বিরল।

ও আমার দেশের মাটি…
বিদেশের মাটিতে থাকলে দেশপ্রেমীরা পলে পলে অনুভব করে দেশের মাটি। স্বদেশের কোন মানুষ দেখলে, স্বভাষী কাউকে দেখলে বাঙালি স্বভাবতই জুড়ে দিতে চায় আড্ডা। কিন্তু স্বদেশ নিয়ে, বিশেষত বাংলাদেশ নিয়ে বিদেশে অনেকেরই ভুল ধারণা বিদ্যমান। কেউবা স্বীয় কর্মদোষে এসব ধারণা আরো পোক্ত করছি, কেউবা চেষ্টা করছি স্বদেশকে বড় করতে। ‘মোহিনী মুম্বাই’ গ্রন্থে লেখক বাংলাদেশ নিয়ে ভারতীয়দের অনেক ভ্রান্ত ধারণার কথা আমার জানান, একই সাথে তাদের চিন্তার সাথে আমাদের চিন্তার যে ফারাক তাও দৃশ্যমান করেন। ফারুক মঈনউদ্দীন ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন মুম্বাই নিয়ে কিন্তু তার প্রায় রচনাতেই প্রিয় বাংলাদেশ কোন না কোন ভাবে উপস্থিত। বাংলাদেশের অকৃত্রিম সসুহৃদ সলীল ঘোষের বাসায় কিংবা কোন স্কুলের কালচারাল প্রোগ্রাম লেখককে প্রায়ই বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলতে হয়েছে। ভেজা বিড়াল নয় বরং টাইগার হয়ে স্বদেশকে তিনি দেখিয়েছেন নানা আলাপে। ‘নতুন পেশা-মেডিকেল ট্রান্সক্রিপশন’, ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী বিক্রান্ত’, ‘ভারতে চিকিৎসা ভ্রমণ’, ‘বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা’, ‘বাংলাদেশে ইংরেজি চর্চার দুরবস্থা’, ‘ভাবমূর্তির সংকট ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ’ প্রভৃতি লেখায় ঘুরেফিরে বাংলাদেশের সমস্যা ও সম্ভাবনা্ নিয়ে লেখক তার ভাবনাকে বিস্তৃত করেছেন।

বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার বিশৃংখলার (অ)কল্যাণে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী ভারতে যায় চিকিৎসা নিতে, এতে দেশের চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে তো প্রশ্ন তোলা যায়ই, দেশ হারায় প্রচুর বিদেশী মুদ্রা। এদেশে ইংরেজির দুর্বল চর্চার কারণে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জে আমরা কত পিছিয়ে যাচ্ছি এবং তার দরুন আমাদের মানবশক্তির যথেষ্ট যোগ্যতা সত্ত্বেও কিভাবে পচ্চাদপদ হয়ে আছে তা লেখক বিস্তৃত করেছেন। আড্ডায়-আলাপে-পেশায়, নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিয়ে, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে অন্যদের যে আগ্রহ ও অজ্ঞতা তার সবিস্তার আছে ‘মোহিনী মুম্বাই’ এর নানা রচনায়। দেশকে, দেশের ইতিহাস ও গৌরবকে হৃদয় দিয়ে ধারণ করে কর্মে এগিয়ে যাবার যে প্রেরণা লেখক দিয়েছেন নানা প্রসঙ্গে তা আমাদের বিপুল তরুণ প্রজন্মের জন্য মঙ্গল-পাথেয়।

‘মোহিনী মুম্বাই’ শুধু ভ্রমণকাহিনীই নয়, দূরে থেকে মুম্বাইকে জানতে হলে, মুম্বাইয়ের সংস্কৃতি, দৃষ্টিভঙ্গি এবং লোকাচারকে জানতে হলে বইটির পাঠ জরুরি। মুম্বাইয়ের রাজনীতি, রাজনৈতিক মেরুকরণ, নেতাদের অভ্যাস, ব্যবসার ইতিহাস, উন্নয়ন, হালহকিকত, কৃষ্টি, সেইসাথে উপমহাদেশের নানা মিথ ও পুরাণ, স্থাপনা ও নন্দনের ব্যাপক ও ইঙ্গিতময় আবহ দেখা যায় প্রাগুক্ত বইটিতে। মুম্বাইয়ের আলো ঝলমলে বিশাল বিশাল ভবনের অনতি দূরেই রয়েছে সবচে বড় বস্তি, অর্থের ঝনঝনানির বিপরীতে নাখাভুখার জীবন… ক্রমাগত যেন আসতে থাকে চলচ্চিত্রের ফিতে… পৃষ্টার পৃষ্টা রাস্তাঘাট আর দোকানের বর্ণনা নয়, মানুষ আর মানবিক বোধ-বিভেদের যে অন্তরঙ্গ বর্ণনা এখানে আছে তা দিয়েই মুম্বাইকে ধরতে হবে মূলত। শহর হিসেবে মুম্বাইয়ের ধার-ভার, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মুম্বাই আগমন, ফকির-দরবেশ এমনকি থরথর করে এগিয়ে যাওয়া মুম্বাইয়ের অর্থনীতি কোনটাই বাদ পড়ে না ‘মোহিনী মুম্বাই’-এ। ফরুক মঈনউদ্দীন এর সৃজনশীল সত্ত্বার নানা জিজ্ঞাসা ও দর্শনের স্বরূপ দেখা যায় আলোচ্য গ্রন্থে। নাতিদীর্ঘ গদ্যে একেকটা বিষয়কে যে আমেজে গ্রন্থকার উপস্থাপন করেন তা চোখের দেখা মিটিয়ে মনের দেখা মেটাতেও সাহায্য করে ঢের। আমাদের ভ্রমণসাহিত্যে অচলায়তনে ‘মোহিনী মুম্বাই’ বিশেষ একটা মাইলফলকই বটে।