বঙ্গ রাখাল : পাঠকের ইশকুলে যৈবতী কন্যা ॥ তুষার শুভ্র বসাক




‘সংস্কৃতির দিকে ফেরা’ (২০১৫) প্রবন্ধগ্রন্থের মাধ্যমে যে লেখকসত্তার সাথে পাঠকের প্রথম পরিচয়, সেই সত্তার নাম― বঙ্গ রাখাল। প্রতিশ্রুতিশীল লেখক, গবেষক, সম্পাদকসহ তাঁর পরিচিতি― বহুমাত্রিক। এরপরও তিনি কবি পরিচয়ে অধিক সমাদৃত। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হাওয়াই ডাঙ্গার ট্রেন’ (২০১৮)-এ চড়ে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘লণ্ঠনের গ্রাম’ (২০১৯) ঘুরে দেখার পরপরই পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছেন টাঙ্গন থেকে প্রকাশিত তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ― যৈবতী কন্যা ইশকুলে (২০২০)।

কবি মানব অস্তিত্বের প্রতিরূপ বাস্তবতার আঙ্গিকে শব্দে-শব্দে সুসজ্জিত করতে যেনো হস্তপটু। সেই পটুতার স্বাক্ষর মেলে এই কাব্যগ্রন্থের সূচীভুক্ত ৫৭টি কবিতায়। উদ্বেগ, কৌতূহল, আকাঙ্খা, ভালোবাসা, কামরাঙা প্রেম, রাজনৈতিক অবক্ষয়, দ্বন্দ্ব-বিকার প্রভৃতি একাকার হয়ে মিশে আছে কাব্যগ্রন্থের পাতায় পাতায়। তাইতো কাব্যগ্রন্থের বর্ণবিন্যাসে কবি কখনো হয়ে উঠেছেন অন্ধ-নাবিক, কখনো রূপকরাজ্যের অন্ধ-বধির বালক তো কখনো দাঁতাল শকুন।

এখানে কাব্যগ্রন্থের শিরোনামেই কবির তিনটি সিরিজ কবিতা আছে। প্রত্যেকটি অনন্যসুলভ অর্থরসে সমৃদ্ধ। কথিত আছে― সৃষ্টির বিধান গার্হস্থ্য জীবনের অঙ্গ। তাই দশকর্মের মধ্যে শ্রেষ্ঠ― গর্ভাধান। যৌবন ভর করা এক কন্যার দৃষ্টিকোণ থেকে সেই নিগূঢ় সত্য কবি তার কাব্যিক পরিভাষায় প্রকাশ করেছেন।
“নবীনরাতেও জমা হয়―প্রজাতিক হাসি― পোয়াতি সোমত্ত
মেয়ে। সরষে মরিচের পেটে আজ নীলবৃক্ষের বিপন্ন
চিরকুট…”
(যৈবতী কন্যা ইশকুলে)

কবির কাকভেজা মন কোন এক যুবকের বেশে― যৌবনভরা এক কন্যার প্রেম আকাঙ্খায় নিমগ্ন। কবির শব্দকল্পে―
“অসহায় আমি বৃষ্টিতে ভিজেতোমার স্পর্শ পেতে চাই―অন্ধবধির বালক। …কামাতুল সকাল তোমাকে আমার করে পেতে চাই প্রতিরাতে…”
(যৈবতী কন্যা ইশকুলে―২)

কবি ও তার যুবতী কন্যা প্রবল প্রেমে উন্মাদ হতে চায় পারস্পরিক ঘ্রাণে। আবার বিচ্ছেদ বেদনায় দুনয়ন ভিজে যায় দুজনার। কবির কলমে―
“স্বপ্নবাজ সকালী উদ্দমতা বুকে পুরে
হেঁটে আসি তোমাদের পাড়া।
… …… … কারণ বিহীন
আইস্ক্রীম হাতে―চুঁইয়ে চুঁইয়ে
ভিজে যায় ভেঁপুয়ের আবেগীচোখ।”
(যৈবতী কন্যা ইশকুলে―৩)

এখন আসি কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতায়। কবিতায় কবি নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন সুসময়ের বৈপরীত্যে। যেখানে সুখ নেই, সেখানে সখীর সাহচর্য খোলসের মতো। তাই সেই বন্ধনে আবদ্ধ থাকা― না থাকার সমান। কবি তাই বলেছেন―
“এখন আমি খেলার সাথী খুঁজি না
মৃতের মতো ঘুরপাক খেয়ে খেয়ে প্রস্থান করি।”
(বৈরি সময় আমার)

সমাজে আজও পরম্পরার মতো চলে আসছে অনেককিছু। তারই ধারাবাহিকতায় পূর্বপুরুষদের শোষণের ছায়া প্রজন্মের মাঝে ছাপ রাখে। কবি বলেছেন―
“রুপকথার কুয়াশারা― বাবাদের জাদুকর করে, উড়িয়েছে মুদ্রার কবুতর
আর বৃদ্ধের আঁকা পোট্রেটচোখে জ্বলে পূর্বপুরুষের শোষণের ছায়া…

নম্রতার জালে আবদ্ধ― শোষণের ক্ষুধার্ত উন্মাদনা।”
(শোষণের ছায়া)

যতো দোষ নন্দ ঘোষের― নাকি বয়সের। দোষ যারই হোক প্রাপ্তবয়সে বীর্যদানপ্রাপ্তি না হলে সংসার যেনো বৈধব্যপ্রাপ্ত হয়। প্রতিটি রাত যেনো কালরাত্রির সমান অনুভূত হয়। কবির কলমে―
“প্রাপ্তবয়স্ক
এক নির্ঘুম রাত
বিধবা হলে
রাত্রির অনন্তে যাপিত হয় স্থূলকাল…”
(বিধবা)

কল্পনার কোন সীমানা হয় না। যে চোখে কল্পনার বাস, সে চোখ বারবার তাড়িত হয় কল্পনায় ডুব দেয়ার জন্য। এই বিষয়ে কবি বলেছেন―
“তোমার উন্মাদ কল্পতাড়িত চোখ
ভিজে আছে― ডুবসাঁতারের জলে।”
(নামতা জীবন)

সমাজে সম্মুখে নানা প্রীত-রীত মান্য করতে হয়। কিন্তু আড়ালে সেই প্রীত হয়ে পায় পিরিতি… সাদা হয়ে যায় কালো, যেনো অন্ধকারের উৎসব। হয়তো এজন্যই কবি বলেছেন―
“অন্তরে এক চুম্বকি লেনদেন― বাহিরে ভালো তো ভেতরে কালো…”
(আত্মকামী)

ঊর্বরভূমি বিরানভূমিতে পরিণত হলেও তৃষ্ণাজলের একটু ছোঁয়া পেলেই সজীবতা মাথা চাড়া দেয়। তদ্রুপ অস্তিত্ব বৈধব্যতুল্য হলেও অন্তরে আফ্রোদিতি ঠিকই বাস করে। কবির ভাষায়―
“যৌনতায় কিনে রাখি নির্বাসিত প্রেম
নারীর অবিরাম আতাজলে নিমগ্নরাত…”
(নিমগ্নরাত)

ছয়টি অনুভাবের মিশ্র স্বাদে শরণার্থী সিরিজটি সাজানো। রহমত আলীর মতো অসংখ্য ছিন্নমূল সংসার ভালোবেসে বাঁচতে চায় বাংলায়। একজন― অসংখ্য প্রেমিকের কুঠিরে আশ্রয় পায় তো কারও কাছে ক্ষুধায় কাতর শরীর, শ্রীহীন স্বদেশের মতো লাগে। কবি বলেছেন―
“চামড়া জড়ানো মায়ের―হাড্ডিসার দেহ
দুর্ভিক্ষ― এ যেন আমারই স্বদেশ।”
(শরণার্থী-৩)

কবি মহাদেব সাহাকে উৎসর্গ করে কবি লিখেছেন―
“কবি তোমার রথের চাকায় পিষ্ট করো আমায়… নিজস্ব পাড়ায় তুমি
মৃদঙ্গ বাজিয়ে শোনাও ব্যর্থপ্রেমিকের লজ্জাবতী গান।”
(ওগো প্রেমিক তোমাকে…)

গ্রাম্য কিংবা শহুরে প্রতিটি নারী দুলফি ফুলের মতো যে মধু সঞ্চয় করে রাখে তা উজাড় করে দিতে হয় শরীরবিদ্যায়… তাইতো কবির ভাষ্য―
“বালিশবুকে যে মেয়েটি বিকেলের কথা ভেবে
আলস্য চোখে ফোটায় বৃষ্টিফুল
তাকেই শরীরবিদ্যায় মেলে দিতে হয় গোপন নগ্নতার আগ্রাসীদেহ”
(নারী অথবা গোপন বালিশ)

দুলফি ফুলের সঞ্চিত মধুর প্রতি লালসা রাখে কতিপয় ভ্রমর। সুযোগ পেলেই মধু খেয়ে পালায়। কবির কলমে―
“জুঁই ফুলের লাজ নাই। বালিশ বুকে চেপে-এখনো খুঁজে ফেরে হারিয়ে
ফেলা মায়ের মুখ; বাবা অজানা মনে সুতোকাটা ঘুড়ি।”
(শিল্পীর লাজ : লজ্জাহত বালিকাজীবন)

স্বদেশ তো উদ্ভট হবেই… ভ্রমর মধু খেয়ে পালায়, অন্ধকারে সাদা কালোর উৎসবে নামে, দিক ও পথভ্রষ্ট হয়ে জাহাজ ঘুরপাক খায়, প্রদীপ নিভিয়ে আলোর স্বপ্ন দেখে দেশ। তাই কবি বলেছেন―
“উদ্ভট স্বদেশ― প্রতীক্ষায় ভোর
আমি এক দাঁতাল শকুন।”
(অন্ধকার এক নির্মমতার নাম)

আমি মুখ, তুমি মুখোশ… আমি উত্তর মেরুতে, তুমি দক্ষিণ মেরুতে। তোমার অবস্থান আমার বিপরীতে। কবির কলমে―
“তুমি ভাসমান জীবনে রোপে আছো মিথ্যার নিরূপায় চারা।”
(দাঁড়িয়ে তুমি আমার বিপরীতে)

মা― অর্থবোধকে এই ক্ষুদ্র শব্দটি সাগরসম। মা-হারা প্রতিটি সন্তানের চোখে বৃদ্ধনারী মাত্রই মায়ের স্বরূপ। মায়ের স্নেহপ্রত্যাশী কবির ভাষ্য―
“রাঙা সন্ধ্যায় একজন বৃদ্ধা আমাকে জড়িয়ে প্রতিদিন হাঁটে― সে আমার
কেউ না; তবু মায়ের মতো আমারই হারানো অতীত।”
(মা)

ইচ্ছা তো সীমাহীন। আর ইচ্ছাধারীরা সেই ইচ্ছা ধরতেই সদা জাগরুক। সেই ইচ্ছার বশিভূত হয়ে কবি তার কবিতায় বলেছেন―
“সকাল থেকেই অফুরন্ত ইচ্ছাদের হাতছানি।”
(জটিল স্বাপ্নিক বাস্তবতা)

প্রত্ননিদর্শনের পিছনে যেমন ইতিহাস লেখা থাকে, তেমনি মৃত্যুর পূর্বেও জীবনে থাকে পূর্ণিমা-অমাবস্যার নানা গল্পগুচ্ছ। এই দুই প্রত্যক্ষকালে অশ্রুসিক্ত হয় মন।
“লতায় পাতায়― দুঃস্বপ্নের রোদ
ঠুকরে খায়― ভেজা ভেজা চোখ।”
(মৃত্যু: প্রত্নইতিহাস)

কবি পূর্বেই ‘অন্ধকার এক নির্মমতার নাম’ কবিতায় বলেছেন, উদ্ভট― স্বদেশ। এই দেশে কেউ নিশ্চিন্তে ঘুমায়, নিতম্বের ছায়া মাপে তো কেউ স্বদেশপ্রেমে নিমগ্ন থাকে, স্বদেশের দগ্ধ শরীরে প্রলেপ দেয়। কবির কলমে―
“…তবু দেখো― ভিক্ষারীর মুখে বিদগ্ধ স্বদেশ ছটফট
করে― জ্বলে অস্বচ্ছ অন্ধ মন্দির।”
(বিদগ্ধ স্বদেশ)

প্রেমিকার চোখে জল এলে প্রেমিক অস্থির হয়ে ওঠে। তখন কিছুই ভালো লাগে না আর।সূর্য যেভাবে জ্বলে সেভাবেই প্রেমিকের হৃদয় দ্বগ্ধ হয়। প্রেমিক কবি বঙ্গ রাখাল তাই লিখেছেন―
“চোখের জলে জমলে নদী
আত্মঘাতী পুরুষ
বুকে তোমার দুঃখ পুষে
জ্বালাই দিনের সুরুজ।”
(চোখের জলে)

মালিক খেয়ালখুশি গাভীর দুধ সংগ্রহ করে, পান করে, বিক্রি করে। বাছুর বেচারা হা করে তাকিয়ে থাকে, মালিকের মর্জির জন্য অপেক্ষা করে― কখন দেবে ছেড়ে, কখন দেবে বাটে মুখ। আমাদের দশাও এমন। শোষকের স্তুতিতে মগ্ন। তাই কবি যথার্থই বলেছেন― আমরা গৃহপালিত।
“ …সুখের অন্তরালে প্রভুর কাছে প্রতিদিন বিসর্জন
দেই বেঁচে থাকার স্বপ্নআশা। প্রভু বড় দয়ালু― জীবন শোষণের মোহন কারিগর।”
(গৃহপালিত জীব)

তুমি আমি সকলেই বুদ্ধিজীবী। স্বজন হারানো শোকের দাড়িপাল্লায় একসমান বাটখারা। অশ্রুসিক্ত নয়নে মাপা থাকবে ওজন।
“ইতিহাসের লাজুক পাতায় তুমিও লিখবে
স্বজন হারানো নিথর দেহাখ্যান।”
(বুদ্ধিজীবী)

উদ্ভট স্বদেশে কবি অন্ধবালক হলেও তার চেতনাতেও প্রতিবাদের ভাষা আছে। গৃহপালিত হলেও কখনও কখনও দাবীর কথা বলে। তাই কবির কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে―
“আমি এখন আর রঞ্জিত চোখে
শিরোধার্য মাথা নোয়াই না।
… .
ভূমিপুত্রের ভাষায় কবিতা লেখি
দাবি আদায়ের ক্রদ্ধ চেতনায়…”
(স্বৈরাচার)

উদ্ভট স্বদেশের রাজনীতিও নিশ্চই উদ্ভট হবে। বলা যায়― বন্য স্বভাবের… কবির কলমে―
“কেড়ে খায় মানুষের জীবন―বুনো রাজনীতি। রাস্তায় শকুন নেমেছে―
বুক চিরে বের করে আনবে― মমতার তুলতুলে স্পর্শ।”
(বুনো রাজনীতি)

জীবন একটা সংগ্রাম। লড়াই করে, প্রতিবাদ করে বাঁচতে হয়। এই সংগ্রামে কেউ মতিলালের মতো জয়ী হয়, কেউ শাহীনার মতো হেরে যায় জীবন-সংগ্রামে। কবির শব্দশৈলীতে―
“ভাগ্যদেবতা এতো নিষ্ঠুর, নাকি মানুষ নামের দেবতাগুলো
থামিয়ে দিলো জীবনের সুদীর্ঘপাড়ি দেওয়া পথঘোড়া

এই কথা সেই সব ধনবান বীরদের জন্য― যারা মানবতার কথা বলে
ক্ষমতার ঘোড়ায় চড়ে…”
(একজন শাহীনা ও মানবিক মুত্যু)

এফোঁড় ওফোঁড় করা কল্পনার সংমিশ্রণ মেলে কবির কাব্যভাবনায়। ব্ল্যাক মেজিক তেমনই একটি কল্পকবিতা।
“… আমি এক জলন্ত গুহা
আগুনের গাছ-তুমি
বিশ্বাসে রাখো হাতের তালু
পাথরে ঢেলে জলের ছিটা।”
(ব্ল্যাক মেজিক)

মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে―কবি তার ভাবনাগুলোকে শব্দগাঁথুনিতে কিভাবে সাজায়? এতো উদ্দীপনা কোথায় পায়। তার উত্তর কবি দিয়েছেন―
“ …যে মেয়েটা প্রতিরাতে আমাকে
সঙ্গমের উত্তাপে মাস্টারবেশনে জাগিয়ে তোলে― শরীর হতে
নেতিয়ে পড়া দেহ… সেই মেয়েই আমার কবিতা।”
(বারুদগন্ধী কবিতা)

শীত যাপনের কাল কবিতায় কবি বলেছেন― শীতে আরও অধিক উষ্ণতা খোঁজে মন। এই উষ্ণতা কামরাঙা স্বাদের।
“শিয়ালও আড়ি পাতে নিঝুম শরীরী
শীত বালিকার খণ্ডিত মেনাসাওয়াই।”
(শীত যাপনের কাল)

যৈবতী কন্যা ইশকুলে কাব্যগ্রন্থের সর্বশেষ কবিতাটির শিরোনাম― ‘আলোকিত সুজন’। এখানে এক দুরন্ত বালকের সংগ্রামমুখী জীবনের সারাংশ তুলে ধরা হয়েছে।
“ত্রিশূল তোমার বুকের মাঝে অপচয়ের ক্ষরণ মুখস্থ
করে তবুও তুমি বটবৃক্ষের বিষণ্ন ছায়ায় শান্তির ফাগুন পাঠিয়ে
বুনোঘাসের চরণে রাখো আলোকিত ভোর…।”
(আলোকিত সুজন)

শেষত একটি কথাই বলবো― যৈবতী কন্যার মৌ মৌ ঘ্রাণ পাঠকের মানসপটে ছড়িয়ে থাকবে বহুকাল। বঙ্গ রাখাল সেই সৌন্দর্য উপভোগ করার অধিকার রাখে।