বলা কথা, না বলা কথা-১ ॥ স্বপনা রেজা



জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনার কথা উনিশো একাত্তর সাল থেকেই মনে আছে। তখন কেবল হাঁটতে শিখেছি। ঐটুকুন বয়সে যা দেখেছি, শুনেছি, বুঝেছি এবং যে ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে পাড়ি দিতে হয়েছে তা কখনো বিস্মৃত হবার নয়। ছোট্ট মনের সবটুকু জায়গাজুড়ে স্পষ্ট ও অস্পষ্ট হয়ে আজও মনে আছে অনেক কথা। প্রতিটি দিনের কথা সময়ানুসারে গুছিয়ে রাখা সম্ভব না হলেও মনে পড়ে অনেক কিছুই।
১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ আমরা তিনবোন কল্পনা, রত্না ও আমি মেজ খালার সঙ্গে চুয়াডাঙ্গা যাই। মেজ খালা পাতা আমার মা লতার জমজ বোন। সাবেক সাংসদ ডা. আসহাব উল হক আমার মেজ খালু।খালু তখন চুয়াডাঙ্গার জনপ্রিয় চিকিৎসক। আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও তৎপরতা বেশ। মায়ের অসুস্থতার সংবাদে মেজখালা ঢাকায় আসেন। মা কিছুটা সুস্থ হলে মেজ খালা আমাদের তিন বোনকে নিয়ে গেলেন। চুয়াডাঙ্গা আমার নানা বাড়ি। চুয়াডাঙ্গার জোয়ার্দার পরিবারের বড় মেয়ে মা। নানা আকতার হোসেন জোয়ার্দার ডাকসাইটে আইনজীবী এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় সংগঠক।

২৬ মার্চ খবর এলো ঢাকায় পাকিস্তান আর্মিরা এ্যাটাক করেছে। ইত্তেফাক ভবন ট্যাংক দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে। আব্বা আসফ উদ দৌলা রেজা তখন দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক। আব্বা, সিরাজ কাকা (শহীদ সিরাজ উদ্দিন হোসেন), আবেদ খানসহ অনেকেই ২৫ মার্চ রাতে ঐ সময়ে ইত্তেফাকে কর্মরত ছিলেন। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানীদের ক্ষোভ ছিল। ফলে ঢাকা আক্রমনের পরিকল্পনা থেকে দৈনিক ইত্তেফাক বাদ পড়েনি। আব্বা, সিরাজ কাকাসহ অনেকেই সেদিন দোতলা থেকে লাফ দিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। মায়ের মুখে সেই গল্প শুনেছি। গোপীবাগের কোন এক জায়গায় প্রায় সাতদিন তাঁরা আত্মগোপন করেছিলেন। আব্বাকে খুঁজতে মা হন্ন হন্ন হয়ে এদিক, সেদিক ঘুরেছেন। অবশেষে আব্বার সংবাদ পান।

চুয়াডাঙ্গায় মেজ খালার বাসায় রাতের অন্ধকারে খালু কথা বলেন ফিসফিস করে। সিদ্ধান্ত হয় চুয়াডাঙ্গা ছেড়ে যাবার। আমরা তিন বোন চলে আসি পৌরসভার সংলগ্ন নানা বাড়িতে। গরুর গাড়ি আনা হলো বেশ কটা। অজানা কোথাও যাবার প্রস্তুতি। ঢাকায় মা, আব্বা ও ভাই মারুফের কথা মনে হলো।
গরু গাড়িতে একে একে উঠলো সবাই। নানা, নানী, বড় মামী, মেজ মামা, চার খালা ও আমরা তিন বোন। নানা, নানী, বড় মামী ও এক খালা ছাড়া গরুর গাড়ির যাত্রীরা কিশোর ও শিশু। গরুর গাড়ি চলতে শুরু করেছে। সেই প্রথম গরুর গাড়িতে চড়া। যাত্রী আসনের সামনে ও পেছনে কাপড় দিয়ে ঢাকা। কেউ যেন বাইরে থেকে দেখতে না পায়, গরু গাড়ি চড়ে কারা যাচ্ছে। সব কিছুই আমার শিশু মনে ভয় ঢুকিয়ে দেয়। ঠোঁট উল্টে চোখের পানি হাতের তালুতে মোছা ছাড়া কোন উপায় নেই।
বড় মামা আকরাম আকতার জোয়ার্দার ডিউক, ছোট মামা আজম আকতার জোয়ার্দার পিন্টু অন্য কোথাও যাবেন বলে আমাদের সঙ্গে এলেন না। সবকিছুই কেমন ঝাপসা, অতি গোপনীয়। কেউ একটার বেশি দুটো কথা বলে না। মেজ মামা আজাদ আকতার জোয়ার্দার বাক প্রতিবন্ধী বলে আমাদের সঙ্গেই থাকলেন।

মেঠোপথ ধরে গরু গাড়িগুলো চলছে হেলেদুলে। এক ধরনের অদ্ভুত শব্দ সেই চলাতে। রাতের অন্ধকারে এসে পৌঁছায় এক অপরিচিত গ্রামে। চারপাশে শুনশান অন্ধকার। হ্যারিকেন জ্বালিয়ে ক’জন মানুষ এলো গ্রামে আগত অতিথিদের কাছাকাছি। গ্রামটির নাম পরে জেনেছি সুন্দরপুর। বড় মামীর আত্মীয়ের বাড়ি। এখানে উঠবার পরিকল্পনা নানা ও বড় মামা আগেই নিয়েছিলেন। রীতিমত আশ্রয় নেয়ার পরিকল্পনা।
দিনের আলোয় দেখা গেলো আশ্রয় নেয়া বাড়ির চেহারা। গোলাকার লাল ইটের মস্ত জমিদার বাড়ি। একটা বড়সড় রুমে আমাদের ঠাঁই হলো। মাঝে পাকা উঠোন। অনেক কটা পরিবার সেখানে। যাদের অধিকাংশই দু’একদিনের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে। কেউ জোড়ে শব্দ করে কথা বলে না। ফিসফিস করে কথাবার্তা চলে।

ছোট্ট আমি কিছুই বুঝে উঠি না। নির্জন গ্রামে আসা, ফিসফিস করে কেনো সকলে কথা বলে তার মানে আমার জানা নেই। মায়ের কাছে ফিরবার ব্যাকুল কান্না কেবল বুক জুড়ে। সকালে নানীকে বললাম, ‘এখানে কেনো আমরা ? বাসায় যাব। মায়ের কাছে যাব।’ নানী বুকে টেনে বললেন, পরিস্থিতি ভালো হোক অবশ্যই তুমি যাবে। কী ভালো না সেটা বুঝবার বয়স তখন না। বয়সে সবার ছোট হওয়াতে মন ভুলাতে আমাকে নিয়ে সবাই ব্যস্ত।

সকাল হলে দেখা যেত বয়সে তরুণ নারী ও বয়স্করা লাল ইটের ঘর থেকে বের হয়ে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত হতেন। খাবার-দাবারের আয়োজন, কৃষিকাজ কিংবা অন্যকাজ। সামান্য দূরে বাঁশবাগান। বাঁশ গাছ দেখলে ভয় লাগতো। কেমন নিরবতা। একা কেউ এই বাঁশ বাগান দিয়ে যাওয়া আসা করে না। বড়দের মুখে এই গল্প শুনে বাঁশ বাগানবিমূখ হতে হয়েছিল। তাছাড়া বড়দের কোলে চড়ে চলাচলটা করতে হতো। কারণ আমার শরীর অসুস্থতা থাকতো প্রায়ই। জ্বর আসে অথচ যায় না। অজানা, অচেনা পরিবেশ, তার উপর মাকে ছেড়ে থাকা বড় কষ্টের। অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় পুনম খালা ও আমার বড় বোন কল্পনা গেল চিকিৎসকের কাছে ঔষধ আনতে। চিকিৎসক একটা সাদা বোতলে গোলাপী রঙের সিরাপ দিলেন। ওরা বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে সেই গোলাপী ঔষধ সাদা হয়ে যায়। ওরা অবাক হয়ে চিকিৎসককে বকা দিতে ছুটে যায়। ফিরে আসে নিজেদের অজ্ঞতা নিয়ে। চিকিৎসক বোতল ঝাঁকি দিয়ে দেখিয়ে দিলেন গোলাপী রঙ আছে ঔষধে। বেচারা খালা আর বোন লজ্জিত হয়ে ফিরে আসে।

একদিন নানা স্থানীয় কাকে দিয়ে যেন ভেড়া কিনে আনালেন। জবাই করা হলো। ভেড়ার মাংস রান্না শেষে আশপাশের সবাইকে নিয়ে খাওয়া হলো। পরের দিন জানলাম নানা আমাদের ছেড়ে কোলকাতায় চলে যাচ্ছেন। নানী সুটকেস গুছিয়ে দিয়েছেন। কোলকাতায় যেয়ে নানা সবাইকে নেবার ব্যবস্থা করবেন। সুন্দরপুর গ্রাম নিরাপদ নয়। পাকিস্তানী আর্মিরা যশোহর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। নানী ও সবার চোখে জল। আতংক ও ভয় সবার চোখেমুখে। নানা রওনা দিলেন। ছোট্ট মন বুঝতে পারলো আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছে ততদিনে। দুধ কিনে আমাকে খাওয়ানোর টাকা শেষ। ইটের মতন শক্ত কালাই রুটি সকালের নাস্তা। দুপুরে কালাই ডালের খিচুড়ী। বড়রা খেতে পারে। কিন্তু আমার আর খাওয়া হয় না।
যতদূর মনে পড়ে নানা চলে যাবার পর আর যোগাযোগ হয়নি। নানা আসতে পারেননি সবাইকে নিয়ে যেতে শেষ অব্দি। নানী ঢাকায় আব্বা ও মায়ের সাথে যোগাযোগ করতে শুরু করলেন। প্রায় প্রতিদিন হলুদ খামে চিঠি ভরে ডাকবাক্সে ফেলতে পাঠান। উত্তর আসে না।

দৈনিক ইত্তেফাকে সাংবাদিকতার পাশাপাশি আব্বা রেডিওতে বুনিয়াদি গণতন্ত্রের আসর ‘আমার দেশ’ এর গ্রন্থণা, পরিচালনা ও উপস্থাপনা করতেন। ‘আমার দেশ’ অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন অভিনয় শিল্পী মিরানা জামান, আয়েশা আক্তার, মজিদ মিয়াসহ আরও অনেকেই। নানীকে দেখতাম প্রতিদিন বিকেলে রেডিও ঘিরে বসে থাকতে আব্বার খবর পাবার জন্য।পরে মায়ের কাছে শুনেছিলাম পাকিস্তান আর্মিরা সাদা গাড়িতে আর্মস নিয়ে বাসায় এসে আব্বাকে অনুষ্ঠান করাবার জন্য তুলে নিয়ে যেত। এমন একদিন ‘আমার দেশ’ অনুষ্ঠানে কেউ একজন আব্বার কাছে জানতে চাইলেন, আব্বা তাঁর মেয়েদের কোন খবর পেয়েছেন কিনা। সম্ভবত আয়েশা আকতার ফুপু প্রশ্নটা করেছিলেন। আব্বার স্ক্রিপ্ট লেখাটা এমন ছিল যাতে আব্বা উত্তরটা হলুদ খামে না দিয়ে ইথারে দিয়ে দিতে পারেন।আব্বা উত্তর করেছিলেন, তিনি খবর পেয়েছেন এবং দুদিন পরই তিনি মেয়েদের আনতে যাবেন। রেডিও ঘিরে বসা নানী ও সকলে আনন্দে আত্মহারা। আমি কাঁদলাম খুশিতে।