বলা কথা, না বলা কথা-২ ॥ স্বপনা রেজা



দিনের আলোয় সুন্দরপুর গ্রামের মানুষজন খুব একটা ঘরের বাইরে বের হন না। নারীরা তো নয়ই। ঢাকা থেকে আগত নানান বয়সের লোকজন লাল ইট সুরকির এই বৃত্তাকার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। শুধু এটুকু বুঝতে পারছিলাম যে, ঢাকার অবস্থা ভালো না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী নাম সম্ভবত রীতা, যিনি রোকেয়া হলের দোতলার বারান্দা থেকে লাফিয়ে নিজের সম্ভ্রম রক্ষা করেছিলেন। নিজেকে নিরাপদ রাখতে তিনিও এসেছেন সুন্দরপুর গ্রামে। এরকম ছোট বড়, নারী পুরুষ আরও অনেকেই কাপড়ের পোটলাপাটলি নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন সুন্দরপুর গ্রামে।

যশোর পর্যন্ত পাকিস্তান আর্মিরা চলে আসার সংবাদে সকলের চেহারায় আতঙ্ক ছিল বেশ। বড়মামী, বাকপ্রতিবন্ধী মেজমামা, খালা ও আমাদের তিন বোনকে নিয়ে নানীও আতঙ্কিত ছিলেন। রেডিওতে আব্বার ‘আমি মেয়েদের আনতে যাব’ এই সংলাপ নানীর সঙ্গে আব্বার যোগাযোগ ঘটিয়ে দেয়। আব্বার জন্য নানীর অপেক্ষার পালা শুরু। ইঞ্জিনচালিত গাড়ির শব্দ ভেসে এলে গ্রামের মানুষজন হাতের কাছে বেঁধে রাখা পোটলাপাটলি নিয়ে দৌড় দেন। গন্তব্য কারো জানা নেই। অজানা আর অনিশ্চিত পথ। অন্যরকম সময়। ভয় আর শঙ্কার চাদরে মোড়ানো।

আর নানী ভাবেন তার রেজা এলো বুঝি। একদিন ভর দুপুরে গাড়ির শব্দে গ্রামের মানুষের দল ছুটতে শুরু করেছে। আমার মতো অনেক শিশুকে বড়রা কোলে নিয়ে, হাতে ধরে ছুটছে। বর্বর পাকিস্তানি আর্মিদের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য বড় মেয়েরা বয়সে ছোট সাজবার জন্য অপেক্ষাকৃত কম বয়সীদের কাপড়চোপড় পরেছে। রেজা আসার সম্ভাবনা মাথায় নিয়ে নানীও আমাদের সকলকে নিয়ে সেই ছুটে চলাদের দলে সামিল হন।
বেশ কিছুটা পথ পাড়ি দেবার পর ছোট্ট একটা পুকুর। নারী, পুরুষ ও শিশুরা গোসল করছে। অনেক মানুষকে একসাথে দেখে তারা অবাক। ছুটে চলাদের মাঝ থেকে কেউ একজন চিৎকার করে, ‘আর্মি আসছে’। নিমিষে পুকুর জনমানব শুন্য হয়ে পড়ে। ভেজা শরীরে পাড়ে উঠে বুকের ওপর কাপড় চেপে মেয়েরা উধাও হয়।

আমরা কোথায় যাচ্ছি, আব্বা আসবে বলেছেন, আমাদেরকে খুঁজে পাবেন তো- এমন প্রশ্ন ছোট্ট মনে ঘুরপাক খায়। আচ্ছা এই গাড়ির শব্দটা কী আব্বার আসার শব্দ? পাকিস্তান আর্মি নয়, আব্বাই কী এসেছেন আমাদের নিতে প্রশ্নটা কেউ একজন করলে নানীর চলার গতি কমে আসে। প্রশ্নটা অমূলক ছিল না। বড়মামীর সম্পর্কে এক ভাই দৌড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে নানীকে জানায়, একটা লাল পিকআপে একজন বাঙালি এসে নানীকে খুঁজছেন। তার সঙ্গে একজন বিহারীও আছেন। বিহারীর কথা শুনে সকলের চেহারা চুপসে যায়। নানী চিন্তিত। রেজার সঙ্গে বিহারী কেন আসবে? চিন্তা-দুশ্চিন্তা দূরে রেখে অবশেষে নানী সুন্দরপুর গ্রামের আশ্রয়স্থলের অভিমুখে পা বাড়ান।
আব্বা এসেছেন। লাল একটা পিকআপ ভ্যান বাড়ির সামনে। সঙ্গে লম্বা একজন লোক। উনি পাঠান, নাম শরপতি খান। আব্বা ও আমাদের সকলকে নিরাপত্তা দিতে উনি আব্বার সঙ্গ নিয়েছেন। এই আয়োজন আমাদের রেল কলোনীর বাসার প্রতিবেশী সুলতানা খালাম্মার। সুলতানা খালাম্মা আমার মাকে বোন ডেকেছেন। সুলতানা খালাম্মার স্বামী রেলওয়েতে চাকরি করতেন। মায়ের চাকরির সুবাদে তখন আমরা রেলকলোনীতে। মুখোমুখি দুই ফ্ল্যাটে দুই পরিবার। সুলতানা খালাম্মার তিন মেয়ে এক ছেলে। জেসমিন, পারভীন, আইরিন ও রাজু। খুব আদর ও ভালোবাসা পেয়েছি তার। আব্বাকে খালাম্মা ও খালুজান ভীষণ শ্রদ্ধা করতেন। শরপতি খান সুলতানা খালাম্মার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। আর লাল পিকআপ ভ্যানটি সুলতানা খালাম্মার এক ভাইয়ের। ভালোবাসার টানটা এতাটাই গাঢ় ও গভীর, তার সাক্ষী উনিশ শ একাত্তর সালের সেইসব দিনরাত্রি।

আব্বাকে দেখে সবাই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যেন আবেগের বৃষ্টিপাত। চারপাশ থেকে জড়িয়ে ধরেছে সবাই। চোখের বাঁধ ভেঙেছে সকলের। আমি আব্বার বুকের ভেতর নিজের বুকের শব্দ শোনার চেষ্টা করলাম। ক্ষণিকে বুঝলাম, অবিকল শব্দ দুই হৃদয়ে। কান্নায় চারপাশ ভুলে গেলাম। আব্বা সঙ্গে করে অনেক শুকনা খাবার এনেছিলেন। মহাআনন্দে নানী ও খালারা সেই খাবারের একটা অংশ গ্রামবাসীদের দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই রওনা হতে হবে ঢাকা অভিমূখে। সুতরাং দেরি করা যাবে না। তড়িঘড়ি করে সব গোছগাছ হলো। পেছন ফেলে সুন্দরপুর গ্রাম যাত্রা শুরু হলো।
লাল পিকআপ ভ্যানের সামনে শরপতি খান, আব্বা ও আমি। বাকিরা সবাই ভ্যানের পেছনে, খোলা জায়গায় চাঁদর বিছিয়ে। সকলের মাথার ওপর শাড়ির ছাউনি। রীতিমতো যাত্রী লুকানোর চেষ্টা। কিন্তু এভাবেই যে যাওয়া সম্ভব হয়েছে পুরোটা পথ তা নয়। রাস্তার মাঝেমাঝে আর্মির চেক পোস্ট। পিকআপ ভ্যানকে দাঁড়াতে হয়েছে বেশ ক’বার। কে যাচ্ছে, কারা যাচ্ছে খোঁজ নেয়া হচ্ছে ভ্যান থামিয়ে। শাড়ির ছাউনি সরিয়ে দেখা হয়েছে পিকআপ ভ্যান যাত্রীদের। পুরোটা রাস্তায় কথা বলেছেন শরপতি খান। আব্বাকে গাড়ির ভেতর বসিয়ে তিনি একাই কথা চালিয়ে গেছেন।
যশোর থেকে সরাসরি ঢাকা আসা হলো না। মাঝ পথে বিরতি নেয়া হলো কুষ্টিয়ায়। কুষ্টিয়ায় সুলতানা খালাম্মার ভাই কুটি মামার বাসায় রাত্রিযাপন। তারপর ভোরে সেখান থেকে আবার একই কৌশল ও সাজে যাত্রা শুরু। অজানা পথ সঙ্গে বুক কাঁপানো ভয়। যেখানেই যাওয়া হয় সবাই ফিসফিস করে কথা বলে। ছোট বড় কটা নদী পাড়ি দিতে হলো। এখন মনে নেই নদীর সংখ্যা।

ঢাকায় লাল পিকআপ ভ্যান পৌঁছালো প্রায় সন্ধ্যার গা ছুঁয়ে। সবকিছু কেমন অজানা। মতিঝিল পীরজঙ্গিশাহ মাজারের কাছাকাছি শাহাজাহানপুর রেলওয়ে কলোনী। কলোনীর সামনের খালি জায়গায় বেড়ে উঠেছে ঘাস ও নাম না জানা ছোটবড় গাছগাছালি।
পিকআপ ভ্যানের চারপাশে ভীড়। স্থানীয় ছেলেমেয়ে, বড়রা এসে জড়ো হয়। কলোনীর দোতলায় আমরা থাকতাম। মা, ভাই মারুফ, ছোটকাকা নান্নু, সুলতানা খালাম্মা, জেসমিন, পারভীন, আইরিন, রাজু নেমে এলো। সবাই সবাইকে জড়িয়ে কেঁদে উঠলো। ফিরে আসার কান্না। ফিরে পাবার কান্না। মা তার তিন মেয়েকে বুকে জড়িয়ে রাখলেন। বিশ্বাস করতে চাইলেন তিনি তার মেয়েদের ফিরে পেয়েছেন।
আমার ছোট্ট মনটা বুঝতে শুরু করেছে দিনগুলো স্বাভাবিক নয়। ফেলে যাওয়া ঢাকা, বাসা আগের মতো নেই। সন্ধ্যা হলে ঘরের সব বাতি নিভিয়ে দেয়া হয় এক এক করে। শব্দহীন হাঁটা চলা সকলের। হ্যারিকিনের সামান্য আলোয় রাত পাড় করবার ঘটনা প্রতিদিনের। রাত হলেই কাছ ও দূর থেকে ভেসে আসে নারী ও পুরুষের করুণ আর্তচিৎকার। কখনোবা গুলির শব্দ। সাথে পোড়া গন্ধ। ঘরের ভেতর ছোট বড় সবাই দলা পাকিয়ে থাকা কখন আলোয় দেখা যাবে একে অন্যকে, কখন নির্মম নির্জন এই আঁধার দূর হবে।
মা বেদনাহত কণ্ঠে বলে উঠেন, ইস্! খুব পরিচিত কাউকে হয়তো ওরা ধরে নিয়ে যাচ্ছে।