বলা কথা, না বলা কথা-৩ ॥ স্বপনা রেজা




খুব ছোট ছিলাম বলে এতো বছর পর দৃশ্যপটের অনেক কিছুই মনে নেই। তবে ছোট্ট মনের ভেতর সেই অনুভুতি আজও নাড়া দেয়। অনেক কথা বলে উঠে মন। শিউরে উঠি। ভয়াবহ দিনের মধ্য দিয়ে পাড়ি দেয়া সময়গুলো চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে বেশ পারি। ১৯৭১ সালের সেইসব দিন ধারাপাতের মতন বলতে না পারলেও টুকরো-টুকরো ঘটনা স্মৃতিতে যা আছে তার সাথে আব্বা-মায়ের মুখে, বড় ভাই-বোনদের মুখে পরবর্তীতে শোনা গল্পগুলো যোগ করলে কোন কিছুই আর অস্পষ্ট থাকেনা। মনে হয় আমার দেখা ৭১ এর দিনগুলি খুব পরিস্কার এবং স্বচ্ছ। আজও আমি দেখতে পাই কী বীভৎস অন্ধকারে ডুবে যেতো সবাই, এই ঢাকা শহর।

মা হোসেনা আকতার জোয়ার্দার লতা। বিয়ের পর লিখতেন হোসেনা আসফ-উদদৌলা লতা। ফর্সা, নিখুঁত নাক চোখ আঁকা লম্বা হালকা-পাতলা গড়নের মা আমার অনবরত উর্দুতে কথা বলতে পারতেন। একারণে তাকে একজন অবাঙালি নারী হিসেবে কেউ কেউ সহজেই ভেবে বসতেন, মনে করতেন। ৭১ সালে মতিঝিল ছাত্রলীগের তখন একজন সক্রিয় কর্মী মা। মায়ের লেখা ডায়েরি পড়ে জেনেছি ছাত্রলীগের কোন একটি বিষয়ের তিনি সম্পাদিকা হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। যখন এই লেখাটা লিখছি তখন মা বেঁচে থাকলে হয়তো আরও বিস্তারিত সুনিশ্চিত হয়ে লেখা সম্ভব হতো। স্থানীয় তরুণ, যুবকদের নিয়ে তার কর্মতৎপরতা ছিলো বেশ। মাকে আপা ডাকতেন সেই সুবাদে দুই তরুণ লেবু ও জসীমকে আমরা মামা ডাকতাম। আমাদের কলোনীর বাসার পেছনেই পর পর টিনশেড এর বাসা তাদের। কলোনীর ভেতর এমন ঘর বাড়ি ছিলো বেশকটি। লেবু মামা আমাদের শৈশবের খেলার সাথী পিন্টুর মামা। পিন্টুদের বাসার সামনে খুকী আপাদের বাসা। খুকী আপার ভাই ইকবাল। আমরা বড় ভাইয়ের মতন দেখতাম তাকে। এসব ঘর-বাড়ির মালিক বসবাসকারীরা। মা, লেবুমামা, জসীমমামা ও ইকবালভাই মহল্লায় মহল্লায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করতেন এবং সেটা হতো খুব গোপনে। মায়ের লিখে যাওয়া ডায়েরিতে এমন অনেক স্মৃতি রয়ে গেছে।

রেলওয়ে হাসপাতালে মা চাকুরি করতেন। বাঙালি ও অবাঙালি দুই ধরনের সহকর্মী তার। অফিস থেকে ঘরে ফেরার সময়ে মা হাতে করে অনেক কিছু নিয়ে ফিরতেন, দেখতাম। সবার চোখে পড়ার আগেই ব্যাগে ভরা সেই জিনিসগুলো রাখা হতো স্টোর রুমে। রাখার সাথে সাথেই তালা ঝুলিয়ে দেয়া হতো। স্টোর রুমের পাশে ছোট্ট একটা সার্ভেন্ট রুম। তারপর রান্নাঘর। সামনের দিকে একটা বেলকনি ছিল কাঠ দিয়ে ঘেরা। বাসা ভর্তি মানুষের থাকার ব্যবস্থায় বেলকনি আর আকাশ দেখতে পেত না। বেলকনির পাঁজর হয়ে উঠলো কাঠময়। ছোট্ট দুটো জানালা দুই পাশে। রেলকলোনীর বাসায় তখন আব্বা, মা, নানী, তিনখালা, এক মামা, তিন কাকা আর আমরা ভাইবোনেরা থাকতাম। ভাই-বোনদের মধ্যে ছিলাম চন্দনা আপা, আরিফ ভাই, কল্পনা আপা, রত্না আপা, আমি ও মারুফ ভাই। কাঠদিয়ে ঘেরা বেলকনিসহ থাকবার জন্য চারটি ঘর। মাঝে লম্বা বারান্দা। খাট ও মেঝে সবখানেই শোবার ব্যবস্থা। মেয়েদের শোবার জন্য মেঝের ঘর। ড্রইংরুম ও বারান্দায় ঘুমাতো পুরুষ সদস্যরা। সার্ভেন্ট রুম ও বেলকনিতে থাকতেন আগন্তুক অতিথি।
সন্ধ্যা হলেই সব ঘরের বাতি নিভিয়ে দেয়া হতো। অপরিচিত দুই,তিনজন কওে মানুষ আসতেন বাসায় রাতের আঁধারে। মাথা ও শরীর চাদর মুড়িয়ে থাকতেন। সহজে চিনবার উপায় নেই। এভাবে থাকতেন যেন কেউ তাদের মুখখানা দেখতে না পায়। তারা বেলকনি আর সার্ভেন্ট রুমে রাত কাটাতেন। নানী যত্ন করে তাদের খেতে দিতেন। উনারা আসলে সবাই যেন কেমন সতর্ক থাকতেন। বাড়তি কেউ এই বাসায় আছেন তা যেন কেউ টের না পায়। স্টোর রুম থেকে হাসপাতাল থেকে মায়ের আনা ব্যাগগুলো থেকে গজ, ব্যান্ডেজ, তুলা, ডেটল, ঔষধ বের করে ছোট ছোট বাজারের ব্যাগে তা রাখা হতো। আমার ইমিডিয়েট বড় ভাই মারুফ। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এর অনুষ্ঠান শোনার জন্য তার ব্যতি-ব্যস্ততা ছিল বেশ। ছোট্ট একটা রেডিও সারাক্ষণ বুকে নিয়ে থাকা চাই। তার শিশু মনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বেশ প্রবল ছিল। মারুফ ভাই কলোনীর সামনে থেকে এলামেলো ভাবে বেড়ে ওঠা গাছ-গাছালি, ঘাস সেই ছোট্ট হাত দিয়ে ছিঁড়ে নিয়ে আনতো ঘরে। যে সমস্ত বাজারের ছোটব্যাগে ঔষধ রাখা হতো তার ওপর সেই গাছ-গাছালি, ঘাস এবং তরি-তরকারি রাখা হতো। মারুফ ভাই ছোট্ট হাতে বড়দের সাথে সেই কাজ করতো। এ যেন শিশু মারুফের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ। খুব ভোরেবাসা থেকে এই সমস্ত ব্যাগ নিয়ে আগন্তুকরা বেরিয়ে যেতেন। পওে জানতে পেরেছিলাম যারা আমাদেও বাসায় রাত কাটিয়ে এইসব ঔষধপত্র নিয়ে যেতেন তারা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। খুব সম্ভবত যতটুকু শুনেছি মকবুল বলে এক ভদ্রলোক যাকে চাচা বলে সম্বোধন করতাম তিনিও মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে ঔষধ নিয়ে আসতেন বাসায়। এভাবে আমাদের স্টোর রুম পরিণত হলো ডিসপেনসরীতে।

অভিনয় শিল্পী আয়েশা আক্তার, মিরানা জামান আব্বার সাথে রেডিওতে নিয়মিত অনুষ্ঠান করতেন। সেই সময়ের জনপ্রিয় একটি রেডিও অনুষ্ঠান ছিল বুনিয়াদি গণতন্ত্রের আসর ‘আমার দেশ’। আব্বা ছিলেন সেই অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট রাইটার এবং পরিচালক সঞ্চালক। অনুষ্ঠানে আব্বা আসফ ভাই হিসেবে অংশ নিতেন। আয়েশা আক্তার অংশ নিতেন মজিদেও মা হিসেবে। আর মিরানা জামান অংশ নিতেন রসুবু হিসেবে। দু’জনকেই আমরা ফুপু বলে সম্বোধন করতাম। ফুপুরা প্রায়শই বাসায় আসতেন। আব্বার বুদ্ধিতে চুলের খোঁপার ভেতর ও মাজায় কাপড়ের ভাঁজে বয়ে আনতেন রেডিও থেকে দেশাত্মবোধক গানের ক্যাসেট। সেইসব বালিশের খোলে ভরে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে আমাদের বাসা থেকে চলে যেতো একটা নির্দিষ্ট স্থানে। শিল্পকলা একাডেমীর সাবেক মহাপরিচালক মরহুম শহীদুল ইসলাম সাহেব পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাতকারে এই বিষয়টি উল্লেখ করে গেছেন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকেই সেই সময়ে বাসায় আসতেন। সেই তালিকায় ছিল অভিনয়শিল্পী, সংগীতশিল্পী, পরিচালক, কবি-সাহিত্যিক।

অনিশ্চিত ও অনিরাপত্তার মাঝেও সবার ভেতর স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন। মায়ের ডায়েরিতে উল্লেখ আছে ২২ জুলাই ইত্তেফাক পত্রিকা প্রকাশিত হবে। ২১ জুলাই মারুফ ভাইয়ের জন্মদিন। আব্বা ২১ জুলাই রেডিও থেকে ইত্তেফাক অফিসে যান। বাসার সাথে লম্বা একটা সময় আব্বার কোন যোগাযোগ ছিল না। টিএন্ডডি ফোনে আব্বা কেনা পেয়ে পাশের বাসার সুলতানা খালাম্মাকে নিয়ে মা ইত্তেফাক অফিসে যান। সুলতানা খালাম্মাকে মা পারভীনের মা বলে সম্বোধন করতেন। আব্বা অফিসেই ছিলেন। রাতে কেনো বাসার থেকে মা বের হয়েছেন সেই ভয়ে আব্বা শঙ্কিত হলেন। আব্বাকে নিয়ে মায়ের যেমন দুঃশ্চিন্তা ছিল মাকেও নিয়েও আব্বার দুঃশ্চিন্তা ছিল। কারণ পাকিস্তানী বর্বরা নারী ও পুরুষ কাউকেই রেহাই দিত না।
ঢাকার রাস্তায় পশ্চিমা আর্মিদের অবস্থান দিন-দিন বাড়তে লাগলো। হিন্দু, মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মের নারীরা বোরখা পরিধান করে বের হয় প্রয়োজন হলে। পুরুষেরা ঘরেই থাকে অধিকাংশ সময়ে। মা আব্বাকে সহজে বাইরে বেরুতে দিতেন না। আব্বার ভয়কে পাশ কাটিয়ে ঘর ও বাইরের প্রায় অধিকাংশ কাজ মা করতেন। অনর্গল উর্দুতে কথা বলতে পারদর্শী মাকে অবাঙালী ভেবে নেয়া সহজ ছিল। সেই সাথে মায়ের ছিল অসীম সাহস। আব্বা ও পুরো পরিবারকে নিরাপদ রাখার জন্য তার সাহস ও কৌশল ছিল অভাবনীয় এবং এক ইতিহাস আমাদের পরিবারের জন্য। শুধু পরিবারই নয় প্রতিবেশীদের পাশেও মা ছিলেন।

বাসার পরিবেশ দিন-দিন নীরব হয়ে পড়ছে। থমথমে ভাব। আব্বা ও মা খুব গোপনে কাজ করেন। আব্বার ছদ্মনাম ছিল আলী হামজা। এই নামে চিঠি আসতো ওপার বাংলা থেকে। অনেক কথা, অনেক নিদের্শনা সেই সব চিঠিতে। সবকিছুর মাঝে মুক্তির অপেক্ষা। এক ভোরে শুনলাম একজন মুক্তিযোদ্ধা আমাদের বাসা থেকে বাজারের ব্যাগ ভরে ঔষধ নিয়ে যাবার পথে পাকিস্তানী আর্মির গুলিতে শহীদ হন। সেইদিন অজানা এক সংকেত পৌঁছে গেল আমাদেও পরিবারে। আতঙ্ক ছড়িয়ে গেল সবার মনে।