বলা কথা, না বলা কথা-৪ ॥ স্বপনা রেজা


১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর। দিনটি ছিল আমাদের পরিবারের জন্য ভয়াবহ এক দিন। পারিবারিক ইতিহাসের করুণ আর্তনাদের দিন। এখনো চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই দিনটির ভয়াবহতা। অতটুকুন বয়সের জীবনের এতো কথা কী করে মনে থাকে প্রশ্নটা অবান্তর হয়ে যায় এবং তা লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কারণেই। জীবনের কিছু অভিজ্ঞতা থাকে যা সংরক্ষণ ও স্মরণ করবার জন্য বয়স লাগে না।

মতিঝিল পীরজঙ্গি শাহ মাজারের কাছে রেলওয়ে কলোনীতে মায়ের চাকুরির সুবাদে আমাদের বসবাস। কলোনী পীরজঙ্গি শাহ মাজারের যে পাশে সেই জায়গাটি শাহজাহানপুর নামে পরিচিত। অর্থাৎ ঐ এলাকার কলোনীগুলোকে শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনী বলা হত। সাংবাদিক স্বামীর পরিবারকে স্বচ্ছল রাখবার প্রয়োজনে মায়ের চাকরিজীবন। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের বেশ কাছেই ছিলো কলোনী। ট্রেনের হুইশেল, চলার শব্দ পাওয়া যেত বেশ। সামনে বড় মাঠ। বড় বড় ঘাস, আগাছায় ভরা সেই মাঠ। আমরা যে কলোনীতে থাকতাম ঠিক তার বাম পাশেই ছিলো খোলা জায়গায়। ওটা মাঠ হিসেবেই ব্যবহার হত। দুপুর গড়িয়ে বিকেল কেবল পা ফেলেছে। প্রতিদিনের মতো খেলতে নেমেছি সেই মাঠে ৬ ডিসেম্বর। গিনি, জেসমিন, পরভীন, ফারুক, পিন্টু, মারুফভাই, রত্নাআপা এবং আরও অনেকেই ছিলো সঙ্গে। কিছুদিন হলো থেকে থেকে আকাশে বিমান উড়ে যেতে দেখা যেতো এবং তা বিকট শব্দ করে। কী এক আশংকায় কলোনীর পাশে বাংকার খোঁড়া হলো। বড়রা কোদাল দিয়ে সেই বাংকার তৈরি করেছিল। লেবু মামা, শহীদ মামা, নান্নু কাকা এবং আরও অনেকেই হাতে কোদাল নিয়েছিল। বড়রা ফিসফিস কওে কথা বলে। আমরা ছোটরা বুঝিনা। মাটি গর্ত কওে বাংকার নয়, যেন মস্ত একটা ঘর বানানো হলো। খেলার জায়গা হলো আমাদের। একবার দল বেঁধে সবাই ঐ মাটির ঘওে ঢুকতাম, আবার দল বেঁধে বের হতাম। খেলার এমন অভিনব জায়গা ও উপাদান সত্যিই বেশ মজার ছিল। ছোট্টমনগুলো তাই বলতো। সেটাই বুঝতো।
বরাবরের মতন সেইদিনও আমরা খেলছি। বিকট শব্দ করে দুটো প্লেন উড়ে গেলো আমাদেও মাথার উপর দিয়ে। যতদূর মনে পড়ে দু’বার চক্কও দিলো মাথার উপর। মনে হচ্ছিল যুদ্ধ বেঁধে গেছে আশেপাশে কোথাও। চিৎকার শোনা গেলো। কারা যেন চিৎকার কওে এগিয়ে আসছে আমাদেও দিকেই। বড়রা চিৎকার করে ছোটদের বলছে, বাসায় যাও সবাই! আমি হতভম্ব। কী হচ্ছে কোথায় ছোট্টমন বুঝতে চাইছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছোটকাকা নান্নু একহাতে আমাকে আরেক হাতে মারুফভাইকে বাংকারের কাছ থেকে ছোঁ মেওে তুলে নিল। সোজা আমাদের দোতলা ফ্ল্যাটে। নিচ থেকে হইচই ভেসে আসছে। হইচইগুলো গাঢ় হচ্ছে ক্রমশঃ এবং খুব কাছে এসে যাচ্ছে। মা বাসার দরজা বন্ধ করে দিলেন। একটা লোহার পাত দরজার বুক বরাবর সেঁটে দিলেন যেন সহজে কেউ বাসার ভেতর ঢুকতে না পারে। পর পর ক’বার গুলির শব্দ হলো। জানালার পর্দা সরিয়ে মা চাপা চিৎকার দিয়ে উঠলেন, আহা! ইস্ ওদেরকে মেরে ফেলেছে। ওরা পড়ে আছে মাঠে। আল্লাহ বাঁচাও। রক্ষা করো।

মায়ের ভাষা বোঝার জন্য জানালার পর্দা সরিয়ে দেখলাম, এলাকার বড়দের ক’জন লাশ হয়ে পড়ে আছেন। লাল মাফলার দিয়ে মাথা ও মুখ ঢাক াক’জনকে দেখলাম আমাদের বাসাকে লক্ষ্য করে কী যেন সব বলাবলি করছে। ‘প্লেন গির গিয়া’ এমন অর্থ না বোঝা শব্দ শুনতে পেলাম। বুক মোচড় দিয়ে উঠলো। সাথে শরীর ঠাণ্ডা করা ভয়। মাকে জড়িয়ে ধরলাম। মায়ের ফর্সা মুখায়ব ততক্ষণে হলুদ ওয়ে উঠেছে। মা অস্থির। থরথর করে কাঁপছেন। মা ভাঙা স্বওে বলছেন, কল্পনার আব্বা। তুমি কোথাও লুকিয়ে পড়ো। মা, কল্পনার আব্বাকে লুকিয়ে ফেলো। কিন্ত আব্বা কোথায় লুকাবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। মায়ের কথা শেষ না হতেই আমাদের বাসার দরজায় এলোপাথাড়ি লাথি পড়তে শুরু করে। আকাশে জমে থাকা মেঘের তুমুল গর্জন শুরু হয়ে গেছে। ভয়ে চৌচির ছোট ছোট প্রাণ। বড়রা তটস্থ। বাসার যুবক বয়সী পুরুষ সদস্যরা লুকালো খাটের নীচে। খালারা, বোনেরা ও বড়মামী জড়োসড়ো ঘরের এক কোণে। আব্বাকে নানী বুকে জড়িয়ে রাখলেন। আর মা আমাদেও আপ্রাণ চেষ্টা করছেন যেন কেউ দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করতে না পারে। মায়ের চেষ্টা ব্যর্থ। দরজার বুক থেকে ছিটকে পড়ে লোহার পাত। দরজা ভেঙে যায়। হুড়মুড় করে প্রবেশ কওে একদল রাজাকার আর আলবদর। কেউ কেউ লাল মাফলার দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছে, কেউ বা উদাম। ওদেও হাতে অস্ত্র। ভয়ংকর সব চেহারা। মা চিৎকার করে ওদের কাছে জানতে চান, কেনো তারা এসেছে। কেনো এভাবে তারা ঘরে প্রবেশ করেছে। মা বাংলা ভাষা ছেড়ে উর্দুতে কথা বলতে শুরু করেছেন। অজানা অসীম সাহস মায়ের সমস্ত সত্তা জুড়ে।

মায়ের প্রশ্নের জবাব দেয় না ওরা। বাসায় ঢুকেই রাজকার, আলবদরেরা আব্বাকে ধওে টানাটানি শুরু করে। নানী আব্বাকে বুকে আকড়ে ধরে রেখেছেন। নানীর কাছ থেকে ওরা আব্বাকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করছেন। নানী নাছোড়বান্দা। কেঁদে বলছেন, আমার রেজাকে নিতে পারবে না তোমরা। নিতে হলে আমার লাশের উপর দিয়ে আমার রেজাকে তোমরা নিয়ে যাও। অসভ্য, পাকজানোয়ারের দল তখন হাতে ধরা লোহা ও বাঁশ দিয়ে আব্বাকে আঘাত করতে শুরু করেছে। কী পাশবিক উন্মাদনা ওদের। মা দৌড়ে এসে আব্বার সামনে দাঁড়ান। আব্বাকে রক্ষা করতে চেষ্টা করেন। আমি আমার ছোট্ট হাতজোড়া দিয়ে ওদেও একজনার পা জড়িয়ে কাঁদতে থাকি। ছোট্ট বুকের পাঁজর ভাঙা কান্না। ওদেরকে নিবৃত্ত করবার চেষ্টা। কেঁদে কেঁদে বলি, আমার আব্বাকে তোমরা মেরো না। ওরা শোনে না। ওদেও মন গলেনা শিশুর কথায়, কান্নায়। ওরা লাথি মারে। আমাকে লাথি মেরে দূরে সরিয়ে দেয়। তারপর আমার মনে নেই কিছু। বড়রা বলেছে, আমি নাকি সেন্সলেস হয়ে পড়েছিলাম বেশ কিছুক্ষণ।

শুনেছি সেই সময়ে মায়ের অনর্গল উর্দু কথার আকুতিতে এবং নানীর করুণ আর্তনাদে এক পাঞ্জাবী ভদ্রলোক মা ও নানীর কাছে আসেন। রাজাকার, আলবদদের সরিয়ে দেন। আব্বাকে ওদের হাত থেকে মুক্ত করেন। ওরা যেতে চাইছিলো না আব্বাকে ছাড়া। কিন্তু পাঞ্জাবী ওদেরকে একরকম জোড় করে বাসা থেকে বের করে আনেন। পাঞ্জাবী লোকটাকে ভদ্রলোক বলছি এ কারনে যে, নানী ও মায়ের মর্মস্পর্শী আকুতির প্রতি তিনি সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন সেইদিন। মায়ের মুখে শুনেছি আব্বা সেইদিন তাৎক্ষণিকভাবে এই পাঞ্জাবী মানুষটির কারণে রক্ষা পেয়েছিলেন। কিন্তু আমার মনে হয়েছে নানীর আকুতি ও মায়ের অসীম সাহস-ই আব্বাকে তাৎক্ষণিকভাবে রক্ষা করেছে সেই সময়টিতে। ওরা চলে যেতেই পাশের বাসার সুলতানা খালাম্মা আর খালু দৌড়ে এলেন। মা ও আমাদেরকে জড়িয়ে কান্না তার থামে না। মাও কাঁদেন। মা কেঁদে বলেন, পারভীনের মা, আমরা বেঁচে আছি। আর আব্বাকে খালু জড়িয়ে ধরেন। বলেন, ভাই ইলেকট্রিক্যাল তার এভাবে করে রেখেছি যেন আপনাকে ওরা ধরে নিয়ে গেলে আমরা সবাই একসাথে মরবো। আপনাকে ছাড়া আমরা কেউ বাঁচবো না। বাঁচতে চাইনা, ভাই। কঠিন সময়ে মানুষের এমন ভালোবাসা প্রকাশের নাম কী হয় আমার জানা নেই। আজও জানতে পারিনি। কোনদিনও হয়তো তা জানতে পারবো না। শুধু অনুভূতির ভেতর তার উপস্থিতি থেকে যাবে আমৃত্যু।

বাসার ভাঙা দরজা কোনোরকম লাগান হল। জানালার পর্দা সরিয়ে দেখলাম, রক্তাক্ত লাশ আর লাশ। কয়েক ঘন্টা আগেও যাঁরা আমাদের সাথে খেলার মাঠে ছিলেন, তাঁরা এখন নিথর দেহমাত্র। মা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। টিএন্ডটি ল্যান্ড ফোনে কথা বলেন কারোর কারোর সাথে। সাংকেতিক সব কথাবার্তা।
বিকেলে দলবেঁধে আসা স্থানীয় বিহারীদের মাঝের একজন সন্ধ্যার একটু আগে আবার বাসায় আসে।