বলা কথা, না বলা কথা-৫ ॥ স্বপনা রেজা


কলোনীর আশফাক নামের একজন আব্বাকে বোঝাতে চেষ্টা করলো যে, আব্বা তাঁর পরিবার নিয়ে নিশ্চিন্তে কলোনীর বাসায় থাকতে পারেন। আর কেউ আব্বাকে বিরক্ত করতে আসবে না। সে সব ব্যবস্থা করে এসেছে। বিকেলের ঘটনার জন্যও সে দুঃখ প্রকাশ করে। সহজ, সরল মনে আব্বা তার কথা বিশ^াস করতে শুরু করেন। সন্ধ্যার অন্ধকার তখন চারপাশে নেমে এসেছে। সেই দিনের অন্ধকার এতো ঘন কালো যে, রাত নয় যেন অন্য এক সময় যা কখনোই আলোর মুখ দেখে না। আলো চেনে না। পরিচিতদের ক’জন শহীদ হয়েছেন। তাঁদেও লাশ পড়ে আছে মাঠে। বাংকার যেখানে সেখানে রক্ত জমাট বেঁধে আছে।

মা শুনতে নারাজ আব্বার কথা। বিকেলের ঘটনার পর মা আর কাউকেই বিশ^াস করতে পারছেন না। আমাদের বাসায় এসে যে আশ্বস্ত করছিল, মা তাকে বেশ ক’বার কলোনীর ভেতর ঢুকতে ও বের হতে দেখেছেন। কাপড়চোপড় গোছাতে শুরু করেন। নানী, খালা, মামী, কাকা ও ভাইবোনদের তৈরি হতে বললেন। রাতের আলো-আঁধারীতে সবাই যার যা প্রয়োজন ছোট ছোট ব্যাগ ও চাদরে রেখে গুছাতে শুরু করে। পাশের বাসার সুলতানা খালাম্মা এলেন। শুনলেন মা সবাইকে নিয়ে অন্য কোথাও যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সিদ্ধান্ত কেবল সিদ্ধান্ত হয়েই থাকেনি। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সব প্রস্ততি চলছে। সুলতানা খালাম্মা বলে বসলেন, ‘আমরাও যাবো আপা আপনাদের সঙ্গে। মরতে হলে সবাই একসঙ্গে মরবো’। মা বললেন, ‘পারভীনের মা আমাদেও পথটা ভীষণ ঝুঁকির। তোমাদেও বিপদ হতে পারে’। নাছোড়বান্দা সুলতানা খালাম্মা। তাঁর ব্যাখ্যা তিনি মাকে বোন বলে ডেকেছেন। সুতরাং বোনের সাথেই তাঁর মরণহবে। সুলতানা খালাম্মা তাঁর তিন মেয়ে এক ছেলে, স্বামী নিয়ে আমাদেও সঙ্গে যাবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন।

বড়দের দেখছি নীরবে নিজেদের গুছিয়ে নিচ্ছেন। আমার শিশু মনে অনেক প্রশ্ন। কাউকে জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেবার সময় কারোর হয় না। আব্বা তারপরও চেষ্টা করলেন মাকে বোঝাতে যে, আশফাক বলে গেছে কোন ভয় নেই। কিছু হবে না আর। মা এবারও কর্ণপাত করলেন না আব্বার কথায়। থেকে থেকে টিএন্ডটি ফোন বেজে উঠছে। মা রিসিভ করছেন আর ফিসফিস করে কথা বলছেন। ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের পরিবেশ অন্যান্য দিনের মতন নয়। একেবারেই ভিন্ন। আর আতংকে মোড়ানো। মা কিছুতেই স্থির হতে পারছেন না। সবাইকে খাইয়ে নিয়ে প্রস্তুত।

বেশ রাত করে বেশ ক’টি জীপ এলো। বাসার সামনে দাঁড়ালো। খুব সাবধানতার সঙ্গে আমরা সকলে নেমে পড়লাম। এতো বেশি সতর্কতা যে, হাঁটার শব্দ যেন আশপাশের কেউ শুনতে না পায়। ছোট্ট মন বলছিলো, কাদেরকে মেরে ফেলা হয়েছে আজ যদি একটু দেখা যেতো। আমার মামা কচি। তার বন্ধু নূরে আলম। কচি মামা, নূরে আলম মামা সবাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে গেছেন। নূরে আলম মামার ছোটভাই শহীদ আলম। আমাকে আর মারুফ ভাইকে অনেক আদর করতেন, সাথে নিয়ে খেলতেন। কে যেন বললো, রাজাকার আলবদরেরা শহীদ মামাকে হত্যা করে গেছে। শুনে কেঁদেছিলাম। শহীদ মামার চেহারা ভাসতে লাগলো। ভীষণ ইচ্ছে হলো দেখতে। কিন্তু উপায় নেই। অন্ধকার গায়ে জড়িয়ে একে একে সবাই উঠলো জীপগুলোতে। মায়ের ক্ষীণস্বরে জানলাম এই জীপগুলো পুলিশের। আব্বাকে চাদও দিয়ে ঢেকে ওঠানো হলো। সুলতানা খালাম্মা পরিবারসহ উঠলেন। তারপর জীপগুলো ছুটতে শুরু করলো অজানাগন্তব্যে। মা ও আব্বাছাড়া কেউই জানে না যে সবাই মিলে কোথায় যাওয়া হচ্ছে। কোথায় মিলবে নিরাপত্তা, অভয়। মুক্তিযুদ্ধ চলছে। গ্রামগঞ্জে, শহরে মুক্তিযোদ্ধারা প্রবেশ করেছে তেমন আভাস বড়দের মুখে।

সতর্কতার সঙ্গে যাত্রার পরিসমাপ্তি অবশেষে। অপরিচিত জায়গায় এসে জীপগুলো দাঁড়ায়। কাকরাইলের আবাসিক এলাকা। অন্ধকারে আশপাশ স্পষ্ট দেখা যায় না। একটা বেশ উঁচুবিল্ডিং। একজন দারোয়ান মূল দরজা খুলে দিলো। মা কথা বললেন। ওরা যেন আগের থেকেই জানতো যে, রাতে তাদেও বিল্ডিংয়ে বসবাসের জন্য একদল মানুষ আসবে। একে একে সবাই ঢুকে পড়ে বিল্ডিংয়ে। সম্ভবত পাঁচতলা বিল্ডিংছিলো। আমরা পাঁচতলায় উঠলাম। পাশাপাশি দুটো ফ্ল্যাট। একটাতে আমাদের, অন্যটাতে সুলতানা খালাম্মা তাঁর পরিবার নিয়ে উঠলেন।

সেই সময়ে বেশ ক’জন পুলিশ কর্মকর্তা আব্বার বন্ধু ছিলেন। আব্বার প্রতি তাঁদেও ভালোবাসা ছিলো অপরিসীম। ঝুঁকির মুখেও তাঁরা আব্বাকে মতিঝিল রেলওয়ে কলোনী ছাড়তে সহায়তা করেন। জীপ পাঠিয়ে দিন। মাকে দেখেছি বিল্ডিংয়ের অপরিচিতদের সঙ্গে কথা বলতে। পরে জানতে পারতাম উনারা মুক্তিযোদ্ধা। রাতে এখানেই অবস্থান করেন। সকালে দেখলাম মস্ত একটা ছাদ আর আকাশ। লাফাতে লাফাতে ছাদে উঠে ছুটোছুটি। গান বাচ্চাদেও মুখে-মুখে, জয়বাংলা, বাংলার গান। কিংবা নোঙর তোলো তোলো সময় যে হলো হলো। এমন কত গান আমাদের ছোট্ট কণ্ঠে। কখন যে শিশুমনগুলো এক একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে উঠেছে। বয়স না হলেও মনের বয়স তখন পরিণত। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যেন।

সকালে খবর এলো আমরা রেলওয়ে কলোনীর বাসা ছেড়ে আসার পর ঐ রাতেই রাজাকার, আলবদরেরা আমাদের বাসায় আবার হামলা চালিয়েছে। ভাঙা দরজা ভেঙে ঢুকেছে। হন্ন হয়ে আব্বাকে খুঁজেছে। কাউকে না পেয়ে ঘরের সব আসবাবপত্র তছনছ করেছে। সুলতানা খালাম্মার বাসাও রক্ষা পায়নি। উপর নীচ প্রতিটি তলার প্রতিটি বাসায় আব্বার সন্ধান করেছে। শত অত্যাচারের পরও কেউ মুখ খোলেনি। দেয়নি আব্বার সন্ধান। প্রতিবেশীদেও ভালোবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মাখা দিন ছিলো ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল। যদিও কাউকে বলা হয়নি আমাদের নতুন ঠিকানা।

নতুন ঠিকানার দুটো ফ্ল্যাটের দরজা সব সময়ই খোলা রাখা হতো। এ চিন্তা সুলতানা খালাম্মার। যেন সব সময় দুটো পরিবারের সবাই সবাইকে দেখতে পায়। এক চুলার রান্না সবাই খেতো। মায়ার বাঁধন, ভালোবাসা যে কতটা দৃঢ় হয় মা ও সুলতানা খালাম্মার সেই সময়কার সম্পর্ক দেখলে বোঝা যেত। পরের দিন সকালে আব্বাকে দেখতে শহীদ সিরাজউদ্দিন কাকা আমাদের নতুন আশ্রয়স্থলে এলেন কাকীকে নিয়ে। সম্ভবত শুধু সিরাজ কাকাই জানতেন আব্বার নতুন ঠিকানা। সিরাজ কাকা আব্বার সহযোদ্ধা, পরমাত্মা এবং অভিন্ন সত্তার দুইবন্ধু। দৈনিক ইত্তেফাকের দুইপ্রাণ পুরুষ আব্বা আসফ উদদৌলা রেজা ও শহীদ সিরাজউদ্দিন হোসন কাকা। সিরাজের রেজা বেঁচে গেছে জেনে তাঁর চোখে পানি আসে। কাকা আবেগ আপ্লুত হন। মাকে সিরাজ কাকা বলেন, ‘লতা ঠিক কাজ করেছে। তা না হলে তোকে বাঁচানো সম্ভব হত না’। মা বললেন, ‘এটা অলৌকিক বেঁচে যাওয়া’। মা ও আব্বাও সিরাজ কাকাকে বলেছিলেন সাবধানে থাকতে, নিরাপদে থাকতে। পাক-বর্বররা এদেশের বুদ্ধিজীবীদেও হত্যা শুরু করে দিয়েছে। কখন কে কাকে হারায় কেউ বলতে পারে না, জানে না। বন্ধু বন্ধুর জন্য কতটা ব্যাকুল থাকতেন সেইসব দিনগুলোতে আমাদের দেখা। আব্বাকে দেখে সিরাজ কাকা আশ^স্ত হয়েছিলেন এই ভেবে যে, তাঁর রেজা বেঁচে গেছে, ঠিক তার তিনদিন পর ১০ ডিসেম্বর রেজার জীবনে সবচাইতে ভয়াবহ সংবাদটি আসে যে তাঁর সিরাজকে রাজাকার আলবদরেরা ধরে নিয়ে গেছে। আব্বার বুক ফাঁটা আর্তনাদ বুঝতে অসুবিধে হয়নি আমাদের কারোর। মা চোখের পানি ফেলেই চললেন।