বাংলার মন্বন্তর : সমকাল ও বিজন ভট্টাচার্যের নাটক ॥ সুমিতা চট্টোপাধ্যায়


যুগ যুগ ধরে মহামারী বা অতিমারী আমাদের সামনে নানা ভাবে উপস্থিত হয়ে মানুষকে বিপর্যস্ত করে এসেছে। অথচ মানব প্রজাতি ধ্বংস হয়নি, মানুষের মন থেকে আশা আকাঙ্ক্ষা মুছে যায়নি। সবকিছুকে অতিক্রম করে নতুনভাবে মানুষ এগিয়ে গেছে তার নির্দিষ্ট পথে। মারী, মহামারী, অতিমারীর পাশাপাশি আমরা আরও একটি শব্দ পাই – ‘মন্বন্তর’ অর্থাৎ দুর্ভিক্ষ – দেশব্যাপী অকাল। ভারতীয় নাট্যচিন্তায় এই মন্বন্তর শব্দটি এসেছে একেবারে প্রারম্ভিক কালে। বলা যায়, ভারতীয় নাটকের সৃষ্টিই হয়েছে মন্বন্তরকে কেন্দ্র করে।

আচার্য ভরত তাঁর নাট্যশাস্ত্রে বলেছেন, ত্রেতাযুগে বৈবস্বত মন্বন্তরের পর পিতামহ ব্রহ্মা ‘সর্ববেদাংনুস্মরণম্‌’ এবং ‘চতুর্বেদাংগসম্ভবম্‌’ অর্থাৎ চতুর্বেদ মন্থন করে ‘পঞ্চমবেদ’ নাট্যবেদ সৃষ্টি করেন সাধারণ মানুষকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য। স্বাভাবিক ভাবেই ত্রেতাযুগে মন্বন্তরের কারণ কী, সে সম্পর্কে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে। এর উত্তরে আচার্য ভরত তাঁর নাট্যশাস্ত্রে বলেছেন – সমুদ্রমন্থনের পর যে অমৃত উঠে এসেছিল, অসুরদের বঞ্চিত করে দেবতারা পান করলেন সেই অমৃত। দেবতাদের এই ছলনা চুপ করে সহ্য করলো না অসুর প্রজাতি। বিরোধ করলো তারা। ফলে শুরু হল যুদ্ধ এবং তার ফলস্বরূপ সমাজে এলো অনাচার অব্যাবস্থা। নেমে এলো মন্বন্তর। একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, মন্বন্তরের কারণ হিসাবে সেখানে খরা, বন্যা বা এই ধরণের কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা আচার্য সেভাবে উল্লেখ করেননি। এ থেকে স্পষ্ট, প্রাচীন কাল থেকেই যে কোন মন্বন্তরের পেছনে যে মানুষের হাত আছে তা অস্বীকার করার উপায় নাই।
উচ্চশ্রেণী আর নিম্নশ্রেণীর মাঝখানের ব্যবধান সমাজ সৃষ্টির প্রারম্ভিক কাল থেকে আজও সমানভাবে চলে আসছে। যে গরীব, তার একমাত্র ধর্ম সে গরীব। সামাজিক বৈষম্য যখন বাড়ে মন্বন্তর ঘনিয়ে আসে তখনই। এক শ্রেণী হয়ে ওঠে বিত্তবান, আর এক শ্রেণী হয় বিত্তহীন। প্রাচীন কাল থেকে এই দূরত্বই মন্বন্তরের প্রধান কারণ। যদিও প্রাথমিক ভাবে যে কোন মন্বন্তরের কারণ প্রাকৃতিক বিপর্যয়। দুর্যোগের মধ্যে দিয়ে সামনে আসলেও আসলে একে দুর্ভিক্ষ বা মহামারীর রূপ দিতে মানুষের হাত যে অনেকখানি তা অস্বীকার করা যায় না।

বাংলাকে যে দুর্ভিক্ষ সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করেছিলো তা প্রথম ঘটেছিলো ১১৭৬ বঙ্গাব্দে। যাতে মৃত্যু হয় এক কোটিরও বেশি মানুষের। একে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির খাজনা আদায়ের নামে শোষণ শুরু করেছিলো, তার ওপর দেখা দিয়েছিলো অনাবৃষ্টি। ফলে সমগ্র বঙ্গপ্রদেশে নেমে আসে দুর্ভিক্ষ, যাকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে গা ঝাড়া দিয়েছে।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাাধ্যায় ‘আনন্দমঠ’ লিখেছেন তার একশো বছর পর। ৭৬’এর সেই দিনগুলো কেমন ছিল তা সেখানে কল্পনা করেছেন লেখক – “১১৭৬ সালে গ্রীষ্মকালে একদিন পদচিহ্ন গ্রামে রৌদ্রের উত্তাপ বড় প্রবল। গ্রামখানি গৃহময়, কিন্তু লোক দেখি না। বাজারে সারি সারি দোকান, হাটে সারি সারি চালা, পল্লীতে পল্লীতে শত শত মৃন্ময় গৃহ। মধ্যে মধ্যে উচ্চ নীচ অট্টালিকা, আজ সব নীরব। বাজারে দোকান বন্ধ, দোকানদার কোথায় পালাইয়াছে ঠিকানা নাই। ভিক্ষার দিন, ভিক্ষুকেরা বাহির হয় নাই, তন্তুবায় তাঁত বন্ধ করিয়া গৃহপ্রান্তে পড়িয়া কাঁদিতেছে। ব্যবসায়ী ব্যবসা ভুলিয়া শিশুক্রোড়ে করিয়া কাঁদিতেছে। দাতারা দান বন্ধ করিয়াছে। অধ্যাপক টোল বন্ধ করিয়াছে, শিশুও বুঝি আর সাহস করিয়া কাঁদে না। রাজপথে লোক দেখি না, সরোবরে স্নাতক দেখি না, গৃহদ্বারে মনুষ্য দেখি না। বৃক্ষে পক্ষী দেখি না, গোচারণে গরু দেখি না। কেবল শ্মশানে শ্মশানে শৃগাল কুকুর।” এই মন্বন্তরকে বিষয় করে পরবর্তী কালে সাহিত্য লেখা হলেও মন্বন্তরের সমকালে মানুষের সেই অসহায় অবস্থাকে তুলে ধরা হয়েছে – বাংলায় এমন সাহিত্যের অভাব রয়েছে।

৭৬’ পরবর্তী যে মন্বন্তর আর একবার বঙ্গপ্রদেশকে বিপর্যস্ত করেছিলো, তা নেমে এসেছিল ১৩৫০ বঙ্গাব্দে বা ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে। ১৯৪২ সালে আগস্ট বিপ্লবের পর থেকেই ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা চরম বিপর্যয়ের পথে এগিয়ে যায়। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিলো তার আগেই – ১৯৩৯ সালে। এই যুদ্ধের সময় থেকেই তার খরচ বহন করতে দেশের সাধারণ মানুষরা অস্থির হয়ে উঠেছিলো। তবে শুধু অর্থনৈতিক কারণ হলে হয়তো মহামারী এতো ভয়ানক হতো না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ব্যয় শুধু আর্থিক দিক থেকেই নয়, অবিভক্ত বাংলার মানুষকে নিজেদের প্রাণ দিয়ে শোধ করতে হয়েছিলো। তা একই সঙ্গে নিয়ে এসেছিলো সামাজিক অনৈতিকতা, মানবিকতাহীনতা, কালবাজারি – সব একসঙ্গে। যা এক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছিলো। ব্রিটিশ সরকারের নীতির বিরুদ্ধে দেশীয় মানুষের আন্দোলনকে দমন করা হয়েছিলো শক্ত হাতে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের রক্ষার জন্য চার্চিল যে দমনকারী অত্যাচারের পরিচালনা করেছিলেন, তাতে ভারতীয়রা বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলো। দেশের মধ্যেকার রাজনৈতিক মতভেদও সেই সময়ে চরমে পৌঁছে গিয়েছিলো। চরমপন্থী ও নরমপন্থীর মতপার্থক্য এতো প্রবল ছিল যে সাধারণ মানুষ দিক্‌ভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলো। পাশাপাশি স্বার্থসিদ্ধির রাজনীতি তো ছিলোই। যে পরিস্থিতি আগস্ট বিপ্লবকে দমন করার ক্ষেত্রে চার্চিলের পক্ষে সহায়ক হয়েছিলো।


সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারতই ছিল যুদ্ধের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। একে ঘরে ঘরে মৃত্যু তার ওপর এই আর্থিক বোঝা, সাধারণ মানুষের পক্ষে বহন করা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিলো। অপরদিকে বিদেশ থেকে ভারতে যে খাদ্য আমদানি হতো যুদ্ধের কারণে তাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই রকম এক বিপর্যস্ত অবস্থায় বাংলার কৃষিপ্রধান মেদিনীপুর অঞ্চলে শরৎকালে সাইক্লোন ও বন্যা আসায় প্রচুর শস্য নষ্ট হয়ে যায়।

১১৭৬’এ বাংলার যে দুর্দশা হয়েছিলো, তার পুনরাবৃত্তি ঘটল ১৩৫০’এ আবার। আগেও ব্রিটিশ সরকারের কাছে ভারতীয়দের খাদ্য-স্বাস্থ্য নিয়ে কোন নীতি ছিল না – এখনও তার সন্ধান মিলল না। বাংলার গ্রামে গ্রামে মৃত্যর মিছিল – খাদ্যের সন্ধানে যারা শহরের পথে পা বাড়িয়েছিল, তারাও এই দুর্ভিক্ষের কবল থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পারেনি। শহর কলকাতার রাস্তায় মানুষের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যেতো প্রতি দিনই। মৃতের সংখ্যা সরকারি মতে ১৫ লাখ হলেও বেসরকারি মতে তা ছিল ৩৫ থেকে ৪৫ লাখ।

আচার্য ভরত তাঁর নাট্যশাস্ত্রে জানিয়েছেন, নাটক হল ‘লোকবৃত্তানুকরং’ এবং ‘লোকস্যসুখদুঃখসমন্বিতঃ’। নাটক হবে লোকবৃত্তের অনুকরণ ও দৃশ্য ও শ্রব্যগুণ সম্পন্ন। সেইসঙ্গে নাটক হল সুখদুঃখ সমন্বিত লোকস্বভাবের প্রতিফলন। পাশ্চাত্য সমালোচক এরিস্টটল-ও নাটক সম্পর্কে এই একই কথা বলেছেন। অর্থাৎ, সমাজ বদলের সঙ্গে সঙ্গে নাটকের রূপ-রীতির পরিবর্তন খুব স্বাভাবিক। তাই প্রথম পর্বে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে নাটক ধর্ম-শিক্ষাকেন্দ্রিক হলেও পরবর্তীকালে তা হয়ে ওঠে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বাস্তব দলিল।

মন্বন্তর, দুর্ভিক্ষ বা মহামারী – প্রাচীন কাল থেকেই এক যুগবদলের সংকেত নিয়ে এসেছে। সমাজ-জীবনের যে কোন বিপরীত পরিস্থিতি আমাদের নানাভাবে শিক্ষা দিয়ে যায় এবং তা সহানুভূতিশীল সচেতন মানুষকে ভাবায়ও নানা ভাবে। সেখান থেকেই গড়ে ওঠে এক নতুন সাহিত্যের ধারা। যে সাহিত্যের মধ্যে কল্পনার ভাব-বিলাসিতার বদলে থাকে বাস্তব জীবন, বাস্তব পরিবেশ। তাই প্রাচীনকাল থেকে নাটক লেখার যে সাধারণ বৈশিষ্ট্য স্বীকৃত ছিলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিবেশে তা হঠাৎ করেই যেন পাল্টে গেলো। যখন সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই সবথেকে বড় হয়ে ওঠে, তখন শুধু সাহিত্য রচনা নয়, বরং সাধারণ মানুষের সমস্যা ও তা থেকে উত্তরণের পথ সন্ধান করা সাহিত্যিকদের কাছে প্রধান হয়ে ওঠে।
বাংলা নাট্য সাহিত্যে বিজন ভট্টাচার্য এসেছিলেন এমন এক চরম অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে। যে সময়ে দাঁড়িয়ে তাঁর পক্ষে নাটকের প্রাচীন চিরাচরিত রূপ রীতি মেনে চলা সম্ভব ছিল না। তাই তাঁর নাটক হয়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী। নিম্নশ্রেণীর না খেতে পাওয়া মানুষজন তাদের প্রতিদিনের সমস্যা নিয়ে উঠে এসেছে তাঁর নাটকে। সমকালের মানুষের জীবন-যন্ত্রণাই ছিল তাঁর নাটকের একমাত্র প্রেরণা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসাই তাঁকে নাটকের জগতে আসতে বাধ্য করেছে। উনিশ শতকের প্রথম দশকে ফরাসি দার্শনিক রোমাঁ রোলাঁর ‘দ্য পিপল্‌স থিয়েটার’ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সেখানে গণজীবনের অভিব্যক্তি ও তা থেকে উত্তরণের পথ দেখানোই নাটকের প্রধান উদ্দেশ্য বলে বলা হয়েছে। বিজন ভট্টাচার্য রোমাঁ রোলাঁর সেই দর্শনকেই অনুসরণ করেছেন তাঁর নাটকে।

১৯১৭ থেকে ১৯৭৮ পর্যন্ত বিজন ভট্টাচার্যের জীবনকাল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ৫০’এর মন্বন্তর, স্বাধীনতা আন্দোলন, তারপর স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে দেশভাগ, তাঁর জন্মস্থান বাংলাদেশ-বিভাজন, নক্শাল আন্দোলন – এমন বহু রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা একের পর এক ঘটেছিলো এই সময়কালের মধ্যে। অনেকাংশে যার সাক্ষী ছিলেন তিনি। তাই বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের এই অস্থিরতা তাঁকে স্পর্শ করে – তিনি প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৪৩-এ এক জটিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপড়েনের যুগে ‘আগুন’ নাটকের মঞ্চায়ণের মধ্য দিয়ে তাঁর নাট্যজগতে প্রবেশ। মন্বন্তরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি বুঝেছিলেন, বাংলাদেশে খাদ্যের অভাব ধীরে ধীরে কী ভয়াবহ রূপ নিতে আরম্ভ করছে। সমাজের সব শ্রেণীর মানুষদের একদিন যে একই ‘কিউ’তে দাঁড়াতে হবে এবং যে পরিস্থিতি সম্মুখে, তাতে “বাঁচতে হলে মিলেমিশে থাকতে হবে” – একথা তিনি মন্বন্তর আসার আগেই বুঝেছিলেন। শুধু দূর থেকে দাঁড়িয়ে মন্বন্তরকে দেখা নয়, তিনি খুব কাছ থেকে এই পীড়িত মানুষগুলোকে দেখেছেন, তাদের কষ্টকে অনুভব করেছেন। তবু তিনি আশাবাদী। তাই ‘আগুন’ নাটকে সকলের চাল পাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি নাটকের যবনিকা টেনেছেন। একই বছরে লেখা বিজন ভট্টাচার্যের দ্বিতীয় নাটক ‘জবানবন্দী’ এখানেও রয়েছে ‘আগুন’-এর মতোই খাদ্য-সংকট। গ্রাম্য চাষী অন্নের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে উঠে এসেছে কলকাতার ফুটপাথে। এখন তারা রাস্তার ভিখারি। খাদ্যের অভাবে এই গ্রাম্য সুখি পরিবারের মূল্যবোধেও ঘাটতি আসে। তাই বেন্দার মা স্বার্থপরের মতো বুভুক্ষু স্বামী আর অসুস্থ নাতিকে না দিয়ে একাই খেয়ে ফেলে নিজের সংগ্রহ করে আনা খিচুড়িটুকু। বেন্দার বউয়েরও রকম সকম পালটে যায়। সে শহরের ‘ভদ্দরনোক’-এর হাতছানিতে সাড়া দেয়। তাই তার পরণে ওঠে নতুন কাপড়।

‘জবানবন্দী’ লেখার পিছনে বিজন ভট্টাচার্য তাঁর মানসিক অবস্থা শমিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন – “ডি এন স্কোয়ারের পাশ দিয়ে রোজ আপিস যাই। রোজই দেখি, গ্রামের বুভুক্ষু মানুষের সংসারযাত্রা। নারী পুরুষ শিশুর সংসার। দেখি বললে ঠিক বলা হবে না। আমি লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতে পারতাম না। চোখ না তুলেও যেতে যেতে অদের উপস্থিতি টের পেতাম। এক একদিন রাস্তার উপরেই শায়িত মৃতদেহ, নোংরা কাপড়ে ঢাকা। মৃতদেহগুলো যেন জীবিত মানুষের চেয়ে অনেক ছোট দেখায়। বয়স্ক কি শিশু, আলাদা করা যায় না। আপিস যাওয়ার পথে অন্য দৃশ্য দেখি। টেলিগ্রাফের তার কাটতে গিয়ে পুলিশের গুলি খেয়ে পাকা ফলের মতো টুপ করে রাস্তায় পড়ে অল্পবয়সী ছেলে। আমি নিজেও একদিন কলেজ স্ট্রিটে পুলিশের প্রচন্ড মার খেলাম। আপিস থেকে ফেরার পথে রোজই ভাবি – এদের নিয়ে কিছু লিখতে হবে।” নাটকের শেষ ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে হলেও চাষীর গ্রামে ফিরে যাওয়াই যে একমাত্র পথ তার ইঙ্গিত দিয়েছেন নাট্যকার।

‘জবানবন্দী’র পর প্রকাশিত হয় ‘নবান্ন’। এরও বিষয় আগের দুটো নাটকের মতোই – খাদ্য সংকট। তবে শুধু খাদ্যের অভাব যে মন্বন্তরের একমাত্র কারণ ছিল না – আনুষঙ্গিক যে আরও অনেক কারণ ছিল, ‘নবান্ন’ নাটকে তা স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করেছেন নাট্যকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, জাপানের আক্রমণ, আগস্ট আন্দোলন, ব্রিটিশ শাসকের পোড়ামাটি নীতি, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, বন্যা, দুর্ভিক্ষ, কালোবাজারি, নারী কেনা-বেচা, চিকিৎসা সংকট, সম্পন্ন মানুষের বিলাসিতা, মানবিক মূল্যবোধের পতন – সমকালের এমন বহু সমস্যা তিনি চার অংকের এই নাটকে তুলে ধরেছেন।‘নবান্ন’ লেখার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বিজন ভট্টাচার্য পরবর্তীকালে বলেছেন – “নিয়মতন্ত্র সম্মত ভাগ-বাঁটোয়ারার পর নিরক্তের স্বাধীনতা এলো কালনেমির অভিশাপ মাথায় করে। তাই বিনা রক্তপাতে অর্জিত স্বাধীনতার পাপস্খলন হলো আত্মঘাতী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়। ‘নবান্ন’ নাটকের রচনাকাল এই রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের প্রারম্ভিক পর্বে।”

মহামারীকে কেন্দ্র করে বিজন ভট্টাচার্য পর পর তিনটি নাটক লেখেন। যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি তাঁর মনের ভেতরের আলোড়নকে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশিত করতে পারেননি, ততক্ষণ তিনি থামেননি। এরপর মন্বন্তর তাঁর নাটকের বিষয় হয়ে না উঠলেও সমাজের প্রতি সচেতনতা ও মানুষের প্রতি সহানুভূতি তাঁর প্রতিটি নাটকেই দেখা গেছে। আসলে মহামারী শুধু বাহ্যিক বা সমাজ-রাজনীতি- প্রাকৃতিক নয়; এক গোটা গোষ্ঠীর মানসিক ব্যাধিও একটা সমাজে মহামারী আনতে পারে। একেও আমরা এক ধরনের মহামারী বলতে পারি। বিজন ভট্টাচার্য সেই মানসিক ব্যাধি থেকে সমাজকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন আজীবন। তাই তাঁর নাটকে বহু সমস্যা নানা ভাবে উঠে আসলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি আশাবাদী।