বিকেলের রোদ ॥ আজনা ইসলাম




হেমন্তের বিকেল বেলাটা জানলার পাশে বসে কাটান তপতী রায়। নিউ টাউন থেকে এয়ারপোর্টের দিকে এগিয়ে যেতে ঘন কালচে সবুজ মাঠ ঘাট যেন আদিগন্ত একটা সবুজের গালিচা। অক্টোবর মাসের শেষ দিকটায় শীত যখন আসি আসি করছে, তখন বিকেলের সোনালী রোদটা সবুজ ঘাসের বুকের ওপর পড়ে আলতো উষ্ণতা বুলিয়ে দেয় যেন।
স্বর্ণকান্তি এই রোদের উষ্ণতা তপতীর কোঁচকানো চামড়ায় আরাম দেয়। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। তপতী বসে বসে ঝিমোন। ঝিমুনী ভাবটা ভাললাগে তাঁর। এ যেন স্বর্গ আর মর্ত্যের মাঝামাঝি একটা অনুভূতি। কেউ নেই আবার মনে হয় যেন সবাই আছে চারপাশে।

তপতী বসু, নৃপেন রায়কে বিয়ে করে তপতী রায় হয়েছিলেন বছর পঞ্চাশেক আগের কথা। রায় বাবুর বদলীর চাকরিতে পাহাড়, জঙ্গল, বিদেশ বিভূঁই ঘুরে কত রকম জীবনের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তপতীর। বাড়িতে কেউ এলে সোল্লাসে সেই গল্প ঝুলি থেকে একটা একটা করে বের করে দেন তিনি। সদা প্রাণোচ্ছল তপতী এ ষাটোর্ধ্ব বয়সেও পরিচিত মহলে দারুন সমাদৃত। মেয়ে বুলাই আর ছেলে বাবাই যখন সংসার আলো করে এলো, তখন তপতীর সংসার-সন্তান সব মিলিয়ে নাভিশ্বাস উঠার অবস্থা। একা, সুনিপুণ হাতে সংসার সন্তান সব ঠিকঠাক চালিয়ে নিতে এতটুকু ভয় হয়নি। নৃপেনকেও স্বামী নয়, বরং পরম বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলেন তপতী। ভালোবাসা বন্ধুত্বে তাঁকে আগলে রেখেছেন নৃপেন সারা জীবন। উচ্চশিক্ষার জন্য একে একে বুলাই-বাবাই পাড়ি দিল বিদেশে। আর রায় বাবু চাকরি জীবনের শেষে এসে কলকাতায় পরিজনের কাছাকাছি থাকার ব্যবস্থা করলেন। বুলাইয়ের বিয়ের বছরই শহর থেকে একটু দূরে, খোলামেলা জায়গা দেখে রায় বাবু নিউ টাউন এর এই বাড়িটা বানিয়ে নিয়েছিলেন। রায় গিন্নি লোক লাগিয়ে আঙ্গিনায় দেশি বিদেশি ফুলের বাগান করে বাড়িটাকে বেশ সুন্দর করে সাজিয়ে নেন। বিদেশ-বিভূঁই চাকুরির সুবাদে এবং শখের বসে রায় বাবু নানা নরকম শামুক, ঝিনুক, পাথর এমনকি প্রত্নতাত্ত্বিক জিনিসপত্ররও সংগ্রহ করেছিলেন। আর ছিল ছবি তোলার চমৎকার হাত। তপতী এইসব কিছু নিয়ে নিখুঁত হাতে বাড়ির ভেতরটা গোছালেন। একটা ছোটখাট যাদুঘরের রূপ দিয়েছিলেন তিনি বাড়িটার। রায় পরিজন আত্মীয়রা অদূরে থাকায় অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই বেশ আনন্দে ভরে উঠল নিউ টাউনের জীবন।

বুলাই বিয়ের পর কানাডাতে চলে গেছে। ওখানে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষিকা। বাবাই পড়াশুনা শেষে নরওয়েতেই থেকে যায়। ওখানে তেলের কোম্পানিতে বড় ইঞ্জিনিয়ার সে। সন্তানদের সাফল্যে তপতীর চোখ চিকচিক করে। ওদের কথা বলতে গেলে ঠোঁটের কোন কান পর্যন্ত বিস্তীর্ণ হয় তাঁর।
রায় দম্পতি প্রথম দিকে বিদেশে বুলাইয়ের কাছে বেড়াতে গেলেও পরে বিদেশ যাওয়া কমিয়ে দেন। একে অত দীর্ঘ যাত্রা আর অন্য দিকে বুলাইয়ের ব্যস্ত জীবন। এ বয়সে এসে সন্তানদের সান্নিধ্য কাম্য হলেও তাদের জীবন যাত্রার সাথে তাল মেলাতে চাননি তাঁরা। বিজ্ঞানের দৌলতে যোগাযোগ হয়েই যায়। আজকাল তো দেখাও হয়ে যায় কেবল ছোঁয়া যায় না। বুলাই, বাবাই প্রায় প্রতিদিন ফোন করে কথা বলে। শনি, রবিবারে কথা হয় সবার সাথে। বুলাইয়ের একটা মেয়ে মিকু আর বাবাইয়ের একটা ছেলে হয়েছে গুড্ডু। মিকু আর গুড্ডু জন্মাবার সময় নৃপেন-তপতী ওদের কাছেই ছিলেন। নাতি-নাতনীদের প্রতি একটা অদ্ভুত টান কাজ করে। সপ্তাহান্তে যখন স্কাইপেতে বাচ্চাদের সঙ্গে দেখা হয়, সময়টা খুব উপভোগ করেন তপতী। সপ্তাহের বাকী দিনগুলোতে বিকেলের রোদে বসে রায় দম্পতি ওদের কথাই আলোচনা করেন। দিন যত গত হয় তপতী নৃপেনকে আরও কাছে পান। এই পাওয়া অন্য পাওয়া।
বাবাইয়ের যখন বিয়ে হল তখন সবাই নিউ টাউনের বাড়িতে এসেছিল। কী আনন্দই না হয়েছিল। অবসরে নৃপেনের সাথে এই গল্পেই প্রগলভতা হয়ে উঠেন তপতী। তপতী এসব আলোচনার ভেতর দিয়ে সন্তাদের উপস্থিতি অনুভব করেন।নৃপেন তপতীকে বলতে দেন।

বাবাইয়ের বিয়ের বছর পাঁচেক পরের কথা, দুর্গা পূজার পরিকল্পনা চলছিল। সেই বার বুলাই পূজার সময় কলকাতায় থাকবে বলে জানালো। তপতীর এটা সেটা কতো কী পরিকল্পনা। কিন্তু, নৃপেন আজকাল এত ঘুমোন যে তপতী কথা বলারই সুযোগ পাচ্ছেন না। নৃপেন তপতীকে জানিয়েছেন যে তিনি খুব দুর্বল বোধ করছেন। খাবারেও আগ্রহ কমেছে। তপতী একজন ডাক্তারের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিলেন। একদিন নৃপেন প্রায় সারাদিন ঘুমালেন। ডাক্তার দেখান হল, ডাক্তার বেশ কিছু পরীক্ষা দিলেন। পূজার আয়োজনে চারদিকে একটা হই হই রব। পূজা এলেই কলকাতা যেন স্নান করে নতুন জামা পরে নানা রঙের গয়না পরে। সাজানো কলকাতা দেখতে খুব সুন্দর লাগে তখন। পঞ্চমীর দিন বুলাই এসে পৌঁছুবে। বুলাইয়ের, মিকুকে নিয়ে আসবার কথা। মিকুর এবার প্রথম পূজা দেখা কলকাতায়। একদিকে মেয়ে-নাতনীকে দেখার আনন্দ অন্য দিকে নৃপেনের শারীরিক অবস্থার এহেন অবস্থা। সাহসী তপতীর মনে ভয় এসে জড়ো হয়। মহালয়ার দুদিন আগের কথা, তপতী বিকেলের চা-জলখাবারের আয়োজন করছিলেন। হঠাৎ ডাক্তারের ফোন। ডাক্তার তপতীকে দেখা করতে বললেন।পরদিন ডাক্তার খানায় গেলে ডাক্তার তপতীকে জানালেন, রিপোর্টে নৃপনের বোনম্যারো ক্যান্সার ধরা পড়েছে। তবে, সেটা একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে। তপতী বোধ শক্তি হারালেন। কী সব বলছেন ডাক্তার। কিভাবে বাড়ি ফেরা হয়েছে তপতীর মনে নেই। ছেলে-মেয়ে, আত্মীয় স্বজন সবাই এল। দুর্গা মা এসে চলে গেল। রায় বাবুর চিকিৎসার ব্যবস্থা হল কানাডাতে বুলাইয়ের কাছে।বছর পাঁচের চিকিৎসায় রায় বাবু ক্যান্সার মুক্ত হলেন। ওঁরা আবার নিউটাউনে ফিরে এলেন। এই কয়েক বছরে তপতীকে একটা অদ্ভুত একাকিত্ব ঘিরে ধরে। আর সেই একাকিত্বের চোরাবালি থেকে বের হতে পুরো সময়টা যেন নৃপেনের সাথেই সম্পৃক্ত থাকার চেষ্টা করেন তপতী।

আগে কখনও কখনও আত্মীয়দের বাড়িতে এক, আধ বেলা একা গিয়ে সময় কাটালেও এখন নৃপেনকে একা রেখে যাওয়াটা একেবারেই বন্ধ করে দিলেন তপতী। তবে, দুজনে ছোট ছোট ভ্রমণ করে্ন এদিক ওদিকে, কখনও সমুদ্রের পাড়ে, কখনও জঙ্গলে। যাতায়াত ব্যবস্থা আগের তুলনায় বেশ ভালো হওয়ার দরুন দুজন বয়স্ক মানুষের কোন অসুবিধা হয় না বেড়াতে যেতে। জীবন আবার চেনা ছকে আবদ্ধ হয়। প্রতিদিন নতুন সূর্য উঠে, নতুন করে আলোয় প্লাবিত হয় জগৎ।

দুই বছর আগে, একদিন সকালে দরজায় খবরের কাগজটা কুড়োতে গিয়ে হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যান রায় বাবু। বেশ রক্ত বেরিয়ে যায় মাথা ফেটে। সত্তর পার হওয়া শরীর এবার আর পেরে ওঠে না।সপ্তাহ তিনেক পরে, সেই দিন ছিল মঙ্গলবার। নৃপেনকে সোফায় বসিয়ে রেখে তপতী স্নানে গিয়েছিলেন। বেরিয়ে এসে পূজার থালাটা নিয়ে তপতী যখন নৃপেনকে নকুল দানা দিতে গেলেন তিনি তখন মাথা হেলে বসে। নৃপেনের সাড়া না পেয়ে থালাটা টেবিলে নামিয়ে তপতী যখন নৃপেনের গায়ে হাত দিলেন তখন নৃপেনের কোন হুঁশ নেই। নৃপেনকে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হল। ডাক্তার জানালেন নৃপেন বাবু আর নেই। সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যায় যে, ছেলে মেয়েদের সাথে আর যোগাযোগ করে উঠতে পারেননি তপতী। ছেলে মেয়েদের খবর দিয়ে নৃপেনকে হিমঘরে রাখা হল। দুদিনের মধ্যেই বুলাই-বাবাই সবাইকে নিয়ে নিউ টাউন পৌঁছল। তপতীর মনে যে বাষ্প ঘনীভূত হয়েছিল, বের করতে পারছিলেন না, বুলাই-বাবাই এসে তপতীকে জড়িয়ে ধরলে সে বাষ্প বানভাসিয়ে প্লাবিত করল তাঁকে। তপতী সন্তানদের জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কাঁদলেন।পরাজয়ের কান্না। পঞ্চাশ বছরের বন্ধুকে হারাবার কান্না।

ছেলেমেয়েরা চেয়েছিল মা তাদের কাছে থাকুক। একা মা কতটা ভাল থাকবেন এটা ওদের বিবেচ্য বিষয়, কিন্তু মায়ের স্বাচ্ছন্দ্যকেই ওরা প্রাধান্য দেয় সবচেয়ে বেশি।তপতী নিউ টাউনে থেকে যান।
সেই বার নৃপেন যখন পড়ে গিয়েছিলেন, তপতী তখন জলে তলিয়ে যাওয়া মানুষ যেমন খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায় তেমনি নৃপেনকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলেন। তপতীর খুব ইচ্ছে হচ্ছিল দেবী হয়ে যেতে, অমরত্ব এনে দিতে নৃপেনকে। একা বেঁচে থাকার বীভৎস আতঙ্ক এসে গ্রাস করছিল তপতীকে। প্রিয় সাথী, দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে যাপিত জীবনের সুখ-দুঃখের সাথীকে যদি হারিয়ে ফেলতে হয়। তাই, এই জানলার ধারে বসে তপতী নৃপেনকে প্রতিজ্ঞা করিয়েছেন অনেকবার, যেন তাঁকে নৃপেন ফাঁকি দিয়ে চলে না যায়। নৃপেন অপরাধীর মতো ক্ষমা চেয়েছেন বারবার। প্রকৃতি যদি তাঁকে কথা রাখার সুযোগ না দেয়; তার দায় ভার নিয়ে ক্ষমা। মহালোকের নিরন্তর খেলায় মৃত্যু অনিবার্য। একে ফাঁকি দেবার ক্ষমতা নৃপেনের হয়নি।

বিকেলের এই নরম আলোর তন্দ্রালোকে তপতী নৃপেনের হাতের মুঠোর সেই উষ্ণতা উপলব্ধি করেন। পাশের ঘরে চলতে থাকা টেলিভিশনের শব্দ নৃপেনের উপস্থিতিকে আরও বাস্তব করে তোলে তপতীর কাছে…