বিদায়, কবি অলােকরঞ্জন দাশগুপ্ত ॥ ফরিদ আহমদ দুলাল



কবি ও অনুবাদক অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত প্রয়াত হলেন ১৮ নভেম্বর জার্মানিতে। ১৯৭১-এর পর থেকেই তিনি জার্মানিতে প্রবাস জীবন কাটাচ্ছিলেন; বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থও ছিলেন অনেকদিন। স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ন’টায় ৮৭ বছর বয়সে প্রয়াত হন কবি। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ১৯৫৭ থেকে ১৯৭১ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের সারস্বতসমাজে তিনি এতটাই প্রিয়জন ছিলেন সবার, যে প্রবাসে থেকেও তিনি লাভ করেন আকাদেমি পুরস্কার, রবীন্দ্র পুরস্কার, আনন্দ পুরস্কার। তাঁর জন্ম ৬ অক্টোবর, ১৯৩৩, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায়। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে যৌবন বাউল ১৯৫৯, নিষিদ্ধ কোজাগরী ১৯৬৭, রক্তাক্ত ঝরোখা ১৯৬৯, ছৌকাবুকির মুখোশ ১৯৭৩, গিলোটিনে আলপনা ১৯৭৭, লঘু সংগীত ভোরের হওয়ার মুখে ১৯৭৮, জবাবদিহির ঢিল ১৯৮২, দেবীকে স্নানের ঘরে নগ্ন দেখে ১৯৮৩, এবার চলো বিপ্রতীপে ১৯৮৪, ঝরছে কথা আতস কাঁচে ১৯৮৫, ধুনুরি দিয়েছে টাকার ১৯৮৮, মরমী করাত ১৯৯০ ইত্যাদি। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতার প্রবণতা বুঝতে আমরা তাঁর একটি কবিতা পড়ে নিতে পারি-
কিন্নরী এক সরল মহর্ষিকে জাদু করেছিল, ফলত
যোগসাজসে প্রকৃতিমথিত পুরুষের ঔরসে
একটি দুহিতা ফুটল সায়াহ্নিকে॥

পদ্মের মতো দুহিতার চোখ দুটি,
নীলিমার ন্যায় আনন নির্বিকার,
তবু কিনা এক গাছের কোটরে ওরা
রেখে এল সেই কন্যারত্নটিকে।

গাছগুলি আজও দারুণ উদারচেতা
(যদিও নেতারা তাদের মৃত্যু চায়)
ওরা অবৈধ পিতৃত্বের ভার
বুকে তুলে নিল পাতায় পাতায় লিখে॥

গাছে যদিও পরম উদারচেতা
ভুলে গিয়েছিল কন্যার নাম দিতে,
তাদের হৃদয়ে শুধুই দৃষ্টি ছিল
সেই কন্যার প্রতিপালনের দিকে।

খিদে পেলে তার যখন কাঁদত খুব
বনস্পত্তির দেবতা চন্দ্র নিজে
পীযূষবর্ষী তর্জনীখানি তাঁর
পান করাতেন জননীর আঙ্গিকে।

অনাম্নী সেই মেয়ের স্বয়ংবরা
হবে আজ, দ্যাখো দূরান্ত থেকে এল
দয়িতেরা তার, সম্প্রদানের আগেই
গাছগুলো কেঁদে মরে গেল একে-একে॥
(দুহিতা॥ অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত)

কবিতার উপস্থাপনশৈলীর সৌন্দর্য শুধু নয়, তাঁর কবিতায় পুরাণের উল্লেখযোগ্য ব্যবহারও পাঠককে আকৃষ্ট করে। তাঁর কবিতায় ভারতীয় পুরাণের আরও কিছু ব্যবহার দেখতে আমরা নিচের কবিতাটি পড়তে পারি-
তুমি যে বলেছিলে গোধূলি হলে
সহজ হবে তুমি আমার মতো,
নৌকো হবে সব পথের কাঁটা,
কীর্তিনাশা পথে নমিতা নদী!
গােধূলি হলো।
তুমি যে বলেছিলে রাত্রি হলে
মুখোশ খুলে দেবে বিভোরবিভা
অহংকার ভুলে অরুন্ধতী বশিষ্ঠের কোলে মূর্ছা যাবে!
রাত্রি হলো।

(একটি কথার মৃত্যুবার্ষিকীতে ॥ অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত)

এই যে কবি বললেন, “অহংকার ভুলে অরুন্ধতী বশিষ্ঠের কোলে মূর্ছা যাবে!” এই কবিতা পড়ে আমাদের জানা হয়ে গেলো ‘বশিষ্ঠ ঋষি’ এবং ঋষিপত্নী ‘অরুন্ধতী’র নাম। অন্য একটি কবিতার নামই ‘আর্টিমিস’। আর্টেমিস গ্রিক পুরাণের অরণ্যদেবী এবং বারো অলিম্পিয়ানদের অন্যতম। রোমান পুরাণে আর্টেমিস চরিত্রটিই ‘ডায়ানা’ হিসেবে পরিচিত। অ্যাপোলো এবং আর্টেমিস যমজ ভাইবোন। আর্টেমিস শিকার, জঙ্গল ও পাহাড় এবং চাঁদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। গ্রিক পুরাণে আর্টেমিসকে চিরকাল অরণ্যচারী এবং চিরকুমারীরূপে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তাঁর সহচরী বনপরীরাও তারই মতো চিরকুমারী। দেবতা এমনকি মানুষও কখনো আর্টেমিস এবং তাঁর সহচরীদের ভালোবাসা পায়নি। কেবল কিছুকালের জন্য বিখ্যাত শিকারী ওরাইয়নের সঙ্গে আর্টেমিসের সখ্য গড়ে উঠেছিলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ওরাইয়ন, অ্যাপোলোর চক্রান্তে আর্টেমিসের হাতেই নিহত হন। আর্টেমিসের অতি অল্পতেই উত্তেজিত ও রাগান্বিত হবার প্রবণতা লক্ষ করা যায়; এবং তিনি তাঁর বিরাগভাজনদেরকে কঠিনতম শাস্তি দিতেন। নাইওবীর সাত কন্যাকে তিনিই হত্যা করেন এবং তাঁর অভিশাপের কারণে তিনি অ্যাকটিয়ন মৃগের রূপ ধারণ করলে নিজের শিকারী কুকুরদের দ্বারা নিহত হন। আর্টেমিস, গ্রিক ও ট্রয়ের যুদ্ধে অ্যাপোলোর সাথে ট্রোজানপক্ষ অবলম্বন করলে হেরা কর্তৃক প্রহৃত হন এবং পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। গ্রিক পুরাণের আর্টিমিস চরিত্রটিকে কবি নিপুণ কাব্যকলায় চিত্রিত করলেন-
কোনো-কোনো দেবী গাছের কোটরে থাকে,
যেমন আর্টেমিস,
দুঃসাহসিক তরুণেরা এ দেবীর দুই চক্ষের বিষ।

শুধু কিশোরীরা আশ্রিত তার, ওরা
কোথাও গেলেও তিনি
তাদের সঙ্গে হেঁটে যান খাকি শাড়ি
পরা দেহরক্ষিণী।

একটি তরুণ একবার রেখেছিল
কিশোরীর পায়ে মাথা,
আর্টেমিসের শান্ত্রীরা তার পিঠে চাবুক কষাল যা-তা।

একবার এক তন্বী অন্যমনে
তার প্রেমিকের বাড়ি
যেতে চেয়েছিল, প্রেমিকের মৃতদেহে
বিঁধে গেল তার শাড়ি।

গাছের কোটর ভরে যায় এইভাবে
স্নেহে আর সন্দেহে,
না-পাঠানো চিঠি না-বাজা নূপুর আর
প্রেমিকের মৃতদেহে।

ক্রমে সব-কিছু পিণ্ডপ্রমাণ এক
মৃত চিঠি হয়ে যায়,
গাছটাই ডেড-লেটার বাক্স হয়ে
অক্ষর কুরে খায়।

সময় হয়েছে এবারে আর্টেমিস,
তোমার বৃক্ষ থেকে নেমে এসে তুমি দাঁড়াও একলা-একা
সংক্রান্তির মেঘে।

সেটুকুই তার প্রতীকী শাস্তি, আর
কিছু দরকার নেই,
সব অপরাধ ক্ষয়ে যায় একবার
অনুতাপ করলেই!

(আর্টেমিস ॥ অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত)

আবার সাধারণের জীবন-প্রাত্যহিকতাও তাঁর কবিতায় যেনো স্ফূর্তি পায়; আসুন পাঠক, নিচের কবিতাটির দিকে মনোযোগ দিই-
ভাগলপুরে যখন থাকতাম
চৈত্র এলে সিতাম্বর জৈন সন্ন্যাসীরা
চিড়েগুড় খেয়েই
আমাদের সেই ছাউনিটাকে আশীর্বাদ
করে চলে যেত।

এবার ওরা কলকাতার ফ্ল্যাটে
হাজির হয়ে তিন-চারদিন অপর্যাপ্ত
ফলাহারের শেষে
আশীর্বাদ দেবার আগে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে
জানতে চাইল শেষবারের মতো
মায়ের চলে যাবার পরে হবিষ্যি করেছিলাম কিনা।

‘এ প্রশ্নটা ফালতু কি নয়?’ তার উত্তরে সাধুরা বলে ওঠে:
“আজ আমাদের পাস করাবার মানদণ্ড উন্নীত হয়েছে।”

(পাশফেইল॥ অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত)

কবিতায় বিমূর্ততার আড়াল পড়তেও আমরা অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের শরণাপন্ন হতে পারি-
প্রতিরক্ষামন্ত্রী এসে উত্তরাখণ্ডের রিক্ত বনাঞ্চলটিকে
মানপত্র দেবার আগেই
সসন্ত্রমে দাঁড়িয়ে পড়লেন
তিন সারি ইউক্যালিপটাস।

নন্দিত হবার পরে মনঃক্ষুণ্ন দীর্ঘদেহী এই
প্রাক্তন নাগরিকেরা কেউ কেউ কাশ্মিরী ব্রাহ্মণ,
অন্যেরা অন্ত্যজ কিছু একসঙ্গে সমূহ অধোগতি
মেনে নিয়ে পাতালে নামছেন, দ্যাখো, এ অবরােহণে
দেহদৈর্ঘ্য বাধা দেয়, সিঁধিয়ে যাবার নিম্নমুখী

সিঁড়িটা দারুণ সরু, ভূমিকম্প পথ করে দেয়,
মাটির ভিতরে অনুকম্পা নিয়ে জেগেছে উদধি।

(ভূমিকম্প পথ করে দেয় ॥ অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত)

অন্যত্র অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত লিখছেন-
“একদিন স্বরচিত সূর্যের গহ্বরে/ সানন্দে যাপন করে ছ’হাজার লিখেছি কবিতা,/ এক-একবার ঈশ্বরের শীর্ণ সিংহাসনে/ তাঁর স্নিগ্ধ সন্নিধানে জায়গা করে নিয়েছি, অন্তত/ এরকম ঠাউরে নিয়ে;/ একদিন অরবিন্দ গুহ/ আমায় বললেন যেন পুনরাবৃত্তির ঘোর থেকে/ সরে এসে অনীশ্বর হয়ে উঠি প্রকাশ্য চত্বরে।”
আজ তাঁর প্রয়াণের পর যেনো পলকেই পঙক্তিগুলো বাণী-সত্ব হয়ে ওঠে।
অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত শুধু কবি নন, তিনি কিছু গল্পও লিখেছিলেন। তাঁর একটি গল্পগ্রন্থের নাম ‘যে সব গল্প দেরাজবন্দি ছিল’। এই বইয়ের একটি গল্পের চরিত্রের নাম সেঁজুতি। লেখক এই গৃহবধূকে পড়াতে যেতেন। তাঁর গল্পে বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন- “গাছগুলি স্ব-ইচ্ছায় উড়তে পারে ঠিকই, কিন্তু মানুষের কাছে ফিরে আসে মানুষ। আমি স্টেশনে পৌঁছে দেখি রাত দশটার আগে কলকাতাগামী কোনো ট্রেনই নেই। কারা নাকি আগের স্টেশনে ফিশ-প্লেট সরিয়ে নিয়েছে,… অথবা এমনও হতে পারে ‘মানুষ হয়ে জন্মেছি। মানুষ হয়েই মরতে হবে’ আমার রক্তকোষে এই অঙ্গীকারের তাড়নাই মারমুখী হয়ে উঠেছিল অগত্যা আমি সেঁজুতির কাছেই ফিরে এসেছিলাম৷” আমরা ঠিক জানি না তিনি কি সত্যিই সেঁজুতির কাছে থিতু হতে পেরেছিলেন কি-না?
অলোকরঞ্জন অনুবাদ করতেন আমরা জানি, জার্মান ভাষার অসংখ্য কবিতা তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন, কিন্তু বাংলা ভাষার কবিতা কি তিনি জার্মানিতে অনুবাদ করেছিলেন কি-না, আমাদের জানা নেই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বলা যায়, আমাদের কবি শহীদ কাদরি যেমন দীর্ঘ প্রবাস জীবন কাটিয়েও বাংলাদেশের একজন প্রভাবশালী কবি ছিলেন; অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তও তেমনি দীর্ঘ প্রবাসজীবন কাটাবার পরও পশ্চিমবঙ্গের কাব্যাকাশে শুধু নয়, বাংলা কবিতার একজন প্রভাবশালী কবি ছিলেন; ছোট-বড় সবাই তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ কবি হিসেবে মান্যতা দিতেন; আজ তাই তাঁর প্রয়াণে বাংলার বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। বিদায় কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত; বিদায় ভালোবাসায়-শ্রদ্ধায়।


ফরিদ আহমদ দুলাল কবি ও প্রাবন্ধিক, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব