বিনোদিনীর যৌনতা ও মনোবিকার ॥ অনুপম হাসান


হিংসা-দ্বেষ, ক্ষোভ, লোভ-লালসা, মোহ-মায়া, প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা, অপ্রাপ্তির বেদনা প্রভৃতি মানবপ্রবৃত্তির অনিবার্যতা। এসব মানবমনে চেতনে কিংবা অবচেতনে বিদ্যমান ও ক্রিয়াশীল থাকে; তা বোঝা যাক বা না যাক- সংগোপনে থাকেই প্রবৃত্তির এসব ক্রিয়া। কখনো এর কোনোটির প্রাবল্য বেড়ে যায়, কখনো আবার কোনো প্রবৃত্তি একেবারে নিঃশেষিত কিংবা নিস্তেজ হয়ে পড়ে; এ ধরনের যেকোনো অবস্থাই অসুস্থতা বা মানসিক রোগের পূর্বাভাস। প্রবৃত্তির এ জাতীয় বিপর্যের কারণে কখনো কখনো মানুষকে সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনোরোগবিদগণেরও শরণাপন্ন হতে হয় কিংবা তাদের চিকিৎসা নিতে হয়, নয়তো মানসিক বিকৃতি চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যার অনিবার্য পরিণাম হিসেবে চিরদিনের জন্য ব্যক্তিকে স্বাভাবিকতা হারাতে হতে পারে। একথাও প্রসঙ্গত মনে রাখতে হবে যে, এসব ক্ষেত্রে অধিকাংশ বাঙালিই চিকিৎসকের কাছে যায় না, অথবা বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণও মনে করে না। দীর্ঘদিন যাবত মনোবিকার কিংবা উন্নাসিক অবস্থা চলতে থাকার পরও যারা চিকিৎসকের শরাণাপন্ন হয় না, পরিণামে তারা উন্মাদ হয়ে পড়ে কিংবা পথেঘাটে পাগলের ন্যায় জীবনযাপন করে অথবা পরিবারের লোকজন কর্তৃক তাদেরকে পাগলা গারদে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। যেকোনো মানুষেরই এ জাতীয় মতিভ্রম ঘটতে পারে। অধিক মানসিক চাপ গ্রহণ করতে না পেরে যে কোনো ব্যক্তিরই এ ধরনের মনোবিকার ঘটতে পারে এবং সেটা প্রতিনিয়ত সমাজে ঘটেও; কখনো চোখে পড়ে কখনো পড়ে না। প্রবৃত্তিগত তীব্র তাড়না এবং মানসিক বিভ্রম নিয়ে এই লম্বা ভূমিকার পেছনে রয়েছে মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) বিখ্যাত উপন্যাস ‘চোখের বালি’র (১৯০৩) নায়িকা বিনোদিনীর যাপিত জীবন কতটা স্বাভাবিক ছিল অথবা আদৌ স্বাভাবিক ছিল কিনা, তার আদ্যোপান্ত ইতিহাস বোঝার চেষ্টা করে দেখা।

বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে নারী হিসেবে প্রথম সারির দুই তিনজনের একজন বিনোদিনী; যে কিনা নিজের আকাঙ্ক্ষার কথা অকপটে স্বীকার করেছে এবং অবলীলায় সমাজের প্রথাগত নিয়মকে অস্বীকার করে স্বীয় আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য সাধ্যমতো চেষ্টাও করেছে। স্বচেষ্টায় বিনোদিনী প্রবৃত্তির তাড়না তৃপ্তিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং পরিণামে সমাজের বিরুদ্ধে হিংস্র হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ বিনোদিনী যখন উপলব্ধি করেছে সমাজের বিদ্যমান কারাগারে থেকে নিজের চাওয়াকে পূরণ করতে পারবে না, তখন তার মনে খুব স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হিংসার আগুন জ্বলে ওঠে, আর সেই আগুনেই মহেন্দ্র-আশার সুখের দাম্পত্য সে নিমিষেই পুড়িয়ে দিয়েছে। এই ঘটনা বিনোদিনী কিভাবে ঘটিয়েছে বা কেন করেছে, তার সূক্ষ্মতর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য; অন্যথা অকারণে বিনোদিনীর স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘাড়ে দোষের বোঝা চেপে বসবে। আমাদের সমালোচকবৃন্দ এক্ষেত্রে একচক্ষু হয়ে বিনোদিনীকে দায়ী করেছেন; কেউবা বিনোদিনীকে দেখেছেন সহানুভূতির চোখে; আবার বিনোদিনীর ক্রিয়াক্রর্মের নিয়ন্তা কিংবা স্রষ্টা হিসেবে রবীন্দ্রনাথও দায়ী হয়েছেন।

একথা নতুন করে বলার দরকার নেই আমরা জানি যে, বিনোদিনী অকালে বিধবা হয়ে প্রাপ্ত বয়সে সুস্থ যৌনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। বলা যায়, সামাজিক সংস্কারের কারণেই বিনোদিনী উদ্ভিন্ন যৌবনেও যৌনাচার থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়েছে সামাজিক নিয়ম তথা সংস্কারের কারণে; কিন্তু ভেবে দেখা হয় নি, কী তার অপরাধ? বিনোদিনী বিধবা হওয়ারও প্রায় পঞ্চাশ বছর আগেই রাষ্ট্র ‘বিধবা-বিবাহ’ আইন (১৮৫৫) পাস করেছিল; অথচ অর্ধশত বছর পরে যুবতীর অকাল বৈধব্য তাকে সামাজিক সংস্কার পালনে বাধ্য করেছে; তার দ্বিতীয় বিয়ের সুযোগ মেলেনি, এমনকি প্রণয়েরও না! কেন বিনোদিনীর বিয়ের সুযোগ মেলে নি- এ প্রশ্ন উঠতেই পারে; কিন্তু সমাধান সহজে মেলে না। কেননা অর্ধ-শতাব্দীকাল পূর্বেই বিধবা-বিবাহ আইন পাস হলেও তখনো হিন্দু রক্ষণশীল সমাজে বিধবা নারীর বিয়ে সহজতর ছিল না; কেননা প্রচলিত সমাজ বিধবা বিয়েকে উৎসাহ দেয়নি। সমাজ-সংস্কারের অনিবার্য ফল ভোগ করতে হয়েছে বিনোদিনীর মতো হাজার হাজার যৌবনপ্রাপ্ত নারীকে শারীরিক আকাঙ্ক্ষাকে অবদমনের মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের (১৮৫৬-১৯৩৯) মনোবিকলন তত্ত্বের প্রতিফলন লক্ষণীয় বিনোদিনীর জীবনবাস্তবতায়; যে যৌনতা মানুষের সাময়িক উত্তেজনা হিসেবে গণ্য করা হতো, তা ফ্রয়েডের মনোবিকলন তত্ত্ব প্রকাশের পরে হয়ে উঠল মানবজীবন তথা জীবন-চেতনাপ্রবাহ ব্যাখ্যার মূল উৎস, বলা যায় কেন্দ্রবিন্দু। এ প্রসঙ্গে সমালোচকের মন্তব্য নিম্নরূপ : কার্যত সাহিত্যে ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণ তত্ত্বের আবিষ্কারের ফলে মানুষের মন, মনের নানামুখী ক্রিয়া, যৌন অবদমন, অবদমনের ফলে নানামুখী শারীরিক-মানসিক সমস্যা, একাকিত্ব, স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, মৃত্যুচিন্তা প্রভৃতি বিষয় আবার নতুনভাবে রূপ পেতে শুরু করল নবতর শিল্পমাধ্যম উপন্যাসে। (নীলিমা আফরিন, ২০১৪, বাংলাদেশের উপন্যাসে মনোবিশ্লেষণ)
সমালোচকের উপরের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় ‘যৌন-অবদমন’ মানবমনের উপর বিচিত্র প্রভাব ফেলতে পারে, এমনকি ব্যক্তিমানুষ বিকারগ্রস্তও হতে পারে কিংবা হয় অথবা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তির জীবনে এই প্রবৃত্তি অবদমনের প্রভাব অনিবার্য হয়ে ওঠে। আমরা একথা জানি যে, বিনোদিনীর ক্ষেত্রে যৌন-অবদমন তার স্বেচ্ছাকৃত ছিল না, এই বাধ্যবাধকতা তার ওপর সামাজিকভাবে আরোপিত ছিল; আরোপিত নিয়ম অন্যায় হলেও সেকালের নারীসমাজ এসব সংস্কারকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছিল অথবা মানতে বাধ্য ছিল তারা। দু’একজন হয়তো গোপনে সমাজের নিয়ম ভেঙে কিংবা সমাজের চোখ ফাঁকি দিয়ে স্বীয় প্রবৃত্তির চাহিদা মিটিয়েছে; এর চেয়ে বেশি কিছু নয়।

‘চোখের বালি’ উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অকাল বিধবা বিনোদিনীকে আমাদের সামনে তুলে ধরলেন- সে সামাজিকভাবে যৌন-অবদমন তথা সংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ; কিন্তু সামাজিক এ প্রক্রিয়াকে মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেনি বিনোদিনী; সে নিজের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছে সমাজের সামনে বুক ফুলিয়ে। একথা বোঝার জন্য বেশিদূর যেতে হয় না; বিহারীর কাছে তার নির্বিকারভাবে প্রণয় প্রার্থনা করার মধ্য দিয়েই তা প্রকাশ হয়ে পড়ে। কোনো বিধবা নারীর পক্ষে সেকালে যৌনতার ব্যাপারে সামাজিক যেসব শৃঙ্খলা ছিল, তা অস্বীকার করেই বিনোদিনী রাতের অন্ধকারে বিহারীর ঘরে ঢুকে সামাজিক নিয়মের বাইরে দাঁড়িয়েই তো নিজের শরীরিক চাহিদা পূরণ করতে চেয়েছে। তার এই চাওয়াকে খুব সোজাসাপ্টা অন্যায় বলার সুযোগ নেই, বরং বিনোদিনীর এই চাওয়াকে ব্যক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের অধিকার হিসেবেই গণ্য করা ভালো। সেখানে যখন বিনোদিনী ব্যর্থ হয়, তখন বিনোদিনীর যৌন-অবদমন প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে; তার প্রতিহিংসা মূলত সমাজের ওপর তথা সমাজ আরোপিত সংস্কারের ওপর কিংবা নির্দিষ্ট করে বললে বলতে হবে বিহারীর ওপর। কিন্তু এই প্রতিহিংসা বিনোদিনী প্রকাশ করবে কিভাবে অথবা তার বাস্তবায়ন পদ্ধতি কী হবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিহারীর নির্বিকার প্রত্যাখ্যান হয়তো ব্যক্তিগত, তবে তা যে খানিকটা সমাজ-শাসিতও সেকথা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিহারীর নিকট প্রত্যাখ্যাত হয়ে বিনোদিনীর প্রতিহিংসার আগুন গিয়ে পড়ে আশালতার দাম্পত্যের ওপর; কেননা একদিন তো এমন ছিল- ঐ সংসার তারই হতে পারতো। সম্ভবত এসব কারণেই আশালতার সুখের দাম্পত্য তছনছ করে দেয়ার সমস্ত আয়োজন করে বিনোদিনী কামার্ত মনোবিকারে। সুতরাং বলতে বাধা থাকে না যে, নিজের শারীরিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়েই মূলত বিকারগ্রস্ত বিনোদিনীর অন্যের সুখের সংসার তছনছ করে দেয়ার মধ্যে আত্মতৃপ্তি খুঁজেছে। অর্থাৎ বিনোদিনী মূলত অনিচ্ছাকৃত যৌন-অবদমনের কারণেই মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে অন্যের (আশা-মহেন্দ্র) সুখের দাম্পত্য তথা যৌনজীবনের প্রতি ক্ষোভে জ্বলে উঠেছে এবং সামাজিক বিধি-নিষেধ উপেক্ষা করে হলেও কিংবা নিজের ক্ষতির সমূহসম্ভাবনা থাকার পরও মহেন্দ্রকে সাথে নিয়ে ঘর ছেড়েছে। বিনোদিনীর এ আচরণকে বিকারগ্রস্ত হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে এজন্য যে, মহেন্দ্রকে নিয়ে ঘর ছাড়লেও বিনোদিনী মুহূর্তের জন্যও তাকে স্পর্শ করতে দেয়নি; অথচ মহেন্দ্রর সাথে তার অচরিতার্থ যৌনতা সফল করার সুযোগ ছিল। তারপরও বিনোদিনী তা করা থেকে বিরত থাকার মধ্য দিয়ে মূলত তার অচরিতার্থ যৌন-অবদমনজনিত যে মানসিক বিকার ঘটেছিল, তারই প্রতিফলন ঘটেছে।

মানুষ যখন সচেতনভাবে কিংবা সমাজের চাপে বাধ্য হয়ে শরীরের আকাঙ্ক্ষাকে দমন করতে বাধ্য হয়, তখন মনে মনে এক ধরনের বিদ্রোহ কিংবা ক্ষোভ চেতনে বা অবচেতনে তৈরি হতেই পারে। চেতন কিংবা অবচেতন মনের সেই ক্ষোভ-বিদ্রোহ হয়তো স্বাভাবিক মাত্রাও ছাড়িয়ে যেতে পারে, আর যখন মানবপ্রবৃত্তির কোনো একটি স্বাভাবিকতা হারায় তখন সেই মানুষের আচরণ সমাজের অন্যদের মতো থাকে না, ফলে সে দোষের ভাগীদার হয়, নয়তো তাকে উন্মাদ আখ্যায়িত করে সমাজের বাইরে বের করে দেয়া হয়। বিনোদিনীর ক্ষেত্রেও অনেকটা সেরকমই ঘটেছে, রবীন্দ্রনাথ তার যৌনতাকে সমাজে স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ হয়ে উপন্যাসের পরিণামে তাকে কাশীতে প্রেরণ করে স্বস্তি লাভ করেছেন। বিনোদিনীর কাশীগমন কিংবা তার বৈধব্যের আচারণীয় কর্তব্য অস্বীকার করে সামাজিক সংস্কারের বিরুদ্ধাচারণ নিয়ে কথা হলেও তার যৌন-অতৃপ্তির ফলে যে মানসিক বিকার ঘটেছিল তা নিয়ে তেমন কোনো কথা ওঠে নি, অথবা বিষয়টিকে আমাদের সাহিত্যসমালোচকগণ সেভাবে দেখারই সুযোগ পান নি।

উপন্যাসের ঘটনাবর্তে বিনোদিনীর যাপিত জীবনের ইতিবৃত্ত একটু মনোযোগ দিয়ে বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়, যে বয়সে তার যা প্রাপ্য ছিল, বিনোদিনী তা থেকে নিয়তি এবং সমাজের কারণে বঞ্চিত হয়েছে। এই বঞ্চনাকে বিনোদিনী প্রথমে দমন করেছে অথবা করতে বাধ্য হয়েছে, কিন্তু ক্রমে ক্রমে সে বয়সের পূর্ণতায় উপনীত হলে, স্পষ্ট করেই বুঝেছে- তার প্রাপ্য তার কাছ থেকে সমাজ-সংসার নিয়মের নাম করে কেড়ে নিয়েছে। ফলে এসবের বিরুদ্ধে ক্রমেই বিনোদিনীর মানসিক চাপ বেড়েছে; বিশেষত মহেন্দ্রর মা রাজলক্ষ্মী যখন বিনোদিনীকে কলকাতায় তাদের বাড়িতে থাকার জন্য নিয়ে আসে, তখন সে চোখের সামনেই দেখে- তার চেয়ে কম সুন্দরী আশালতার সুখের দাম্পত্যজীবন! এই দেখাতেও হয়তো কোনো সমস্যা ছিল না; যদি না একদিন মহেন্দ্রর সাথে তার বিয়ের কথা হতো! চোখের সামনে আশালতার সুখের দাম্পত্য দেখে আর ভাবে- এসবই তার হতে পারতো! মূলত এই ভাবনাই বিনোদিনীকে অস্বাভাবিক প্রবৃত্তি চরিতার্থের দিকে হাঁটতে উদ্বুদ্ধু করে; একদিকে অকাল বৈধব্যের যাতনা, অন্যদিকে চোখের সামনে নিজের প্রাপ্তিকে অন্যের হতে দেখে বিনোদিনীর মনে হিংসা অথবা ক্ষোভের জন্ম নেয়। তাছাড়া দিনের পর দিন পূর্ণ যৌবনা বিনোদিনী শরীরের চাহিদাকে সমাজ-সংস্কারের কারণে নিবৃত্ত করতে বাধ্য হয়ে, তার অবদমিত মনও অবচেতনে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। হিংসা, অবদমনের বিদ্রোহ এবং যৌনতা বিনোদিনীকে বিকারগ্রস্ত করে ফেলে এবং বিকারের পূর্বাহ্ণেই বিহারীর কাছে তার যৌন চাহিদা পূরণের প্রত্যাশা করে; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যেকোনো কারণেই হোকে, বিহারীকে রোধ করেন এবং বিনোদিনীকে ফিরিয়ে দেন। এরকম পর্যায় বিনোদিনী কেন, যেকোনো মানুষই যৌনবিকারগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে; বিনোদিনীর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ফলে বিনোদিনীর হিংসার আগুন সবটাই গিয়ে পড়েছে আশালতার সংসারের ওপর।

বিনোদিনীর প্রতি একদিকে বিহারীর অবহেলা, অন্যদিকে তার প্রতি মহেন্দ্রর অনাকাঙ্ক্ষিত আকর্ষণ বিনোদিনীকে চরম অধঃপতনের সুযোগ করে দেয় এবং মহেন্দ্রকে স্বীয় দৈহিক আকর্ষণের মোহে সম্পূর্ণ অন্ধ করে তুলতে সক্ষম হয় বিনোদিনী। এখানে মূলত দেখার বিষয়- বিনোদিনীর মানসিক প্রবৃত্তিগুলো নানাভাবেই চাপের মধ্যে পড়েছে। প্রথমত সমাজ সংস্কারের নামে, দ্বিতীয়ত আশালতার সুখের দাম্পত্য, যা আসলে বিনোদিনীর হতে পারতো, তৃতীয়ত বিনোদিনীর যৌনাবেদনের প্রতি বিহারীর চরম উপেক্ষা; কথাবাহুল্য সবগুলো ঘটনাই বিনোদিনীকে মানসিক চাপের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল- যা তাকে অস্বাভাবিক পথে হাঁটতে বাধ্য করেছিল। এখানে যদি ধরে নেয়া যায়, বিহারীর কাছ থেকে বিনোদিনী যৌনতৃপ্তি লাভ করতে পারতো, তাহলে হয়তো উপন্যাসে আশালতা-মহেন্দ্রর দাম্পত্যজীবন ঘিরে যে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা হওয়ারই কোনো সুযোগ ছিল না। যে বিহারীর কাছে একদিন বিনোদিনী হাঁটুমুড়ে প্রণয় কিংবা যৌনতা প্রাপ্তির প্রত্যাশা করেছিল, সেই বিনোদিনী যখন সমাজ-সংসারের প্রতি চরম প্রতিশোধ গ্রহণ করে মহেন্দ্রকে ঘর ছাড়া করতে সক্ষম হয়, তখন বিনোদিনীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় বিহারী; চরম প্রতিশোধপরায়ণ বিনোদিনীর পক্ষে তখন আর কারো প্রণয় গ্রহণ করাও বোধহয় সম্ভব ছিল না। সম্ভবত এ কারণেই তখন বিহারীর বিয়ের প্রস্তাবে স্বীয় যৌবনকে সার্থক করে তোলার সুযোগ থাকলেও বিনোদিনী তা অবহেলায় পরিত্যাগ করেছে; কেননা তখন তো সে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। বিনোদিনীর এই মানসিক ভারসাম্যহীনতাকে পুঁজি করেই রবীন্দ্রনাথ তাকে কাশীতে পাঠিয়ে দিয়েছেন বাকি জীবন ধর্মেকর্মে নিয়োজিত থাকতে।

বিনোদিনী যদি মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত না হতো, তাহলে মহেন্দ্রকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যাওয়ার পর, খুব স্বাভাবিকভাবেই তার সাথে যৌনসম্পর্ক তৈরি করতে পারতো; কিন্তু বিনোদিনী তা করা থেকে বিরত থেকেছে। কেন থেকেছে? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা খুব দরকার। এখানে আবার নতুন প্রশ্নও উত্থাপিত হয় যে, শুধুমাত্র যদি যৌনতৃপ্তির আশায়-ই মহেন্দ্রকে হরণ করা বিনোদিনীর উদ্দেশ্য ছিল, তাহলে মহেন্দ্রকে নিয়ে পালিয়ে পাওয়ার পর তার সাথে যৌনতায় লিপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে তো বিনোদিনীর কোনো বাঁধা ছিল না; কিন্তু তার কেশাগ্র পর্যন্ত মহেন্দ্রকে স্পর্শ করতে দেয়নি, শরীর তো দূরের কথা। তাহলে আশালতার কাছ থেকে মহেন্দ্রকে হরণ করে বিনোদিনীর কী লাভ হলো? এখানে মূলত লাভের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে- বিনোদিনীর মানসিক বিকারগ্রস্ততা; যৌবনে বিনোদিনীর যৌন-অপ্রাপ্তি তাকে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন করে তুলেছিল বিধায় সে তার শরীরের প্রতি পুরুষের চাহিদা কতটা প্রবল হতে পারে, সেটা দেখাতে চেয়েছিল; আর সেটা যে ছিলই তা মহেন্দ্রর ক্রিয়াকলাপে বেরিয়ে এসেছে। আর বিনোদিনী স্বীয় যৌবনের চাহিদাকেই সমাজের সামনে তুলে ধরতেই মহেন্দ্রর সাথে এমন একটি নাটক করেছে; যে নাটকের পেছনে রয়েছে তার মানসিক বিকারগ্রস্ততা।

উপন্যাসের ঘটনা হয়তো সম্পূর্ণ বদলে যেত বিহারী যদি রাতের অন্ধকারে বিনোদিনীর প্রণয়ের প্রতি সম্মান দেখাত, যদি তাকে বুকে টেনে নিত, যদি তাকে সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দিত অথবা ন্যূনতম পক্ষে হলেও বিনোদিনীর যৌনদাবি পূরণ করত; তাহলে হয়তো আশালতা-মহেন্দ্রর দাম্পত্য নিয়ে উপন্যাসের ঘটনাবর্তে যে ঝড় উঠেছিল তা ওঠার কোনো সুযোগই ছিল না। কেননা বিনোদিনীর অবদমিত যৌন-আকাঙ্ক্ষা যদি বিহারীর নিকট থেকে তৃপ্তি লাভ করত তাহলে তার প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠারও সুযোগই হয়তো থাকত না, কিংবা এ নিয়ে তার মানসিক বিকারও ঘটত না। এক্ষেত্রে বলা অন্যায় হবে না যে, বিনোদিনীর যৌন-অবদমনের ফলে যে মানসিক বিকার সৃষ্টি হয়েছিল তার পেছনে প্রথম দায়ী সমাজের সংস্কার, দ্বিতীয়ত দায়ী বিহারী। সমাজ যদি বিনোদিনীকে দ্বিতীয়বার বিয়ের সুযোগ দিত অথবা তাকে বৈধব্যব্রত পালনে বাধ্য না করত, কিংবা বিহারীর নিকট থেকে বিনোদিনী অবৈধ হলেও যে প্রণয়ের প্রত্যাশা করে রাতের অন্ধকারে তার কাছে ছুটে গিয়েছিল, সে যদি বিনোদিনীকে অবৈধভাবেও যৌনতৃপ্তি দিতে সম্মত হতো, তাহলেও উপন্যাসের ঘটনাবর্তে নতুন কোনো সংকটের সৃষ্টি হতো না বলেই আমাদের বিশ্বাস।

অতএব পরিণামে আমরা একথা বলতে পারি যে, বিনোদিনী বাধ্য হয়েছিল যৌন-অবদমন করতে; যা মূলত সমাজ তার ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল সংস্কারের নামে; সেই সংস্কার উপেক্ষা করেও বিনোদিনী চেয়েছিল যৌন-চাহিদাকে পূরণ করতে- যা অবৈধভাবে হলেও বিহারীর পক্ষে বিনোদিনীকে দেয়া সম্ভব ছিল। বিনোদিনীর ওপর চাপিয়ে দেয়া সংস্কার এবং বিহারীর উপেক্ষা তাকে চূড়ান্তভাবে মতিভ্রমের পথে ঠেলে দিয়েছে। অতএব বিনোদিনীর মানসিক বিকারগ্রস্ততার পেছনে যেমন সমাজের সংস্কার দায়ী, একইভাবে বিহারীর উপেক্ষাও সমানভাবে কিংবা আরো খানিকটা অধিক দায়ী। সামগ্রিক এই বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, পরিণামে যে বিনোদিনীকে কাশীতে যেতে হয়েছিল, সেটা রবীন্দ্রনাথের স্বেচ্ছাকৃত নয়, বরং বিনোদিনীর নিজর সিদ্ধান্ত ছিল। অর্থাৎ বিনোদিনীর জীবন-পরিণাম ব্যর্থ হওয়ার পেছনে রবীন্দ্রনাথের হাত নেই; বরং সমাজ-সংস্কার এবং বিহারীর উপেক্ষা তাকে বিকারগ্রস্ত করে তোলায় তার জীবন ব্যর্থ হয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ স্রষ্টা হিসেবে বিনোদিনীর সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাকে নির্বিঘ্নে কাশীতে যাওয়ার পথ করে দিয়েছেন মাত্র।